|
বাংলাদেশের সংবিধান পরিপন্থীঃ তবুও কালো
টাকা সাদা করার প্রস্তাব
বিশ্ব
মন্দার
পরিপ্রেক্ষিতে
বাংলাদেশে বিনিয়োগ
বাড়াতে আগামী ২০০৯-১০ অর্থ বছরের বাজেটে
সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে পাঁচ বছর মেয়াদী
বণ্ড বাজারে ছাড়ার মাধ্যমে
কালো
টাকা
(অপ্রদর্শিত আয়)
বৈধ
করার
সুযোগ দিতে সরকারের কাছে দাবী
জানিয়েছেন
শিল্প ও বণিক সমিতির (এফবিসিসিআই) সভাপতি
আনিসুল হক।
কোনো প্রশ্ন
ছাড়া কালো
টাকা
সাদা করার সুযোগ দেওয়ার দাবী
জানিয়েছেন
আনিসুল হক।
অর্থাৎ
কোনো ব্যাক্তি
কালো
টাকা
বৈধ
করতে
চাইলে কোথা থেকে সে ঐ টাকা আয়
করেছে সে-প্রশ্ন
করা যাবে না,
এমন দাবী
করেছেন
তিনি।
আনিসুল
হকের কালো
টাকা
বৈধ
করার
সুযোগ দেওয়ার এ-দাবীর পুরোপুরি বিরোধিতা
করেছেন রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদরা।
বুধবার
সন্ধ্যায় ইউকেবেঙ্গলির প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপ-কালে
তারা বলেছেন,
বার-বার এ-সুযোগ
দেয়া অনৈতিক।
কালো টাকা
সাদা করার সুযোগ দেয়া সংবিধানের
লঙ্ঘন।
এর মাধ্যমে
দুনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিভাবে
স্বীকৃতি
দেয়া হয়।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ
সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন,
কালো টাকা
সাদা করার সুযোগ দিয়ে কালো টাকার
মালিকদের পুরস্কুত করা হয়।
প্রতি বছর
এ সুযোগ দিলে কেউ আর ট্যাক্স দেবে
না।
তিনি বলেন,
'লুটেরা-ধনিক
শ্রেণীকে সন্তুষ্ট করতেই আমাদের সরকারগুলো
বার-বার এ সুযোগ দিয়ে থাকে।
মুজাহিদুল
ইসলাম সেলিম বলেন,
'অবস্থা
এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে,
নিয়মিত কর
পরিশোধ করা সাদা টাকাই যেনো এখন অবৈধ
টাকা।
সব খানেই কালো
টাকার দৌরাত্ম।
কালো টাকা
থাকা মানে বছর-বছর সম্মান দেওয়া।'
তিনি
তিরস্কার করে
বলেন,
'বছর-বছর
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সংক্রান্ত
বক্তৃতা-বিবৃতি না দিয়ে সংবিধানেই একটা
নিয়ম করে দেওয়া উচিত
যাতে
প্রত্যেক বছর কালো টাকা সাদা করার সুযোগ
থাকবে।'
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আহবায়ক
খালেকুজ্জামান বলেন,
'কালো
টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া সংবিধানের
লঙ্ঘন।
এর মাধ্যমে
দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
একজন
দুর্নীতিবাজ দুর্নীতির অভিযোগে শাস্তি পাবেন,
আর যে-অবৈধভাবে
অপার্জিত কালো টাকা সাদা করবেন তিনি
শাস্তি পাবেন না,
পার পেয়ে
যাবেন-এটা কোনো অবস্থতেই মেনে নেয়া যায়
না।
বার-বার এ-অবৈধ
সুযোগ দেয়া হলে যারা নিয়মিত কর দেন,
তারা
নিরুৎসাহিত হবেন।
মানুষ তার
উপার্জিত অর্থের ট্যাক্স বা কর না
দিয়ে ঘরে রেখে দেবেন।'
এ-কারণে কোনো
অবস্থাতেই এ-অবৈধ সুযোগ দেয়া উচিত
নয় বলে
জানান তিনি।
খালেকুজ্জামান
বলেন,
'আমাদের
সংবিধানে
পরিষ্কারভাবে
লেখা আছে
অবৈধভাবে উপার্জিত কোনো অর্থ বৈধ করার
সুযোগ দেয়া যাবে না।
কালো টাকা
অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ।
এ-কালো
টাকা সাদা বা বৈধ করার সুযোগ দিয়ে
আমরা বার-বার
সংবিধান
লঙ্ঘন করছি।
একইভাবে
দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে
স্বীকৃতি
দিচ্ছি।'
অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
ডঃ
আকবর আলি
খান বলেন,
'কালো
টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া অনৈতিক।
এ-অবৈধ
সুযোগ দিয়ে খুব বেশি লাভ হয় না।
এর আগেও
বহুবার এ-সুযোগ
দেয়া হয়েছিলো
কিন্তু
খুব বেশি কালো টাকা সাদা হয়নি।
সরকারের
কোষাগারেও ট্যাক্স হিসেবে তেমন অর্থ জমা
পড়েনি।'
তিনি বলেন,
'এর
আগে একবার শুধু কালো টাকা সাদা করার
সুযোগ দিয়ে সাড়া পাওয়া গিয়েছিলো।
আর সেটা
ছিলো
বিগত-বিএনপি
জামায়াত জোট সরকারের শেষ সময়ে।
তার একটা
সুনির্দিস্ট কারণও ছিল ঐ সময়ে পাঁচ
বছর ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে যারা অবৈধ
অর্থ (কালো টাকা) বানিয়েছিলেন তারা শেষ
সময়ে এসে বৈধ (সাদা) করেছিলেন।'
আকবর
আলি খান বলেন,
'বার
বার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলে
কালো টাকা ধরা পড়ার সুযোগ চিরতরে
বন্ধ হয়ে যাবে।
সবাই তাদের
উপার্জিত অর্থ ঘরে রেখে দেবে।
কোনো ট্যাক্স
দেবে না।
কারণ তারা
জানে,
সরকার সুযোগ দেবে;
তখন কিছু
জরিমানা দিয়ে কোনো ঝামেলা ছাড়া কালো
টাকা সাদা করে নেবেন।
এ-কারণে
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া
মানে দেশে কালো টাকা সৃস্টির এক ধরণের
সুযোগ করে দেওয়া বলে আমি মনে করি।'
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যলয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক
আনু মুহাম্মদ বলেন,
বন্ডের মাধ্যমেই
হোক আর অন্য যে প্রক্রিয়াতেই হোক না
কেনো,
কোনো
অবস্থাতেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ
দেয়া ঠিক নয়।
তিনি বলেন,
কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়া একটি
অবিরাম প্রক্রিয়া হিসেবে থেকেই যাচ্ছে।
প্রতিবারই
ব্যবসায়ীরা সরকারকে নানাভাবে চাপ দিয়ে এ-অবৈধ
সুবিধা আদায় করে নেয়।
তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের সময়ও তারা এ-সুবিধা আদায় করে
নিয়েছে।
এবার তারা বিশ্ব
অর্থনীতির মন্দার অজুহাত দেখিয়ে দেশে
বিনিয়োগ বাড়াতে কালো টাকা সাদা করার
সুযোগ চাইছে।
কিন্তু কালো
টাকা সাদা করার সুযোগ দিলে দেশে
বিনিয়োগ বাড়ে অতীতে কখনই তা প্রমাণিত
হয়নি।
আনু
মুহাম্মদ প্রশ্ন করেন,
'বিগত
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু-বছর
দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান
হয়েছে।
তাহলে কালো টাকা
কোথায় ছিলো?
দুর্নীতি-বিরোধী
অভিযান কি তাহলে কালো টাকার বিরুদ্ধে
ছিলো
না?'
তিনি বলেন,
'সরকার
পরিবর্তন হয়,
কিন্তু নীতির
পরিবর্তন হয়।
কালো টাকা
সাদা করার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে একই
ঘটনা ঘটছে।
ধারাবাহিকভাবে
এ-প্রক্রিয়া চলেই আসছে।
বর্তমান
সরকার দিন বদলের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছে।
আশা করি
এ-সরকার
এবার এ-অবৈধ সুযোগ দেবে না।'
বণ্ড
ছেড়ে কালো টাকা সাদা করার সুপারিশ
প্রসঙ্গে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজী
হননি
রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব
বৌর্ডের
(এনবিআর) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মুজিদ।
তিনি বলেন,
'আমি
মনে করি কোনো টাকাই অলস পড়ে থাকা
উচিত
নয়।
সব টাকাই
অর্থনীতির মূল ধারায় আসা উচিত।'
ঢাকা
থেকে আবদুর রহিম হারমাছি
২৫
মার্চ ২০০৯ |