|
বাংলাদেশের
সিলেটের লাউয়াছড়াতে বহুজাতিক
কোম্পানীর ধ্বংসলীলা
বিলুপ্তপ্রায়
প্রাণী
লতাগুল্ম,
হরেক রকম পাখী আর
নয়নাভিরাম সবুজ সুন্দরের নাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান।
এ-বছরের জানুয়ারীতে
বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানী শেভরন লাউয়াছড়ার সংরক্ষিত উদ্যানে 'সিসমিক' জরীপ চালায়।
সিসমিক জরীপের ফলে বনে
আগুন ধরে ধ্বংস হয়ে গেছে জানা-অজানা মূল্যবান জীব-অনুজীব।
ফাটল ধরেছে পার্শ্ববর্তী
গ্রামে ও পাহাড়ে।
মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিনানিপাত
করছে।
লাউয়াছড়া ঘুরে এসে ইউকেবেঙ্গলির
জন্য লিখেছেন মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার মৌলভীবাজার রেইঞ্জের ২,৭৪০ হেক্টর
আয়তনের পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের এক হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকাকে ১৯৯৬ সালে
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
জাতীয় উদ্যান ঘোষণার বছর
ঘুরতে-না-ঘুরতেই ভয়াবহ এক অগ্নিকান্ড সংঘটিত হয় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে।
এ-অগ্নিকান্ডের ব্যাপারে
অক্সিডেন্টালের সংযোগ থাকার ব্যাপার নিয়ে পরবর্তীতে বহু কথা হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে।
পরবর্তীতে আরেক বহুজাতিক
কোম্পানী ইউনোকল এ-সংরক্ষিত বনের মধ্যে পাইপ লাইন বসিয়ে বনের জীব-বৈচিত্রের
ক্ষতিসাধন করে।
বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের বসবাস লাউয়াছড়াতে।
দূর্লভ এ-প্রাণীটি
বাংলাদেশ,
ভারত,
চিন ও মায়ানমার ছাড়া
পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে
বর্তমানে ৬৯টি উল্লুক রয়েছে।
অথচ আশির দশকেও উল্লুকের
সংখ্যা ছিলো তিন হাজারের মতো।
উল্লুক ছাড়াও এখানে ১৬৭
প্রজাতির উদ্ভিদ,
চার প্রজাতির অর্কিড ও ১৭
প্রজাতির দুর্লভ পোকা-মাকড় রয়েছে।
মুখপোড়া হনুমান,
কুলু বানর,
মায়া হরিণ,
শজারু,
খরগোশ,
অজগর,
সাত ভায়ালা,
লাল মাথা ট্রোগন,
কালো ধনেশ ও
পাহাড়ী ময়না-সহ বিরল
প্রজাতির পাখী ও বৃক্ষের অভয়াশ্রম এ-লাউয়াছড়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
গত জানুয়ারীতে
শেভরন-পরিচালিত সিসমিক জরীপের ফলে বনের ঠিক কতোটা ক্ষতি হয়েছে,
তা এ-মূহুর্তে বলা সম্ভব
নয়।
জ্বালানী তেল খুঁজে বের করার
অনুমতিতে লাউয়াছড়াতে সিসমিক জরীপটি চালায় শেভরন।
উল্লেখ্য,
সিসমেক জরীপ চালানোর সময়
জরীপের জন্য নির্দিষ্ট স্থান-সহ আশেপাশের এলাকার ভূগর্ভে প্রচন্ড 'শক-ওয়েভ' বা
'ভাইব্রেশন' তৈরী হয়,
যার ফলে ভূগর্ভ ও
ভূপৃষ্ঠ-সহ নির্দিষ্ট স্থানটির জীব-জগতের উপরেও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার হুমকি তৈরী হয়।
এছাড়াও ভূগর্ভে বিস্ফোরণ
ঘটানোর ফলে ভূগর্ভে নতুন এক বিন্যাস তৈরী হয়ে যাবার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।
সিসমিক জরীপের ফলে
শিলাস্তরে ফাটল ধরলে উপরের দিকের মাটির স্তর নেমে যাবারও ভয় দেখা দেয়।
শেভরনের
প্রতি
বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরে মনোভাব
পরিবেশবাদী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের ঘোর বিরোধিতা সত্ত্বেও শেভরন লাউয়াছড়ায় সিসমিক
জরীপের কাজ শুরু করে।
শেভরন বাংলাদেশের
প্রচলিত সমস্ত আইনকে অমান্য করে সিসমিক জরীপের কাজ শুরু করে।
শেভরনকে বাংলাদেশের
স্বার্থ-বিরোধী এ-কাজের অনুমতি দেয় বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর ২০০৭ সালের
সেপ্টেম্বর মাসের শেষ
সপ্তায়।
উল্লেখ্য,
বহুজাতিক কোম্পানী
শেভরনকে সিসমিক জরীপের সুযোগ করে দেবার জন্য বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরকে বিদ্যমান
জাতীয় পানি নীতি (১৯৯৯),
জাতীয়
স্বাস্থ্য-নীতি (২০০০),
জাতীয় পর্যটন নীতিমালা
(১৯৯২),
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (১৯৯৭),
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ
আইন (১৯৯৫),
বন্য প্রাণী সংরক্ষণ (সংশোধীত)
অধ্যাদেশ (১৯৭৪),
বন আইন (১৯২৭),
পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ
অধ্যাদেশ (১৯৭৭) এবং জাতিসংঘ প্রনীত আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র সনদ (সিবিডি-১৯৯২)-এর
পরিপন্থী।
পরিবেশ সংক্রান্ত এসব অধ্যাদেশ,
আইন ও নীতিমালায় স্পষ্ট
উল্লেখ আছে যে,
কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোনো
ধরণের স্থাপনা,
খনন বা কোনো পরিকল্পনা গ্রহণের
আগে অবশ্যই সে-এলাকার প্রাথমিক পরিবেশগত পরীক্ষা (Initial
Environmental Examination /IEE)
ও পরিবেশগত প্রভাব যাচাই
(Environmental Impact Assessment/EIA)
করে প্রতিবেদন তৈরী করে তা
জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
তারপরেই কেবল এ-ধরণের
সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে;
তবে জনগণ যদি এ-ধরণের
কাজের বিরোধিতা করে, তবে তা বাস্তবায়িত করার কোন সুযোগ কোনোভাবেই নেই।
অথচ বাংলাদেশ পরিবেশ
অধিদপ্তর উপরোল্লেখিত সমস্ত-ধরণের নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে শেভরনকে সিসমিক জরীপের
অনুমতি দেয়,
যা কোনো ভাবেই বাংলাদেশের জাতীয়
স্বার্থ রক্ষা পায়নি।
সরকারের উচ্চ-মহলের
তত্ত্বাবধানে চলতি বছরের ১৯ ফ্রেব্রয়ারীতে রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে
'সংরক্ষিত বনাঞ্চলে শেভরন বাংলাদেশ লিমিটেডকে সীসমিক সার্ভে
পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ
ওয়াইল্ড লাইফ (প্রিজার্ভেশন) (এামেন্ডমেন্ট)
এাক্ট
১৯৭৪-এর ২৩(৩) ধারা মোতাবেক শর্ত-শিথিলপূর্বক
জনস্বার্থে অনুমতি'
প্রদান করা হয়।
আইনী ফাঁক-ফোকরের কারণে সিসমিক
জরীপ চালিয়ে শেভরন লাউয়াছড়াতে যে-ক্ষতিসাধন করেছে, তার কোনো প্রতিকারের উপায় নেই।
শেভরনের সিসমিক জরীপ এবং অতঃপর
লাউয়াছড়া
বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের কাছ থেকে সিসমিক জরীপের অনুমতি-পত্র
পাওয়ার সাথে-সাথে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো তীব্র বিরোধিতা করে।
সে-সময় শেভরনের বাংলাদেশ এক্সর্টানাল
এফেয়ার্সের পরিচালক
নাসের আহম্মদ সংবাদপত্রে বলেছিলেন,
'পরিবেশ নিয়ে আমরা খুবই
সচেতন।
আমরা কাজ শেষ করবো পরিবেশের
ক্ষতি না করেই।
পরিবেশ নিয়ে অনেকে অনেক রকম
মন্তব্য করছেন।
আশা করব,
সবাই দায়িত্ব নিয়ে কথা
বলবেন ।'
অন্যদের প্রতি
দায়িত্বশীল (!) আচরণের আহবান জানালেও,
শেভরন কিন্তু দায়িত্বশীল
আচরণ করেনি কিংবা তাদের দাবী অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি।
সিসমিক জরীপে বিষ্ফোরক
ব্যবহারের ফলে লাউয়াছাড়া জাতীয় উদ্যানের মাটির নিচে সর্বত্র কম্পনের ঘটনা ঘটেছে।
এক-একটি বিস্ফোরণ বা
বৌম্বিং
করার জন্য অন্ততঃ ১ঘন্টা
জেনারেটর চালিয়ে ড্রিলিংয়ের কাজ চলেছে।
এসব ড্রিল করা গর্তের
গভীরতা ৪০ ফুট থেকে ৭০ ফুট পর্যন্ত।
জানা গেছে, জরীপ চালানোর
সময় পুরো জরীপ এলাকায় পোতা হয়েছিলো হাজারখানেক বিস্ফোরক।
লাউয়াছড়া
বনে আন্ডারগ্রাউন্ড বৌম্বিংয়ের কারণে বন থেকে মায়া হরিণ,
গোন্ধগকুল,
মেছো বাঘ-সহ উল্লেখযোগ্য
বিরল-প্রায় প্রজাতির বন্য-প্রাণীরা অভয়াশ্রম ছেড়ে লোকালয়ে চলে এসেছে।
বনের সার্বিক ক্ষতি
সম্পর্কে বিশিষ্ট উদ্ভিদ বিজ্ঞানী নওয়াজেশ আহম্মেদ বলেন,
যে-সব গাছের শিকড় মাটির
গভীরে যায় সেসব গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অনুজীব ধ্বংস হতে পারে।
মাটির উপরিতলা থেকে বিশ
ফুটের মধ্যে কম্পন আসলে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।'
ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ীর-ঘরের
একাধিক বাসিন্দা ইউকেবেঙ্গলিকে জানিয়েছে,
শেভরন আগে থেকে সিসমিক
জরীপের কথা বলেনি।
শেভরনের সিসমিক জরীপে
সংরক্ষিত বন লাউয়াছড়াই নয়,
আন্ডারগ্রাউন্ড বোমার
কারণে কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের প্রায় ৩০০ বাড়ীতে ফাটল দেখা দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ঘর-বাড়ীর
বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সরজেমিন তদন্তে দেখা
গেছে, সিসমিক জরীপে বোমার আঘাতে কমলগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ বালিগাঁও গ্রামের অধিকাংশ
ঘরবাড়ীতে ফাটল দেখা দিয়েছে।
বৌম্বিংয়ের কারণে দক্ষিণ
বালিগাও গ্রামের বাসিন্দা মনির হোসেনের পাকা বাড়ীতে ১৭টি ফাটল ধরেছে।
শুধু মনির হোসেনই নয়,
দক্ষিণ বালিগাঁওয়ের আরেক বাসিন্দা দিনমজুর হারুন মিয়ার (৩৫) দুটি মাটির ঘর শেভরনের
বোমার কারণে ফেটে গেছে।
ফাটলের সংখ্যা ৩৫টি।
হারুন মিয়া ক্ষোভের সাথে
জানালেন,
'যার
দুটো মাটির ঘর আছে, তার কাছে সেটা অনেক বড়ো।
আমরা এখন সব সময় আতঙ্কে
থাকি কোনো সময় ঘরটা ভেঙ্গে পড়ে।'
হারুন
মিয়ার পাশের বাড়ীতে থাকেন শাহানা বেগম।
অল্প কয়েকদিন আগে বিধবা
হয়েছেন শাহানা বেগম।
ছ'টি ছেলে-মেয়ে নিয়ে
এ-বিধবা এমনিতে পড়েছে বিপাকে,
তার উপর আবার শেভরনের
সিসমিক জরীপের কারণে ঘরে দেখা দিয়েছে ফাটল।
শাহানা বেগমের মতো জাবার
মিয়া,
বজলু মিয়ারাও ভূমিহীন।
এসব ভূমিহীন পরিবারের
এখন একটাই চিন্তাঃ ফেটে যাওয়া ঘরগুলো না পড়ে যায়।
শুধু ঘর নয়,
সিসমিক জরীপ থেকে রক্ষা
পায়নি গ্রামের টিউবওয়েলগুলো।
পানির বদলে ওগুলো থেকে
এখন বালি উঠছে।
প্রবীণ গ্রামবাসী মুঞ্জুর আলী
বলেন,
'বোমার
শব্দে গ্রামের মাটি পর্যন্ত কাঁপতো।
একদম থরথর করে কাঁপতো।
আমরা সব সময় আতঙ্কে আছি
কখন আবার বোমা ফাটার কাজ শুরু হয়।'
ক্ষতিপূরণের অভিজ্ঞতা এখানকার মানুষের খুবই খারাপ।
অক্সিডেন্টাল যখন
মাগুরছড়াতে অগ্নিকান্ড ঘটায়, তখনও সরকারী-বেসরকারী পর্যায় আশ্বাস দেওয়া হয়েছিলো
ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
আশ্বাস বাস্তবাতার মুখ
দেখিনি।
এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের কোনো
টাকা পায়নি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী।
তবে গ্রামবাসীর অভিযোগ
আওয়ামীলীগের শাসনামলে ক্ষতিপূরণের টাকা একাই মেরে দেয় তৎকালিন আওয়ামীলীগের নেতা
রফিক প্রফেসর।
দৃশ্যপটে এবার আওয়ামীলীগ না
থাকলেও আছে বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
বিএনপির স্থানীয় নেতা ও
কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সাথে শেভরনের সখ্যতা বেশ ভালো।
সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান
গোলাম কিবরিয়া শেভরনের জরীপ কাজে ৬ মাসের চুক্তির জন্য তার দলের প্রায় ৪০০ শ্রমিক
দিয়েছেন।
ডান হাত হিসাবে পরিচিত আলমাসের
মাধ্যমেই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।
অভিযোগ আছে,
আলমাসের ভয়ে এলাকাবাসী শেভরনের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবীও করতে পারে না।
বরাবরের মতো স্থানীয়
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবারও ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকা করা হয়েছে,
তবে প্রকৃত
ক্ষতিগ্রস্তেরা আদৌ ক্ষতিপূরণ পাবে কি-না, তা নিয়ে স্থনীয় মানুষের মনে সন্দেহ রয়েছে।
শেভরনের
সিসমিক জরীপের কাজ যখন শুরু হয়, তখন চলছিলো প্রাণীদের প্রজনন-কাল।
সিসমিক জরীপের ফলে
প্রাণীর প্রজননে যে-অপূরণীয় ক্ষতি হযেছে, তা কোনোভাবেই পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব নয় বলে
মনে করেন একাধিক প্রাণীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ।
প্রাণীদের প্রজনন-কালে
কেনো শেভরনকে সিসমিক জরীপের কাজ করার অনুমতি দেওয়া হলো,
এ-বিষয়ে প্রশ্ন করলে কথা
বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর ও শেভরনের কর্মকর্তারা।
মার্কিন টাকায় বন রক্ষা?
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে সাড়ে ছয় মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজেট নিয়ে শুরু
হয়েছে নিসর্গ নামের একটি পাইলট প্রজেক্ট।
২০০৩ সালে জুন মাসে
এ-প্রজেক্টের কাজ শুরু হয়।
লাউয়াছড়া ব্যতীত
এ-প্রজেক্টের আওতাধীন রয়েছে সাতছড়ি সংরক্ষিত বন (হবিগঞ্জ),
টেকনাফ গেম রিজার্ভ
(কক্সবাজার),
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য
(চট্রগ্রাম) এবং রেমাকালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (হবিগঞ্জ)।
বিপদের কথা হলো, নিসর্গ
পরিচালিত পাঁচটি প্রজেক্টই সুরমা বেসিনে।
তেল গ্যাস উত্তোলনের
জন্য সুরমা বেসিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ রিজার্ভ হিসেবে মনে করেন তেল-গ্যাস-খনিজ
সম্পদ বিশেষজ্ঞরা।
অনেকে মনে করেন,
বন রক্ষার নামে
মার্কিনীরা আসলে বাংলাদেশের তেল-গ্যাসের উপর আধিপাত্য বজায় রাখতে চায়।
নিসর্গের অর্থের জোগান
দাতা ইউএসএইড।
আর ইউএসএইডকে বার্ষিক মোটা টাকা
দেয় শেভরনসহ তেল গ্যাস উত্তোলনকারী অন্যান্য মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানী।
শেভরনের বাংলাদেশী বন্ধুরা
শুধুমাত্র বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর আর বন বিভাগ মিলে শেভরনকে সিসমিক জরীপ শুরু
করার অনুমোদন দিতে পারেনি।
এদের সাথে জড়িত রয়েছে
দেশীয় কিছু বেসরকারী প্রতিষ্ঠান,
যারা আবার বিভিন্ন সময়
পরিবেশ রক্ষার জন্য সভা-সেমিনার করে আসছে।
শেভরনের জরীপের জন্য
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন সংশোধন করেছে সরকার।
এ-কাজে সরকার ও শেভরনকে
সাহায্য করেছে ইউএসএইড,
ওয়াইল্ডলইফ অব বাংলাদেশ
(ডব্লিউটিবি)।
এতো গেলো আইনী সহায়তাকারী
শেভরনের বন্ধুরা।
এর বাইরেও রয়েছে জরীপ মনিটরিং
কমিটিতে শেভরনের পছন্দসই সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা।
জরীপ কমিটিতে রয়েছে
আইইউসিএন এর নেতৃত্বে ১২ সদস্যের কমিটি যার মধ্যে
স্বয়ং শেভরনও আছে।
আর যার নেতৃত্বে জরীপ
কমিটি, সেই আইইউসিএন হলো শেভরনের অর্থে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান।
ফলে প্রশ্ন ওঠা
প্রাসঙ্গিকঃ
এসব জরীপ কমিটী বাংলাদেশের
স্বার্থ দেখবে,
না শেভরনের
স্বার্থ দেখবে?
সংবাদপত্রে আইইউসিএন-এর ভাষ্য
দেখলে তার উত্তর মিলে।
জরীপ
মনিটিরিংয়ে নিয়োজিত আইইউসিএন-এর প্রাণী বিশেষজ্ঞ সাংবাদিকদের বলেন, 'বিস্ফোরণের ফলে
প্রাণীদের কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না।'
এ-দাবী প্রসঙ্গে
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ -বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক আনু
মুহাম্মদ ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন, 'বহুজাতিক কোম্পানীগুলো বাংলাদেশের জ্বালানী সম্পদ
দখলে নিতে চায়।
এ-কাজে তারা অনেক টাকা খরচ
করছে, কিছু পরিবেশ প্রতিষ্ঠান ও কিছু প্রভাবশালী সাংবাদিকদের পিছনে।
এরা গবেষণার জন্য
মনিটরিং বা রিপৌর্ট করে না।
কোম্পানীগুলো এদেরকে
ব্যবহার করে বৈধতা আদায়ের জন্য।'
তিনি আরও বলেন,
'বাংলাদেশের
জনগণতো বাংলাদেশের সম্পদের মালিক নয়,
মালিক হোলো বহুজাতিক
কোম্পানী ও তাদের এ-দেশীয় দালালরা।'
পৃথিবী-ব্যাপী শেভরন
শুধু
বাংলাদেশেই নয়,
পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করার
জন্য সারা পৃথিবীতে পরিচিত শেভরন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
এ-বহুজাতিক কোম্পানীটি খোদ মার্কিনীদের কাছে পরিবেশ ধ্বংসকারী হিসাবে পরিচিত।
২০০২ সালে শেভরনকে ৮২টি
অভিযোগের কারণে ৪০ লক্ষ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হয়েছে।
ক্যালিফোনিয়ায় এল
রেগুনডো রিফাইনারীর কাছে ভূ-গর্ভস্থ পানি দূষিত করার দায়ে দিতে হয়েছে ১০ লাখ ৫৫
হাজার মার্কিন ডলার।
উটাহ রাজ্যের
এানেথে
পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৮ লাখ ৬৯ হাজার নয়শো ৯২ ডলার গুনতে হয়েছে।
কলোরোডার রেঙ্গলিতে
পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলাল এবং
এানেথেই
গ্যাস প্লান্টে
অগ্নিকান্ডের জন্য শেভরনকে গুনতে হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
বাইরেও শেভরন একটি আতঙ্কের নাম।
এ-কোম্পানীটি
নাইজেরিয়াতে কয়েকটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্টীকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাইজেরিয়ায় হয়তো বেশি
পরিমাণেই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে শেভরন।
শেভরনের মতো
কোম্পানীগুলোর বাড়াবাড়িতে বাধ্য হয়ে বিল ক্লিন্টন একবার বলেন,
'শেল,
মবিল ও শেভরনের মতো বহুজাতিক
কোম্পানীর কার্যক্রম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে যাচ্ছে।'
এমেনেস্টি
ইন্টারন্যাশনাল শেভরনকে একটি আদিবাসী নিপীড়ক কোম্পানী হিসাবে চিহ্নিত করেছে।
ব্যাপক পরিবেশ বিধ্বংসী
কাজ করায় ইকুয়েডরে জনগণের তোপের মুখে পড়েছে শেভরন।
শেভরনের বক্তব্য
লাউয়াছড়া
জাতীয় উদ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া,
সিসমিক জরীপ এলাকার
বাড়ী-ঘরে ফাটল সৃষ্টি এবং জাতীয় উদ্যানের জীব-বৈচিত্র ধ্বংসের ব্যাপারে শেভরনের
ভূমিকা নিয়ে শেভরনের বাংলাদেশ এক্সটার্নাল
এাফেয়ার্সের
পরিচালক নাসের আহম্মদের সাথে কথা হয় এ-প্রতিবেদকের।
নাসের আহমদ জানান,
লাউয়াছড়াতে অগ্নিকান্ডের সাথে শেভরনের কোনো সম্পর্ক নেই।
তার বক্তব্য অনুসারে,
আগুন লাগার বিষয়টি শেভরন
জেনেছে পত্রিকার মাধ্যমে।
যেহেতু শেভরন ওখানে কাজ
করছিলো, তাই অনেকে ধরে নিয়েছে এটা শেভরন ঘটিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে একটা তদন্ত
কমিটি গঠিত হয়।
সে-তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা
দিয়েছে।
তারা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে,
আগুন লাগার সাথে শেভরনের কোনো সম্পর্ক নেই।
পেট্রোবাংলা ও স্থানীয়
প্রশাসনের তদন্তেও শেভরনকে দায়ী করা হয়নি।
সরেজমিন
তদন্তে আলোচ্য এলাকার শ'তিনেক বাড়ীঘরে ফাটল দেখা দেয়ার সাথে শেভরনের কোন সম্পর্কের
কথাও অস্বীকার করেছেন নাসির আহম্মদ।
তিনি জানান, সিসমিক
জরীপে এ-রকম ফাটল ধরার কোনো সম্ভাবনা নেই।'
নাসের বলেন, 'তারপরেও
আমরা ১৭ মিটার সেইফ দূরত্বে
বৌম্বিং করেছি।
আপনি ওসব এলাকায় দেখে
থাকবেন সব মাটির ঘর।
ওসব ঘরে এমনিতে ফাটল
থাকে।
এটা
স্বাভাবিক ফাটল।'
নাসেরকে
প্রশ্ন করা হয়ঃ 'জরীপ কমিটিতে যারা আছে তার মধ্যে আইইউসিএন আপনাদের পার্টনার
অর্গানাইজেশন।
আপনারা আইইউসিএনকে টাকা দেন।
তাহলে উক্ত সংগঠনের
যে-প্রতিবেদন তা আপনাদের পক্ষে যাবে এটাই স্বাভাবিক|'
উত্তরে নাসের বলেন,
'মানুষের
যা ইচ্ছে তাই ভাবুক।
আইইউসিএন একটা
আন্তর্জাতিক সংগঠন।
আমরা দেখি কাজের
ক্ষেত্রে কে কতোটা কমিটেড।
টাকা কে দেবে বলুন?'
তাকে আরও
প্রশ্ন করা হয়ঃ 'লাউয়াছড়া একটি সংরক্ষিত বন।
এখানে যে-কোনো প্রকার
কাজ আইনত নিষিদ্ধ।
শেভরন কীভাবে কাজটি
পেলো?' এ-প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,
'সরকারী
একটা গেজেইটের মাধ্যমে আমরা অনুমতি পাই।
এ-কাজটি করা যাবে কি-না
সে রকম একটা বিষয় ছিলো,
সে-কারণে গেজেইটে
প্রকাশিত করতে হয়।
আমরা প্রথম থেকেই
বাগানের পরিবেশ নিয়ে সচেতন ছিলাম।'
'শেভরন
খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিবেশ নষ্ট করার দায়ে কোটি-কোটি টাকা জরিমানা দিতে
হয়েছে।
নাইজেরিয়াতে তাদেরকে হত্যাকারী
হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এমেনেস্টি
ইন্টারন্যাশনাল শেভরনকে নৃ-তাত্ত্বিক জাতীগোষ্টী ধ্বংসকারী কোম্পানী হিসেবে চিহ্রিত
করছে;
এরকম অবস্থায় বাংলাদেশে শেভরনের
ভূমিকা কী হবে?'
প্রতিবেদকের
এ-প্রশ্নের জবাবে নাসের বলেন,
'শেভরন
প্রায় ১৮০টি দেশে কাজ করছে।
ফলে কোথাও-কোথাও কিছু
ব্যাপার ঘটে যেতে পারে।
যদি সেরকম কিছু হয় তবে
আমরা ক্ষতিপূরণ ও দিয়ে থাকি।'
আগুন
লাগা বা ঘরবাড়ীতে ফাটল তৈরীর মতো ব্যাপারগুলো থেকে নাসের আহম্মদ যেভাবে শেভরনের
পক্ষে যে বিবরণ দিয়েছেন, তার সাথে বাস্তবতার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই বলেই মনে করা
যায়।
লাউয়াছড়াতে আগুন লাগার সময়টিতে
শেভরন সেখানে উপস্থিত ছিলো।
সে-সময়ে শেভরনের অনেক
স্টাফের সেখানে হাজির থাকার কথা জানা যায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকেই।
ঘরবাড়ীর ফাটল প্রসঙ্গেও
শেভরন নির্বাহীর কথাবার্তার সাথে এলাকাবাসীর অভিজ্ঞতার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা থেকে
আরিফুজ্জমান
২৮ জুন,
২০০৮
ইউকেবেঙ্গলির সিলেট সূত্রঃ
শেভরনের সিসমেক জরীপ-জনিত কারণে লাউয়াছড়াও আশেপাশের এলাকাতে কী ধরণের ক্ষতি হয়েছে
বা ক্ষতির সমম্ভাবনা আছে সে-ব্যাপারে বাংলাদেশের সংবাদ-মাধ্যমগুলোতে তেমন কোনো
সংবাদ প্রকাশ না হবার কারণে সচেতন মহলের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সূত্রে প্রকাশ,
এ-ব্যাপারে কোনো উৎসাহ না দেখানোর জন্য প্রচ্ছন্ন সতর্কতার মধ্যে আছে মিডিয়া।
ইউকেবেঙ্গলির বিশেষ একটি
সূত্র সিলেট থেকে জানিয়েছে,
শেভরনের সিসমেক জরীপটির
ফলশ্রুতিতে শ্রীমঙ্গলের কমলগঞ্জে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভিতরে অবস্থিত
একটি পাহাড়ে ইতিমধ্যে বড়ো ধরণের ফাটল দেখা দিয়েছে।
এছাড়াও পাশ্ববর্তী একটি
রাস্তাতেও গভীর ফাটল ও গর্ত তৈরী হবার খবর পাওয়া গেছে।
|