|
আদালতের মদতে হন্ডুরাসে
সেনাবাহিনীর ক্ষমতা-দখলঃ
প্রেসিডেন্ট
বিতাড়িত
হাইকৌর্ট
থেকে
আসা সরাসরি মদতের সুযোগে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে হন্ডুরাসের
সেনাবাহিনী। এ-ঘটনার সাথে যুক্ততার ব্যাপারে কোনো-কোনো মহল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের
দিকে আঙ্গুল তোলা হলেও তা সরাসরি অস্বীকার করেছেন বারাক ওবামা। এদিকে
স্নায়ু-যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে লাতিন আমেরিকার প্রথম সেনা-অভ্যূত্থানের প্রতিবাদে
রাস্তায় নামতে শুরু করেছেন হন্ডুরাসের জনগণ। ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্টও স্বপদে ফিরে
আসার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
ঘটনার বিবরণে
প্রকাশ, রোববার ভোররাতে শো-দুয়েক সেনা-সদস্যের একটি দল রাজধানী তেগুচিগালপার
পূর্ব-প্রান্তে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট ভবনটি ঘেরাও করে প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল
সেল্যাইয়ার (৫৬) দেহরক্ষীদের অস্ত্র কেড়ে নেয়। এর পর সেনাবাহিনী চাপ-প্রয়োগের
মাধ্যমে সেল্যাইয়াকে প্রতিবেশী দেশ কৌস্টারিকাতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট
সেল্যাইয়া জানিয়েছেন সেনা-বাহিনীর লোক-জন তাকে অস্ত্রের মুখে প্রাসাদ থেকে তুলে
নিয়েছে। ঘটনার বিবরণ প্রকাশ করে ভেনিজুয়েলার তেলেসুর টেলিভিশনকে তিনি বলেন,
‘ওরা
ভোরের দিকে আমার বাড়ীতে ঢুকে গুলি ছুঁড়তে থাকে। তারা বেয়নেট দিয়ে [আমার কক্ষের]
দরোজা ভেঙ্গে ফেলে ও আমাকে গুলি করার হুমকি দিতে থাকে’।
সেনা-অভ্যূত্থানের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য জনগণের উদ্দেশ্যে
ডাক দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট সেল্যাইয়া। এছাড়াও ক্ষমতায় ফিরে আসার ব্যাপারে দৃঢ়
অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তিনি।
জানা যাচ্ছে,
অভ্যুত্থান সংঘটনের পর-পরই সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ
করেন পার্লামেণ্ট স্পীকার রৌবের্তো মিচেলেতি। কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব-গ্রহণের সময়
দু-দিনের জন্য দেশব্যাপী কারফিউ ঘোষণা দেয়া ছাড়াও সেনা-অভ্যূত্থান নয় বরং সম্পূর্ন
আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রেসিডেন্ট পদটি গ্রহণ করার দাবী করেন মিচেলেতি।
সেল্যাইয়ার ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হবার ব্যাপারটিকে অভ্যূত্থান হিসাব স্বীকার করতে
রাজী হননি তিনি। সেল্যাইয়ার দল লিবারেল পার্টির সদস্য মিচেলেতি জানান, দেশের শান্তি
ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য তিনি স্বচ্ছতা ও সততার সাথে বিরামহীনভাবে কাজ করে যাবেন।
সেনাবাহিনীর পক্ষে সোচ্চার সমর্থন ব্যক্ত করে মিচেলেতি বলেন,
‘আমরা
এখন যা করে চলেছি, তা গনতান্ত্রিক’।
সেনাবাহিনী আদালতের নির্দেশনা-মাফিক কাজ করছে বলেন দাবী জানান তিনি।
লক্ষণীয়
ব্যাপার, মিচেলেতি নিজে স্বীকার না করলেও, এটা স্পষ্ট যে, অভ্যূত্থানের আগে-পরে
আদালতের পক্ষ থেকে বস্তুতঃ ক্ষমতা দখল করে নেয়ার পক্ষেই সমর্থন দেয়া হচ্ছে।
সেনা-অভ্যুত্থানের ঘটনাটিকে বৈধতা দান করে সোমবার সুপ্রীম কৌর্ট জানায়, আইনের শাসন
রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা থেকেই সেনা-বাহিনীর এ-কাজটি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনীকে ‘সংবিধানের
রক্ষক’
হিসাবে বর্ণনা করার পাশাপাশি ও পদচ্যুত প্রেসিডেন্ট সেল্যাইয়াকে আইন-বিরোধী
কার্যক্রমের জন্য দায়ী করে সুপ্রীম কৌর্ট। উল্লেখ্য, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে
গণ-ভৌটের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিলেন সেল্যাইয়া। অবশ্য, এর কিছু দিন আগে থেকেই
প্রেসিডেন্টের সাথে বিরোধের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলো সুপ্রীম
কৌর্ট।
প্রসঙ্গতঃ কয়েক
দিন আগে সেনা-বাহিনীর দ্বারা ভৌটের বাক্স পৌঁছে দেয়ার জন্য সরকারী নির্দেশ মান্য না
হবার কারণে সেনা-প্রধান জেনারেল এডমান্ডৌ ঔরেলানাকে বরখাস্ত করেন ম্যানুয়েল
সেল্যাইয়া। এ-ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিরক্ষা-মন্ত্রী পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
বস্তুতঃ সেনা-প্রধানের বরখাস্ত হওয়া ও তার ধারাবাহিকতাতে নৌ ও বিমান বাহিনীর
প্রধানদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেনা-অভ্যূত্থানের ব্যাপারটি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়
বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে অভ্যূত্থানের আগেই আদালতের মাধ্যমে অভ্যূত্থানকে
বৈধতা-দানের ব্যাপারটিকে নতুন এক প্রয়াস হিসাবেই দেখা হচ্ছে।
সুপ্রীম
কৌর্টের সাথে-সাথে আইন-সভা কংগ্রেস থেকে সেনা-অভ্যূথানের ব্যাপারে সমর্থন জ্ঞাপন
করা হলেও, সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, সেনা-অভ্যূত্থানের প্রতিবাদে ইতোমধ্যে বিপুল সংখ্যক
মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছেন হন্ডুরাসে। সেনা-অভ্যূত্থানের ঘটনাতে বিক্ষুব্ধ বহু
মানুষ লাঠিসোঁটা ও স্টীলের রড হাতে নিয়ে রাজপথে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে
বার্তা-সংস্থাগুলো। সোমবার দিনের কোনো এক-সময়ে কয়েক হাজার মানুষের একটি জোট
প্রেসিডেন্ট-ভবনের পুনর্দখল নেয়ার জন্য রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের দিকে এগুতে থাকলে
সেনা-বাহিনী তাদেরকে বাধা দেয়। বিক্ষুব্ধ মানুষ-জন সেল্যাইয়ার সমর্থনে মিছিল করার
সাথে-সাথে তাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার দাবী জানিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০০৫
সালে চার-বছর মেয়াদের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন সেল্যাইয়া। সে-সময় কথা
ছিলো, প্রথম মেয়াদের পরে তিনি আর প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। এ-হিসাব অনুসারে আগামী
জানুয়ারী মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত তার ক্ষমতায় থাকার কথা ছিলো। পরবর্তী সময়ে
এ-ব্যাপারে নতুন করে জন-মত যাচাইয়ের লক্ষ্যে এক গণ-ভৌটের উদ্যোগ নেন সেল্যাইয়া।
রোববার গুরুত্বপূর্ণ গণ-ভোটটি অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিলো। সুপ্রীম কৌর্টের পক্ষ থেকে
গণ-ভৌটকে অবৈধ ঘোষণা করা হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয় সাত-মিলিয়ন
জনসংখ্যার দেশ হন্ডুরাসে। পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, মূলতঃ গণ-ভৌটকে অবৈধ ঘোষণা করে
দেয়া সুপ্রীম কৌর্টের ঘোষণাটির মধ্য দিয়ে হন্ডুরাসে সেনা-অভ্যূত্থানের পথ প্রশস্ত
করে দেয়া হয়।
এদিকে,
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট হুগৌ শ্যাভেস হন্ডুরাসের সেনা-অভ্যূত্থানে
যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করলেও, তা প্রত্যাখান করেছেন মার্কিন
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। শ্যাভেজ জানিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভেনিজুয়েলার
সেনা-বাহিনীকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। সেল্যাইয়াকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে
সম্ভাব্য সকল কিছু করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করার সাথে-সাথে ঘটনার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের
জড়িত থাকার সম্ভাবনার কথাও জানান শ্যাভেজ। হন্ডুরাসের ঘটনা-প্রবাহের ব্যাপারে দেয়া
এক বিবৃতিতে ওবামা জানান, দেশটির প্রেসিডেন্টের গ্রেফতার হয়ে যাবার ব্যাপারটি নিয়ে
তিনি গভীর উদ্বেগের মধ্যে আছেন। উল্লেখ্য, হন্ডুরাসের সেনা-বাহিনীর সাথে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের গাঢ়-সম্পর্কের ব্যাপারটি অবশ্য বেশ পুরোনো। স্মরণ করা
যেতে পারে, প্রতিবেশী নিকারাগুয়াতে ড্যানিয়েল ওর্তেগার নেতৃত্বাধীন বামপন্থী
স্যান্দানিস্তা পার্টিকে ক্ষমতা-চ্যুত করার জন্য হন্ডুরাসের সেনা-বাহিনীকে ব্যবহার
করতো সিআইএ। দেশটিতে সেনা-শাসনের পর্বটিও অবশ্য বেশ দীর্ঘ। ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৮২ সাল
পর্যন্ত সেনা-শাসনাধীনে ছিলো হন্ডুরাস। ইউরৌপীয়ান ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও সেল্যাইয়ার
গ্রেফতারের ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে।
স্মরণ করা যেতে
পারে, সেল্যাইয়া একজন রক্ষনশীল রাজনীতিক হিসাবে ক্ষমতায় আসলেও গত দু-বছর ধরে
তিনি
মার্কিন-বিরোধী অবস্থান অনুসরণ করে যাচ্ছিলেন। এ-সময়-কালে তিনি ভেনিজুয়েলার
প্রেসিডেন্ট হুগৌ শ্যাভেসের একুশ শতকের সমাজতন্ত্র কর্মসুচিরও সমর্থক হয়ে ওঠেন।
লন্ডনঃ ৩২৯ জুন ২০০৯ |