|
প্রীতির বন্ধন
যুথিকা
বড়ুয়া
রক্তের
সম্পর্ক সবচে' বড়ো সম্পর্ক।
আপনজন যত দূরেই থাকুক,
সম্পর্ক চিরকাল অটুট থাকে। কখনো ছিন্ন হয়ন... আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়,
দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্নভাবে থাকার কারণে সম্পর্কের গভীরতা ক্রমশ কমে আসে।
আগের মতো টান আর থাকে
না। তদ্রুপ অনাত্মীয়া, অজানা অপরিচিত মানুষের সাথে অগাধ মেলামেশায় এবং উদয়স্ত মুখ
দর্শনে সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠাও খুব
স্বাভাবিক।
যার সূত্র ধরে অচিরেই হৃদয়
গহ্বরে জন্ম নেয় শ্রদ্ধা, স্নেহ-মমতা আর ভালোবাসা।
যে-ভালোবাসায় কোনো
স্বার্থ নেই। কোনো
চাহিদা নেই। নেই কোনো ঈর্ষা, ক্রোধ, মান-অভিমান, অনুযোগ ও অভিযোগ।
যার সঙ্গে রক্তের কোনো
সম্পর্ক নেই।
যেমন
আমাদের প্রতিবেশী পারুলের সঙ্গে মাত্র দু'দিনের আলাপচারিতায় গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব।
পারুল খুউব মিশুকে এবং মিষ্টি স্বভাবের
মেয়ে।
কথায় কথায় খালি হাসে।
প্রথম দর্শনেই
আবেগাপ্লুত হয়ে সহৃদয়ে এমন অমায়িকভাবে আমায় 'দিদি' বলে সম্বোধন করলো, মনে হলো ও
যেনো আমার অনেক দিনের চেনা, অনেক কাছের, বহু দিনের সম্পর্ক ওর সঙ্গে।
যাযাবরের
মতো জীবন পারুলের।
ওর
স্বামী চাকুরীর সুবাদে
দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ায়।
প্রবাস জীবনে শতো
ব্যস্ততা আর প্রতিকূলতার মধ্যেও অবসর সময়ে আমাদের কথা হতো টেলিফোনের মাধ্যমে।
গল্প করতো মিডল ঈষ্টের।
শুনতাম, জানা দেশের বহু
অজানা কথা।
কিন্তু দিদি বলে ডাকলেই
আবেগাপ্লুত হয়ে মুহূর্তেই কোমল হৃদয়টা আমার গহীন মমতায় ভরে গিয়ে মনশ্চক্ষে ভেসে
উঠতো, পুতুলের মতো আমার ছোট্টবোন মিনুর গোলাপ গালের তুলতুলে নরম মসৃণ দুষ্টু-মিষ্টি
সেই মুখখানা।
হারিয়ে যেতাম কৈশোরের হাজার
মায়া জড়ানো সোনা-ঝরা দিনের অম্লান স্মৃতির মণি-মেলায়।
যখন উন্মুক্ত নীলাকাশের
নীচে মখ্মলে সিগ্ধ সবুজ ঘাসের 'পরে কিংবা নাম না জানা প্রস্ফূটিত
লাল-নীল-হলদে-বেগুনী ফুলের বিকশিত পাঁপড়িগুলিতে ঝাঁকে-ঝাঁকে উড়ে এসে বসা রং-বেরংয়ের
ফড়িং, প্রজাপতি দেখলেই মিনু উর্দ্ধঃশ্বাসে ছুটে যেতো দু'হাতে ওদের জড়িয়ে ধরতে।
ততক্ষণে
বুদ্ধিরচাতুর্য্যে ওরা চোখের পলকে ওকে ফাঁকি দিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে পালাতো।
মিনুও প্রাণপনে মরিয়া
হয়ে ছুটতো ওদের পিছু-পিছু।
কিন্তু ধরতে না পারার
চরম ব্যর্থতায় ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে, হাতের আঙ্গুলগুলি কামড়ে ধরে, পা-দু'টো বাঁকা করে
অশ্রুসিক্ত চোখে এমন করুণ দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকতো, বুকটা চকিতে মোচড় দিয়ে উঠলেও
হাসি চেপে রাখা যেতো না।
মিনু ভ্যাঁ করে কেঁদে
উঠতো অপমানে।
তখন ওকে শান্ত করতে গিয়ে বুকের
গভীরে জড়িয়ে ধরে আদর করে ওর কপালে-গালে
চুমোয়-চুমোয়
অবুঝ মনটা ওর মুহূর্তেই
অনাবিল খুশীতে ভরিয়ে দিতাম।
আর তক্ষুণিই ওর
আঁধার-মলিন মুখে ঝিলিক দিয়ে খিল্-খিল্ শব্দে বয়ে যেতো হাসির ঝর্ণা।
হঠাৎ
একদিন পারুল সপরিবারে দেশান্তর হচ্ছে শুনে মেঘের আড়ালে সূর্য ডুবে যাবার মতো
উৎফুল্ল মনটা আমার তৎক্ষণাৎ বিষাদে ভরে গেল।
অবিনার্য কারণেই ঘনিয়ে
এলো বিদায়ের পালা।
কিন্তু বিদায় মানেই তো
বিচ্ছেদ।
আর বিচ্ছেদ মানেই বেদনা।
যা আমার কোমল হৃদয়কে
বড্ড বেশি কষ্ট দেয়।
কিন্তু কেনো? পারুল তো
আমার কেউই হয় না।
বছর তিনেক আগেও তো ওকে চিনতাম
না, জাতাম না।
তাহলে!
হয়তো
অদৃশ্য এক দৃঢ় বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছিলাম বলেই।
ওকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম
বলেই।
তাই সারারাত চোখের পাতা দুটোকে
এক করতে পারিনি।
ভিতরে-ভিতরে ক্ষণপূর্বের
বেদনাময় গহীন অনুভূতিগুলি বারবার দংশনে অন্তরের কষ্ট-বেদনাগুলিই তরল হয়ে অঝোরে নয়নে
শুধু বয়ে যেতে লাগলো।
আর তখনিই মনে পড়ে গেলো,
ঠিক এমনি করেই অদৃশ্য মায়াজ্বালে জড়িয়ে, অশ্রুজলে হৃদয়ের দুকূল প্লাবিত করে
চিরদিনের মতো বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিলো আমাদের বুলবুল।
বুলবুল
ছোট্ট একটি পাখী।
একদিন কোথা থেকে উড়ে এসে আমাদের
রান্নাঘরের চাল ঘেঁষা বিশাল পেঁপে গাছের ডালে বসে থর্থর্ করে কাঁপছিল।
রক্তে ভিজে যাচ্ছিল ওর
গা।
কিসে যেন কাঁমড়িয়ে ঘা করে
দিয়েছিল।
তাড়ালেও যাচ্ছিলো না।
অবশেষে মিনুর একান্ত
পীড়াপীড়িতেই পাখীটাকে আশ্রয় দেওয়া হলো ঘরের কোণায় এবং যথাযথ সেবা-শুশ্রূষায় একটি
ফুটফুটে শিশুর মতো দুদিনেই চাঙ্গা হয়ে উঠলো।
তখন কি আর ছেড়ে দেওয়া
যায়!
বুলবুল নামকরণেই রয়ে গেল আমাদের
পোষা হয়ে।
থাকতো খাঁচার ভিতরে।
আর উতলা হয়ে মিনু
সারাদিন খাঁচা ধরে বসে থাকতো।
বুলবুলকে কখনোও একা
থাকতে দিতো না।
অথচ নিজে অবোধ শিশু, আর বুলবুল
অবলা প্রাণী।
সারাক্ষণ আবোল-তাবোল বকতো ওর
সঙ্গে।
বুলবুলের মা-বাবা কোথায়।
হারিয়ে গেছে কি-না।
ওর মন খারাপ লাগছে কি-না।
ওর ঠোঁটটা এতো
লম্বা কেনো।
ওর দাঁত নেই কেনো।
কীভাবে খায়।
হাজারটা প্রশ্ন মিনুর।
বুলবুলও যেনো কতো বুঝতো
ওর কথা!
ক্ষণে-ক্ষণে পাখনা মেলে নেচে
উঠতো আর কানে তালা লাগিয়ে কর্কশ কন্ঠে ওর ভাষায় গেয়ে উঠতো 'টিরিট্টি, টিরিট্টি।'
একদিন
খাঁচাটা বারান্দার কার্ণিশে ঝুলিয়ে রাখতে গিয়ে মাটিতে পড়ে বেঁকে যায় খাঁচার দরজাটা।
মোটা তার দিয়ে শক্ত করে
বেঁধে দেওয়া সত্ত্বেও দরজাটা কিছুতেই আর বন্ধ হতো না।
সারাদিন আলগা থাকতো।
ভয় হতো, বুলবুল উড়ে না
পালিয়ে যায়।
কিন্তু তার পরেও প্রায় ন'মাস
প্রভুভক্তের মতো পোষা হয়েছিলো।
ভাবলাম, আমাদের মতোই
বুলবুলও বোধহয় মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছে।
ওদের অন্তরেও
মায়া-মমতা-ভালোবাসা আছে।
কিন্তু ও-যে একটা পাখী!
মানুষের আদর ভালোবাসা ওরা কখনোই বুঝবে না।
যার মূল্য ওরা কোনো দিনই
দিতে পারবে না।
আর সেটাই দৃষ্টান্ত স্বরূপ
প্রমাণিত করে, একদিন দিগন্তের প্রান্তরে ঊষার প্রথম সূর্যের উজ্জ্বল আলো উদ্ভাসিত
হবার পূর্বেই বুলবুল কখন-যে খাঁচা থেকে বেরিয়ে উড়ে পালিয়ে গেলো, আমরা কেউ জানতে
পারলাম না।
ভেবেছিলাম, মুক্ত আকাশের
বিশুদ্ধ বাতাস কিছুক্ষণ উপভোগ করে নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। কিন্তু বুলবুল আর ফিরে আসেনি।
কেঁদে-কেঁদে হয়রান মিনু।
আমরাও বেদনাহত।
কিন্তু কতো দিন!
দিন যায়, মাস যায়, কেটে
যায় বছর।
ততোদিনে শৈশবের ধূলোবালি ঝেড়ে
মিনু কৈশোরে, আর যৌবনে পৌঁছুতেই আমার হৃদয়পটভূমি থেকে ক্রমশ একটু একটু করে মুছে
যেতে লাগল বুলবুলের স্মৃতি।
বিলুপ্ত হতে লাগলো মনের
গভীরে জমে থাকা রাশি-রাশি মায়া-মমতা আর ভালোবাসা।
হয়তো
এমনি করেই একদিন পারুলও আমাদের ভুলে যাবে।
ভুলে যাবে ঋতুর মতো
পরিবর্তিত জীবন যাত্রার অন্তবিহীন পথ চলতে-চলতে পিছনে ফেলে-আসা মানব-প্রীতির
আনন্দময় কিছু স্মৃতি ও ভালোবাসা,
যা প্রাত্যাহিক জীবনে
আমার স্মৃতির পথে অম্লান পাথেয় হয়ে থাকবে।
যুথিকা বড়ুয়াঃ কানাডা প্রবাসী লেখক ও সঙ্গীত শিল্পী
আপলৌডঃ ২১ মার্চ, ২০০৮ |