|
পাকিস্তানে শাসক-জোটে ভাঙ্গনঃ
শরিফ অভিযুক্ত করলেন জারদারিকে
'শত্রুর
শত্রু আমার মিত্র' এ-নীতির ভিত্তিতে পাকিস্তানে সেনা-শাসক মুশারফের বিরুদ্ধে শরিফের
মুসলিম লীগ ও জারদারির
নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিওপলস পার্টি যে-জোট বেঁধেছিলো, প্রেসিডেন্ট
হিসেবে মুশররফের পদত্যাগের পর সে-জোট সম্ভবতঃ যৌক্তিক কারণেই ভেঙ্গে গেলো।
জারদারির বিরুদ্ধে ওয়াদা ভঙ্গের
অভিযোগ এনে জোট ভেঙ্গে তার বিপরীতে প্রাক্তন এক বিচারপতিকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী
হিসেবে দাঁড় করিয়ে পৃথক অবস্থান নিলেন শরিফ।
সোমবারে
রাজধানী ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মলন ডেকে মুসলিম লীগের নেতা ও প্রাক্তন
প্রধানমন্ত্রী নাওয়াজ শরিফ জানিয়েছেন, মুশাররফের বরখাস্ত-করা প্রধান বিচারপতি-সহ
অন্যান্য বিচারকের পুনর্বহাল ও নতুন প্রেসিডেন্ট নিয়োগ প্রশ্নে পাকিস্তান পিওপলস
পার্টির (পিপিপি) সাথে বনিবনা না হবার কারণে তার দল মুসলিমলীগ (শরিফ) জোট সরকার
থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
জোট-ত্যাগের ঘোষণা-কালে শরিফ অভিযোগ করেন,
গত নভেম্বরে মুশাররফের
হাতে বরখাস্ত হওয়া বিচারকদের পুনঃনিয়োগের ব্যাপারে বারংবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে
চলেছে পিপিপি।
উল্লেখ্য,
গত বছর মার্চ মাসের নয়
তারিখে দুর্নীতির অভিযোগ এনে প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীকে বরখাস্ত করেছিলেন
মুশাররফ।
কিন্তু কয়েক মাস পরে,
জুলাই মাসের বিশ তারিখে
সুপ্রীম কৌর্টের রায়ে স্বপদে ফিরে এসেছিলেন চৌধুরী।
বরখাস্ত থাকা অবস্থাতে
চৌধুরীর সমর্থনে আইনজীবীরা দেশজুড়ে বিশাল আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন,
যা এক পর্যায়ে এসে
মুশাররফ-বিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ লাভ করে।
গত বছরের তেসরা নভেম্বর
মুশাররফ জরুরী আইন জারী করলে আরও একবার পদ হারান ইফতেখার।
ইফতেখার ছাড়াও ষাটজনের
মতো বিচারককে বরখাস্ত করেছিলেন মুশাররফ।
বরখাস্ত
হওয়া প্রধান বিচারপতি-সহ সকল বিচারপতিকে অবিলম্বে স্বপদে ফিরিয়ে আনার জন্য পিপিপির
উপরে চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন নাওয়াজ শরিফ।
এ-ব্যাপারে তিনি সোমবার
পর্যন্ত সর্বশেষ সময়-সীমা ঘোষণা করে রেখেছিলেন।
এ-প্রসঙ্গে তিনি নিজের ও জারদারির স্বাক্ষর করা চুক্তিপত্র সাংবাদিকদের সামনে মেলে
ধরে অভিযোগ করে বলেন যে, মুশারফের অভিশংসন অথবা পদত্যাগের ২৪ ঘন্টার মধ্যে
বিচারপতি ও বিচারকদের পুনর্বহালের যে-ওয়াদা করা হয়েছিলো, পিপিপি তার বরখেলাফ করেছে।
রাজনৈতিক
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, মুশাররফের সাথে বুঝাপড়ার ভিত্তিতে যেভাবে 'দায়মুক্তি'
পেয়ে পাকিস্তানে
এসেছিলেন পিপিপি নেতা আসিফ আলি জারদারি,
বিচারপতি ইফতেখার স্বপদে
ফিরে এলে তা বিঘ্নিত হবার আশঙ্কা থেকেই এক্ষেত্রে অনীহা দেখাচ্ছে পিপিপি।
স্মরণ করা যেতে পারে,
বেনজির ভূট্টোর শাসনামলে
দুর্নীতির দায়ে জারদারিকে কয়েক বছর কারাবাস করিয়েছিলেন মুশাররফ।
জারদারী কারাগার থেকে
বেরিয়ে পাকিস্তান ছেড়ে চলে যান নির্বাসনে থাকা স্ত্রী বেনজিরের কাছে।
এমনকি গত বছরের শেষ দিকে
দীর্ঘদিন পরে মুশাররফ ও যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সাথে বুঝাপড়ার ভিত্তিতে বেনজির যখন
পাকিস্তান ফিরে আসেন,
তখনও সন্তানদের নিয়ে
দুবাইয়ে থেকে যান জারদারি।
গত বছর সাতাশে ডিসেম্বর
রাওয়ালপিন্ডিতে আততায়ীর হাতে বেনজির নিহত হবার পরে দেশে আসেন জারদারি।
জোট-ত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা-কালে সোমবার নাওয়াজ শরিফ আরও জানান,
মুশাররফের স্থানে নতুন
প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে দু'দলের মধ্যে যে-ধরণের সমঝোতা হয়েছিলো,
জারদারির নাম ঘোষণা
দেয়ার মধ্য দিয়ে তা থেকেও সরে গেছে পিপিপি।
উল্লেখ্য,
গত শনিবার পিপিপির পক্ষ
থেকে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য জারদারিকে সর্বসম্মতভাবে মনোনীত করা হয়েছে।
শরিফের বক্তব্য অনুসারে,
পার্লামেন্ট ভেঙ্গে
দেয়ার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা অবস্থায় একজন নির্দলীয় ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ার
ব্যাপারে দু'দল একমত হয়েছিলো।
প্রেসিডেন্ট পদের জন্য জারদারির মনোনয়নের ব্যাপারে পিপিপির সমালোচনা করলেও নিজের
দলের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসাবে সাবেক প্রধান বিচারপতি সাইদুজ্জমান
সিদ্দিকীর নাম ঘোষণা করেছেন শরিফ।
তিনি সিদ্দিকীকে একজন
নির্দলীয় ব্যক্তি হিসাবে আখ্যায়িত করেন।
সেপ্টেম্বরের ছয় তারিখ
কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন সভাগুলোর সদস্যদের ভৌটে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে।
কৌয়ালিশন
থেকে বেরিয়ে গেলেও বিচারকদের স্বপদে বহাল করা ও পাকিস্তানে সাচ্চা গণতন্ত্র কায়েমের
সংগ্রাম চালিয়ে যাবার অঙ্গীকার করেন মুশাররফের হাতে ক্ষমতা হারানো শরিফ।
তিনি আরও জানান, জোটে না
থাকলেও দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তার দল পিপিপির সাথে কাজ করবে।
শরিফের
পক্ষ থেকে আসা সিদ্ধান্তের পরিণতিতে পাকিস্তানের পরিস্থিতি কোন্ দিকে যায়,
সে-ব্যাপারে আতঙ্কের মধ্যে আছে আর্ন্তজাতিক মহল।
লক্ষ্য করার বিষয়,
কয়েকদিন আগে মুশাররফের
বিদায় ও তার পরবর্তীতে জারাদারিদের সাথে শরিফদের রশি টানা-টানির ফাঁকে তালেবানী
হামলার ধার বেড়ে গেছে পাকিস্তানে।
এমনকি সোমবার দিনও
ইসলামাবাদের উত্তর-পশ্চিমে সোয়াতে একটি সরকারী স্থাপনার উপরে তালেবানী হামলাতে
প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে তিন ব্যক্তি।
এদিকে
শরিফের ঘোষণার পর-পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে পাকিস্তান রুপীর বড়ো ধরণের দর-পতনেরও
(এক ডলার =৭৬.৭০ রুপী) খবর পাওয়া গেছে।
এছাড়াও আগের দিনের
তুলনায় শেয়ার বাজারে দুই শতাংশ দর-পতনের খবর শোনা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে,
শরিফরা জোট থেকে বেরিয়ে
গেলেও এখনই আরেক দফা সাধারণ নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা তৈরী হয়নি পাকিস্তানে।
কয়েকটি ক্ষুদ্র দলকে
সাথে নিয়ে হয়তো সরকার টিকিয়ে রাখতেও সক্ষম হবে পিপিপি।
কিন্তু যে-দুটি ইস্যুকে
কেন্দ্র করে জোট ভেঙ্গে গেলো, জারদারী ও তার লোকেরা তার সমাধান কীভাবে করেন,
সেদিকেই এখন সকলের চোখ।
সাধারণ
শত্রু
মুশাররফের
বিদায়ের জন্য হাতে-হাত মিলিয়ে কাজ করলেও,
কয়েকদিনের টানাপোড়েন
শেষে সোমবারের ঘোষণাটির পরে জারদারি ও শরিফের সম্পর্ক কোনদিকে মোড় নেয় তাও এখন
দেখার বিষয়।
লন্ডনঃ ২৫ আগস্ট, ২০০৮ |