|
মুগাবেকে
সমর্থনের পথ থেকে সরে এলো দক্ষিণ আফ্রিকার শাসক দল
দক্ষিণ
আফ্রিকার শাসকদল এএনসি জিম্বাবুয়ের সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের
ওপর জবরদস্তিমূলকভাবে চড়াও হওয়ার অভিযোগ এনেছে। মঙ্গলবার দলটির পক্ষ থেকে জানানো
হয়, কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে তারা ভীত এবং এ-পরিস্থিতিতে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন
সম্ভব নয়। এএনসির এ-কঠোর বক্তব্যের ফলে জিম্বাবুয়ের সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ আরও
তীব্রতর হলো। কেনো-না দক্ষিণ এশিয়ার শাসকদল এএনসি এর আগে মুগাবেকে কার্যতঃ সমর্থন
দিয়ে এসেছে। তবে ২৩ জুন সোমবার নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত জিম্বাবুয়ের সঙ্কট বিষয়ক
প্রস্তাবে দক্ষিণ আফ্রিকা অভিন্নমত পোষণ করার পর থেকেই দেশটির নতুন কূটনৈতিক
অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এ-দিকে ডাচ
দূতাবাসে আশ্রয়গ্রহণকারী জিম্বাবুয়ের বিরোধী দলীয় নেতা মর্গান চাঙ্গিরাই বলেছেন,
যে-কোনো সুবিধাজনক সময়ে তিনি ডাচ দূতাবাসের আশ্রয়স্থল ত্যাগ করতে প্রস্তুত রয়েছেন।
তবে, তিনি জানান, অযৌক্তিক পথে চালিত মুগাবের রাজত্ব তাঁকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা
দিতে পারবে বলে তিনি মনে করেন না।
এ-সময় চাঙ্গিরাই
সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে মুগাবের রাজত্বকে সমালোচনা করে গৃহীত
প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। নিরাপত্তা পরিষদের এ-প্রস্তাবে জিম্বাবুয়ের সরকারকে
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের স্বাধীন প্রচারণা চালানোর অধিকার খর্ব করে ধারাবাহিকভাবে
সহিংসতা চালানোর জন্যে কঠোর সমালোচনা করা হয়। জিম্বাবুয়ের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট
নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ-প্রথম কোনও প্রস্তাব গ্রহণ করলো। দক্ষিণ আফ্রিকার
আপত্তির কারণে জাতিসংঘ এ-সঙ্কট সম্পর্কে এতোদিন নীরব ছিলো। কিন্তু ব্রিটিশ
কূটনীতিকদের উদ্যোগের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা ২৩ জুন সোমবার তার আগের অবস্থান থেকে সরে
আসে এবং নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতির সঙ্গে অভিন্নমত পোষণ করে।
উল্লেখ্য, আগামী ২৭
জুন জিম্বাবুয়েতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের ভৌট হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু
তার আগেই উদ্ভূত সহিংস পরিস্থিতিতে বিরোধী দলীয় প্রার্থী সানগিরাই ২২ জুন রোববার
নির্বাচন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা দেন। নিরাপত্তাজনিত সঙ্কটের কারণে
এ-দিন চাঙ্গিরাই তার বাড়ী ছেড়ে রাজধানী হারারের ডাচ দূতাবাসে আশ্রয় নেন। এর আগেও
তিনি গত এপ্রিলে নিরাপত্তাজনিত কারণে পাশের রাষ্ট্র বতসোয়ানায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
বিরোধীরা অভিযোগ
এনেছে, গত মার্চ মাস থেকে রাজনৈতিক সহিংসতায় জিম্বাবুয়েতে মৃত্যু ঘটেছে ৮০ জনেরও
বেশি বিরোধী দলীয় কর্মীর ও আহত হয়েছে ১০ হাজারেরও কর্মী-সমর্থক। ২০ হাজারেরও বেশি
বাড়ীঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং ঘর ছেড়ে পালাতে হয়েছে দু-লাখের বেশি মানুষকে।
এ-রকম রাজনৈতিক তাণ্ডবের মুখে শেষপর্যন্ত বিরোধী দল মুভমেন্ট ফর ডেমোক্র্যাটিক
চেইঞ্জ এমডিসি-র নেতা ও রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মর্গান চাঙ্গিরাই আগামী ২৭ জুনের
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। তিনি বলেন, 'যেখানে ভোটের
বদলে জীবন চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে আমরা জনগণকে ভোট দিতে যেতে বলতে পারি
না।' ঝুকিঁপূর্ণ আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোয় গণহত্যা বন্ধের উদ্যোগ নেয়ার জন্যেও তিনি
আহ্বান রাখেন জাতিসংঘের প্রতি।
জিম্বাবুয়ের
রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে ২৯ মার্চে প্রথম দফার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের
পর। এ-নির্বাচনে এমডিসির রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মর্গান সানগিরাই বিজয়ী হয়। এমডিসি
দাবী করে, তাদের প্রার্থী ৫০.৩ শতাংশ ভৌট পেয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়,
তিনি বেশি ভৌট পেলেও ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাননি এবং সে-কারণে সংবিধান অনুসারে আবারও
নির্বাচন হতে হবে। এসময় স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিবীক্ষণকারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও
বলা হয়, চাঙ্গিরাই মোট ভোটের ৪৯ শতাংশ ভোট পেলেও এবং তা বর্তমান রাষ্ট্রপতি মুগাবের
পাওয়া ভোটের চেয়ে বেশি হলেও বিজয়ের জন্যে প্রয়োজনীয় ভোটের সামান্য কম। এ-সময়
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং মর্গান চাঙ্গিরাই গোপনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র
বতসোয়ানায় আশ্রয় নেন। পরে ২৭ জুন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা
হয়।
এদিকে
যুক্তরাষ্ট্র
এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো অনেকদিন
ধরেই চাইছে,
প্রতিবেশী দেশগুলো
জিম্বাবুয়ের উপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করুক।
গত এপ্রিল মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের আফ্রিকা বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা জেনদাওয়াই
ফ্রেইজার এ-লক্ষ্যে আফ্রিকার দেশগুলি সফর করেন। তিনি তখন মন্তব্য করেন,
জিম্বাবুয়েতে ঐকমত্যের সরকারে কোনো প্রয়োজন নেই, কেনো-না সেখানে বিরোধী দল এমডিসি
নির্বাচনে জয়ী হয়েছে।
তবে
প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে
জিম্বাবুয়ে নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
যেমন,
দক্ষিণ আফ্রিকার
রাষ্ট্রপতি এমবেকি জিম্বাবুয়ে-সঙ্কটের মুখ্য মধ্যস্থতাকারী
এবং তিনি মুগাবের সমালোচনা করতে অনিচ্ছুক।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকার
শাসকগোষ্ঠী এএনসি ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো কঠোর পথ অনুসরণের জন্যে তাকে চাপ দিচ্ছে।
জাতিসংঘের বিবৃতিতে সোমবার দক্ষিণ
আফ্রিকার সমর্থন এবং মঙ্গলবার মুগাবে-রাজত্ব নিয়ে
এএনসির
কড়া সমালোচনা এ-অবস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের
প্রতিবেশী রাষ্ট্র
জাম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি
মোয়ানাওয়াসা অনেক আগে থেকেই মুগাবের
কঠোর সমালোচক।
তিনিই
জিম্বাবুয়েতে বাইরের
অস্ত্রবাহী জাহাজ যেতে না দেয়ার জন্যে
গত এপ্রিল মাসে
আফ্রিকার প্রতি আহ্বান রাখেন,
যা মুগাবেকে প্রচণ্ড
উত্তেজিত করে তোলে।
তবে
এাঙ্গোলার
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে জিম্বাবুয়ের
মুগাবের গভীর সখ্য রয়েছে।
কেনো-না, গত সত্তরের
দশকে এ-দুটি দেশ একই সময়ে ঔপনিবেশিক শাসন হটিয়ে
স্বাধীন হয়।
প্রতিবেশী বতসোয়ানা
অবশ্য মুগাবের মিত্র নয়।
বিরোধী দলীয় নেতা মর্গান
চাঙ্গিরাই মার্চের নির্বাচনের পর
পালিয়ে সেখানেই আশ্রয় নিয়েছেন।
কিন্তু নামিবিয়া
জিম্বাবুয়ের ঘনিষ্ট
মিত্র এবং এ-দেশটিও
পরিকল্পনা নিচ্ছে শ্বেতাঙ্গ-মালিকানাধীন খামারগুলো কৃষ্ণাঙ্গ গ্রামবাসীদের কাছে
পুনর্বন্টন করে দেয়ার।
মোজাম্বিক তার মাটিতে
জিম্বাবুয়ের
বেশ কিছু শ্বেতাঙ্গ কৃষক
গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে।
মোজাম্বিকের সরকার বিরোধী-পক্ষের প্রতিই খানিকটা সহানুভূতিশীল বলে
মনে করা হয়।
তাঞ্জানিয়ার শাসকগোষ্ঠী
মুগাবে ও তার পার্টি জানু-পিএফ-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং তার সমালোচনা করতে অনিচ্ছুক।
ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক
কঙ্গোর রাষ্ট্রপতি জোসেফ কাবিলাও মুগাবের ঘনিষ্ঠ মিত্র, যার বাবা লরেন্ট কাবিলার
প্রতি বিদ্রোহের সময় সমর্থন জানিয়ে
মুগাবে জিম্বাবুয়ে থেকে
সৈন্যবাহিনী
পাঠিয়েছিলেন।
মালাওয়ীকে
অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ মনে করা হলেও এখানে
জিম্বাবুয়ের
বংশোদ্ভূদ ৩০ লাখ
অধিবাসী রয়েছেন।
এদের বেশির ভাগই
কৃষিশ্রমিক এবং জিম্বাবুয়েতে
তারা কাজ
হারানো ছাড়াও
মুগাবের
নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
শুধু
রাজনৈতিক সঙ্কট
নয়, অর্থনৈতিক সংকটও জিম্বাবুয়েতে
ঘনীভূত হয়ে উঠেছে।
রয়টার্স,
বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থা ও
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার হিসেবে অনুযায়ী এখানে এখন মুদ্রাস্ফীতি ১০০,০০০
শতাংশ! অন্যদিকে বেকার মানুষ ৮০ শতাংশ।
এ দেশের মানুষের গড় আয়ু
৩৭ বছর।
অপুষ্টিতে ভুগছেন জনসংখ্যার ৪৫
শতাংশ।
লন্ডনঃ ২৪
জুন, ২০০৮ |