|
বাংলাদেশে খনি-দুর্নীতি
মামলায় সাইফুর-নিজামী-মুজাহিদ কারাগারে
বাংলাদেশে
বহুল আলোচিত বড়ো পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের
সাবেক অর্থ-মন্ত্রী ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা এম সাইফুর রহমান,
জামায়াতে ইসলামীর আমির
মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেট্যারী জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে কারাগারে
পাঠিয়েছে দেশটির বিশেষ আদালত।
উচ্চ আদালতের নির্দেশে
সোমবার এ-তিনজন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ
দেন।
পরে তাদের ঢাকা কেন্দ্রীয়
কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
নিজামী
চলতি বছরই গ্যাটকৌ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে একবার কারাগারে গিয়েছিলেন।
তবে সেনা-নিয়ন্ত্রিত
তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশটির দায়িত্ব নেওয়ার পর সাইফুর ও মুজাহিদের কারাগারে যাওয়া
এ-প্রথম।
এ-মামলায় গ্রেপ্তারী-পরোয়ানা
মাথায় নিয়েই গত মাসে মুজাহিদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা-সহ অন্যান্য
উপদেষ্টাদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেন,
যা ঐ সময় দেশটিতে বড়ো
ধরণের বিতর্কের ঝড় তুলে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলো সরকার।
এদিকে
শীর্ষ দু-নেতার আত্মসমর্পণের খবরে বিপুল সংখ্যক জামায়াত নেতা-কর্মী এদিন সংসদ ভবন
এলাকায় জড়ো হয়।
সংসদ ভবনের বিশেষ আদালত নিজামী
ও মুজাহিদকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিলে নেতা-কর্মীরা রাস্তা আটকে প্রতিবাদ
সমাবেশ করে।
ফলে সোমবার দুপুরে রাজধানীর
খামারবাড়ী-বিজয় সরণী সংযোগ সড়কে কয়েক ঘণ্টা গাড়ী চলাচল বন্ধ থাকে।
রাজধানীর বায়তুল
মোকাররম-পল্টন এলাকাতেও রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে দু-নেতার কারাগাগারে পাঠানোর
প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে জামায়াত নেতা-কর্মীরা।
এ-কারণে সোমবার ঢাকা
শহরে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
একই
মামলায় রোববার সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা একেএম মোশাররফ হোসেনকেও
কারাগারে পাঠায় আদালত।
দুর্নীতি দমন কমিশনের
দায়ের করা এ-মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার মন্ত্রীসভার ১০ মন্ত্রী-সহ
মোট ১৬ জন আসামী।
তবে খালেদা জিয়া উচ্চ আদালতের
আদেশে ছাড়া পান।
তার বিরুদ্ধে মামলার
কার্যক্রমেও স্থগিতাদেশ রয়েছে।
এদিকে
জাতীয় নির্বাচনের মাস খানেক আগে দেশটির বিতর্কিত রাজনৈতিক দল জামায়াতের শীর্ষ
দু-নেতাকে কারাগারে পাঠানের ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা
ধারণা করছেন,
এ-নেতা তিনজনকে কারাগারে
পাঠানোর ঘটনায় দেশটির তত্বাবধায়ক সরকারের হাত থাকতে পারে।
এক্ষেত্রে দু-ধরণের
অনুমান করছেন তারা।
এর একটি হচ্ছে,
বিএনপি-জামায়াত জোট যাতে
সরকার ঘোষিত ১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেয়, সেজন্য চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্য তাদের
কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আর অন্যটি হচ্ছে,
সরকার নিজেই চাচ্ছে না
১৮
wW‡m¤^i
দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত
হোক।
আর এ-জন্য দেশে যাতে অস্থিতিশীল
পরিবেশ সৃষ্টি হয়, সে-উদ্দেশ্য সরকার নিজেই একটি ক্ষেত্র তৈরী করে দেওয়ার জন্য এ
ব্যবস্থা করেছে।
সোমবার
সকাল ১০টার দিকে নিজামী আদালতে আসেন।
এর ১৫ মিনিট পর মুজাহিদ
এবং সাড়ে ১১টায় সাইফুর হাজির হন।
বিশেষ জজ আদালত-২ এর
বিচারক একে রায় আদালতে শুনানি শুরু করেন বেলা সাড়ে ১২টায়।
এজলাসে আসন গ্রহণের পর
বিচারক আইনজীবীদের চেয়ারে বসে থাকা নিজামী ও মুজাহিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের
আসামীর কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়াতে বলেন।
বিচারকের এ-নির্দেশে
কিছুটা হতভম্ব হয়েই তারা দুজনে কাঠগড়ায় দাঁড়ান।
তবে অন্য আসামী সাইফুর
রহমান অসুস্থ থাকায় হুইল চেয়ারেই বসে থাকেন।
এরপর সাইফুর,
নিজামী ও মুজাহিদের
আইনজীবীরা আদালতে দুটি করে মোট ছয়টি আবেদন দাখিল করেন।
এতে আসামীদের জামিন বহাল
ও মামলার শুনানি মুলতবি রাখার আবেদন করা হয়।
সাইফুর
রহমানের কৌঁসুলী ব্যারিস্টার রেহান আদালতে বলেন,
এ-মামলায় হাইকৌর্টের
একটি বেঞ্চ খালেদা জিয়া,
আবদুল মান্নান ভূঁইয়া,
এমকে আনোয়ার,
ডঃ খন্দকার মোশাররফ
হোসেন ও এম শামসুল ইসলামকে জামিন দিয়েছে।
মঙ্গলবার হাইকৌর্টে
এ-মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
এ-অবস্থায় তার (সাইফুর)
জামিন বহাল রাখা হোক।
তখন বিচারক জানতে চান,
'আসামী
সাইফুর রহমান জামিনে আছেন কি-না।
যদি না থাকে তাহলে
জামিনের প্রশ্ন আসছে কেনো?'
জবাবে রেহান বলেন,
'না,
জামিনে নেই।
তবে মামলাটি স্থগিতে
হাইকৌর্টে আবেদন করা হয়েছে।'
নিজামী ও
মুজাহিদের পক্ষে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন,
মতিউর রহমান নিজামী ও
আলী আহসান মুজাহিদের পক্ষে হাইকৌর্টে মামলাটি বাতিলের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
কয়েক দফা শুনানিও হয়েছে।
মঙ্গলবার আবার শুনানির
জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
তিনি বলেন,
'এই
অবস্থায় আমরা এখানে হাজির হয়ে আসামীদের জামিন বহাল ও পূর্বাবস্থায় রাখার আবেদনের
পাশাপাশি শুনানিও মুলতবি করার আবেদন জানাচ্ছি।'
আসামী
পক্ষের আইনজীবীদের আবেদনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলী মোশাররফ হোসেন কাজল
বলেন,
'তিন
আসামীর কেউই জামিনে নেই।
এর মধ্যে আলী আহসান
মুজাহিদকে ৩ b‡f¤^‡ii
মধ্যে বিচারিক আদালতে
আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিলো হাইকৌর্ট।
কিন্তু তিনি তা না-করে
আইন অমান্য করেছেন।
আইনজীবী কাজল বলেন,
'এ-মামলার
অভিযোগপত্র দাখিলের আগ পর্যন্ত নিজামীকে আটক বা হয়রানি না করতে হাইকৌর্ট নির্দেশ
দিয়েছিলো,
কিন্তু অভিযোগপত্র দাখিলের পর
তিনি আটক না জামিনে আছেন, সে-বিষয়ে আদালত বা আমরা কিছুই জানি না।
অথচ তার আইনজীবী দাবী
করছেন,
আসামিরা জামিনে আছেন।'
কাজল যুক্তি দেখিয়ে বলেন, 'এটা
সঠিক নয়;
যেখানে জামিনই নেই,
সেখানে জামিন বহাল রাখার
সুযোগও নেই।'
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলী বলেন,
আসামীদের বিরুদ্ধে আনা
অভিযোগ গুরুতর।
এ-অবস্থায় জামিন দিলে মামলার
ক্ষতিও হতে পারে।
তাছাড়া জরুরী ক্ষমতা অধ্যাদেশ
অনুযায়ী,
তাদের জামিন চাওয়ার অধিকারও নেই।
তাই অবিলম্বে তাদের
কারাগারে পাঠানো হোক।
দু-পক্ষের শুনানি শেষে দুপুর ২টায় বিচারক আসামী পক্ষের আবেদনগুলো খারিজ করে দেন।
একই সঙ্গে তিনি সাইফুর,
নিজামী ও মুজাহিদকে
কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন তিনি।
বিচারক একে রায় আগামী ১২
নভেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিনও ধার্য করেছেন।
আদালতের
আদেশের পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েই সাবেক শিল্পমন্ত্রী নিজামী সাংবাদিকদের বলেন,
'ক্রয়
কমিটির (মন্ত্রী পরিষদের) সদস্য হওয়ার কারণে যদি আসামী হতে হয়;
তাহলে ভবিষ্যতে কোনো
ক্রয় কমিটিও হবে না,
কেউ এর সদস্যও হবে না।
নিজামীকে গ্যাটকৌ মামলায়
গত ১৮ মে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৫ জুলাই ছাড়া পান তিনি।
আদালতের
কার্যক্রম শেষে একটি প্রিজন ভ্যান সাইফুর,
নিজামী ও মুজাহিদকে নিয়ে
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
বেলা সোয়া ৩টার দিকে
তাদের তিন জনকে কারাগারে ঢোকানো হয়।
গত ৪ ও ৫
নভেম্বর
বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেন ও
আফজাল হোসেন আহমেদের হাইকৌর্ট বেঞ্চ সাইফুর,
নিজামী ও মুজাহিদকে ১০
নভেম্বরের
মধ্যে আদালতে আত্মসমর্পণ করার
নির্দেশ দেয়।
মুজাহিদ এর আগে ১৯ অক্টোবর
জামিনের আবেদন নিয়ে হাইকৌর্টে গেলে তখনও জামিন না দিয়ে তাকে ৩
নভেম্বরের
মধ্যে বিচারিক আদালতে
আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিলো।
বড়ো
পুকুরিয়া দুর্নীতি মামলাটি দায়ের করা হয় গত ২৬ ফেব্রুয়ারী।
গত ৫ অক্টৌবর মামলার
অভিযোগপত্র দাখিল করে দুর্নীতি দমন কমিশন।
তাতে বলা হয়,
চীনা প্রতিষ্ঠান
কনসোর্টিয়াম অফ চায়না ন্যাশনাল মেশিনারী ইম্পৌর্ট
এান্ড
এক্সপৌর্ট কৌর্পোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে বড়ো পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদন,
ব্যবস্থাপনা ও
রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করায় সরকারের প্রায় ১৫৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।
গত ৬
অক্টোবর আদালত মুজাহিদ-সহ মামলার ৯ আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারীর আদেশ
দেয়।
কিন্তু পুলিস মুজাহিদকে
গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়।
যদিও ওই সময়ে মুজাহিদকে
সরকারের সঙ্গে সংলাপ-সহ দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা যায়।
ঢাকা থেকে
আবদুর রহিম হারমাছি
১০
নভেম্বর
২০০৮ |