|
সরলার সরল কাহিনী
যুথিকা
বড়ুয়া
বাংলাদেশে ধনী
ও প্রভাবশালী মানুষের চেয়ে মধ্যবিত্ত অ নিম্নবিত্ত মানুষের সংখ্যাই বেশি।
এর
মধ্যে বেশির ভাগই হত-দরিদ্র ও অসমর্থ।
অর্থনৈতিক দুর্দশায় শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করা তো দূরের কথা, বলতে গেলে এদেরকে
অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন-যাপন করতে হয়।
এরা
আমাদের সভ্য-সমাজে নিগৃহীত, অবহেলিত ও নিপীড়িত।
এদের
মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াবার ক্ষমতা থাকে না।
এদেরকে
পদে-পদে অপদস্থ এবং মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
এরা
কখনো দেশের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হয় না।
এদের
জীবন-যাপন, জীবিকা নির্বাহ ও পেটের ক্ষুধা নিবারণের খোঁজ কেউ রাখে না।
কোন এক আষাঢ়
মাসে দ্রুতপায়ে হাঁটছিলাম ট্রেন ধরবো বলে।
হঠাৎ
শুনি মানুষের কোলাহল।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি, এক বিশাল দালান-বাড়ীর প্রাঙ্গনে প্রচন্ড ভীঁড়।
লোকে-লোকারণ্য।
খুব
হৈ-চৈ হচ্ছে
।
আমি থমকে
দাঁড়াই।
লোকের
কানাঘুষোয় অবগত হলাম, শিশু অপহরণের দায়ে এক মহিলাকে আটক করা হয়েছে।
ভাবলাম,
এ-আর নতুন কী।
দিনকাল
কবেই-বা ভালো ছিলো।
অহরহই
তো ঘটছেই।
তবু
স্বভাব-সুলভ কারণে মহিলা চোরকে দেখার ইচ্ছাটা প্রবলভাবে জেগে উঠলো।
গিয়ে
দেখলাম, বহুদিনের পুরানো ময়লা ছেঁড়া-বস্ত্র পরিহিতা এক মহিলা একহাত ঘোমটা টেনে বসে
আছে।
ওর কোলে
কাঁথা জড়ানো একটি ছোট্ট দুগ্ধপোষ্য শিশু।
ওর
দু'হাতে একগোছা রং-বেরংয়ের প্লাষ্টিকের চুড়ি।
পায়ে
কবেকার হাওয়াই চটি।
নোংরায়
ভর্তি বড়-বড় নখ।
পা-দুটোও ফুলে ফেঁপে উঠেছে।
ওর পা
বেয়ে অনবরত ঝরছে বিন্দু-বিন্দু রক্ত।
আপাতদৃষ্টিতে মহিলাটিকে ভিখীরির মতো লাগছিলো।
কেউ
বলছে, 'কূলটা', 'পাপিষ্ঠা'।
আবার
কেউ-কেউ বলছে, পালিয়ে যাচ্ছিস কোথায় চুন্নী? বল্ কোথা থেকে বাচ্চা চুরি করেছিস?
কাদের বাচ্চা চুরি করেছিস, শীগ্গির বল; নয়তো এক্ষুণি তোকে পুলিসে ধরিয়ে দেবো।'
পুলিশের নাম
শুনেই মহিলা থর্থর্ করে কাঁপতে শুরু করে।
ভয়ার্ত
দৃষ্টি মেলে বাচ্চাটিকে শক্তহাতে চেপে ধরে জড়োসড়ো হয়ে বসে।
কিন্তু
উত্তেজিত জনতা মারধোর করবার হুমকি দেখায়।
অশ্লীল
ভাষায় গালি-গালাজ শুরু করে।
রীতিমতো
প্রস্তুতি নিয়ে তেড়ে আসতেই মহিলাটি কান্না জড়িত কন্ঠে আর্তচিৎকার করে ওঠে, 'আমি চোর
নই, আমি সরলা। ও আমার বাচ্চা। কত্ত কষ্টে নয়টা মাস প্যাটে রাইখ্যা আমিই জনম দিছি
অরে।
আমিই অর
মা।'
শিশুটিকে
আলিঙ্গনে জোরে বুকে চেপে ধরে সরলা।
গভীর
মমতায় ওর কপালে একটা চুম্বন করে বললো, 'সংসারে আমাগো কেউ নাই গো বাবু।
সব
ভাইস্যা গ্যাছে।
আমারে
দয়া করেন।'
সরলা
ঘূর্ণিঝড়ে কবলিত
সর্বহারা এক হতভাগী জননী।
জরা-জীর্ণের মতো রুগ্ন শরীর।
বয়সের
তুলনায় অকালেই বুড়িয়ে গিয়েছিলো।
খুটিয়ে
দেখলে বোঝা যায়, যৌবনে কম সুন্দরী ছিলো না সরলা।
ভাগ্যের
নিমর্ম পরিহাসে অনাদরে-অবহেলায় ওর লাবণ্য একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।
ঘটা করে
না হলেও রীতিমতো পুরোহিত ডেকে শাস্ত্র মতেই ওর বিয়ে হয়েছিলো পার্শ্ববর্তী গ্রামের
তরুণ নন্দলালের সঙ্গে।
খাঁটি সোনা
বেঁকে গেলেও যেমন তার মূল্য কমে যায় না, ঠিক তেমনি একজন পুরুষ-মানুষ শতো কুৎসিত
কিংবা বিকলাঙ্গ হলেও আমাদের সমাজে তার পুরুষত্ব কখনো কমে যায় না। আর গেলেও সরলার
মতো মেয়ের তাতে কী-ইবা এসে যায়।
বরং ওর
জন্য শাপে-বর হয়েছিলো।
বিমাতার
নির্যাতনে জীবন-যাপন করার চাইতে পঙ্গু
স্বামীর
ঘর-সংসার করা
ঢের ভালো।
এতো পরম
সৌভাগ্য সরলার।
নন্দলাল
ক্র্যাচ্ ছাড়া চলতে পারতো না।
জীবনের
মৌলিক চাহিদা মেটাতেই ওকে হিমশিম খেতে হতো।
তবে ওর
মনের শক্তি ছিলো প্রচুর।
কখনোও
ভেঙ্গে পড়েনি।
নন্দ
ডাব বিক্রি করতো বাজারে।
এক
হাতেই ঠেলাগাড়ি টানতো।
ঘরে
হাঁস-মুরগী পালতো সরলা।
এভাবে
ওদের দু'টো পেট কোনরকমে চলে যেতো।
অসন্তোষ
অভিযোগ কিছুই ছিলো না।
ছিলো
পরিপূর্ণ সুখ ও শান্তি।
আর ছিলো
সরলার অনাবিল মুখের অনিন্দ্য সুন্দর হাসি, যা কখনোও ম্লান হতো না।
থাকতো
খড়-কূটোর ছাউনি দেয়া ছোট্ট মাটির কুঁড়েঘরে।
প্রত্যেক বছর ওদের গ্রাম বন্যার জলে গৃহহীন হয়ে পড়ে শতো-শতো মানুষ।
মারাও
যায় অনেকে।
যারা
বেঁচে থাকে, তাদের অনেকে অন্ন-বস্ত্র আর আশ্রয়ের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়
গ্রামে-গঞ্জের পথে-ঘাটে, শহরের অলিতে-গলিতে।
সরলাকে
আমি যখন দেখি, তার অল্প কিছুদিন আগে স্বামী-সংসার হারিয়ে পথে নেমেছে সে।
বানের জলে কোথায় যে ভেসে গেছে নন্দলাল
আর সাধের সংসার।
নবজাত শিশুর প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে শহরে আসতে হয় সরলাকে আশ্রয়ের সন্ধানে।
কতো আশা
বুকে নিয়ে নতুন সংসার সাজিয়ে ছিলো সে।
গড়ে
তুলেছিলো
স্বর্গসুখ
কতোনা স্বপ্নীল
আকাঙ্খা সঞ্চিত হয়েছিলো ওর মনের মণিকোঠায়।
অথচ
ভাগ্যের নিমর্ম পরিহাসে অচিরেই হারিয়ে ফেলল সব কিছ।
ভেবেছিলো,
শহরে মাথা গোঁজার মতো একটুখানি আশ্রয় কোথাও হয়তো জুটে যাবে।
সন্তানই
একমাত্র সম্বল,
যার মুখ
চেয়ে জীবনের সব দুঃখ-যন্ত্রণা ভুলে যাবে সরলা।
ভুলে
যাবে স্বামী
নন্দলালকেও।
কিন্তু
মুখে বলা যতো সহজ, বাস্তব ততোই কঠিন।
স্বামী
নন্দলালের
মুখখানা চোখের পর্দায় হঠাৎ ভেসে উঠতেই গহীন বেদনায় বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে সরলার।
দু'হাতে
বুক চাপড়াতে-চাপড়াতে বিলাপ করে বলে, 'আমি তারে রক্ষা করতে পারি নাই
।
আমি যে বচন
দিছিলাম সারা জীবন তার পাশে থাকুম।
রক্ষা
কুরুম। আমি পারি নাই তারে বাঁচাইতে।
আমি
বড়োই নিষ্ঠুর - স্বার্থপর। আমারে ক্ষমা করো প্রভু।
বাচ্চাটারে দয়া করো, আমারে পথ দেখাও।'
কিন্তু সঠিক
মঞ্জিলে পৌঁছনোর সুগম পথ সরলাকে দেখাবে কে? সমাজ বড়ো কঠোর, নিষ্ঠুর ও ভাবলেশহীন।
জীবনে
ধূর্ত-প্রতারকের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হতে-হতে আজ বিলুপ্ত হয়েছে মায়া-মমতা, বিশ্বাস
আর ভালোবাসা।
অস্থিতিশীল এখন সমাজ।
এমন এক
সমাজে কে নেবে সরলার দায়িত্ব? এর সঠিক উত্তর আমাদের কারও জানা নেই।
যুথিকা বড়ুয়াঃ
কানাডা প্রবাসী লেখিকা ও সঙ্গীত শিল্পী।
guddi_2003@hotmail.com
৩ জানুয়ারী,
২০০৮
|