|
বাংলাদেশে পঁচাত্তরের
জেইল-হত্যা
মামলার
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা
খালাস
১৯৭১
সালের বাংলাদেশ-মুক্তিযুদ্ধের
প্রধান
চার
নেতা
সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে
(ছবিতে সাদা পোশাক-পরা
দু'পাশের চারজন) ১৯৭৫
সালে কারাগারে অন্তরীণ রেখে
হত্যার দায়ে অভিযুক্তদের
মধ্যে অন্যতম প্রধান চার
ব্যক্তিকে অব্যাহতি
দিয়েছে বাংলাদেশ হাইকৌর্ট।
বৃহস্পতিবার বিকেলে হাইকৌর্টের প্রদত্ত রায়ের মধ্য দিয়ে জেলহত্যা মামলা থেকে
অব্যাহতি পেয়ে গেলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবঃ) সৈয়দ ফারুক রহমান,
মেজর (অবঃ) শাহরিয়ার
রশিদ খান,
মেজর (অবঃ) বজলুল হুদা ও
মহিউদ্দিন আহমেদ।
নিম্ন-আদালতের
রায়ে এদেরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
দেয়া হয়েছিলো।
পরে অভিযুক্তরা
নিম্ন-আদালতের
রায়ের বিরুদ্ধে হাইকৌর্টে
এাপীল
করেন।
নিম্ন-আদালতের রায়ে
মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত অপর দুই পলাতক আসামী মারফত আলী ও আবুল হোসেন মৃধাকেও অব্যাহতি
দিয়েছে উচ্চ আদালত।
হাইকৌর্ট
জানিয়েছে,
মামলাটিতে মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত
পলাতক আসামী রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের সাজা বহাল থাকবে।
উচ্চ আদালতের রায়ে অবশ্য নিম্ন-আদালতে যাবজ্জীবন
কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে
আট
জনের সাজা বহাল রয়েছে।
এরা সবাই বর্তমানে পলাতক।
যাদের সাজা বহাল রাখা
হয়েছে, তারা হলেনঃ অবসর-প্রাপ্ত কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ,
শরীফুল হক ডালিম,
লেফটেন্যান্ট কর্নেল নূর
চৌধুরী,
লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমএম রাশেদ
চৌধুরী,
মেজর আহমদ শারফুল হোসেন,
ক্যাপ্টেইন আব্দুল মাজেদ,
ক্যাপ্টেইন মোঃ
কিসমত হাশেম
ও ক্যাপ্টেইন নাজমুল হাশেম
আনসার।
বিচারপতি
নজরুল
ইসলাম
চৌধুরী
ও
বিচারপতি আতাউর রহমান
খানের বেঞ্চ
আদালতের রায়ের
বিরুদ্ধে
আসামীদের
এাপীল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর দীর্ঘ ২৬ কার্য-দিবস শুনানির পরে এ-রায় ঘোষণা
করে।
হাইকৌর্ট বলেছে,
তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ
প্রকৃত হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হয়েছে।
কেবলমাত্র তিনজন সাক্ষী
ছাড়া অন্য সাক্ষীরা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী মারফত আলী ও আবুল হাসেম মৃধার বিরুদ্ধে
জোরালোভাবে সাক্ষ্য দেয়নি;
ফলে ওই তিন জনের সাক্ষীর
উপর ভিত্তি করে হত্যা মামলায় দণ্ড দেওয়া যৌক্তিক নয়।
আদালত
বলে,
যেসব সাক্ষী ১৯৭৫ সালের ৩রা
নভেম্বর
বঙ্গভবন ও কারাগারে উপস্থিত
থাকার দাবী করে সাক্ষ্য দিয়েছেন,
তাদের বক্তব্য অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে।
বঙ্গভবনের কর্মচারীদের
মধ্যে যারা সাক্ষী দিয়েছেন, তাদের সাক্ষ্যও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি আদালতের কাছে।
আদালতের মতে, ওই রাতে
তারা সেখানে কেনো উপস্থিত ছিলেন, তার বিশ্বাসযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা নেই।
আদালত
আরও জানায়,
বঙ্গভবন ও ঢাকা কেন্দ্রীয়
কারাগারে নিবন্ধন-বই নিম্ন-আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি।
বাংলাদেশের উচ্চ-আদালতের
মতে হত্যাকাণ্ডের দিন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বঙ্গভবনে আসা-যাওয়া প্রমাণ করে না
যে,
এ-হত্যার উদ্দেশ্যে তারা
আসা-যাওয়া করেছিলেন।
আদালতের মতে,
সেনা-সদস্যদের পরিধানে কাপড় কেমন ছিলো তা নিয়ে সাক্ষীদের বক্তব্য ছিলো অসঙ্গতিপূর্ণ।
কেনো-না সাক্ষীদের কেউ
তাদের পরিধানে খাকী পোষাক আবার কেউ কালো পোশাক পরিহিত থাকার কথা বলেছিলেন। মামলার
গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী কর্নেল শাফায়েত জামিলের বক্তব্যও অসামঞ্জস্য বলে অভিমত দিয়েছে
আদালত।
জানা
গেছে,
হাইকোর্টের এ-রায়ের
বিরুদ্ধে সুপ্রিম
কৌর্টে
আপীল করবে
রাষ্ট্রপক্ষ।
মামলায়
রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি
এাডভোকেইট আনিসুল হক রায়টিকে দুঃখজনক ও আইনের
নামে প্রহসন বলে অভিহিত করে বলেন,
'যারা
বাংলাদেশের
স্বাধীনতার জন্য
[বাঙালীদের] রক্ত দিতে দেখেছেন, তারা এ-রায়ে মর্মাহত।'
উল্লেখ্য,
৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের পরদিন
লালবাগ থানায় তৎকালীন পুলিশের ডিআইজি আব্দুল আওয়াল
আসামী তৎকালীন ক্যাপ্টেইন মোসলেম উদ্দিন-সহ চার জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ
২৩ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ১৯৯৮ সালের ১৫
অক্টৌবর আসামী
মোসলেম উদ্দিন
ও লেঃ কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান-সহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পত্র
দেওয়া হয়।
দীর্ঘ ৬
বছর মামলার বিচার
শেষে ২০০৪ সালের ২০
অক্টৌবর
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মোঃ মতিউর রহমান রায় দেন।
রায়ে
আদালত মোসলেম
উদ্দিন,
দফাদার
মারফত আলী ও দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। এছাড়াও
নিম্ন আদালত লেঃ কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লেঃ
কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও মেজর মোঃ বজলুল হুদা-সহ ১৫ জনকে যাবজ্জীবন
কারাদণ্ড দেয়।
মেজর
মোঃ খায়রুজ্জামান ও রাজনীতিক কেএম ওবায়দুর রহমান,
শাহ
মোয়াজ্জেম হোসেন,
নুরুল
ইসলাম মঞ্জুর ও তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে এ-হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া
হয়েছিলো তখন।
ঢাকা
থেকে আবদুর রহিম হারমাছি, ২৮
অগাষ্ট ২০০৮
|