|
বাংলাদেশে সীমান্ত রক্ষী বিদ্রোহে নিহত
সেনা-কর্মকর্তাদের শেষকৃত্য
বাংলাদেশে
সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে সংঘটিত বিদ্রোহে নিহত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের শেষকৃত্য
সম্পন্ন হয়েছে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। দোষীদের দ্রুত
বিচারের জন্য সরকার গঠন করেছে বিশেষ ট্রাইবুন্যাল। অবৈধ
হত্যা-সহ সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগে এক হাজারেরও বেশি বিডিআর-সদস্যদকে অভিযুক্ত করে
মামলা দায়ের করেছে পুলিস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
মুখোমুখী হলেন আবেগ-উদ্বেলিত সেনা-কর্মকর্তাদের। এখনও
পর্যন্ত আত্মসমর্পণ না-করা বিডিআর-সদস্যদের পাকড়াও করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে
সেনাবাহিনীকে।
বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিডিআরের বিদ্রোহীদের হাতে নিহত উর্ধ্বতন
কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের মরদেহ পাওয়া গিয়েছে, দেশ-ব্যাপী জাতীয় শোক পালন শেষে
সোমবার রাজধানী ঢাকায় পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
শেষকৃত্য-সম্পন্ন হওয়া ৫০টি মরদেহের মধ্যে ৪৮টি উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার,
১টি বিডিআর-প্রধানের স্ত্রীর এবং অন্যটি একজন সাধারণ সৈনিকের।
কর্তৃপক্ষীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, সর্বশেষ হিসাব মতে এখনও পর্যন্ত
৭ সেনা কর্মকর্তার হদিস মিলেনি।
উল্লেখ্য, সেনাবাহিনী থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত বিডিআরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে
অধঃস্তন সদস্যদের মধ্য থেকে গত বুধবার ঢাকার পিলখানাস্থ সদর দপ্তরে সংঘটিত বিদ্রোহে
নির্মমভাবে নিহত হন বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা। দৃশ্যতঃ
বেতন-ভাতা-সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্য, দু্র্ব্যবহার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের
সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশী সংবাদ-মাধ্যমগুলো বিদ্রোহীদের
সাক্ষাতকার সহকারে প্রচার করলেও, পরবর্তীতে এ-ঘটনার পিছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে
সরকার ও বিরোধী দল-সহ সর্বমহল থেকে দাবী করা হচ্ছে। সামরিক
বাহিনীর প্রধান জেনারেল মইন উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমগুলোকে দায়িত্বশীল
হয়ে সংবাদ পরিবেশন করার এবং সেনাবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে সংশ্লিষ্ট খবরাখবের
সত্যতা যাচাইয়ের পর তা প্রকাশ করার অনুরোধ জানান। বিভিন্ন
গুজবের মুখে গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক-শেষ সাংবাদিকদের সাথে
আলাপ-কালে তিনি উল্লেখিত অনুরোধটি করেন।
এদিকে পার্লামেন্টের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতা খালেদা জিয়া বিদ্রোহ সামলাতে
সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে
বিদ্রোহীদের প্রতি প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার বিষয়টিকে তিনি
মারাত্ম ভুল হিসাবে আখ্যয়িত করেন। অপর দিকে, শেখ হাসিনাও
খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নীরবতার জন্য সমালোচনা করেন এবং স্মরণ করিয়ে দেন যে, তার স্বামী
প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে সর্বোচ্চ সংখ্যক সেনা-কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছিলো।
বিরোধী দলীয় নেতা হিসাবে তিনি সরকারের পক্ষ থেকে একটি টেলিফৌনও পাননি বলে
আক্ষেপ প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত সরকারের সাথে পূর্ণ সহযোগিতারও আশ্বাস দেন খালেদা
জিয়া।
রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টতঃ শোকাকুল ও বিক্ষুব্ধ সেনা-কর্মকর্তাদের
শোক-ক্ষোভ প্রশমনে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে যান।
সংবাদ-মাধ্যমে প্রকাশ, সেখানে সেনা-কর্মকর্তারা কোনো ধরণের আবেগ সংবরণ না-করে
প্রধানমন্ত্রীকে তাদের ক্ষোভ ও দাবী কথা তুলে ধরেন। এক
পর্যায়ে আবেগ-সংক্রমিত প্রধানমন্ত্রী ও সেনা-কর্মকর্তাগণ সকলেই ডুকরে কেঁদে উঠেন।
স্বজন হারানো প্রসঙ্গে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতা-মাতা-ভাই-সহ নিকট
আত্মীয়দের হারার বিষয়টি উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার
পিতা বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় ১৯৭৫ সালে সপরিবারে নিজ বাড়ীতে সেনাবাহিনীর হাতে
নির্মমভাবে নিহত হন। জানা যায়, সেনাকুঞ্জে সমবেত
সেনা-কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার কাছে তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যাডভৌকেইট
সাহারা খাতুন ও স্থানীয় সরকার বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক-সহ কয়েকজনকে
বরখাস্ত করার দাবী জানান। সেনাকর্মকর্তাদের দাবীর
প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের পাকড়াও করার অনুমতি দেন, যা অপারেশন
রেবেল হান্ট (বিদ্রোহী শিকার) নামে ঘোষিত হয়।
রোববার রাতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকে অপরাধী
বিদ্রোহীদের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠনের সিদ্ধান্ত
ঘোষুণা করেন।
একই
দিনে পূর্বাহ্নে রাজধানী ঢাকার লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাদী হয়ে
নাম-জানা-অজানা এক হাজারেরও বেশি বিডিআর-সদস্যকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের
করেন। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সমাবেশ থেকে শুরু করে অবৈধ
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার অভিযোগ আনেন। ইতোমধ্যে বিডিআরের
উপ-সহকারী পরিচালক বা এডিডি তৌহিদুল আলমকে বিদ্রোহের প্রধান হোতা হিসেবে অভিযুক্ত
করে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে বিদ্রোহের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম ও বিকাশ ঘটে
চলেছে। ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া
সুনির্দিষ্টভাবে বিরোধী দলের এমপি ও পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সম্পর্কিত
বলে পরিচিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করেছে।
অবশ্য, চৌধুরী এ-অভিযোগকেও ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন।
অপরদিকে, সরকার দলীয় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানাকের সাথে বিদ্রোহের
হোতা বলে অভিযুক্ত বিডিআরের এডিডির ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ও সংশ্লিষ্টতার কথা বলা
হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকৃত ঘটনার তদন্তের জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা
এফবিআই ও ব্রিটিশ দন্তকারী সংগঠন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সাহায্য চেয়েছেন।
লন্ডন অফিসঃ ৩ মার্চ ২০০৯ |