London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

সরকারের সাথে  সংলাপ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল

[বাংলাদেশে সরকারের সাথে সে-দেশের বামপন্থী দল বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর রাজনৈতিক সংলাপ বিষয়ে মিডিয়াতে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে দলটির পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয়েছে। গত বুধবার বাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মিডিয়াগুলোর প্রতিনিধিদের নিমন্ত্রণ করা হয় এবং সেখানে দলের শীর্ষ নেতা খালেকুজ্জামান লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে দলের অস্থান ব্যাখ্যা করেন। ইউকেবেঙ্গলি যেহেতু সংলাপ বিষয়ে স্থানীয় রিপৌর্টারের পাঠানো খবর প্রকাশ করেছিলো, তাই বিভ্রান্তি কাটাতে বসদের বক্তব্য বাসদেরই ভাষায় প্রকাশিত হবার সুযোগ করে দেবার জন্য নিচে তুলে ধরা হলো (বানান-রীতি আমাদের)। আমাদের আগেকার প্রকাশিত সংবাদে কোনো ভুল তথ্য কিংবা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকলে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত - সম্পাদক।]

'আপনারা অবগত আছেন গত ৪ জুন ২০০৮ আমাদের দলের সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ঐ সংলাপে আমরা দলের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পেশ করিতা সত্ত্বেও কিছু পত্রিকা এবং কিছু মহল আমাদের বক্তব্যকে বিকৃত করে উদ্দেশ্যমূলক প্রচার চালায়সে প্রেক্ষিতে আমরা দেশবাসীর সামনে আমাদের বক্তব্য অবিকৃতভাবে পুনরায় তুলে ধরার জন্য এ-সংবাদ ব্রিফিং আয়োজন করেছি আমরা আশা করি এর মাধ্যমে সকল বিভ্রান্তির অবসান হবে

আমাদের মূল বক্তব্যে যাওয়ার আগে ইতোমধ্যেই যেহেতু সরকারের পক্ষ থেকে বাজেট পেশ করা হয়েছে সে প্রসঙ্গে দু একটি কথা বলে যেতে চাই এবারের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধকে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাত হিসেবে বলা হয়েছেএটা আমাদের শাসকশ্রেণীর দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ একদিকে বলা হয়েছে বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হল, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৯%-এ নিয়ে আসা অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে দেদার ঋণ গ্রহণের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা বাজার ব্যবস্থা এখনও সিণ্ডিকেইট চক্রের নিয়ন্ত্রণেআমরা খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবী করেছিলাম কিন্তু বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি সরকার ৩২ লাখ টন খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহের কথা বললেও গুদামে জায়গা আছে মাত্র ১৮ লাখ টন রাখার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মত জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে গত বছরের মূল বাজেটের চেয়ে এবার বরাদ্দ কমেছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে গত বাজেটে বরাদ্দ ছিলো ১২,৩৮০ কোটি টাকাএবার বরাদ্দ হয়েছে ১২,২৭৩ কোটি টাকা অর্থাৎ ১০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ কমেছে অন্যদিকে প্রতিরক্ষা খাতে গতবারের চেয়ে এবার ১০২৯ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে

এছাড়া এবার দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য সবচেয়ে বেশি, ৫৮.৩% বরাদ্দ রাখা হয়েছে কিন্তু এ যে কাজীর গরু গোয়ালে না থেকে খাতায় থাকার মতো, গতবারের অভিজ্ঞতা তা দেখিয়ে দেয় গতবারও বিরাট আকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রণয়ন করে একই কথা বলা হয়েছিলো বাস্তবে গত ১১ মাসে এর মাত্র ৪৬% বাস্তবায়িত হয়েছেএবার তা-ও না হবার আশঙ্কা আছে

বর্তমান সরকার ১৮ মাস আগে ক্ষমতা গ্রহণ করেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট থেকে জনগণকে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলোওই মুক্তি মিলেছে কি? অর্থ উপদেষ্টার মতে, বিদ্যুৎ ঘাটতি ৯০০ মেগাওয়াট বাস্তবে, অনেকের মতে, তা ১৫০০ মেগাওয়াটেরও বেশি গতবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থ উপদেষ্টা বলেছিলেন, ২০০৭ সাল শেষে ৬০০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে কিন্তু তা হয় নিপরে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, ২০০৮ সাল শেষে ১০০০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে কিন্তু অর্থ উপদেষ্টা বাজেট বক্তৃতায় আবারো ৬০০ মেগাওয়াটের কথা শুনিয়েছেন বিদুৎখাতে তাদের নড়বড়ে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটেছেএবার গতবারের চেয়ে এ-খাতে ৩২৫ কোটি টাকা কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে

সংবিধানের ২০ নং অনুচ্ছেদ লংঘন করে প্রতিবারের মতো এবারো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছেতার সাথে শিল্পে কর অবকাশের সুযোগও অব্যাহত আছেএতে এফবিসিসিআইসহ ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বেশ খুশীএদের এই গদগদ ভাব দেখে বোঝা যায় ঋণ করে তৈরি করা এবারের বাজেট থেকে কে ফায়দা লুটবেফলে এবাজেট ব্যবসাবান্ধব হলেও গরীব বন্ধব নয়

সংলাপ প্রসঙ্গঃ সংলাপের নির্দেশিকা হিসাবে ১২ মে ২০০৮ প্রধান উপদেষ্টার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণকে হাজির করা হয়েছিলো আমরা সেই ভাষণের মূল প্রতিপাদ্যের ওপর ১০টি বিষয়ে আমাদের ভিন্নমত-সহ সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের মতামত তুলে ধরেছি এবং বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে কিছু বিষয় ও করণীয় সর্ম্পকে বলেছি

জাতীয় ঐকমত্য বা জাতীয় সনদ সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য ছিলো - একদিকে স্বাধীনতা-বিরোধী যুদ্ধাপরাধী, স্বৈরাচার, দুর্নীতিগ্রস্ত লুটপাটের দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি, আর অন্যদিকে প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক, নীতিনিষ্ঠ আদর্শবাদী রাজনৈতিক শক্তি - এ দুয়ের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-পদ্ধতি প্রশ্নে একটা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা বাস্তব নয়তবে জাতীয় স্বার্থে যে-ঐকমত্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তা হলোঃ মুক্তিযুদ্ধের মৌলচেতনা অর্থাৎ গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ-সহ সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করাপাশাপাশি '৯০-এর সামরিক স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, নারী, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিক্ষক-সহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিতভাবে উত্থাপিত দাবী, যা গণদাবী হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিলো, তার বাস্তবায়ন করা

'লেজুড় রাজনীতির অপসংস্কৃতি' সম্পর্কে আমরা বলেছি, যারা রাজনীতিতে 'লেজুড়' থাকতে পারে মনে করেন, তারাও মানবেন যে, হিংস্র প্রাণীর লেজে বিষ থাকে না, থাকে মাথায়, দাঁতে-নখে-মুখেএখন দুষ্ট রাজনীতি মাথা-শরীর-দাঁত-নখ সবই থাকবে শুধু লেজ খসিয়ে দেয়া হবে, তাতে কি দুষ্ট রাজনীতির দুষ্ট-প্রভাব লুপ্ত হবে? না রাজনীতির নামে অপরাজনীতির অপঃসংস্কৃতি দূর হবে? তাই আদর্শবাদী রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল বিচ্ছিন্নতা নয়, দুষ্ট রাজনীতি ও তার পৃষ্ঠপোষক রাজনৈতিক দলের সংশ্রব-মুক্ত থাকাই সমাধান বলে আমরা মনে করি

দল নিবন্ধন প্রসঙ্গে বলেছি, সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার রাজনীতির গুণগত উত্তরণের কথা বলা হচ্ছে অথচ নিবন্ধনের জন্য যে-সকল করণীয় ও মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে ভিন্ন আদলে কিংবা স্বমূর্তিতে দুর্বৃত্তায়িত অতীত রাজনীতিকেই পুনর্বহালের সুযোগ করে দেয়া হয়েছেএখন দলের নিবন্ধন তার যথার্থ প্রয়োজন সীমা ছাড়িয়ে বাস্তবে নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে চলে যাচ্ছেএ-ধরণের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে শাসকগোষ্ঠীর হাতে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কণ্ঠরোধের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে

রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রসঙ্গে আমরা বলেছি, ব্যাপক গণআয়তনে গণতান্ত্রিক চেতনা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির জাগরণ ছাড়া কতিপয় নেতা-নেত্রীদের ছাঁটাই-বাছাই করে কিংবা একই চেতনা-পুষ্ট লোকদের নানা শিবিরে বিন্যস্ত করে সংস্কার প্রচেষ্টা নিলে রাজনীতিকে দুর্বৃত্তমুক্ত করা কিংবা রাজনৈতিক দলের প্রকৃত গণতন্ত্রায়ন হয় নাআর জরুরী অবস্থা বহাল রেখে জাতীয় জাগরণ এবং জনগণের প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশও সম্ভব নয়

প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি ও উন্নয়ন প্রসঙ্গে আমরা বলেছি, কথিত মুক্তবাজার ও বিশ্বায়নের প্রবক্তারা তাদের নিজেদের বাজার অন্যের জন্য মুক্ত করে রাখেনি এ-সকল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তেল, খনিজ সম্পদ লুট করার জন্য লক্ষ-লক্ষ মানুষ মেরে ইরাক, আফগানিস্তান দখল করেছেএরাই আমাদের দেশে এসে উন্নয়ন সহযোগী সেজে জুতার মাপে পা বানানোর মতো করে আমাদের অর্থনীতি পরিচালনার কথা যখন বলে আর শাসকগোষ্ঠী নতশিরে তা মেনে নেয়, তখন তা প্রতিযোগিতামূলক না হয়ে পরনির্ভরশীলতায় পর্যবসিত হয়একটা স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতির ভিত মজবুত না করে প্রতিযোগিতা তো দূরে থাক, টিকে থাকাই কঠিনআমাদের সেদিকে মনযোগী হতে হবে কথিত দাতাগোষ্ঠী ২০০৬-০৭ অর্থ-বছরে ঋণ দেয় ৫৭৪৩ কোটি টাকা এবং অনুদান দেয় ৪২৫৫ কোটি টাকাআর এদের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে হয় ৫২৩৭ কোটি টাকাপ্রাপ্ত ঋণের প্রায় ২২ ভাগ সুদ পরিশোধ করতেই চলে যায়অথচ প্রবাসীরা একই সময়ে পাঠিয়েছে ৪১৩০০ কোটি টাকাকিন্তু এ-টাকা বিনিয়োগের বিষয়ে শাসকদের মনোযোগ তেমন নেইশুধু ঋণ খয়রাতের দিকেই নজর কারণ তার একটা বড়ো অংশ দেশী-বিদেশী চক্র মিলে লুটেপুটে খেতে পারে

হরতাল ধর্মঘট ইত্যাদি প্রসঙ্গে আমরা বলেছি, এগুলো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের হাতিয়ার এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারঅতীতে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা বহির্ভূত বৃহৎ বুর্জোয়া দলগুলো এগুলোকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার না করে তাদের ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় থাকার উন্মত্ত হানাহানিতে ব্যবহার করেছে যার ফলে একটা নৈরাজ্যকর-হিংসাত্মক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছিলোএখন সে-দৃষ্টান্ত তুলে ধরে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের পদক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে নাকারণ সমাজে শোষণ, জুলুম, দুর্নীতি-দুঃশাসন থাকছে অথচ জনগণের ও শ্রমজীবী মানুষের সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের অধিকার থাকবে না যা শাসকগোষ্ঠী ও মালিকশ্রেণীর হাতে জনগণ এবং শ্রমিকশ্রেণীকে শোষণ ও পীড়নের সীমাহীন ক্ষমতা তুলে দেবে

দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান সম্পর্কে আমরা বলেছি, সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির যে ভয়াবহ চিত্র হাজির করা হয়েছিলো, দেশের মানুষের কাছে তা অবিশ্বাস্য মনে হলেও অবাস্তব মনে হয়নিকিন্তু দেখা গেলো সরকারের ঘোষণা ও আদালতে হাজির করা তথ্য, সাক্ষ্য প্রমাণে বিরাট ফাঁকতাছাড়া একই কাতারের দুর্নীতিবাজদের কাউকে 'ফায়ার' কাউকে 'হায়ার' এবং কারও 'বিচার' আবার কাউকে 'পাচার' করা হচ্ছে এগুলো সরকারের দুর্নীতি-বিরোধী অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেশুধু তাই নয়, দু‌র্নীতিবাজদের ভবিষ্যত পুনর্বাসনেরও রাস্তা করে দিয়েছে

ক্ষমতার ভারসাম্য প্রসঙ্গে আমরা বলেছি, বর্তমানের পার্লামেন্টারী সরকার পদ্ধতির মধ্যে বহু ধরণের সাংবিধানিক, প্রশাসনিক, আইনী কাঠামোগত অসঙ্গতি ও ভারসাম্যহীনতা আছেসবদিক থেকে সঠিক জনপ্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতার যথাযথ ব্যবস্থা না করে শুধু রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ভাগাভাগির হেরফের করলে তেমন ফল আসবে নাআর ভারসাম্য করতে গিয়ে রাষ্ট্র-প্রশাসনে এমন কোনো সংস্থা বা ব্যবস্থা দাঁড় করানো যাবে না, যা পার্লামেন্টকে পরোক্ষ অধীনতার মধ্যে নিয়ে যায় কিংবা পার্লামেন্টারী পদ্ধতির শাসনব্যবস্থার মূল আদলকে পাল্টে ফেলে

কৃষি ও কৃষক প্রসঙ্গে আমরা বলেছি, কৃষকের স্বার্থ-রক্ষা ও কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য-নিরাপত্তা প্রশ্নে সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী কার্যক্রম যেমন - ভূমি সংস্কার, সরকারী খাসজমি উদ্ধার ও প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে বণ্টন, কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পকে প্রাধান্যে রেখে খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা ও উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি, কৃষি গবেষণা, কৃষি ভর্তুকি, খোদ কৃষকের কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য ও কৃষি উপকরণের সুলভ সহজ প্রাপ্তি, কৃষকদের উন্নতমানের কৃষিশিক্ষা ও প্রযুক্তি-সহ জাতীয় অর্থনীতির ভিত মজবুত করার ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ-সহ অন্যান্য পদক্ষেপ স্পষ্ট নয়ফলে প্রচুর সম্ভাবনা সত্ত্বেও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বেএখন বাজেট ঘোষণার পর আমাদের বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ হচ্ছে

নির্বাচন এবং জরুরী অবস্থা প্রসঙ্গে আমরা বলেছি, এ-সরকার ক্ষমতায় আসার পর ৭২ ঘণ্টার বেশী জরুরী অবস্থা জারী রাখার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছিলো না এবং এখনও নেইআর সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করে ডিসেম্বর ২০০৮ এর মধ্যেই নির্বাচন করা দরকার

সংবিধান প্রসঙ্গে আমরা বলেছি যে, গত ৩৭ বছর ধরে সমস্ত সরকারগুলো সংবিধান লঙ্ঘন করেই দেশ শাসন করে এসেছেতার ধারাবাহিকতা এখনও বহাল আছে আমরা এ-সকল অসঙ্গতির কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছিযেমন সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে পরিকল্পিত অর্থনীতির কথা বলা আছে, অথচ দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করা হয়েছে বেকারদের ভাতা দেয়ার এবং অসুস্থ, পঙ্গু, বিধবা, এতিম, বৃদ্ধ ইত্যাদি অসহায় মানুষকে রাষ্ট্রীয় ভাতা ও বিবিধ সাহায্য প্রদানের কথা বলা আছেকিন্তু তা অনুসরণ করা হচ্ছে না ১৭ অনুচ্ছেদে একই পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা থাকলেও তিন ধরণের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে১৮ এর (২)-তে পতিতালয়, জুয়া ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা আছেকিন্তু দেশে পতিতাবৃত্তি চালু রয়েছে ২০ এর (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করতে পারবে নাঅথচ প্রতিবছরই কালোটাকা সাদা করার ব্যবস্থা হয়েছে, এবারও তা করা হয়েছে২৫ এর (১) [গ]-তে সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশকিতাবাদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর কথা আছেকিন্তু ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন হানাদারি ও জবরদখলের বিরুদ্ধে আমাদের সরকারগুলো কখনও কথা বলেনি৩৫ এর (৩) ও (৫)-তে ফৌজদারী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রকাশ্য বিচার লাভ ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন না করার বিধান রয়েছেকিন্তু সেগুলির কিছুই মানা হয়নি এবং হচ্ছে নাপুলিশ রিমান্ডে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে

তাছাড়া সংবিধানে এ-পর্যন্ত ১৪টি সংশোধনী আনা হয়েছেযার মধ্যে ২য়, ৪র্থ, ৫ম, ৭ম, ৮ম সংশোধনী বহাল রেখে কোনো গণতান্ত্রিক শাসন পরিচালিত হতে পারে নাএ-সকল সংশোধনীর মাধ্যমে এবং ১২ নং অনুচ্ছেদ উপড়ে ফেলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মৌলচেতনা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে ধূলিস্যাৎ করা হয়েছেআমরা ঐকমত্যের প্রশ্নে এ-বিষয়গুলো তুলে ধরেছিকিন্তু এ-সরকারের কাছে সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রস্তাব রাখিনিসরকারের পক্ষ থেকেও সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়নিতারা একটা পর্যালোচনা কমিশন গঠনের কথা ভাবছেন বলে জানিয়েছেন

আমরা সর্বশেষ জাতীয় ঐকমত্য ও বিদ্যমান রাজনৈতিক ও জনজীবনের সঙ্কট মোকাবেলার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ উল্লেখ করেছিঃ

১)   একাত্তরের মৌলচেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধানের ২য়, ৪র্থ, ৫ম, ৭ম এবং ৮ম সংশোধনী বাতিল করা বিশেষ ক্ষমতা আইন '৭৪, বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৫০৫ (ক) ধারা, ফৌজদারী কার্যবিধির ৯৯ (ক) ধারা, ৫৪ ধারা, ডিএমপি ৮৬ ধারা, সন্ত্রাস দমন অধ্যাদেশ, অর্পিত (শত্রু) সম্পত্তি আইন-সহ সকল কালাকানুন বাতিল করা

(ক)    সংবিধানের ১২ নং অনুচ্ছেদ পুনঃপ্রবর্তন করা এবং ৩য় ভাগে ২৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকার এবং অনুচ্ছেদ ১৫ (ক) (খ) (গ) (ঘ), ১৭ [ক], ১৮ (২), ২০ (২), ২৫ (গ) এবং ৩৫ (৩) (৫) ইত্যাদি ধারার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ শাসনকার্য পরিচালনার অতীত-রীতি কঠোরভাবে বন্ধ করা

(খ)     অগণতান্ত্রিকভাবে প্রণীত 'শ্রম আইন ২০০৬' এবং টিটিসি কর্তৃক পেশকৃত সংশোধিত শ্রম অধ্যাদেশ ২০০৮ বাতিল করে আইএলও সনদের সাথে সঙ্গতিবিধান করে শ্রম আইন প্রণয়ন করা বাজার দরের সাথে সঙ্গতি রেখে ৫ মণ চালের সমপরিমাণ মূল্য ন্যূনতম মজুরী ঘোষণা করা

(গ)     সমতল ও পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাসমূহের ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সম্পত্তির উপর আইনী অধিকার-সহ সার্বিক বিকাশের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা বিধান করা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাসমূহের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ করা

(ঘ)     আইন করে সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা-সহ মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক শক্তির চাপে স্থগিতকৃত নারীনীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ এবং সিডও-সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন করে নারী-পুরুষের সকল বৈষম্য বিলোপ করা

২)    সামরিক  স্বৈরশাসন-বিরোধী '৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের মাধ্যমে প্রণীত ছাত্রসমাজের  ১০ দফা, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের ৫ দফা, ১৭ কৃষক সংগঠনের ১০ দফা, ঐক্যবদ্ধ নারী সমাজের ১৭ দফাসহ অন্যান্য শ্রেণী-পেশার সংগ্রামী জনগণ কর্তৃক উত্থাপিত দাবীসমূহ আজকের প্রাসঙ্গিকতায় বাস্তবায়ন করা

(ক)    আদর্শহীন, সুবিধাবাদী লুটপাটের রাজনীতির বিপরীতে আদর্শবাদী, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক রাজনীতির পক্ষে সরকারী-বেসরকারী সকল প্রচার-মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালানো

(খ)     ছোটবেলা থেকে আদর্শ-চেতনা গড়ে তোলার পরিপূরক শিক্ষা কার্যক্রম ঢেলে সাজানো অন্ধত্ব, কুসংস্কার, যুক্তিহীনতার পরিবর্তে বিজ্ঞানমনস্ক ভাবমানস গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা

(গ)     ভোগবাদ ও অপঃসংস্কৃতি বিরোধী সামাজিক আন্দোলন ও সচেতনতা গড়ে তোলা

(ঘ)     রাজনৈতিক দলের তথ্য যা নির্বাচন আয়োজনের সহায়ক হয় ততোটুকুর বাইরে এমন শর্তাবলী হাজির করা ঠিক হবে না, যা পরবর্তী শাসকদলের হাতে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়

(ঙ)     '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং '৯০-এর স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন-সহ জাতীয় রাজনীতিতে জনগণের সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামে সক্রিয় রয়েছে, দুর্নীতিগ্রস্ত দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির প্রভাবমুক্ত এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে এমন সকল রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য সহজতর আনুষ্ঠানিক রীতি প্রবর্তন করা

(চ)     গণতান্ত্রিক চেতনা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও শক্তি বিকাশের সামনে প্রশাসনিক, আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রথাগত সকল বাধা অপসারণ করা

(ছ)     সংবাদপত্র ও প্রচার মাধ্যমের ওপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও চাপ প্রয়োগ বন্ধ করা

৩)  দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির বিপরীতে জনগণের প্রকৃত রাজনীতি গড়ে তোলার স্বার্থে অবিলম্বে জরুরী আইন            প্রত্যাহার, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া

৪)  চাল, ডাল ও তেল-সহ খাদ্য দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা

(ক)    ব্যক্তি মালিকানায় খাদ্যবাণিজ্য বন্ধ করে চাল, ডাল, আটা, তেল ও শিশুখাদ্যের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু করা

(খ)     অবিলম্বে গ্রাম-শহর সর্বত্র রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা

)  দুবৃত্তায়িত, দুর্নীতিগ্রস্থ, অধঃপতিত বুর্জোয়া রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে রাজনীতির গুণগত উত্তরণের লক্ষ্যে পক্ষপাতহীনভাবে দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার ও বিচার করা সরকারের দ্বৈত নীতি পরিহার করা

৬)  সকল নাগরিকের জামিন পাওয়ার ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা নিরাপরাধ কেউ যাতে শাস্তি না পায় তা নিশ্চিত করা

৭)   অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া চালু করা

৮)  কালোটাকার মালিক, ঋণখেলাপী ও ধর্মব্যবসায়ীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা

৯)  কালো টাকা, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করে ঘোষিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের  মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা

১০)  নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে জনমনে সৃষ্ট আশঙ্কা দূর করতে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণাসহ অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের পরিবেশ গড়ে তোলা

১১)   ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, নারীসহ সকল শ্রেণী-পেশার সংগঠনের সাথে সংলাপে বসা ও মতামত গ্রহণ করা

১২)   ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের সারাবছরের কাজ ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকৃষি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হাটে-বাজারে, সরকারী ক্রয়কেন্দ্র খুলে খোদ কৃষকের কাছ থেকে ধানসহ কৃষিপণ্য ক্রয় করাকৃষি উপকরণের ন্যায্যমূল্য ও সরবরাহ নিশ্চিত করা।'

লন্ডনঃ ১২ জুন, ২০০৮

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.