|
গাজা-সাহায্যের
আবেদন প্রচারে
বিবিসির অস্বীকৃতিঃ
চাপ অব্যাহত
গাজায় জরুরী মানবিক
সাহায্যে জন্য ব্রিটেইনের ডিজেস্টার কমিটীর আবেদন সম্প্রচার করবে না বলে দৃঢ়
অবস্থান নিয়েছে বিবিসি। বহু সংগঠন ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সমালোচনা ও অনুরোধের
মুখেও অটল বিবিসির ডাইরেক্টর জেনারেল মার্ক থম্পসন। থম্পসনের মতে, গাজায় সাহায্যের
আবেদন বিবিসি থেকে সম্প্রচারিত হলে প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা ক্ষুন্ন হবে। এদিকে,
বিভিন্ন মহল থেকে বিবিসির উপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
অক্সফাম-সহ তেরোটি
সাহায্য সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত ডিজেস্টার ইমার্জেন্সী কমিটী (ডিইসি) গাজার জন্য জরুরী
খাদ্য-ওষুধ-কম্বল প্রভৃতি কেনার লক্ষ্যে জনসাধারণের কাছে অর্থ-সাহায্যের আবেদন
জানাচ্ছে। তাদের এ-আবেদন তৎপরতার অংশ হিসেবে তারা বিভিন্ন প্রচার-মাধ্যমের সাহায্য
কামনা করেছে। আইটিভি, চ্যানেল ফৌর ও চ্যানেল ফাইভ তাদের সাহায্যের আবেদন সম্প্রচার
করতে সম্মত হলেও বিবিসি এ-বিষয়ে অপারগতার কথা প্রকাশ করে। রোববার রাতে বিবিসি
জানিয়েছে, ‘নীতিগতভাবে
বৃহত্তর এলাকায় সাহায্য প্রদানের কথা বললেও ডিইসি স্পষ্টতঃ ইঙ্গিত করেছে যে,
ইসরায়েলের পরিস্থিতির জন্য সাহায্যের কোনো প্রয়োজন নেই; প্রকৃত প্রস্তাবে তাদের
আবেদন শুধুমাত্র গাজার জন্য।’
তাই আবেদনটি সম্প্রচারিত হলে তা ‘একপক্ষীয়’
হয়ে যাবে বলে মনে করেন বিবিসি-কর্তা থম্পসন। একইভাবে স্কাই নিউজ প্রাথমিক পর্যায়ে
সাহায্যের আবেদনটি সম্প্রচারে রাজী থাকলেও পরে বিবিসির মতো একই কারণ দেখিয়ে অপারগতা
প্রকাশ করে। এদিকে আইটিভি জানিয়েছে, তারা সোমবার সন্ধ্যায় ২মিনিট দীর্ঘ একটি মানবিক
সাহায্যের আবেদন সম্প্রচার করবে। আইটিভি ছাড়াও চ্যানেল ফৌর এবং চ্যানেল ফাইভ একই
আবেদন সম্প্রচার করবে।
এদিকে সাহায্যের আবেদন সম্প্রচারে
অপারগতা জানানোর পরে বিবিসি প্রায় ১১ হাজার অভিযোগ-পত্র পেয়েছে। এছাড়া আর্চবিশপ থেকে
শুরু করে মন্ত্রী-এমপি ও অভিনেতা-অভিনেত্রী-সহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগণ
সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছেন। কমন্স সভার বিভিন্ন দলীয় ৬০ জন এমপি বিবিসিকে
সম্প্রচার বিষয়ক সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ণের আহ্বান জানিয়েছেন। বিবিসির গৃহীত
সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রোববার রাতে প্রতিষ্ঠানটির গ্লাসগৌতে কার্য্যালয়ের রিসিপশন
এরিয়া একটি বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
জানা যায় সমাবেশে যোগদানকারী অন্যান্যদের মধ্যে লেবার এমপি রিচার্ড বার্ডেনও
উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, বার্ডেন
বিবিসিকে সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ণের বিষয়ে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণের জন্য কমন্স সভার
এমপিদের সংগঠিত করেছেন। বিবিসির অবস্থান প্রসঙ্গে বার্ডেন বলেন,
‘আমি
মনে করি, বিবিসি যা করেছে, তা খুবই উদ্বেগের বিষয়।’
এদিকে আরেক লেবার এমপি জেরাল্ড কৌফ্ম্যান বিবিসির এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পিছনে
ইসরায়েল-সমর্থক গোষ্ঠীর ‘জঘন্য
চাপ’
রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিবিসি
সম্ভবতঃ এবিষয়টিকে একটি বিশাল ঝামেলা হিসাবে দেখছে।‘
তিনি বলেন, ‘এ-ঝামেলা-বোধের
কারণ হচ্ছে ইসরায়লীদের চাপ।‘
ব্রিটেইনের উপর ইসরায়েলী প্রভাবের সমালোচনা করে কৌফ্ম্যান,
‘এখানে
ইসরায়েলী কূটনৈতিক অবস্থান খুবই সক্রিয়, যা মোটেও আনন্দদায়ক নয়।‘
ব্রিটেইনের
কালচারাল সেক্রেট্যারী এ্যান্ডী বার্নহ্যাম মন্তব্য করে বলেন যে, সাহায্যের আবেদন
সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে বিবিসি নিরপেক্ষ নয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক
উন্নয়ন বিষয়ক সেক্রেট্যারী ডগলাস এ্যালেকজান্ডার, কমিউনিটী সেক্রেট্যারী হ্যাজেল
ব্লিয়ার্স, স্বাস্থ্য মন্ত্রী বেন ব্র্যাডশো-সহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক
ব্যক্তিত্ব বিবিসির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তারা বিবিসিকে সিদ্ধান্তটি
পুনর্মূল্যায়ণেরও আহ্বান জানিয়েছেন। বিবিসির অপারগতা ডিইসির অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে
নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন চ্যারিটী কমিশনের চেয়ারম্যান
ডেইভিড হাইন্ড।
এদিকে ডিইসির
মানবিক সাহায্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ক্যান্টাবারী আর্চবিশপ ডঃ রোয়ান উইলিয়ামস্
বলেন যে, বিবিসির উচিৎ ডিইসির সাহায্যের আবেদনটি সম্প্রচার করা। ইয়র্কের আর্চবিশপ
ডঃ জন সেন্টামুও ডিইসির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এদিকে কনসার্ভেটিভ এমপি মার্ক
ফীল্ড মনে করেন, বিবিসির সিদ্ধান্তের ফলে উদ্ভূত বিতর্কের কারণে সাহায্য আবেদনটির
আবেদন মাত্রা আরও বেড়ে গিয়েছে। তিনি বলেন,
‘বিতর্কের
কারণে আবেদনটি অধিক মাত্রায় প্রচার পেয়েছে যা [স্বাভাবিক অবস্থায়] অকল্পনীয়।’
অস্কার মনোনয়ন পাওয়া
অভিনেত্রী সামান্থা মর্টন ঘোষণা দিয়ে বলেছেন,
‘সাহায্য
আবেদন সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্ত’
পরিবর্তন না করলে বিবিসির জন্য তিনি আর কোনো কাজ করবেন না। তিনি বিবিসির গৃহীত
সিদ্ধান্তটিকে ‘ভয়ানক’
ও ‘ঘৃণ্য’
হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সিদ্ধান্তটির মাধ্যমে বিবিসি নৈতিক ভীরুতা দেখিয়েছে বলে
মন্তব্য করছেন কৌতুক অভিনেতা বিল বেইলী।
উল্লেখ্য, বিবিসি
২০০৬ সালে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ্ সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সাহায্যের আবেদনের
সম্প্রচার নাকচ করেছিলো। কিন্তু ২০০৮ সালে বার্মার জন্য সাহায্যের আবেদন একবার
প্রচার করেছিলো।
স্মরণ করা যেতে পারে, তিন সপ্তাহ ব্যাপী
ইসরায়েলী আগ্রাসনের ফলে গাজার আধিবাসীরা বর্তমানে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সেখানে
খাদ্য-পানি-ওষুধের মারাত্মক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী গাজা
পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৩৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন। কিন্তু জাতিসংঘ এখনও
প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করে উঠতে পারেনি।
লন্ডনঃ ২৬
জানুয়ারী, ২০০৯ |