|
মানব-উন্নয়ন
ক্ষেত্রে
যুক্তরাষ্ট্র
দ্বাদশ স্থানেঃ
ধনী-গরীবে বৈষম্য ভয়ঙ্কর
মানব
উন্নয়নের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে দ্বাদশ
স্থানে অবস্থান করছে।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে
জাতিসংঘের মান উন্নয়ন প্রতিবেদনের সূচনালগ্নে দেশটির স্থান ছিলো তালিকার দ্বিতীয়
স্থানে।
'দ্য
মেজার অফ আমেরিকাঃ আমরিকান হিউম্যান ডিভেলাপমেন্ট রিপৌর্ট ২০০৮-২০০৯'
শীর্ষক মানব উন্নয়ন
সংক্রান্ত বুধবার
প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে মানব উন্নয়নের বেশির ভাগ সূচকে অন্যান্য ধনী
দেশ,
এমনকি কোনো-কোনো ক্ষেত্রে
কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের তুলনাতেও বেশ পিছিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র।
এছাড়াও স্বাস্থ্য,
শিক্ষা ও জীবন মানের
ক্ষেত্রে মার্কিন সমাজের বর্তমান প্রকট বৈষম্য বিরাজ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে
প্রতিবেদনে।
'দ্য
মেজার অফ আমেরিকা'
হচ্ছে কোনো ধনী দেশের জন্য
এককভাবে প্রস্তুত প্রথম মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন।
অক্সফ্যাম আমেরিকা,
দ্য কনরাড হিলটন
ফাউন্ডেশন ও রকফেলার ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে প্রস্তুত প্রতিবেদনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের
৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রত্যেকটি এবং ৪৩৬টি কংগ্রেসশন্যাল ডিস্ট্রিক্টটের মানব উন্নয়ন
পরিস্থিতি উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও লিঙ্গ,
বর্ণ ও জাতিসত্ত্বার
ভিত্তিতে মানব উন্নয়ন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সদ্য-প্রকাশিত
প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য,
শিক্ষা ও জীবন মানের
বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে বড়ো ধরণের অসমতা বিরাজ করছে।
জানা যাচ্ছে,
স্বাস্থ্যসেবা-খাতে
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘন্টা-প্রতি গড় ব্যয় ২৩০ মিলিয়ন ডলার,
আর দৈনিক হিসাবে ৫
বিলিয়ন ডলারের বেশি।
অথচ মার্কিনীদের
আয়ুষ্কাল বর্তমানে প্রায় সবগুলো
'উন্নত'
দেশের মানুষজনের নিচে।
আবার,
মাথাপিছু আয়ের বিচারে
সারা বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও,
প্রত্যাশিত গড়
আয়ুষ্কালের ক্ষেত্রে মার্কিনীরা আছে বিশ্বের মধ্যে বিয়াল্লিশতম স্থানে।
উল্লেখ্য,
মানব উন্নয়নের সূচক
বিচারে জাতিসংঘের তালিকার প্রথম ১১টি দেশের প্রত্যেকটির মাথাপিছু গড় আয়
যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কম।
হিসাবানুসারে,
বর্তমানে বেঁচে থাকার
সীমার ক্ষেত্রে মার্কিনীদের তুলনায় জাপানীরা গড়ে ৪ বছরেরও বেশি এগিয়ে আছে।
পশ্চিম ইউরৌপ,
নরডিক দেশগুলো ছাড়া,
এমনকি ইসরায়েল,
গ্রীস,
সিঙ্গাপুর,
কৌস্টারিকা,
দক্ষিণ কোরিয়ার
মানুষেরাও মার্কিনীদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচার প্রত্যাশা করতে পারে।
জীবন কালের ক্ষেত্রে
ভিন্নতা পাওয়া গেছে দেশের ভিতরেও।
এখন আমেরিকান-এশিয়ান
নারীর গড় আয়ুষ্কাল ৮৯ বছর।
পক্ষান্তরের
আফ্রিকান-আমেরিকান নারীর ক্ষেত্রে এ-হার ৭৬ বছর।
উভয় গ্রুপের পুরুষদের
মধ্যে এ-ব্যবধান ১৪ বছরের।
এহেন দুর্বিপাকের জন্য
স্বাস্থ্যসেবা লাভের ক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক জনগণের বঞ্চিত হওয়াকে কারণ হিসাবে
চিহ্নিত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য,
অতি ব্যয়-বহুল হবার
কারনে বর্তমানে প্রতি ৬ জনের মধ্যে ১ জন মার্কিনীর (৪৭ মিলিয়ন) স্বাস্থ্য-বীমা নেই।
এর ফলে এসব লোক খুব
সীমিত মাত্রার স্বাস্থ্যসেবা লাভে সমর্থ হয়।
বৈশ্বিক মানদন্ডে প্রত্যাশিত
আয়ুষ্কালের ক্ষেত্রে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থান ৪২তম।
আর জন্মের পরে ১ বছর
পর্যন্ত বেঁচে থাকা শিশুর সংখ্যার বিচারে দেশটি আছে ৩৪তম স্থানে।
এ-হার ক্রোয়েশিয়া,
কিউবা,
এস্তোনিয়া ও পৌল্যান্ডের
সমান।
প্রতিবেদনে জানা গেছে,
যে-কোনো ধনী দেশের
তুলনায় মার্কিন শিশুদের দারিদ্র-সীমার নিচে থাকার হার বেশি।
বস্তুতঃ ১৫ শতাংশ (১০
দশমিক ৭ মিলিয়ন) মার্কিন শিশু,
মাসে গড়-আয় ১,৫০০
হাজার ডলারের নিচে এমন পরিবারগুলোতে বাস করে।
আরও জানা যাচ্ছে,
যুক্তরাষ্ট্রের মোট
জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ (৪০ মিলিয়ন) পত্রিকার প্রবন্ধ পড়া বা ইন্সট্রাকশন ম্যানুয়াল
পড়ার মতো সাধারণ শিক্ষাগত দক্ষতা থেকে বঞ্চিত।
ইউরৌপের বেশির ভাগ অংশ,
জাপান,
কানাডা এবং রাশিয়াতে
৩ থেকে ৪ বছর বয়েসী
শিশুদের প্রি-স্কুলে ভর্তির হার প্রায় ৭৫ শতাংশ।
অথচ যুক্তরাষ্ট্রে এ-হার
৫০ শতাংশ।
ধনী দেশগুলোর সাথে তুলনাই নয়,
দেশের ভিতরেও অঞ্চল ও
জাতিসত্ত্বা ভেদে অসমতার বিবরণও দেয়া হয়েছে
'দ্য
মেজার অফ আমেরিকাতে'।
উদাহরণস্বরূপ,
শিক্ষা,
স্বাস্থ্য
এবং জীবন-যাত্রার মানের মত মানব উন্নয়ন সূচকগুলোর বিচারে সর্বাগ্রে থাকা কানেকটিকাট
অঙ্গরাজ্যের চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ বছর পিছিয়ে আছে তালিকার সর্বনিম্নে থাকা মিসিসিপির
জনগণ।
পার্থক্যের উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ
করা যায় টেক্সাসে অবস্থিত টুয়েন্টি নাইনথ কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের কথা।
এ-স্থানটিতে
হাইস্কুল-ডিগ্রী না থাকা লোকের হার এখনো পর্যন্ত গত শতকের সত্তুরের দশকের পর্যায়ে
অবস্থান করছে।
কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টগুলোর
মধ্যে মানব উন্নয়ন সূচকের বিচারে যৌথভাবে সবার আগে আছে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের
ফৌরটিনথ ডিস্ট্রিক্টটি ও ক্যালিফৌর্নিয়ার টুয়েন্টিয়েথ ডিস্ট্রিক্ট।
জাতিসত্ত্বার দিক থেকে
দেখলে মানব উন্নয়ন সূচকের বিচারে সবার শীর্ষে অবস্থান করছে এশিয়ান পুরুষরা।
আর সবার পেছনে আছে
আফ্রিকান-আমেরিকান পুরুষরা।
এ-দুই গ্রুপের মধ্যে ৫০
বছরের পার্থক্য বিরাজ করার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
যুক্তরাষ্ট্রে আয়-বৈষম্য ও
নিম্নবর্গের জন্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্যের ব্যাপারগুলোও লক্ষ্য করার মত।
দেখা যাচ্ছে যে,
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একবারের সামনের দিকে থেকে ৫ ভাগ মানুষের গড় আয় বছরে ১ লক্ষ
৬৮ হাজার ১৭০ ডলার।
পক্ষান্তরে একেবারের
নিচের ৫ ভাগের গড় আয় বছরে ১১ হাজার ৩৫২ ডলার।
শ্রমজীবি পরিবারগুলোর
লোকজনের জন্য ফ্যামিলি লীভ,
সিক লীভ বা চাইল্ড কেয়ার
দেয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র।
দেশটিতে মাতৃত্বকালীন
ছুটি প্রদান সংক্রান্ত কোনো সরকারী বাধ্যবাধকতাও নেই।
সদ্য প্রকাশিত
প্রতিবেদনটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ-প্রবণতা সংক্রান্ত ভয়াবহ এক চিত্রও পাওয়া
যাচ্ছে।
বর্তমানের হিসাবে দেশটিতে
বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৫ শতাংশের বাস।
কিন্তু সারা বিশ্বে যত
কারাবন্দী আছেন, তাদের মধ্যে ২৪ শতাংশেরই অবস্থান মার্কিন কারাগারগুলোতে।
লন্ডনঃ ১৭
জুলাই, ২০০৮ |