|
মাদাগাস্কারে প্রেসিডেন্ট-ভবন সেনা-দখলেঃ
সমর্থন আছে বিরোধীদের
অবশেষে
ভারতীয় মহাসাগরীয় দ্বীপ-রাষ্ট্র মাদাগাস্কারের রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে
সেনাবাহিনী। সোমবার রাজধানী এন্টানানারিভোতে একটি প্রেসিডেন্ট-প্রাসাদের গেইট
ট্যাংকের আঘাতে গুঁড়িয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেছে সেনাদল। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত
রাজধানীর উপকন্ঠে অপর একটি প্রাসাদে শারীরিকভাবে নিরাপদে ছিলেন প্রেসিডেন্ট। তবে
পর্যবেক্ষকদের মতে, এ-নিরাপত্তা কতো সময় পর্যন্ত বহাল থাকবে, তা প্রশ্ন-সাপেক্ষ।
এদিকে, সর্বশেষ ঘটনার ভিতর দিয়ে সেনা-নেতৃত্বের সাথে আঁতাতের ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে
যাবার কারণে সরকার-বিরোধীদের গণতন্ত্রে আস্থা থাকার ব্যাপারটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে
শুরু করেছে।
খবরে
প্রকাশ, সোমবার রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র অবস্থিত প্রেসিডেন্ট-ভবনটি দখল করে নেয়
সেনা-সদস্যরা। সংবাদ-মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ভবন দখলের সময় ট্যাংক ব্যবহার করে
সেনাবাহিনী। এ-সময় আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে মুহুর্মূহু ফাঁকা গুলি ছোঁড়া হয়।
সেনাবাহিনীর প্রেসিডেন্ট-ভবন দখল করার সাথে-সাথে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দখল
নিয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। বার্তা-সংস্থা রয়টারের সাথে আলাপে নাম-প্রকাশে
অনিচ্ছুক প্রেসিডেন্ট ভবন দখলকারী দলের এক কর্নেল বলেন, প্যালেস দখল করে নেয়া
সম্পন্ন হয়েছে। এ-পর্যন্তই ছিলো আমাদের আজকের মিশন। আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত আর
কোনো নির্দেশ আসেনি। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, প্রেসিডেন্ট মার্ক রাভালোমানানা
রাজধানীর উপকন্ঠে আইয়াভোলোহা প্যালেসে নিরাপদে ছিলেন। তবে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে
এ-প্রাসাদটিও দখল করে নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, জানুয়ারী মাস থেকে শুরু
হওয়া রাজনৈতিক সহিংসায় এ-পর্যন্ত কমপক্ষে একশো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আর সরকার ও
বিরোধী পক্ষের বিবাদের সুযোগে রাজনীতির ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে
সেনাবাহিনী।
গত ১০
তারিখ এক ঘোষণাতে বিবাদ মীমাংসার জন্য উভয় পক্ষকে এখতিয়ার বহিভূর্তভাবে বাহাত্তর
ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছিলো সেনাবাহিনী। সে-ঘোষণার পরে সপ্তাহ না পেরুতেই
প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ দখল করে নিলো সেনাবাহিনী। পর্যবেক্ষকদের ধারণা বুধবার রাত
পর্যন্ত প্রেসিডেন্টকে দৃশ্যতঃ নিরাপদ অবস্থানে থাকতে দেখা গেলেও, তাকে গৃহীবন্দী
করে ফেলা বা তার বিরুদ্ধে অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের সমূহ আশঙ্কা আছে। জানা গেছে,
প্রেসিডেন্টের শতো-শতো সমর্থক সেনাবাহিনীর প্রবেশ ঠেকানোর লক্ষ্যে আইয়াভোলোহা
প্যালেসের
চারপাশে
অবস্থান নিয়েছে। সেনাবাহিনীর এ-বাধা ভেঙ্গে ভবনে প্রবেশ করতে চাইলে সংঘাত অনিবার্য
হয়ে ওঠার আশংকা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট-ভবন দখল করে নেয়ার পর থেকে
রাজধানীর জন-জীবন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবার খবর পাওয়া গেছে। বিদেশী সাংবাদিকদের
প্রেরিত খবরে জানা যায়,
এন্টানানারিভোতে বুধবার রাতে
ভুতূড়ে নীরবতা বিরাজ করছিলো।
এদিকে,
প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ দখলের দিনটিতেই নির্বাচিত সরকারকে হঠানোর ব্যাপারে
সেনাবাহিনীর সাথে বিরোধী পক্ষের আঁতাতের ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে গেছে। বুধবার
সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রেসিডেন্ট ভবন দখলের কিছু আগে, প্রেসিডেন্টকে গ্রেফতার করার
জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি আহবান জানান বিরোধী পক্ষের নেতা এন্ড্রী রাজোলিনা। এছাড়া
একই সময়ে তার প্রতি পুরোপুরি সমর্থন ঘোষণা করেন গত ১১ তারিখে নিজেকে সেনাবাহিনীর
প্রধান হিসাবে ঘোষণা করা কর্নেল আদ্রেঁ নদ্রিয়ারিজাওনা। তিনি জানান, পুরো
সেনাবাহিনী বিরোধীদের সাথে আছে। নদ্রিয়ারিজাওনা বলেন, আমরা মালাগাসি জনগণের হয়ে
এখানে আছি। এন্ড্রী রাজোলীনা যদি সমস্যার সমাধান ঘটাতে পারেন, তাহলে আমরা তার পেছনে
থাকছি।
মাদাগাস্কারে সেনাবাহিনী বুধবার যে-ঘটনা ঘটিয়েছে, তার কড়া নিন্দা করেছে আফ্রিকান
ইউনিয়ন। সেনাবাহিনীর তৎপরতাকে 'অভ্যূত্থান প্রচেষ্টা' সমালোচনা করা ছাড়াও,
সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অক্ষুন্ন রাখার জন্য মাদাগাস্কারের সকল মহলের প্রতি আহবান
জানিয়েছে ইউনিয়ন। উল্লেখ্য, গত সোমবার মার্ক রাভালোমানানা তার মেয়াদ পূর্ণ করা না
করা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি গণ-ভৌট অনুষ্ঠানে পুনঃপ্রস্তাব দিলেও
বিরোধীরা তা প্রত্যাখান করে। রাভালোমানানা ২০০৬ সালের দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট
নির্বাচিত হন। স্বাভাবিক অবস্থায় ২০১১ সালে তার মেয়াদ পূর্ণ হবে। তবে বিরোধীদের
আন্দোলনের মুখে তিনি মেয়াদ পূর্ণ করার ব্যাপারে জনমত যাচাইয়ের জন্য গণ-ভৌটের
প্রস্তাব দিয়েছেন। সেনা-সমর্থনপুষ্ট বিরোধীরা এ-প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে একটি
অন্তবর্তীকালীন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্ততের দাবী জানাচ্ছেন। অনেক বিশ্লেষকের
ধারণা, প্রেসিডেন্টকে 'স্বৈরাচারী' এবং নিজেকে 'গণতন্ত্রী' হিসাবে দাবী করলেও,
ভৌটের পথে না হেঁটে রাজলীনা যে-পথে হাঁটছেন, তা মূলতঃ মাগাগাস্কারে সেনাশাসনের পথ
উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
লন্ডনঃ ১৬
মার্চ ২০০৯ |