|
ব্রিটিশ শিশু-কিশোরদের
মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহঃ প্রতিবেদনে প্রকাশ
[ব্রিটেইনের
শিশু-কিশোরদের মানবাধিকার সংক্রান্ত
বিস্তৃত তথ্য নিয়ে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড,
ওয়েলস ও নর্দান আয়ারল্যান্ডের চিলড্রেন'স কমিশনারদের পক্ষ থেকে একটি যৌথ প্রতিবেদন
প্রকাশ করা হয়েছে সোমবার।
জাতিসংঘের জন্য
প্রস্তুতকৃত এ-প্রতিবেদনে দেশটির চৌদ্দ মিলিয়ন শিশু-কিশোরের সার্বিক পরিস্থিতির এক
ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য
শিশুদের কল্যাণে শতোভাগ নিবেদিত থাকার কথা বলা হয়েছে।
পড়ুন ইউকেবেঙ্গলি
প্রতিবেদন।]
প্রতিবেদনে প্রকাশ, সরকারী হিসাব অনুসারেই ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ব্রিটেইনে
শিশু-অপরাধের হার কমেছে, কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এ-সময়কালের মধ্যে অপরাধের
দায়ে অভিযুক্ত হওয়া মোট শিশুর সংখ্যা এক-চতুর্থাংশ বেড়ে গেছে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে করা
হচ্ছে শিশুদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ব্রিটেইনের রাষ্ট্রযন্ত্র উত্তরোত্তর কঠোর
অবস্থান গ্রহণ করছে।
প্রতিবেদন প্রণয়নকারী
চার কমিশনারের পক্ষ থেকে শিশু অধিকারের কার্যকর স্বীকৃতির জন্য নীতিমালা
প্রণয়নকারীদের প্রতি জোর আহবান জানানো হয়েছে।
শিশুদের
অধিকারের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের যে-চারটি বড়ো খুঁত উল্লেখ করা
হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে, শিশু-কিশোর অপরাধের ব্যাপারে শাস্তিদানমুখী বিচার ব্যবস্থা,
জনমনে টীন-বয়েসীদের ভীতিকর হিসাবে দেখার এক ধরণের প্রবণতা গড়ে ওঠা, বাড়ীতে
[শিশুদের] শারীরিক শাস্তির হাত থেকে রেহাই দেবার ব্যবস্থায় অপ্রতুলতা, ইউরৌপের
দেশগুলোর মধ্যে শিশু দারিদ্রের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর সঙ্গে থাকা।
খবরে প্রকাশ, ব্রিটেইনের
শিশু-কিশোর পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি সোমবার দিনই জাতিসংঘের কাছে হস্তান্তর
করে দেয়া হবে।
গত পাঁচ বছরে ব্রিটেইনের
শিশু-অধিকার পরিস্থিতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবির্তত সাধিত হয়েছে কি-না, তা বিশ্ব
সংস্থাটির পক্ষ থেকে যাচাই করে দেখার ক্ষেত্রে প্রতিবেদনটি কাজে লাগাবে বলে মনে করা
হচ্ছে।
২০০২ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের
প্রতিবেদনে শিশু অধিকারের 'মারাত্মক লঙ্ঘনের' দায়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে অভিযুক্ত
করা হয়েছিলো।
উক্ত প্রতিবেদনে ব্রিটিশ
কর্তৃপক্ষের প্রধান যে- কয়েকটি ব্যর্থতা চিহ্নিত করা হয়েছিলো, সেগুলোর মধ্যে
অভিভাবকদের চড়-থাপ্পড়ের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করতে না পারা,
এ্যাসাইলাম
আবেদনকারী শিশুদের ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো এবং উত্তর আয়াল্যান্ডে
শিশুদের উপরে প্ল্যাস্টিক ব্যাটন ব্যবহার ছিলো অন্যতম।
ব্রিটেইনের শিক্ষা
ব্যবস্থাতে শিশুদের ভাবনা-চিন্তাগুলোর মূল্যায়নের কোনো ব্যবস্থা না থাকারও সমালোচনা
করা হয়েছে সোমবারের প্রতিবেদনটিতে।
এছাড়াও ব্রিটেইনের
শিক্ষাঙ্গনে 'স্পেশাল নীডস' আছে এমন শিশুদের জন্য সুব্যবস্থার অভাবের কথা জানানো
হয়েছে।
সোমবারের
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০২ সালে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ব্রিটেইনে শিশু-কিশোরদের
পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর জন্য যে-সাতাত্তরটি সুপারিশ করা হয়েছিলো, তার বেশির
ভাগগুলোই বাস্তবায়িত হয়নি।
শিশু অধিকার সংক্রান্ত
জাতিসংঘ সনদের যে-সব লঙ্ঘন ব্রিটেইনে অব্যাহত আছে, তার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছেঃ কমবয়েসী
আইন-লঙ্ঘনকারীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যন্ত্রণাদায়ক নৌজ,
রীব
এ্যান্ড
থাম্ব হৌল্ড পদ্ধতি ব্যবহার,
এ্যাসাইলাম
আবেদনকারী শিশুদের বয়স পরীক্ষার জন্য ডেন্টাল এক্স-রে পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা, লার্নিং ডিফিকাল্টী আছে
এমন শিশুদের ক্ষেত্রে এনএইচএসের ভিতরে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য।
সর্বশেষ হিসাব থেকে জানা
যাচ্ছে, ব্রিটেইনের শিশুদের মধ্যে ৩.১ মিলিয়ন (২৯ শতাংশ) দারিদ্রবস্থার মধ্যে বাস
করে।
এছাড়াও ১ মিলিয়নের অধিক শিশু
নিম্মমানের আবাসনে জীবন-যাপন করছে।
প্রতিবেদন প্রস্তুকারীদের মধ্যে অন্যতম, কমিশনার ফর ইংল্যান্ড
স্যার আল আয়েন্সলী গ্রীন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলো প্রকাশিত
প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করা হয়েছে।
গ্রীন অভিযোগ করেন,
আঠারো বছর আগে জাতিসংঘ সনদে সাক্ষর করার সময় নতুন প্রজন্মের অধিকার সংক্রান্ত
ব্যাপারে যে-অঙ্গীকার করা হয়েছিলো, তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিলো ব্যর্থ হচ্ছে ব্রিটিশ
কর্তৃপক্ষ।
আলাদাভাবে ওয়েলসের পরিস্থিতি বর্ণনা করে কমিশনার ফর
ওয়েলস কীথ টাওলার বলেন, '[ওয়েলসের]
একটি ভালো দিক হচ্ছে, এখানে স্কুল লীগ টেবিল বলে কিছু নেই এবং শিশুদেরকে সাত, এগারো
এবং চৌদ্দ বছর বয়সে টেস্টে বসতে হয় না।
আর খারাপ দিকটি হলো,
ওয়েলশ শিশুদেরকে ইংল্যান্ডে জেল খাটতে যেতে হচ্ছে।'
প্রাপ্তবয়ষ্ক সার্ভিসের
তুলনায় চিলড্রেন হেলথ সার্ভিসের পরিস্থিতি খারাপ বলেও জানিয়েছেন টাওলার।
কমিশনার ফর নর্দান আয়ারল্যান্ড
প্যাট্রিশিয়া লুইসলী
জানান, বর্ণবাদ ও বৈষম্যের শিকার হওয়াটা উত্তর আয়ারল্যান্ডে ট্র্যাভেলার এবং জাতিগত
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশুদের ক্ষেত্রে নৈমিত্তিক এক অভিজ্ঞতা।
কমিশনার ফর স্কটল্যান্ড
ক্যাথলীন মার্শালের
ভাষ্যমতে, ব্রিটেইনের অন্যান্য
অংশের মতো স্কটল্যান্ডেও শিশু ও তরুণ বয়েসীদের ভীতিকর হিসাবে ধরে নেয়ার এক প্রবণতা
গড়ে উঠেছে। এমনকি এ-অংশটিকে পাবলিক স্পেইস
থেকে দূরে রাখার এক ধরণের [নেতিবাচক] আকাঙ্খাও বেড়ে উঠছে।
স্কটল্যান্ডে
জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে মর্মান্তিক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন মার্শাল।
আগামী
বুধবার প্রতিবেদন প্রস্তুতকারীরা জিনিভাতে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে
ব্রিটেইনের শিশু পরিস্থিতি নিয়ে আলাপে বসবেন।
এ-সময় ইংল্যান্ডের
শিশুদের একটি দলও উপস্থিতি থাকবে।
শিশুদের পক্ষ থেকে
শিশুদের ব্যাপারে মিডিয়ার নেতিবাচক ভূমিকা এবং শিশুদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে
প্রাপ্ত বয়ষ্কদের ব্যর্থতার মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।
সরকারের
পক্ষ থেকে শিশু অধিকার প্রসঙ্গে মন্তব্য-কালে চিলড্রেন'স মিনিস্টার বেভারলী হিউজেস
বলেন, 'আমরা শিশুদের কল্যাণে শতভাগ নিবেদিত।'
তার তথ্য-মতে, ক্ষমতাসীন
লেবার সরকারের আমলে ৬ লক্ষের অধিক শিশুকে দারিদ্র-সীমার উপরে নিয়ে আসা ও ৩ হাজার
চিলড্রেন'স সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে।
এছাড়া বর্তমান সরকারের
আমলে স্কুল ফান্ডিংয়ের হার পূর্বের তুলনায় ৮৭ শতাংশ বাড়ার কথা বলেছেন মন্ত্রী।
হিউজেস
আরও বলেন, এসব সত্ত্বেও সরকার পরিতৃপ্ত নয়।
তার দাবী, শিশুদের জন্য একটি সুখী
শৈশব উপহার দেয়ার প্রত্যয় থেকে সরকারের পক্ষ থেকে ডিপার্টমেন্ট ফর চিলড্রেন,
স্কুলস এন্ড
ফ্যামিলিস নামে একটি নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে।
এদিকে,
চিলড্রেন'স কমিশনারের প্রতিবেদনের সাথে সঙ্গতিমূলক
চিলড্রেন'স রাইটস এলায়েন্স
ফর ইংল্যান্ড (সিআরএএই)-এর এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, ব্রিটিশ সরকার ২০০২ সাল
থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থী ত্রিশটি আইন পাস করেছে।
শতাধিক চ্যারিটির
কোয়ালিশন হিসাবে কাজ করে সিআরএ এ-সোমবার জানিয়েছে, যদিও ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকে
শিশুদেরকে সকল কর্মসূচি কেন্দ্রে রাখার কথা বললেও, কার্যত সবচেয়ে
দুরাবস্থার মধ্যে থাকা এই অংশটিকে সুরক্ষা প্রদানে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
লন্ডনঃ ৯
জুন, ২০০৮
আর্কাইভ8 |