|
বাংলাদেশের
জাতীয় সম্পদ
কর্ণফুলী
পেইপার মিলে নীরব লুটপাট
এক
সময়ের এশিয়ার বৃহত্তম কর্ণফুলী পেইপার মিল (কেপিএম) এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার
অর্থলিপ্সার শিকারে পরিণত হয়ে ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন একমাত্র
রাষ্ট্রয়াত্ব কাগজ শিল্পের এ-প্রতিষ্ঠানে চলছে নীরব লুটপাট।
এখানে রক্ষকই যেনো ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে হরিলুট চালাচ্ছে।
বর্তমান জরুরী অবস্থায় সিবিএ কার্যক্রম বন্ধ এবং সিবিএ নেতারা চাকুরিচ্যুত ও পলাতক
থাকলেও এক শ্রেণীর কর্মকর্তা কর্ণফুলী পেইপার মিলে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে
হাতিয়ে নিচ্ছেন বিপুল অর্থ-কড়ি।
কারখানার মূল্যবান যন্ত্রাংশ পাচার,
উচ্ছেদ বাণিজ্য,
বাসা-ভাড়া
বাণিজ্য,
যন্ত্রাংশ
ক্রয় ও টেন্ডার বাণিজ্য,
কাঁচামাল
(বাঁশ ও পাল্পউড) সংগ্রহ ইত্যাদি কাজে কর্ণফুলী পেইপার মিলে এখন ভয়াবহ অনিয়মের ঘটনা
ঘটছে।
রমরমা 'বাসা ভাড়া'
বাণিজ্য
কর্ণফুলী
পেইপার মিলের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য গড়ে তোলা আবাসিক এলাকার বাসা-সমূহে
হাজার-হাজার টাকার 'বাসা ভাড়া'
বাণিজ্য চলছে।
এ-অনৈতিক বাণিজ্যের কারণে কর্ণফুলী পেইপার মিলে প্রতি-বছর লাখ-লাখ টাকা অপচয় হচ্ছে।
মিলের নিজস্ব তদন্তে এ-অনিয়মের চিত্র উদ্ঘাটিত হলেও এক শ্রেণীর কর্মকর্তা মোটা
অংকের ঘুষ নিয়ে বাসা-ভাড়া বাণিজ্য বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না।
কিছু দিন
আগে সরজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা যায়,
কর্ণফুলী
পেইপার মিলের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত কলাবাগান ও বারোঘোনিয়া এলাকার শতাধিক
বাসা অবৈধভাবে ভাড়া দিয়ে রমরমা ব্যবসা খুলে বসেছেন মিলের এক শ্রেণীর
কর্মকর্তা-কর্মচারী।
কর্ণফুলী পেইপার মিলটি কেপিআই গ্রেইড-১ ভূক্ত হলেও মিলের নিরাপত্তা বিভাগের
কর্মকর্তার প্রত্যেক্ষ সহায়তায় মিলের বাসস্থানগুলো বহিরাগতদের অবৈধভাবে ভাড়া দেয়া
হয়।
'ওয়ান-ইলেভেন'-এর
পর যৌথ বাহিনীর অভিযানে কর্ণফুলী পেইপার মিল এলাকা থেকে বহিরাগতদের উচ্ছেদের
লক্ষ্যে এলাকায় গড়ে-উঠা বিভিন্ন বাড়ি-ঘর উচ্ছেদ করা হলেও মিলের নিজস্ব বাসায় থাকা
অবৈধ বহিরাগত ভাড়টিয়াদের উচ্ছেদ করা হয়নি।
অতি
সম্প্রতি কর্তৃপক্ষ মিলের শ্রমিক-কর্মচারীদের বাসায় অবৈধ ভাড়াটিয়া চিহ্নিত করতে
মিলের বিদ্যুৎ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের
একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
১০
মে জমা দেয়া তদন্তŹ কমিটির প্রতিবেদনে মিলের ২৪টি বাসায় অবৈধ ভাড়াটিয়া আছে বলে
চিহ্নিত করা হয়
এবং ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ ও মিলের বাসা ভাড়া-দানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ
করা হয়।
অভিযোগে
প্রকাশ,
তদন্ত পরিচালিত হওয়ার পর মিলের
নিরাপত্তা,
শ্রম কল্যাণ ও প্রশাসন বিভাগের
কতিপয় কর্মকর্তা এসব বাসা নিয়ে নতুন বাণিজ্য খুলে বসেন।
বাসা ভাড়া দেয়া প্রতিটি
শ্রমিক-কর্মচারী থেকে কর্মকর্তারা মাথাপিছু ১০ হাজার টাকা করে প্রায় দু'লাখ টাকা
ঘুষ আদায় করেন এরা।
ভাড়াটিয়া আছে এমন একটি
বাসার বরাদ্দপ্রাপ্ত একজন কর্মচারী ঘুষ দিতে
অস্বীকার করলে সে-বাসার
বরাদ্দ-আদেশ বাতিল করে কর্তৃপক্ষ।
পক্ষান্তরে তদন্ত
প্রতিবেদনকে উপেক্ষা করে কর্মকর্তারা বাকী ২৩টি বাসার ভাড়াটিয়া এবং বরাদ্দ বহাল
রাখেন ঘুষের বিনিময়ে।
বর্তমানে তদন্তে-প্রাপ্ত
২৩টি বাসা-সহ মিল এলাকার আরও প্রায় শতাধিক বাসায় অবৈধ ভাড়াটিয়া রেখে কতিপয়
শ্রমিক-কর্মচারী রমরমা ব্যবসা খুলে বসেছেন।
আর এসব বাসায় ভাড়াটিয়া
রাখার সুযোগ করে দিয়ে মিলের নিরাপত্তা ও প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট
হারে মাসোহারা আদায় করছেন।
বহিরাগতদের কাছে ভাড়া দেয়া কর্ণফুলী পেইপার মিলের অনেক বাসা এখন সন্ত্রাসী
অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রস্থলের পাশাপাশি অসামাজিক কার্যকলাপের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে
বলে স্থানীয় পর্যায় থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এতে মিলের নিরাপত্তা
পুরোপুরি বিঘ্নিত হলেও কতিপয় কর্মকর্তা শুধু অর্থ-লিপ্সার কারণে দেশের কেপিআই
গ্রেইড-১ ভুক্ত একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের দিতে ঠেলে দিচ্ছেন।
এলাকার সাধারণ
শ্রমিক-কর্মচারীরা জানিয়েছেন, মিলের তদন্তে উদ্ঘাটিত হওয়ার পরও প্রধান নিরাপত্তা
কর্মকর্তার ঘুষ-বাণিজ্যের কারণে মিল এলাকার অবৈধ ভাড়াটিয়া ও বহিরাগতদের উচ্ছেদ করা
হচ্ছে না।
এক বছরে ৫০
লাখ টাকার যন্ত্রাংশ পাচার
দেশের বৃহত্তম
কাগজকল কর্ণফুলী পেইপার মিল থেকে গত এক বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকার মুল্যবান যন্ত্রাংশ
পাচার হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ,
মিলের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেইট ও আনসার
সদস্যদের সহায়তায় মিলের মুল্যবান যন্ত্রাংশ পাচার করা হলেও জড়িত গডফাদারদের
বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে জানা যায়,
যৌথবাহিনীর অভিযানের
মধ্যেও কর্ণফুলী পেইপার মিল থেকে একের পর এক মূল্যবান যন্ত্রাংশ পাচারের ঘটনা ঘটছে।
মিলের ওয়ার্কশপ,
বিদ্যুৎ বিভাগ,
স্টৌর,
মৌটর গ্যারেইজ,
বাঁশ কেন্দ্র,
বয়লার হাউস,
পাল্পমিল,
ইনষ্ট্রুমেন্ট শাখা-সহ
বিভিন্ন শাখা থেকে মুল্যবান ক্যাবল,
মৌটর,
বিভিন্ন বৈদ্যুতিক
সরঞ্জাম,
রোটার,
তামা এসএস,
এবং
এমএস রড-সহ লক্ষ-লক্ষ টাকা
দামের যন্ত্রাংশ একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র নির্বিঘ্নে পাচার করছে।
মিলের যন্ত্রাংশ পাচারের
সাথে কারখানার নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আনসার সদস্যদের কেউ-কেউ
সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত এক
বছরে কারখানা থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের যন্ত্রাংশ পাচারের ঘটনা ঘটলেও
পাচারকারী চক্রের গডফাদাররা এখনো রয়েছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
কাপ্তাই থানা পুলিশ
বিভিন্ন সময়ে পৃথক অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উদ্ধার ও কিছু বহিরাগত
পাচারকারীকে গ্রেফতার করলেও মূল হোতারা সব-সময়ই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মিলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান
কর্ণফুলী পেইপার মিল থেকে নিয়মিত যন্ত্রাংশ পাচার হচ্ছে এটা
AŻ^xKvi
করার উপায় নেই।
কারখানাটি কঠোর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে থাকলেও নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান কর্মকর্তার
সাথে পাচারকারীদের যোগসাজশ থাকায় যন্ত্রাংশ পাচার বন্ধ হচ্ছে না।
কাঁচামাল (বাঁশ
ও পাল্পউড) সংগ্রহে অনিয়ম
কর্ণফুলী
পেইপার মিলের উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল বাঁশ ও পাল্পউড সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়ম
দুর্ণীতির পাশাপাশি চলছে ঘুষ-বাণিজ্য।
মিলের
কাঁচামাল সংগ্রহকারী ঠিকাদারদের সাথে কাঁচামাল সংগ্রহ বিভাগের কর্মকর্তারা যোগসাজশ
করে কর্ণফুলী পেইপার মিলকে কোটি-কোটি টাকা লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।
মিলে কাঁচামাল
সরবরাহকারী ঠিকাদাররা যে পরিমাণ বাঁশ মিলে সরবরাহ করেন,
কাগজেপত্রে তার কয়েকগুন সরবরাহ করা হয়েছে দেখিয়ে বিল আদায় করেন।
একটি সূত্র জানিয়েছে,
৫০ হাজার বাশ সরবরাহ করে
১ লক্ষ বাঁশ সরবরাহের বিল উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে।
একইভাবে পাল্পউড সরবরাহের ক্ষেত্রেও ঠিকাদারা কয়েকগুণ অতিরিক্ত বিল আদায় করে মিল
থেকে।
অভিযোগ আছে যে,
এ-কাজে
সহায়তা করেন মিলের কাঁচামাল সংগ্রহ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা।
এ-কর্মকর্তা ঠিকাদারদের নিকট থেকে 'ধার' নেয়ার আড়ালে ঘুষ আদায় করেন বলে কথিত আছে।
ঠিকাদারদের কাছ থেকে ধার নিয়ে তিনি কখনো তা ফেরত দেননি।
আর
ঠিকাদাররাও ধারের টাকা কখনো ফেরত চাননি।
শোনা যায়,
ঠিকাদাররা
এ-কর্মকর্তাকে এক লাখ টাকা ধার দিয়ে ৫ লাখ টাকার কাজ আদায় করেন।
কথা বলবেন না
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে কথা বলার জন্য এ-প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার
চেষ্টা চালানো হয়।
কিন্তু তিনি তার
পিএস-এর মাধ্যমে জানান,
বিসিআইসির অনুমতি ছাড়া মিডিয়ার সাথে কথা বলবেন না।
এহেন অনড় অবস্থানের প্রেক্ষিতে ব্যবস্থাপনা
পরিচালকের কোন বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
ঢাকা
থেকে আরিফুজ্জমান
২০ জুলাই
২০০৮ |