|
জিততে
মরিয়া কারজাইঃ আফগানিস্তানে নারী-বিরোধী
কঠোর আইন
আফগানিস্তানের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুনর্বার জেতার লক্ষ্যে মরীয়া হামিদ
কারজাই সম্প্রতি নারী-বিরোধী কট্টর একটি আইন পাস করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে মঙ্গলবার।
জাতিসংঘের মতে পাস হওয়া আইনটির বলে স্ত্রীর সম্মতি না থাকলেও স্বামী তাকে শারীরিক
সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করতে পারবেন। এছাড়াও আইনানুযায়ী, স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী
ঘরের বাইরেও যেতে পারবেন না। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আলোচ্য আইনটিকে
তালেবান আমলের আইনের চেয়েও জঘন্য হিসাবে সমালোচনা করা হয়েছে।
খবরে
প্রকাশ, নারী-বিরোধী এ-আইনটি পাস হবার পরে গত মাসে এতে স্বাক্ষর করেন কারজাই।
কিন্তু এখন পর্যন্ত এ-আইনের বিস্তারিত কিছুই জন-সম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। তবে
সরকার-ঘনিষ্ঠ সূত্রকে ব্যবহার করে মিডিয়া জানিয়েছে, আইনটি বলা হয়েছে স্বামীর অনুমতি
ছাড়া নারীরা ঘরের বাইরে কাজকর্ম ও শিক্ষা-গ্রহণ করতে পারবেন না। এমনকি ডাক্তারের
কাছে যেতে চাইলেও স্ত্রীকে স্বামীর অনুমতি পেতে হবে। এছাড়াও ইচ্ছা না থাকলেও
স্ত্রীকে স্বামীর পক্ষ থেকে আসা শারীরিক সম্পর্কের আহবানে বাধ্যতামূলকভাবে সাড়া
দিতে হবে। ইউনাইটেড নেশন্স ডেভেলাপমেন্ট ফান্ড জানিয়েছে, আফগানিস্তানে পাস হওয়া
আইনটিতে এমন ধারাও যুক্ত করা হয়েছে, যাতে-করে কোনো সন্তানকে কাস্টৌডী প্রদানের
ক্ষেত্রে মা নয় বরং পিতা বা পিতামহকে সে-অধিকার দেয়া হবে।
ধারণা
করা হচ্ছে, বিশেষ-করে শিয়া সম্প্রদায়ের কাছ থেকে নির্বাচনী সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্য
থেকেই নারীদের বিরুদ্ধে কট্টরতম আইনটি পাস করানোর পথে অগ্রসর হয়েছেন কারজাই।
উল্লেখ্য, সুন্নী অধুষ্যিত আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ হচ্ছেন শিয়া।
পর্যবেক্ষকদের মতে, অগাস্ট মাসের নির্বাচনে জেতার জন্য কারজাইয়ের উদ্যোগটির ফলে
শিয়া ধর্মগুরুরা ব্যাপকভাবে লাভবান হবে। আফগানিস্তানে শিয়াদের জন্য প্রচলিত আইনের
পরিবর্তে একটি শিয়া পারিবারিক আইনও বর্তমানে বিদ্যমান আছে।
শিয়াদের
ভিতরে হাজারা সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও নারী-বিরোধী আইনটির পক্ষে জোর দাবী চালানোর
খবর পাওয়া গেছে। এ-সম্প্রদায়ের ভৌটাররাই আগামী নির্বাচনে ভৌটের হাওয়া ঘুরিয়ে দিতে
পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। হাজারা নেতা ও এমপি উস্তাদ মোহাম্মদ আকবরি মঙ্গলবার দাবী
করেন, আলোচ্য আইনটিতে প্রকৃত-প্রস্তাবে নারীদেরকে আসলে সুরক্ষাই দেয়া হয়েছে। তিনি
বলেন, ইসলামে পুরুষ ও নারীর জন্য সমান অধিকার দেয়া আছে কিন্তু পুরুষ ও নারীকে
যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে সেখানে কিছু পার্থক্য বিদ্যমান আছে। উস্তাদের মতে, পুরুষ
হচ্ছে শক্তিমান আর নারী হচ্ছে কিছুটা দূর্বল। উদাহরণ দিতে গিয়ে এ-হাজারা নেতা
জানান, এমনকি পশ্চিমা বিশ্বেও নারীদেরকে অগ্নি-নির্বাপকের কাজ করতে দেখা যায় না।
স্ত্রীর
ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক-স্থাপনের যে-অধিকার স্বামীকে দেয়া হয়েছে, তার
পক্ষেও যুক্তি দেখিয়েছেন উস্তাদ। তার দাবী-মতে অসুস্থ থাকলে বা 'গ্রহণযোগ্য'
'কৈফিয়ৎ' দেখাতে পারলে স্ত্রীর জন্য যৌন সম্পর্কের আহবান প্রত্যাখান রাখা হয়েছে
আইনে।
আফগান
পার্লামেন্টের উচ্চ-কক্ষের সদস্য সেনিটর হুমায়রা নামাতি মনে করেন, কারজাইয়ের
সম্মতিতে যে-আইনটি পাস হয়েছে, তা তালেবান আমলে পাস হওয়া আইনের চেয়েও জঘন্য। তিনি
আরও বলেন, এর বিরুদ্ধে যারাই কথা বলতে চেয়েছেন, তাদেরকেই ইসলাম-বিরোধী আখ্যা দেয়া
হয়েছে। অপর একজন পার্লামেন্টারিয়ান শিনকাই জাহিন কারোখাইল জানান, পার্লামেন্টের
প্রায় কোনো ধরণের আলাপ-আলোচনা ছাড়াই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আইনটি পাস করা হয়। তিনি
বলেন, ওরা [সরকার-পক্ষ] বলতে গেলে গোপন সমঝোতার মতো করে আইনটি পাস করিয়ে নিয়েছে।
কারজাই প্রশাসনের বিরুদ্ধে এ-ব্যাপারে এখন পর্যন্ত পশ্চিমা সরকারগুলো কোনো ধরণের
কথাবার্তা না শুরু হওয়ার ব্যাপারটিকে সমালোচনা করছেন আফগানিস্তানের মানবাধিকার
কর্মীরা। গার্ডিয়ান পত্রিকার সাথে আলাপে আফগানিস্তান ইনডিপেনডেন্ট হিউম্যান রাইটস
কমিশনের প্রধান সোরায়া সোভ্রাং বলেন, আইনটি আফগানিস্তানের নারীর জন্য বিপর্যয়কর।
আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ-ব্যাপারে যা করছে তা লজ্জাকর। তিনি জানান, যখন
পার্লামেন্টে আলোচনা শুরু হয়েছিল্ তখনই যদি আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ
করা হতো, তাহলে আইনটি প্রনয়ন করানো থেকে কারজাইকে ঠেকানো সম্ভব হতো।
কোনো-কোনো পর্যবেক্ষক মনে করেন, কৌশলগত কারণেই আইনটির ব্যাপারে কোনো ধরণের অবস্থান
গ্রহণ থেকে বিরত থাকছে পশ্চিমা দেশগুলো। বিশেষ-করে, কারজাইয়ের সাথে বারাক ওবামা
প্রশাসনের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কোথায় যেয়ে ঠেকে, তা দেখার ব্যাপারেই এখন মূল-মনোযোগ
দেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, তালেবান-দমনে ব্যর্থতার সাথে-সাথে কারজাই প্রশাসনের
সর্বব্যাপী দুর্নীতির ব্যাপারটি নিয়ে নাখোশ হয়ে আছে মার্কিন প্রশাসন। গত সপ্তাহের
এক খবর-মতে, কারজাইয়ের উপরে রাশ টেনে ধরার লক্ষ্যে আফগানিস্তানে একজন ব্যাপক
ক্ষমতা-সম্পন্ন প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করার ব্যাপারটি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে
যুক্তরাষ্ট্র। তবে এক্ষেত্রে কারজাই আবার বিরুদ্ধে চলে যান কি-না, অথবা ক্ষমতায়
টিকে থাকার বাসনা থেকে পশ্চিমা স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে ওঠেন কি-না, সে-ব্যাপারটিও
সম্ভবত বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। ৩১ মার্চ ২০০৯
|