London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

প্রীতির বন্ধন

যুথিকা বড়ুয়া

রক্তের সম্পর্ক সবচে' বড়ো সম্পর্কআপনজন যত দূরেই থাকুক, সম্পর্ক চিরকাল অটুট থাকে। কখনো ছিন্ন হয়ন... আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্নভাবে থাকার কারণে সম্পর্কের গভীরতা ক্রমশ কমে আসেআগের মতো টান আর থাকে না। তদ্রুপ অনাত্মীয়া, অজানা অপরিচিত মানুষের সাথে অগাধ মেলামেশায় এবং উদয়স্ত মুখ দর্শনে সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠাও খুব স্বাভাবিক। যার সূত্র ধরে অচিরেই হৃদয় গহ্বরে জন্ম নেয় শ্রদ্ধা, স্নেহ-মমতা আর ভালোবাসাযে-ভালোবাসায় কোনো স্বার্থ নেই। কোনো চাহিদা নেই। নেই কোনো ঈর্ষা, ক্রোধ, মান-অভিমান, অনুযোগ ও অভিযোগযার সঙ্গে রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই।

যেমন আমাদের প্রতিবেশী পারুলের সঙ্গে মাত্র দু'দিনের আলাপচারিতায় গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। পারুল খুউব মিশুকে এবং মিষ্টি স্বভাবের মেয়েকথায় কথায় খালি হাসেপ্রথম দর্শনেই আবেগাপ্লুত হয়ে সহৃদয়ে এমন অমায়িকভাবে আমায় 'দিদি' বলে সম্বোধন করলো, মনে হলো ও যেনো আমার অনেক দিনের চেনা, অনেক কাছের, বহু দিনের সম্পর্ক ওর সঙ্গে

যাযাবরের মতো জীবন পারুলেরওর স্বামী চাকুরীর সুবাদে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ায়প্রবাস জীবনে শতো ব্যস্ততা আর প্রতিকূলতার মধ্যেও অবসর সময়ে আমাদের কথা হতো টেলিফোনের মাধ্যমেগল্প করতো মিডল ঈষ্টেরশুনতাম, জানা দেশের বহু অজানা কথা কিন্তু দিদি বলে ডাকলেই আবেগাপ্লুত হয়ে মুহূর্তেই কোমল হৃদয়টা আমার গহীন মমতায় ভরে গিয়ে মনশ্চক্ষে ভেসে উঠতো, পুতুলের মতো আমার ছোট্টবোন মিনুর গোলাপ গালের তুলতুলে নরম মসৃণ দুষ্টু-মিষ্টি সেই মুখখানা হারিয়ে যেতাম কৈশোরের হাজার মায়া জড়ানো সোনা-ঝরা দিনের অম্লান স্মৃতির মণি-মেলায়যখন উন্মুক্ত নীলাকাশের নীচে মখ্‌মলে সিগ্ধ সবুজ ঘাসের 'পরে কিংবা নাম না জানা প্রস্ফূটিত লাল-নীল-হলদে-বেগুনী ফুলের বিকশিত পাঁপড়িগুলিতে ঝাঁকে-ঝাঁকে উড়ে এসে বসা রং-বেরংয়ের ফড়িং, প্রজাপতি দেখলেই মিনু উর্দ্ধঃশ্বাসে ছুটে যেতো দু'হাতে ওদের  জড়িয়ে ধরতেততক্ষণে বুদ্ধিরচাতুর্য্যে ওরা চোখের পলকে ওকে ফাঁকি দিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে পালাতোমিনুও প্রাণপনে মরিয়া হয়ে ছুটতো ওদের পিছু-পিছুকিন্তু ধরতে না পারার চরম ব্যর্থতায় ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে, হাতের আঙ্গুলগুলি কামড়ে ধরে, পা-দু'টো বাঁকা করে অশ্রুসিক্ত চোখে এমন করুণ দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকতো, বুকটা চকিতে মোচড় দিয়ে উঠলেও হাসি চেপে রাখা যেতো নামিনু ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠতো অপমানে তখন ওকে শান্ত করতে গিয়ে বুকের গভীরে জড়িয়ে ধরে আদর করে ওর কপালে-গালে চুমোয়-চুমোয় অবুঝ মনটা ওর মুহূর্তেই অনাবিল খুশীতে ভরিয়ে দিতামআর তক্ষুণিই ওর আঁধার-মলিন মুখে ঝিলিক দিয়ে খিল্-‌খিল্‌ শব্দে বয়ে যেতো হাসির ঝর্ণা

হঠাৎ একদিন পারুল সপরিবারে দেশান্তর হচ্ছে শুনে মেঘের আড়ালে সূর্য ডুবে যাবার মতো উৎফুল্ল মনটা আমার তৎক্ষণাৎ বিষাদে ভরে গেলঅবিনার্য কারণেই ঘনিয়ে এলো বিদায়ের পালাকিন্তু বিদায় মানেই তো বিচ্ছেদ আর বিচ্ছেদ মানেই বেদনাযা আমার কোমল হৃদয়কে বড্ড বেশি কষ্ট দেয়কিন্তু কেনো? পারুল তো আমার কেউই হয় না বছর তিনেক আগেও তো ওকে চিনতাম না, জাতাম না তাহলে!

হয়তো অদৃশ্য এক দৃঢ় বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছিলাম বলেইওকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম বলেই তাই সারারাত চোখের পাতা দুটোকে এক করতে পারিনি ভিতরে-ভিতরে ক্ষণপূর্বের বেদনাময় গহীন অনুভূতিগুলি বারবার দংশনে অন্তরের কষ্ট-বেদনাগুলিই তরল হয়ে অঝোরে নয়নে শুধু বয়ে যেতে লাগলোআর তখনিই মনে পড়ে গেলো, ঠিক এমনি করেই অদৃশ্য মায়াজ্বালে জড়িয়ে, অশ্রুজলে হৃদয়ের দুকূল প্লাবিত করে চিরদিনের মতো বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিলো আমাদের বুলবুল

বুলবুল ছোট্ট একটি পাখী একদিন কোথা থেকে উড়ে এসে আমাদের রান্নাঘরের চাল ঘেঁষা বিশাল পেঁপে গাছের ডালে বসে থর্‌থর্‌ করে কাঁপছিলরক্তে ভিজে যাচ্ছিল ওর গা কিসে যেন কাঁমড়িয়ে ঘা করে দিয়েছিল তাড়ালেও যাচ্ছিলো নাঅবশেষে মিনুর একান্ত পীড়াপীড়িতেই পাখীটাকে আশ্রয় দেওয়া হলো ঘরের কোণায় এবং যথাযথ সেবা-শুশ্রূষায় একটি ফুটফুটে শিশুর মতো দুদিনেই চাঙ্গা হয়ে উঠলোতখন কি আর ছেড়ে দেওয়া যায়! বুলবুল নামকরণেই রয়ে গেল আমাদের পোষা হয়ে থাকতো খাঁচার ভিতরেআর উতলা হয়ে মিনু সারাদিন খাঁচা ধরে বসে থাকতোবুলবুলকে কখনোও একা থাকতে দিতো না অথচ নিজে অবোধ শিশু, আর বুলবুল অবলা প্রাণী সারাক্ষণ আবোল-তাবোল বকতো ওর সঙ্গে বুলবুলের মা-বাবা কোথায়হারিয়ে গেছে কি-নাওর মন খারাপ লাগছে কি-নাওর ঠোঁটটা এতো লম্বা কেনোওর দাঁত নেই কেনোকীভাবে খায়হাজারটা প্রশ্ন মিনুরবুলবুলও যেনো কতো বুঝতো ওর কথা! ক্ষণে-ক্ষণে পাখনা মেলে নেচে উঠতো আর কানে তালা লাগিয়ে কর্কশ কন্ঠে ওর ভাষায় গেয়ে উঠতো 'টিরিট্টি, টিরিট্টি।'

একদিন খাঁচাটা বারান্দার কার্ণিশে ঝুলিয়ে রাখতে গিয়ে মাটিতে পড়ে বেঁকে যায় খাঁচার দরজাটামোটা তার দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া সত্ত্বেও দরজাটা কিছুতেই আর বন্ধ হতো নাসারাদিন আলগা থাকতোভয় হতো, বুলবুল উড়ে না পালিয়ে যায় কিন্তু তার পরেও প্রায় ন'মাস প্রভুভক্তের মতো পোষা হয়েছিলোভাবলাম, আমাদের মতোই বুলবুলও বোধহয় মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছেওদের অন্তরেও মায়া-মমতা-ভালোবাসা আছেকিন্তু ও-যে একটা পাখী! মানুষের আদর ভালোবাসা ওরা কখনোই বুঝবে নাযার মূল্য ওরা কোনো দিনই দিতে পারবে না আর সেটাই দৃষ্টান্ত স্বরূপ প্রমাণিত করে, একদিন দিগন্তের প্রান্তরে ঊষার প্রথম সূর্যের উজ্জ্বল আলো উদ্ভাসিত হবার পূর্বেই বুলবুল কখন-যে খাঁচা থেকে বেরিয়ে উড়ে পালিয়ে গেলো, আমরা কেউ জানতে পারলাম না ভেবেছিলাম, মুক্ত আকাশের বিশুদ্ধ বাতাস কিছুক্ষণ উপভোগ করে নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। কিন্তু বুলবুল আর ফিরে আসেনি

কেঁদে-কেঁদে হয়রান মিনুআমরাও বেদনাহতকিন্তু কতো দিন! দিন যায়, মাস যায়, কেটে যায় বছর ততোদিনে শৈশবের ধূলোবালি ঝেড়ে মিনু কৈশোরে, আর যৌবনে পৌঁছুতেই আমার হৃদয়পটভূমি থেকে ক্রমশ একটু একটু করে মুছে যেতে লাগল বুলবুলের স্মৃতিবিলুপ্ত হতে লাগলো মনের গভীরে জমে থাকা রাশি-রাশি মায়া-মমতা আর ভালোবাসা

হয়তো এমনি করেই একদিন পারুলও আমাদের ভুলে যাবেভুলে যাবে ঋতুর মতো পরিবর্তিত জীবন যাত্রার অন্তবিহীন পথ চলতে-চলতে পিছনে ফেলে-আসা মানব-প্রীতির আনন্দময় কিছু স্মৃতি ও ভালোবাসা, যা প্রাত্যাহিক জীবনে আমার স্মৃতির পথে অম্লান পাথেয় হয়ে থাকবে

যুথিকা বড়ুয়াঃ কানাডা প্রবাসী লেখক ও সঙ্গীত শিল্পী

আপলৌডঃ ২১ মার্চ, ২০০৮

   

আর্কাইভ8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.