|
স্পেইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে সিরিজ-দূর্নীতির অভিযোগ
স্পেইনে
নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ডঃ সাইফুল
আমিন খানের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি
দূর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দূতাবাসের স্টাফ আনার
নামে অর্থ গ্রহণ, নিজের পছন্দমতো লোক আনার জন্য দূতাবাসের কর্মী ছাঁটাই, দূতাবাসে
ভূয়া স্টাফ দেখিয়ে মাসে-মাসে বেতন তোলা, দূতাবাসের স্টাফ হিসাবে লোক এনে ব্রিটেইনে
পাঠিয়ে দেয়া, অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে বাঙালীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলা, প্রবাসীদের
সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকারের রক্ষিত তহবিল তসরুপ এবং পারিবারিক ভ্রমণের জন্য
দূতাবাস থেকে অর্থ গ্রহণ-সহ স্পেইনের বাঙালী কমিউনিটিতে বিভেদ সৃষ্টিতে ইন্ধন-দানের
মারাত্মক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে ডঃ খানের বিরুদ্ধে।
সাম্প্রতিক সময়ে তার
বিরুদ্ধে স্পেইন-প্রবাসী বাঙালীদের অনাস্থা চরমে উঠছে বলে জানা গেছে।
এছাড়াও তার আমলে স্পেইনে
বাংলাদেশ প্রবাসীদের ব্যাপক স্বার্থহানির হবার খবরও পাওয়া গেছে।
অভিযোগ
আছে যে, কিছুদিন আগে ফারুক নামের এক ব্যক্তিকে বাংলাদেশ দূতাবাসের স্টাফ হিসাবে
দেখিয়ে বড়ো অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে স্পেইন নিয়ে আসেন রাষ্ট্রদূত ডঃ খান।
স্পেইন নিয়ে আসার পর
ফারুককে ভিসা দেয়ার জন্য
স্পেইনের ব্রিটিশ দূতাবাসের বরাবরে চিঠি লেখে বাংলাদেশ দূতাবাস।
এর পিছনে আর্থিক
লেনদেনের ঘটনা কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।
আবার, আবুল কালাম নামের
একজন দূতাবাস কর্মীর সাথে রাষ্ট্রদূতের বৈরি আচরণের ব্যাপারেও তথ্য পাওয়া গেছে
দূতাবাস সূত্র থেকে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ
থেকে নতুন লোক আনার কথা বলে আবুল কালামকে দূতাবাসের বাইরে কাজ করায় প্রলুব্ধ করেন
রাষ্ট্রদূত।
বর্তমানে আবুল কালাম দূতাবাসে
কাজ না করলেও, তার নামের বিপরীতে বেতন তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অপর এক অভিযোগে প্রকাশ,
মোহাম্মদ আনোয়ারুল আযাদ নামের একজনকে দূতাবাস ছেড়ে দিয়ে বাইরে কাজ করার পরামর্শ দেন
ডঃ খান। কিন্তু
রাষ্ট্রদূতের এহেন পরামর্শ
গ্রহণে রাজী ছিলেন না আযাদ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারী থেকে ৮
মার্চ পর্যন্ত বাৎসরিক ছুটি নিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করেন তিনি।
এ-ফাঁকে রাষ্ট্রদূত
সাইফুল আমিন খান তিনজন স্টাফ চেয়ে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাবরে আবেদন করেন।
স্পেইন দূতাবাস থেকে
ঢাকাকে জানানো হয় যে, আযাদ সেখানে আর কাজ করছেন না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে
যেয়ে এ-তথ্য জানতে পেরে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বাৎসরিক ছুটির কাগজ-পত্র দেখান তিনি।
এমতাবস্থায়, পুরোনো
স্টাফরা কোথায় গেছে এবং কেনো তিনজন নতুন স্টাফ নিয়োগ দেয়া দরকার, এসব জানতে চেয়ে
স্পেইনের দূতাবাসের কাছে চিঠি পাঠানো হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে।
প্রশ্নের কোনো সদুত্তর
না পেয়ে রাষ্ট্রদূতের চেয়ে পাঠানো তিন ব্যক্তিকে ভিসা না দেয়ার জন্য ঢাকা থেকে
দিল্লীস্থ স্পেইন দূতাবাস বরাবরে অনুরোধ জানানো হয়।
জানা গেছে, শেষ পর্যন্ত
চাহিদা মাফিক তিন ব্যক্তিকে স্পেইন নিতে পারেননি রাষ্ট্রদূত মহোদয়।
কিন্তু
ঘটনার শেষ এখানেই হয়নি।
অভিযোগে প্রকাশ, ছুটি
শেষে চাকুরীতে যোগদানের জন্য দূতাবাসে গেলে আনোয়ারুল আযাদের উপরে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে
ওঠেন রাষ্ট্রদূত।
এক পর্যায়ে আযাদকে দূতাবাসের
কার্ড ফিরিয়ে দেয়ার জন্য চাপ দেন তিনি।
কিন্তু আযাদ জানান,
চাকুরী থেকে বাদ দিতে হলে নিয়ম-মোতাবেক তাকে একমাসের নোটিশ দিতে হবে দূতাবাসের পক্ষ
থেকে।
এমতাবস্থায়, কার্ড জমা না দিলে
আযাদের বিরুদ্ধে পুলিসী ব্যবস্থা গ্রহণ করে কার্ড ফেরত নেয়ার হুমকি দেন রাষ্ট্রদূত।
শেষ পর্যন্ত দু'মাসের
বকেয়া বেতন প্রাপ্তি সাপেক্ষে কার্ড ফিরিয়ে দিতে রাজী হন আযাদ।
কিন্তু তাও না পাবার
কারণে স্পেইনের আদালতে মামলা দায়ের করেন আযাদ।
মাদ্রিদের বাঙালী-সূত্র থেকে জানা গেছে, ২৬ মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস
উদযাপন উপলক্ষ্যে বাঙালী ব্যবসায়ী আব্দুস সোবহান, জামাল উদ্দীন মনির-সহ বেশ কয়েকজন
ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বড়ো অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রদূত সাইফুল
আমিন খান।
উল্লেখ্য, দূতাবাসে
জাতীয় দিবসগুলো উদযাপনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেই অর্থ বরাদ্দ দেয়া থাকে।
ব্যক্তিগত ভ্রমণকে
অফিশিয়াল ভ্রমণ হিসাবে দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে আলোচ্য
রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, সম্প্রতি
কয়েকজন বাঙালী ব্যবসায়ীর নিমন্ত্রণে স্পেইনের নয়নাভিরাম দ্বীপ মাইয়র্কাতে সস্ত্রীক
বেড়াতে যান ডঃ খান।
ব্যবসায়ীদের সৌজন্যে
বিলাস-বহুল হৌটেলে থাকা-খাওয়া ছাড়াও ভ্রমণ-কালে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দামী কিছু
উপহার সামগ্রীও লাভ করেন রাষ্ট্রদূত।
বিশ্বস্ত সূত্রে প্রকাশ,
সম্পূর্ণ অন্যের-ব্যয়ে সম্পন্ন এ-ভ্রমণকে অফিশিয়াল ভ্রমণ হিসাবে দেখিয়ে দূতাবাস
থেকে অর্থ তুলেছেন করেছেন ডঃ খান।
বহুলালোচিত এ-রাষ্ট্রদূত স্পেইনের বাঙালী কমিউনিটিতে ভেদাভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন
বলে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এ-প্রতিবেদকের কাছে।
রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে
দল-মত নির্বিশেষে অনাস্থা জ্ঞাপনের একটি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া গেছে
বিভিন্ন মহল থেকে।
উল্লেখ্য, গত ৮ জুন
বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য বার্সিলোনাতে বাসকারী
বেশ কিছু বাঙালী রাস্তায় নেমে আসেন।
এ-সময় একটি অনুষ্ঠানে
যোগ দেয়ার জন্য বার্সিলোনা অবস্থান করছিলেন ডঃ খান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের
বিবরণে প্রকাশ, রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে বক্তব্য সম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে শতাধিক
বাঙালী অনুষ্ঠানস্থলটি ঘেরাও করেন।
বিক্ষোভকারীরা
রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বাঙালীদের সাথে অসহযোগিতা ও কমিউনিটিতে বিভেদ
সৃষ্টির অভিযোগে স্লৌগান দিতে থাকে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে
উঠলে পুলিশ মাঠে নামে।
এক পর্যায়ে পুলিসী
নিরাপত্তায় অনুষ্ঠান-স্থল ত্যাগে বাধ্য হন রাষ্ট্রদূত।
বিক্ষোভকারীরা
রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তুলে একটি তাৎক্ষণিক সমাবেশেরও আয়োজন করেন।
এ-সমাবেশে বক্তব্য রাখেন
বার্সিলোনার বাংলাদেশ এসৌসিয়েশনের সভাপতি সুরুজ জামান, সেক্রেট্যারী মিয়া মোহাম্মদ
শরীফ, সহ-সভাপতি গৌতম সাহা, কমিউনিটি নেতা আব্দুল বাছিত কয়ছর, মফিজুল ইসলাম, জাহেদ
উদ্দীন, শাব্বির আহমেদ দুলাল, শাহাব উদ্দিন প্রমুখ।
মাদ্রিদের বাঙালী কমিউনিটির নেতারাও রাষ্ট্রদূত সাইফুল
আমিন খানের নানা
কর্মকান্ডের ব্যাপারে এ-প্রতিবেদকের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
এ-ব্যাপারে কিছুদিন আগে
কমিউনিটির পক্ষ থেকে একটি সভারও আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ এসৌসিয়েশনের
সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক-সহ কমিউনিটি নেতা তালাত মাহমুদ উজ্জ্বল, ডাঃ দুলাল
আহমদ-সহ আরও বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন, স্পেইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের
বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেদিকে তারা সতর্ক নজর রাখছেন।
এ-ব্যাপারে কমিউনিটিকে
সাথে নিয়ে প্রতিবাদ জানানোর আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছেন উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ।
রাষ্ট্রদূত ডঃ সাইফুল
আলম খানকে প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের বরাবরে আনুষ্ঠানিক আহবান
জানানোর একটি প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
স্পেইনে
বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রবাসী কল্যাণ ফান্ড নামে যে-তহবিলটি রয়েছে, তার ব্যবহার নিয়েও
রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ রয়েছে বাঙালীদের মধ্যে।
উল্লেখ্য, প্রতিটি
পাসপৌর্ট থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায়ের মাধ্যমে এ-তহবিলে জমা রাখা হয়।
স্পেইনে কোনো বাঙালীর
মৃত্যু হলে তার মরদেহ দেশে প্রেরণ বা কোনো বাঙালী কোনো করুণ পরিণতির সম্মুখীন হলে,
তার জন্য এ-তহবিল থেকে ব্যয় করার কথা।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে যায়,
আবেদন করা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো মৃতদেহ দেশে প্রেরণের জন্য অর্থ পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ, মাত্র ক'দিন
আগে বার্সিলোনার শান্তাকলামের সিলেট এসৌসিয়েশনের সেক্রেট্যারী এবাদুর রহমান মারা
গেলে তার মৃতদেহ দেশে পাঠানোর জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা চেয়ে দূতাবাসের
বরাবরে আবেদন করা হয়।
কিন্তু দূতাবাস থেকে
জানানো হয়, এ-ধরণের সহায়তা-দানে মাসখানেক সময় লাগবে।
প্রাপ্য সহযোগিতা থেকে
বঞ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে আছে সংগঠনটি।
স্পেইনে
বাংলাদেশের দূতাবাসের অতিথি আপ্যায়ন তহবিল নাড়াচাড়া নিয়েও কথা উঠেছে।
জানা যায়, দূতাবাসে
অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য প্রতিমাসে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ৫১৮ ইউরো পান
রাষ্ট্রদূত সাইফুল আমিন খান।
দূতাবাসের জন্য আছে
ভিন্ন আরেকটি বরাদ্দ।
অভিযোগে প্রকাশ,
রাষ্ট্রদূত মহোদয় কাউকে আপ্যায়নের ব্যাপারাদিতে না যেয়ে, মাসের দশ তারিখের মধ্যেই
নিজের ও দূতাবাসের জন্য বরাদ্দ আপ্যায়ন তহবিলের পুরোটাই তুলে নেন।
কিছুদিন
আগে এশিয়ান ডেভেলাপমেন্ট ব্যাঙ্কের বার্ষিক সভায় যোগদানের জন্য ঢাকা থেকে মাদ্রিদ
আসেন বাংলাদেশ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ডঃ মির্জা আজিজুল ইসলাম।
খবর পাওয়া গেছে, তার এক
রাতের খাবারের আয়োজনের জন্য দূতাবাসের হিসাব রক্ষকের কাছে এক হাজার ইউরো চেয়ে বসেন
রাষ্ট্রদূত।
কিন্তু রাষ্ট্রদূতের জন্য
বরাদ্দ ৫১৮ ইউরোর বেশি দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন হিসাব রক্ষক।
রাষ্ট্রদূত এ-ব্যাপারে
চাপ দিতে শুরু করলে প্রবাসী কল্যাণ ফান্ড থেকে অর্থ নিয়ে তার ইচ্ছাপূরণে বাধ্য হন
হিসাব রক্ষক।
সাইফুল
আমিন খানের আমলে স্পেইনে বাংলাদেশের স্বার্থ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও
অভিযোগ করেছেন অনেকে।
উল্লেখ্য, অনেকে মনে
করেন, ডঃ খান রাষ্ট্রদূত পদে যোগদানের আট
মাসের মধ্যে যতো বাঙালীকে স্পেইন থেকে
ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, তা ইতোপূর্বে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া লোকজনের মোট সংখ্যার
দ্বিগুণ হবে।
উপরে
বর্ণিত অভিযোগগুলোর ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানার জন্য ইউকেবেঙ্গলি প্রতিবেদক
সম্প্রতি রাষ্ট্রদূত সাইফুল আমিন খানের সাথে যোগাযোগ করেন। বিস্ময়করভাবে, উত্থাপিত
অভিযোগগুলোর কোনোটির ব্যাপারেই কোনো স্পষ্ট বক্তব্য প্রাকশ করেননি তিনি।
স্পেইন থেকে
ইউকেবেঙ্গলির প্রতিনিধি মিনাজুল
আলম মামুন
২১ জুন,
২০০৬ |