|
বিশ্বব্যাঙ্কের পরামর্শে ধনী-বান্ধব উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাপত্র
বাংলাদেশে

দরিদ্র
ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সন্তানদের উচ্চশিক্ষা লাভের স্বপ্ন শেষ হতে চলেছে
বাংলাদেশে।
বিশ্ব-ব্যাংকের
চাহিদামতো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এ-মাসেই যে-কৌশল-পত্র সরকারের
নীতি-নির্ধারনী মহলে পেশ করতে যাচ্ছে, তাতে সম্পূর্ণভাবে ধনী-বান্ধব এক
শিক্ষা-নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে।
এমনিতেই সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে নানান পাকে-প্রকারে ছাত্র-বেতন, পরীক্ষা ফী থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার
ব্যয় বেড়ে গেছে ব্যাপক-হারে।
'দাতাদের' চাপে নতুন করে
ধনী-বান্ধব শিক্ষা-ব্যবস্থা গৃহীত হলে সাধারণ ঘরের শিক্ষার্থীদের বর্তমান হতাশাকর
অবস্থান শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সে-ব্যাপারে বড়ো ধরণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংক
বাংলাদেশ সরকারকে ১৪শো কোটি টাকা দিচ্ছে উচ্চ-শিক্ষা 'সংস্কারের' জন্য।
পড়ুন
মোহাম্মদ আরিফুজ্জামানের তৈরী করা ইউকেবেঙ্গলির প্রতিবেদন।
বিশ্বব্যাংক-এডিবির মতো 'দাতাদের' চাপে বাংলাদেশ সরকার উচ্চ-শিক্ষা থেকে ভূতর্কি
তুলে নেওয়ার দীর্ঘ-মেয়াদী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি
কমিশন এ-সম্পর্কিত একটি কৌশল-পত্র সরকারের কাছে চলতি মাসে পেশ করতে যাচ্ছে বলে
কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্র ইউকেবেঙ্গলিকে নিশ্চিত করেছে।
মঞ্জুরি কমিশনের
কৌশল-পত্রে শিক্ষার্থীদের বেতন-ফী বৃদ্ধি-সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শতো-ভাগ
নিজস্ব অর্থে চলা বা বেসরকারীকরণের সুপারিশ করা হয়েছে।
ছাত্র-আন্দোলনের সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে কৌশল-পত্রে চার-পর্বে উচ্চ-শিক্ষার
'সংস্কার' বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে মঞ্জুরি কমিশন।
প্রস্তাবিত চার-পর্ব
হচ্ছেঃ
প্রাথমিক
পর্ব ২০০৬-২০০৭, স্বল্প-মেয়াদী
২০০৮-২০১৩, মধ্য-মেয়াদী
২০১৪-২০১৯ ও দীর্ঘ-মেয়াদী ২০২০-২০২৬।
শিক্ষার্থীদের অর্থের যোগান আসবে কোথা থেকে?
বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজস্ব অর্থায়নে শিক্ষার ব্যয়-ভার মেটানোর জন্য ছাত্রদের বেতন ফী
বৃদ্ধির প্রতি জোর দিয়েছে মঞ্জুরি কমিশন।
২০০৮ থেকে ২০২৬ সাল
পর্যন্ত মোট ৩টি ধাপে বেতন বৃদ্ধি করা হবে।
২০২৬ সালের মধ্যে সকল
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হবে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
মঞ্জুরি
কমিশনের কৌশল-পত্রে দেশি-বিদেশী ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের ঋণ নেয়ার
পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
বলাই বাহুল্য, এ
কৌশল-পত্র বাস্তবায়িত হলে সাধারণ আয়ের পরিবার থেকে আসা একজন শিক্ষার্থীকে কোনো
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময়ই ব্যাংকের মোটা ঋণের বোঝা নিয়ে ঢুকতে হবে আর
বের হতে হবে ঐ ঋণের সুদ-আসলের বোঝা নিয়ে।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন,
'সাম্রাজ্যবাদ শিক্ষা-খাতে বিনিয়োগ করতে চায়, তাই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের চেষ্টা
করছে।
এর ফলে গরীব ও মধ্যবিত্তেরা
উচ্চ-শিক্ষা হতে বঞ্চিত হবে।
তবে বাংলাদেশের ইতিহাস
দেখলে এটাই প্রমাণিত হয় যে, এ-দেশে জনগণ-বিরোধী কোনো শিক্ষানীতি বা কৌশল কখনো
বাস্তবায়িত হতে পারেনি এবং জনগণের আন্দোলনের চাপে শেষ পযর্ন্ত পিছু হটতে বাধ্য
হয়েছে শাসকশ্রেণী।'
বাংলাদেশ
ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংসদের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া শাহীন এ-সম্পর্কে
ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন দেশের পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কমিশন
দেশ ও
জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
চলতি বছর ভর্তিচ্ছু
শিক্ষার্থীদের উপর অন্যায্য ফরমের দাম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে
নাইট শিফট চালুর ব্যাপারে তারা দীর্ঘদিন সক্রিয়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে
একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করাই তাদের লক্ষ্য।
দেশের পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তারা ব্যবসায়িক লাভজনক বিনিয়োগের-খাত হিসাবে দেখতে চায়।
আর ঐ সকল জায়গায় শুধু
পড়বে শাসক-শ্রেণীর সন্তানেরা।
গরীব-মধ্যবিত্ত ঘরের
শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে না।
বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে
মঞ্জুরি কমিশন আমাদের শিক্ষাখাতকে ধ্বংস করতে চায়।'
বাণিজ্যিক কৌর্সগুলোতে গুরুত্বঃ মৌলিক জ্ঞান-বিজ্ঞান উপেক্ষা
মঞ্জুরী
কমিশনের প্রস্তাবিত উচ্চ-শিক্ষার পুরোটাই হবে বাজার-নির্ভর একটি লাভজনক বাণিজ্যিক
বিষয়।
মৌলিক জ্ঞান অনুসন্ধান এবং
বিজ্ঞান শিক্ষা হবে উপেক্ষিত।
বাজারমুখি শিক্ষার প্রসঙ্গে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন,
'মানব-বিদ্যা ছাড়া মানুষ বিকশিত হয় না।
মানব-বিদ্যা,
সমাজ-বিদ্যা ছাড়া কোনো মানুষ শিক্ষা লাভ করলে সে-শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না।
আমরা চাই না যে,
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো যান্ত্রিক বা খণ্ডিত মানুষ তৈরীর যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার হোক।'
বাংলাদেশ
ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি আরিফুল ইসলাম বলেন, 'কৌশল-পত্রে যে সব সুপারিশ করা হয়েছে
তা একান্তভাবেই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ।
কৌশল-পত্রে শিক্ষাকে
একটি লাভজনক বিনিয়োগ হিসাবে দেখা হয়েছে।
বিজ্ঞান, কৃষি
শিক্ষার,সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শনের মতো অপরিহার্য বিষয়গুলোকে উচ্চশিক্ষা থেকে সরিয়ে
দেয়া হয়েছে।
বিবিএ-এমবিএ’র মতো অনুৎপাদনশীল
শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
এটা মূলত বিদেশি
বহুজাতিক কৌম্পানীগুলোর জন্য সস্তায় চাকরিজীবী তৈরী করার জন্যই করা হচ্ছে।'
আবাসিক
হল নির্মাণ না-করার পরামর্শ
মঞ্জুরি
কমিশন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হল নির্মাণ না করার সুপারিশ করেছে।।
মঞ্জুরি কমিশনের
কৌশল-পত্রে, 'অধিক সংখ্যক আবাসিক হল সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরী করে' বলে মন্তব্য করা
হয়েছে।
ইউকেবেঙ্গলির
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি হলে মাত্র ৪৩ দশমিক ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পায়।
নতুন করে
আবাসিক হল নির্মাণ না করার সুপারিশ সম্পর্কে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি
ফকরুদ্দিন কবির আতিক জানান, এটা অনভিপ্রেত সিদ্ধান্ত।
গরীব-মধ্যবিত্ত ঘরের
মেধাবী সন্তানেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে আসে।
এসব মেধাবীরাই
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
এদের শিক্ষার ভার
রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
আবাসন সঙ্কট নিরসনের
জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক হল নির্মাণের
দাবী জানান তিনি।
মঞ্জুরি
কমিশনের প্রস্তাবিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নমুনা
মঞ্জুরি
কমিশন দেশে আরো ২৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করার সুপারিশ করেছে
কৌশল-পত্রে।
প্রস্তাবিত পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে নামেই হবে সরকারী কিন্তু বাস্তবে বেসরকারী।
এসব পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি দিয়েই চলবে।
এই হলো মঞ্জুরি কমিশন
প্রস্তাবিত সরকারী আদলে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়।
মঞ্জুরি কমিশন
প্রস্তাবিত সদ্য প্রতিষ্ঠিত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ
বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ফীর হার দেখলে মঞ্জুরি মিশনের প্রস্তাবনার কাজ সরকার যে
আগেভাগেই শুরু করেছে এটা সহজেই অনুমেয়।
নোয়াখালী
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ ৪টি।
ভর্তি ফী নির্ধারণ করা
হয়েছে ২০ হাজার ২০০ টাকা।
ডাইনিং ফী ১ হাজার ৮০০
টাকা এবং বিদ্যুৎ বিল ও সেমিস্টার ফী বাবদ ৫ হাজার টাকা দিতে হবে প্রতিটি
শিক্ষার্থীকে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নামের এসব
বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় মূলতঃ শিক্ষার্থীদের অর্থে পরিচালিত হবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে
১ম বর্ষে একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি হতে কলা ও বাণিজ্য বিভাগে ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা এবং
বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে ১০ হাজার ৩৫৫ টাকা দিতে হয়।
এর সঙ্গে সেমিনার ফি
হিসাবে ১ হাজার ৭০০ টাকা দিতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনো
আবাসিক হল নেই।
বিশ্ব-ব্যাংকের উপর নির্ভরশীলতা বাড়বে
তথাকথিত
দাতাগোষ্ঠীর নেতা বিশ্ব-ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে শিক্ষা-ব্যয় সঙ্কোচনের
ব্যাপারে সরকারগুলোকে চাপ প্রয়োগ করছিলো।
এই চাপের ধারাবাহিকতাতেই
সরকারী চাহিদা-মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণভাবে
বড়লোকমুখী কৌশল-পত্রটি প্রনয়ন করা হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ
ইউকেবেঙ্গলিকে
জানান,
শিক্ষাখাতকে তারা একটি বিনিয়োগের মাধ্যম হিসাবে পেতে চায়।
এই ভয়াবহ পরিকলপনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের
ভবিষ্যৎ ভয়াবহ।
সরকারী
অনুদানে চলবে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়!
লক্ষ্য
করার ব্যাপার, মঞ্জুরী কমিশনের কৌশল-পত্রের মধ্য দিয়ে অর্থের অভাবে সাংঘাতিকভাবে
ধুঁকতে থাকা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সাধারণ ঘরের শিক্ষার্থীদের জন্য
প্রবেশ-অসম্ভব একস্থানে পরিণত করার চেষ্টা করা হলেও,
সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক
উদ্দেশ্যে পরিচালিত বাজার-ভিত্তিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সরকারী
অনুদানের আনুষ্ঠানিকতা চূড়ান্ত করা হয়েছে সম্প্রতি।
গত ২৩
অক্টোবর ২০০৮ সেনা-নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন
আহমেদের সভাপতিত্বে একনেকের এক বৈঠকে হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটী এনহ্যান্সমেন্ট
প্রৌজেক্ট (এইচইকিউপি) নামের ৬৮১ কোটি টাকার একটি বিল অনুমোদন হয়।
উক্ত প্রকল্পের অধীনে
৩০টি সরকারী ও ৫১ টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক মান্নোয়নের জন্য এ-অর্থ
অনুদান হিসাবে দেওয়া হবে।
বিশ্ব-ব্যাংক প্রকল্পটির
৮৮ শতাংশ অর্থ বা ৫৯৮ কোটি টাকা বাংলাদেশকে উচ্চ- শিক্ষা ঋণ হিসেবে দেবে।
তবে ঋণের শর্তানুযীয়
২০০৯ সালের জানুয়ারী থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা বলেছে
বিশ্বব্যাংক।
প্রকল্প অনুযায়ী সরকারী
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বাণিজ্যিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিশ্বব্যাংক থেকে
উচ্চ সুদে আনা অর্থ ভর্তুকি পাবে।
বুঝাই যাচ্ছে যে,
শিক্ষার্থীদের নামে দেওয়া এই ভূতর্কি মূলত পাবেন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা।
বেসরকারী
বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া সরকারের ভূর্তকি প্রসঙ্গে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার নাগরিকদের শিক্ষা দেয়া।
শিক্ষা মৌলিক অধিকারের
মধ্যে পড়ে।
এভাবে বাণিজ্যিক বেসরকারী
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতর্কি দেওয়া সরকারের উচিত নয়।
সরকারী
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যারা ভর্তি হয়, তারা খুবই মেধাবী।
মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের
শিক্ষার সুযোগ করে দেয়া সরকারের দায়িত্ব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
স্বায়ত্ত্বশাসন বলে কিছু
থাকবে না
মঞ্জুরি
কমিশনের কৌশলপত্র বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বলে কোনো কিছু
অবশিষ্ট থাকবে না।
মঞ্জুরি কমিশনের
কৌশল-পত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ভিসি নিয়োগের জন্য একটা সার্চ কমিটী গঠন করা হবে।
এ-সার্চ কমিটীতে থাকবেন
আমলা, এনজিওবিদ, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও দলীয় রাষ্ট্রপতি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি
কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হলে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ লঙ্ঘিত হবে এবং
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নষ্ট হবে বলে শিক্ষাবিদরা মনে করছেন।
মঞ্জুরি কমিশনের সুপারিশ
মতে, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ক্যাম্পাস
পুলিস/নিরাপত্তা বাহিনী গঠনে
দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
ক্যাম্পাস পুলিস
প্রৌক্টর অফিসের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।
মঞ্জুরি কমিশনের এহেন
সুপারিশ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র তপন
মাহমুদ লিমন বলেন, এটা উদ্ভট সুপারিশ।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে
শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে দিতে হবে।
সেখানে কোনো প্রকার
পুলিসী বা গোয়েন্দা তৎপরতা শিক্ষার্থীরা মেনে নেবে না।
ছাত্র-রাজনীতি বন্ধের সুপারিশ
কৌশল-পত্রে ছাত্র-রাজনীতি বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।
মঞ্জুরি কমিশনের মতে,
ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক থাকায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের
পরিবেশ নষ্ট করে।
তবে মঞ্জুরি কমিশনের
ছাত্র-রাজনীতি বন্ধের আসল কারণ হিসাবে বলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের আন্তরিক
চেষ্টা সত্ত্বেও ছাত্র নেতৃবৃন্দের জোরালো প্রতিবাদের কারণে বেতন-ফী বাড়ানো সম্ভব
হয়নি।
ছাত্র-রাজনীতি বন্ধের ব্যাপারে বাংলাদেশ আওয়ামী-লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক নূরুল
ইসলাম নাহিদ বলেন, ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ করার প্রস্তাব অযৌক্তিক।
বাংলাদশের স্বাধীনতায়
ছাত্রদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ করে
দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না।
নানা কারণে সাময়িকভাবে
আমাদের ছাত্র-রাজনীতি একটি অংশ বিপথগামী হয়েছে।
গণতন্ত্র, সুশাসন ফিরে
এলে আমাদের ছাত্র-রাজনীতি আবারও গৌরবময় অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।
এ-প্রসঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ফকরুদ্দিন কবির আতিক বলেন,
ছাত্র-রাজনীতি বন্ধের মাধ্যমে বিদ্যমান দখলদারিত্বের ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ হবে না।
আমাদের মূলধারার রাজনীতি
আজ কলুষিত।
মূলধারার রাজনীতিতে যদি আদর্শগত
পরিবর্তন হয় তবেই লেজুড়বৃত্তির ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ হবে।
ছাত্র রাজনীতি বন্ধের এই
পরামর্শ মূলত সাম্রাজ্যবাদের দেওয়া।
কারা
ছিলেন কৌশলপত্র তৈরীতে?
মঞ্জুরি
কমিশনের কৌশলপত্র প্রনয়ণে এনজিও, আমলা, ব্যবসায়ী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রতিনিধিদের আধিপত্য রয়েছে।
সাউথ-ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ডঃ এম শমসের আলী, ডেফৌডিল ইন্টারন্যাশনাল
বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ডিরেক্টরের চেয়ারম্যান এম সবুর খান ও ইস্টার্ন
বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌর্ড অব গভর্নর্স চেয়ারম্যান আবুল কাসেম হায়দারের মতো ব্যক্তিরা
কৌশল-পত্র প্রনয়ন প্রক্রিয়াতে জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে।
এরা মূলতঃ বড়ো ব্যবসায়ী।
অবাক হওয়ার মতো
বিষয় হলো,
এসব ব্যক্তি যে-সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত, সেসব
বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনই
নয়,
মঞ্জুরি কমিশনেরও মতামত হলো যে সেখানে মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক,
লাইব্রেরী, নিজস্ব ক্যাম্পাস-সহ অন্যান্য অবকাঠামোর অভাব রয়েছে বলে
এ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করেছে।
কালো তালিকাভুক্ত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষককেও কৌশল-পত্র প্রনয়ণ
কমিটীতে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কৌশল-পত্রের তৈরীর অন্যতম সদস্য অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম কৌশল-পত্র সম্পর্কে
ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন, 'বিশ্ব-ব্যাংক সব সময় আমাদের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে
বিতর্কিত ভূমিকা পালন করে।
প্রথম থেকে
ব্যাক্তিগতভাবে আমি বিষয়টি মাথায় রেখেছিলাম।
আমি স্পষ্ট বলে
দিয়েছিলাম, যদি বিশ্বব্যাংক কোনো বিষয় হস্তক্ষেপ করে তবে আমি কাজ করেবো না।
এই কৌশলপত্রে যেমন
নেতিবাচক দিক আছে তেমনি ইতিবাচক দিক ও আছে।
সরকারের উচিত হবে
নেতিবাচক দিকগুলো বাদ দিয়ে ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে কাজ করা।'
তিনি আরও
জানান, 'বর্তমান বাস্তবতায় বেতন ফী বৃদ্ধি ছাড়া উচ্চ-শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়,
তবে শিক্ষার্থীদের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে গরীব-মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষার্থীদের
শিক্ষার পুরো দায়-ভার রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত।'
সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, 'পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তানরা কম
টাকায় পড়বে, এটা হতে পারে না।
কোটি টাকার গাড়ি হাঁকিয়ে
ধনী-ঘরের সন্তানরা এসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রী পড়ে যাবে এটা হতে পারে না।
বড়লোক ঘরের সন্তানদের
অবশ্যই টাকা দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পড়া উচিত।'
কৌশল-পত্রে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের সুপারিশ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইসলাম বলেন, 'আমি
ব্যক্তিগতভাবে ছাত্র-রাজনীতি বন্ধের বিষয়টির বিরোধীতা করেছি।
তবে সন্ত্রাস,
টেন্ডারবাজীর ছাত্র-রাজনীতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।'
ঢাকা থেকে মোহাম্মদ
আরিফুজ্জামান
৩
নভেম্বর ২০০৮
|