|
বাংলাদেশে বিদ্রোহীদের বিচার হবেঃ হাসিনার ক্ষমার
নতুন ব্যাখ্যা
বাংলাদেশের
সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর বিদ্রোহের
সঙ্কট নিরসনে বুধবারে প্রধানমন্ত্রী যে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা করেছিলেন, পরবর্তী
পরিস্থিতিতে তার নতুন ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর লেফট্যানেন্ট
জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মুবীন
বলেছেন, জড়িতদের ক্ষমা করা উচিত নয় এবং করাও হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রী এ্যাডভৌকেইট সাহারা খাতুন
বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ ক্ষমা হত্যাকারীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। অবশ্য সাধারণ
কাদের জন্য প্রযোজ্য তা অবশ্য তিনি ব্যাখ্যা করেননি। উল্লেখ্য,
বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্রোহীদের
প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। বিদ্রোহের ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৭টি লাশ
উদ্ধার করা হয়েছে। এদের অধিকাংশই উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত
খবর অনুযায়ী এখনও প্রায় ৭২ জন সেনা কর্মকর্তা নিখোঁজ রয়েছেন।
মাত্র দু’মাস
আগে বাংলাদেশের সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
বুধবারের ঘটনায় সকল বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।
কিন্তু শুক্রবার তিনি এ-ঘোষণা থেকে সরে এসে জানিয়েছেন, সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডে
জড়িতদের কোনো ক্ষমা করা হবে না। তিনি বলেন,
‘কাউকে
হত্যা করার কোনো অধিকার কারো নেই।’
তিনি সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার তদন্ত করা হবে ও জড়িতদের খুঁজে বের করে অবশ্যই শাস্তি
প্রদান করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, ঘটনার ইন্ধনদাতা হিসেবে
কোনো একটি গোষ্ঠী কাজ করেছে। তিনি বলেন,
‘ঘটনার
পিছনে একটা গোষ্ঠীর ইন্ধন অবশ্যই আছে। যারা ইন্ধন জুগিয়েছে তাদের খুঁজে বের করা হবে।’
এদিকে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর প্রিন্সিপাল স্টাফ লেফট্যানেন্ট
জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মুবীন একটি লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছেন,
‘মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার অর্থ এই নয় যে, যারা
হত্যা-বিদ্রোহ-অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য জঘন্য কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের ক্ষমা
করা।’ তিনি জানিয়েছেন,
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সাধারণ ক্ষমার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। লেঃ
জেনারেল মুবীন বিবৃতিতে আরও বলেন,
‘বিডিআরের
যেসকল সদস্য এ-ধরণের বর্বর ও নৃশংস কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের ক্ষমা করা যাবে না এবং
ক্ষমা করা হবেও না।’ তিনি জানান,
জড়িতদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে
‘কঠোর
ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’ প্রদান করা
হবে। জানা গেছে, ঘটনার দিন বিডিআর সদর দপ্তরে প্রায় ৯,০০০ জওয়ান উপস্থিত ছিলো।
উল্লেখ্য, এ-পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বিডিআর জওয়ান গ্রেফতার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান
জেনারেল মইন উ আহমেদ শুক্রবার সংবাদ-কর্মীদের সাথে কথা বলার সময় তাদেরকে সত্য কথা
তুলে ধরার বিষয়ে অনুরোধ জানান। তিনি বলেন,
‘আপনাদের
কাছে অনুরোধ এমন কিছু বলবেন না, এমন কিছু স্ক্রল দিবেন না, যা সঠিক নয়।’
সেনাপ্রধান আরও বলেন,
‘আপনারা
জেনে-শুনে-বুঝে তারপর দিবেন।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে শুক্রবারের সাক্ষাতের প্রসঙ্গে জেনারেল মইন জানান,
দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত সেনাবাহিনীর তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো তিনি সরকার
প্রধানকে অবহিত করেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী এ-বিষয়ে ইতিবাচক
সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। এছাড়া জেনারেল মইন দৃঢ়ভাবে সাংবাদিকদের বলেন,
‘আমি
আপনাদের পুনরায় বলতে চাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সরকারের প্রতি অনুগত রয়েছে।’
২৫ তারিখে সংঘটিত ঘটনাকে শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য বিরাট
ক্ষতি হিসেবে বর্ণনা করে জেনারেল মইন বলেন,
‘এটা
একটা দুর্যোগ, এর থেকে আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে।’
এদিকে, ঘটনায় নিহত প্রত্যেক সেনা কর্মকর্তার পরিবারের জন্য সেনা বাহিনীর তহবিল থেকে
৫ লক্ষ টাকা অর্থ-সাহায্য প্রদানের বিষয়টি আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর)
এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে।
শুক্রবার বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীতে
নতুন মহা-পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, বিদ্রোহের প্রাথমিক অবস্থাতেই
মহা-পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাকিল আহমেদকে হত্যা করা হয় বলে জান গেছে। নতুন
মহা-পরিচালক হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মইনুল হোসেনকে নিযুক্ত করা হয়েছে। নতুন
মহা-পরিচালক জানিয়েছেন, বিদ্রোহের পর জওয়ানদের মনোবল ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করা হয়েছে।
তিনি বলেন,
‘মনোবল ফিরিয়ে আনতে ও
আবার সুশৃঙ্খল বাহিনীতে পরিণত করতে কাজ শুরু হয়েছে।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মইনুল সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশের সকল সীমান্তই সুরক্ষিত
রয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ম সচিব (আনসার ও সীমান্ত) সৈয়দ মুস্তাফীজুর
রহমান স্বাক্ষরিত একটি প্রেসনৌটের মাধ্যমে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ছুটিতে থাকা ব্যতীত সকল
বিডিআর সদস্যদের স্ব-স্ব কর্মস্থলে অথবা বিডিআর সদর দপ্তর, ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর
অথবা নিকটস্থ থানায় রিপৌর্ট করার নির্দেশ জারী করা হয়েছে। প্রেসোনৌটে আরও বলা হয়েছে
যে, যারা উল্লেখিত সময়ের মধ্যে রিপৌর্ট করতে ব্যর্থ হবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ
ব্যব্যস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রী
এ্যাডভৌকেইট সাহারা খাতুন জানিয়েছেন, ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত কমিটী ইতিমধ্যেই কাজ
শুরু করে দিয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন,
‘আমরা
দ্রুত কাজ করার চেষ্টা
করছি।
আশা করছি,
নির্ধারিত সাত দিন সময়ের মধ্যে
তদন্ত কাজ শেষ করতে পারব।’
এছাড়া তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঘটনার আলামত নষ্ট না করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।
অন্যদিকে,
বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির
নানক বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা
‘পরিকল্পিতভাবে’
ঘটানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন,
‘সুপরিকল্পিত
ও গভীর ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতিতে এ-হত্যাকাণ্ড হয়েছে।’
প্রতিমন্ত্রী নানক আরও বলেন,
‘আমরা
বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি যে, এ-ঘটনা ঘটানো জন্য দীর্ঘদিন ধরে
কাজ করা হচ্ছিলো।’
বুধবারের ঘটনার পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশ
সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বিশ্বনেতৃবৃন্দের কাছে যথাযথ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে বলে
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার প্রধান শেখ হাসিনার পদক্ষেপকে
সময়োচিত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকদের মন্তব্য
যে, পুরো ঘটনাটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বিশেষ করে
সরকারের ডিরেক্টৌরেট জেনারেল অফ ফৌর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই), ন্যাশনাল
সিকিউরিটী ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই) ও স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এক্ষেত্রে প্রশ্নের
সম্মুখীন হচ্ছে।
লন্ডনঃ ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯
|