|
বাঙালী
রেস্টুরেন্ট-কর্মী হত্যায় প্রাক্তন ব্রিটিশ সেনার যাবজ্জীবন
দণ্ড
চৌদ্দ বছর আগে এক বাঙালী রেস্টুরেন্টে-কর্মীকে
বর্ণবাদী বিদ্বেষ থেকে গুলি করে হত্যা করার দায়ে ইরাকে যুদ্ধ-করা এক প্রাক্তন
ব্রিটিশ সেনাকে শুক্রবার গ্লাসগৌর স্কটিশ হাইকৌর্ট দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন
কারাদণ্ড দিয়েছে। রায় শোনার
পর প্রাক্তন এ-সৈনিক কৌর্ট রুমের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে
গিয়ে শেষপর্যন্ত ধরা পড়েছে।
খবরে প্রকাশ, ইরাকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর
এক সময়কার সার্জেন্ট ২৯ বছর বয়সী মাইকেল রস তার ১৫ বছর বয়সে মুখোশে মুখ ঢেকে
গ্রাহক-ভর্তি রেস্টুরেন্টে ঢুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছিলো ওয়েটার
শামসুদ্দিন মাহমুদকে। ১৯৯৪ সালের ২রা জুন রাতে স্কটল্যান্ডের
উত্তর-দ্বীপাঞ্চল ঔর্কনীর প্রধান শহর ক্রিকওয়ালের মুমুতাজ রেস্টুরেন্টে
মাহমুদ-হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। জানা যায়, ঔর্কনীতে ২৫ বছরের মধ্যে এটি ছিলো প্রথম
হত্যাকাণ্ড। স্থানীয় কমিউনিটিতে সদা-হাস্যোজ্জ্বল মাহমুদ সুপরিচিত হবার কারণে তার
খুনের ঘটনায় সমগ্র অঞ্চল শিহরিত ও শোকাহত হয়। পুলিসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে
সমস্ত ফেরী ও বিমানবন্দর বন্ধ করে তন্ন-তন্ন করে তল্লাসী ও
জিজ্ঞাসাবাদের পরও মাহমুদ-হত্যার কোনো 'ক্লু' বের করতে
পারেনি পুলিস। সমগ্র ব্রিটেন-জুড়ে টেলিভিশনে সাক্ষ্য বা 'ক্লু'
দেবার জন্য আবেদন জানানোর পরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সাক্ষ্য -প্রমাণের
অভাবে মাহমুদ-হত্যার কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি পুলিস। শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়
মাহমুদ-হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান ফাইলটি।
অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে দু'বছর আগে
সাক্ষী হিসেবে এগিয়ে আসেন এক স্কটম্যান, যার নাম উইলিয়াম গ্রান্ট
(৫১)। তিনি জানান, মাহমুদ-হত্যার দিন ১৫ বছর বয়সী মাইকেল রসকে অস্ত্র-হাতে একটি
পাবলিক টয়লেট থেকে 'ওহ শিট' বলে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলেন তিনি। গ্রান্ট
স্বীকার করেন, দীর্ঘ ১২ বছর এ-তথ্য গোপন রেখেছিলেন - এমনকি স্ত্রীর কাছেও বলেননি
তিনি। কিন্তু বিবেকের দংশন সইতে না পেরে ২০০৬ সালে ক্রিকওয়াল পুলিসের কাছে মুখ
খোলেন গ্রান্ট।
গ্রান্টের
দেয়া সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ঔর্কনী-কাঁপানো মাহমুদ-হত্যা মমলাটি 'রিঔপেন' করে
পুলিস। ২০০৭ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট হিসেবে আয়ারল্যন্ডে কর্মরত
অবস্থায় মাইকেল রসকে অভিযুক্ত করা হয় মাহমুদ-হত্যা মামলায়।
উল্লেখ্য, ইরাক যুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার
জন্য বহুল প্রসংশিত মাইকেল রস অব্যর্থ গুলি ছোঁড়ায় দক্ষতার জন্য 'ব্ল্যাক ওয়াচ' স্নাইপারে
উন্নীত হন।
দীর্ঘ এক বছর যাবত বিচার প্রক্রিয়া চলার
পর স্কটিশ হাইকৌর্ট মাইকেল রসকে মাহমুদ-হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে রায় দেয়।
বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে করা উক্তি ও ডায়েরী নৌটে প্রাপ্ত বর্ণবাদী-মন্তব্য
এবং সর্বপোরি ইরাক যুদ্ধে তার সাহসিকতা ও অব্যর্থ গুলি করার
দক্ষতার কথা উল্লেখ করে হাইকৌর্ট মাইকেল রসের কৃত-কর্মকে একটি
বর্ণবাদী-হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু, রায় শোনার
পর দোষী সাব্যস্ত হওয়া মাইকেল রস পুনর্বার নিজেকে সাহসী প্রমাণ করে
কাঠগড়া থেকে লাফিয়ে কৌর্ট-রুমের পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়। এ-নাটকীয়
ঘটনায় কৌর্ট সম্ভিত হয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত কৌর্টের নিরাপত্তা কর্মী ও পুলিস
মিলে ধরে ফেলে স্নাইপার রসকে, যিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে মুখ
ঢেকে জনসম্মুখে 'সিঙ্গেল শট' করে হত্যা করেছিলো সুদূর বাংলাদেশ থকে ভাগ্যের সন্ধানে
আসা হতভাগ্য শামসুদ্দিন মাহমুদকে।
ব্রিটেইনের প্রধান সংবাদ মাধ্যমগুলো
জানায়, ১৪ বছর পর হলেও প্রকৃত হত্যাকারীরকে বিচারের অধীনে নিয়ে আসার জন্য নিহত
মাহমুদের বাংলাদেশে-থাকা পরিবার কৃতজ্ঞতা ও স্বস্তি প্রকাশ করেছে।
লন্ডনঃ ২০ জুন, ২০০৮ |