London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

সরলার সরল কাহিনী

যুথিকা বড়ুয়া

বাংলাদেশে ধনী ও প্রভাবশালী মানুষের চেয়ে মধ্যবিত্ত অ নিম্নবিত্ত মানুষের সংখ্যাই বেশিএর মধ্যে বেশির ভাগই  হত-দরিদ্র ও অসমর্থ অর্থনৈতিক দুর্দশায় শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করা তো দূরের কথা, বলতে গেলে এদেরকে অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন-যাপন করতে হয়এরা আমাদের সভ্য-সমাজে নিগৃহীত, অবহেলিত ও নিপীড়িতএদের মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াবার ক্ষমতা থাকে নাএদেরকে পদে-পদে অপদস্থ এবং মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়এরা কখনো দেশের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হয় না।  এদের জীবন-যাপন, জীবিকা নির্বাহ ও পেটের ক্ষুধা নিবারণের খোঁজ কেউ রাখে না

কোন এক আষাঢ় মাসে দ্রুতপায়ে হাঁটছিলাম ট্রেন ধরবো বলেহঠাৎ শুনি মানুষের কোলাহল এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি, এক বিশাল দালান-বাড়ীর প্রাঙ্গনে প্রচন্ড ভীঁড় লোকে-লোকারণ্যখুব হৈ-চৈ হচ্ছে আমি থমকে দাঁড়াইলোকের কানাঘুষোয় অবগত হলাম, শিশু অপহরণের দায়ে এক মহিলাকে আটক করা হয়েছেভাবলাম, এ-আর নতুন কীদিনকাল কবেই-বা ভালো ছিলোঅহরহই তো ঘটছেইতবু স্বভাব-সুলভ কারণে মহিলা চোরকে দেখার ইচ্ছাটা  প্রবলভাবে জেগে উঠলোগিয়ে দেখলাম, বহুদিনের পুরানো ময়লা ছেঁড়া-বস্ত্র পরিহিতা এক মহিলা একহাত ঘোমটা টেনে বসে আছেওর কোলে কাঁথা জড়ানো একটি ছোট্ট দুগ্ধপোষ্য শিশুওর দু'হাতে একগোছা রং-বেরংয়ের প্লাষ্টিকের চুড়িপায়ে কবেকার হাওয়াই চটিনোংরায় ভর্তি বড়-বড় নখ পা-দুটোও ফুলে ফেঁপে উঠেছেওর পা বেয়ে অনবরত ঝরছে বিন্দু-বিন্দু রক্ত আপাতদৃষ্টিতে মহিলাটিকে ভিখীরির মতো লাগছিলোকেউ বলছে, 'কূলটা', 'পাপিষ্ঠা'আবার কেউ-কেউ বলছে, পালিয়ে যাচ্ছিস কোথায় চুন্নী? বল্‌ কোথা থেকে বাচ্চা চুরি করেছিস? কাদের বাচ্চা চুরি করেছিস, শীগ্‌গির বল; নয়তো এক্ষুণি তোকে পুলিসে ধরিয়ে দেবো।'

পুলিশের নাম শুনেই মহিলা থর্‌থর্‌ করে কাঁপতে শুরু করেভয়ার্ত দৃষ্টি মেলে বাচ্চাটিকে শক্তহাতে চেপে ধরে জড়োসড়ো হয়ে বসেকিন্তু উত্তেজিত জনতা মারধোর করবার হুমকি দেখায়অশ্লীল ভাষায় গালি-গালাজ শুরু করেরীতিমতো প্রস্তুতি নিয়ে তেড়ে আসতেই মহিলাটি কান্না জড়িত কন্ঠে আর্তচিৎকার করে ওঠে, 'আমি চোর নই, আমি সরলা। ও আমার বাচ্চা। কত্ত কষ্টে নয়টা মাস প্যাটে রাইখ্যা আমিই জনম দিছি অরেআমিই অর মা।'

শিশুটিকে আলিঙ্গনে জোরে বুকে চেপে ধরে সরলা।  গভীর মমতায় ওর কপালে একটা চুম্বন করে বললো, 'সংসারে আমাগো কেউ নাই গো বাবুসব ভাইস্যা গ্যাছেআমারে দয়া করেন' সরলা ঘূর্ণিঝড়ে কবলিত সর্বহারা এক হতভাগী জননী জরা-জীর্ণের মতো রুগ্ন শরীরবয়সের তুলনায় অকালেই বুড়িয়ে গিয়েছিলোখুটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, যৌবনে কম সুন্দরী ছিলো না সরলাভাগ্যের নিমর্ম পরিহাসে অনাদরে-অবহেলায় ওর লাবণ্য একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছেঘটা করে না হলেও রীতিমতো পুরোহিত ডেকে শাস্ত্র মতেই ওর বিয়ে হয়েছিলো পার্শ্ববর্তী গ্রামের তরুণ নন্দলালের সঙ্গে।  

খাঁটি সোনা বেঁকে গেলেও যেমন তার মূল্য কমে যায় না, ঠিক তেমনি একজন পুরুষ-মানুষ শতো কুৎসিত কিংবা বিকলাঙ্গ হলেও আমাদের সমাজে তার পুরুষত্ব কখনো কমে যায় না। আর গেলেও সরলার মতো মেয়ের তাতে কী-ইবা এসে যায়বরং ওর জন্য শাপে-বর হয়েছিলোবিমাতার নির্যাতনে জীবন-যাপন করার চাইতে পঙ্গু স্বামীর ঘর-সংসার করা ঢের ভালোএতো পরম সৌভাগ্য সরলারনন্দলাল ক্র্যাচ্‌ ছাড়া চলতে পারতো নাজীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই ওকে হিমশিম খেতে হতোতবে ওর মনের শক্তি ছিলো প্রচুরকখনোও ভেঙ্গে পড়েনিনন্দ ডাব বিক্রি করতো বাজারেএক হাতেই ঠেলাগাড়ি টানতোঘরে হাঁস-মুরগী পালতো সরলাএভাবে ওদের দু'টো পেট কোনরকমে চলে যেতোঅসন্তোষ অভিযোগ কিছুই ছিলো নাছিলো পরিপূর্ণ সুখ ও শান্তিআর ছিলো সরলার অনাবিল মুখের অনিন্দ্য সুন্দর হাসি, যা কখনোও ম্লান হতো নাথাকতো খড়-কূটোর ছাউনি দেয়া ছোট্ট মাটির কুঁড়েঘরে প্রত্যেক বছর ওদের গ্রাম বন্যার জলে গৃহহীন হয়ে পড়ে শতো-শতো মানুষমারাও যায় অনেকেযারা বেঁচে থাকে, তাদের অনেকে অন্ন-বস্ত্র আর আশ্রয়ের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায় গ্রামে-গঞ্জের পথে-ঘাটে, শহরের অলিতে-গলিতে।  

সরলাকে আমি যখন দেখি, তার অল্প কিছুদিন আগে স্বামী-সংসার হারিয়ে পথে নেমেছে সে।  বানের জলে কোথায় যে ভেসে গেছে নন্দলাল আর সাধের  সংসার।  নবজাত শিশুর প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে শহরে আসতে হয় সরলাকে আশ্রয়ের সন্ধানেকতো আশা বুকে নিয়ে নতুন সংসার সাজিয়ে ছিলো সেগড়ে তুলেছিলো স্বর্গসুখ কতোনা স্বপ্নীল আকাঙ্খা সঞ্চিত হয়েছিলো ওর মনের মণিকোঠায়অথচ ভাগ্যের নিমর্ম পরিহাসে অচিরেই হারিয়ে ফেলল সব কিছ।   ভেবেছিলো, শহরে মাথা গোঁজার মতো একটুখানি আশ্রয় কোথাও হয়তো জুটে যাবেসন্তানই একমাত্র সম্বল, যার মুখ চেয়ে জীবনের সব দুঃখ-যন্ত্রণা ভুলে যাবে সরলাভুলে যাবে স্বামী নন্দলালকেওকিন্তু মুখে বলা যতো সহজ, বাস্তব ততোই কঠিন

স্বামী নন্দলালের মুখখানা চোখের পর্দায় হঠাৎ ভেসে উঠতেই গহীন বেদনায় বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে সরলারদু'হাতে বুক চাপড়াতে-চাপড়াতে বিলাপ করে বলে, 'আমি তারে রক্ষা করতে পারি নাই আমি যে বচন দিছিলাম সারা জীবন তার পাশে থাকুমরক্ষা কুরুম। আমি পারি নাই তারে বাঁচাইতেআমি বড়োই নিষ্ঠুর - স্বার্থপর। আমারে ক্ষমা করো প্রভু বাচ্চাটারে দয়া করো, আমারে পথ দেখাও।'

কিন্তু সঠিক মঞ্জিলে পৌঁছনোর সুগম পথ সরলাকে দেখাবে কে? সমাজ বড়ো কঠোর, নিষ্ঠুর ও ভাবলেশহীনজীবনে ধূর্ত-প্রতারকের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হতে-হতে আজ বিলুপ্ত হয়েছে মায়া-মমতা, বিশ্বাস আর ভালোবাসা অস্থিতিশীল এখন সমাজএমন এক সমাজে কে নেবে সরলার দায়িত্ব? এর সঠিক উত্তর আমাদের কারও জানা নেই

যুথিকা বড়ুয়াঃ কানাডা প্রবাসী লেখিকা ও সঙ্গীত শিল্পী

guddi_2003@hotmail.com

৩ জানুয়ারী, ২০০৮

   

আর্কাইভ8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.