|
যুক্তরাষ্ট ও ন্যাটৌর তীব্র
সমালোচনা করেছে রাশিয়া
বিশ্ব
অর্থনীতির দূরাবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছে অপর পরাশক্তি
রাশিয়া।
বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিমন্ডলে
ভূমিকা পালনে আগ্রহ প্রকাশের পাশাপাশি নতুন নিয়মাবলী প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও শনিবার
গুরুত্বারোপ করা হয়েছে দেশটির পক্ষ থেকে।
এছাড়াও
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে নর্থ আটলান্টিক ট্রীটী অর্গেনাইজেশন (ন্যাটৌ) জোটের
অপ্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে সোচ্চার বক্তব্য রেখেছে রাশিয়া।
সেইন্ট
পিটার্সবার্গ (সোভিয়েত
আমলের লেনিনগ্রাদ) শহরে শুরু হওয়া ইন্টারন্যাশনাল ইকোনোমিক ফৌরামের
দ্বাদশ সম্মেলনের উদ্বোধনীতে ভাষণদান-কালে প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদভ জানান,
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে-অর্থনৈতিক অবনমন চলছে, তার জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে
বিকাশমান রুশ অর্থনীতির পক্ষ থেকে একটি সমাধানের পথ দেখানো সম্ভব বলেও দাবী করেছেন
মেদভেদভ।
রুশ প্রেসিডেন্টের মতে,
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি ভূমিকা গ্রহণ করেছে, কিন্তু উক্ত ভূমিকা
পালনের সামর্থ দেশটির নেই।
পৃথিবীর সর্ববৃহৎ
অর্থনীতির [যুক্তরাষ্ট্র] পক্ষ থেকে নেয়া আক্রমণাত্মক নীতিমালার পরিণতিতে অসংখ্য
মানুষ দরিদ্রতর হয়ে পড়ছে বলে তথ্য দেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের
ব্যর্থতার পাশাপাশি পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজনের রাশিয়ার পক্ষ থেকে
আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সহযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন
মেদভেদভ।
এ-প্রসঙ্গে বিকাশমান রুশ
অর্থনীতি এবং এর জ্ব্বালানী তেলের বিশাল ভান্ডারের কথা স্মরণ করিয়ে দেন প্রেসিডেন্ট।
বৈশ্বিক সমস্যাবলী
মোকাবেলার লক্ষ্যে শীর্ষ-স্থানীয় ফাইনান্সিয়াল কোম্পানী এবং বিশ্লেষকদের নিয়ে একটি
আর্ন্তজাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের ব্যাপারেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে রাশিয়া।
মেদভেদভ তার বক্তব্যে
মন্তব্য করে বলেন যে, 'বিশ্বায়ন অনিবার্য কিন্তু মার্কিন ডলারকে ঘিরে সৃষ্ট হতাশার
কারণে পৃথিবী বিনিয়োগ সম্পদের অভাবে ভূগছে।'
তিনি আরও বলেন, 'পৃথিবী
প্রকৃতিগতভাবেই বৈশ্বিক।
[এর] অর্ন্তগত একটি দেশ
ভুল করলে তা সারা [বিশ্ব] অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।'
মেদভেদভ বলেন, 'আমেরিকার
বাজার যতো বড়োই হোক না কেনো কিংবা এর অর্থব্যবস্থা যতো শক্তিশালীই হোক না কেনো,
বৈশ্বিক পণ্য-বাজার ও অর্থ-বাজারের বিকল্প হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।'
মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পরোক্ষভাবে সাম্রাজ্যবাদী আখ্যা দিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট
বলেন, 'আমরা [বিশ্বের অর্থনৈতিক] খেলার নতুন নিয়ম নির্ধারিত করতে চাই এবং তা চাই
কোনো সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খা থেকে নয়, বরং আমাদের জ্বালানী সম্পদের কারণে।'
রাশিয়াকে বিশ্বশক্তি
হিসাবে দাবী করে মেদভেদভ বলেন, 'পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণে নিজের দায়িত্ব কী রাশিয়া
তা জানে।'
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অবশ্য বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক ভূমিকা পালন সংক্রান্ত
রুশ সমালোচনা প্রত্যাখান করা হয়েছে।
এক প্রতিক্রিয়ায় দেশটির
কমার্স সেক্রেটারী কার্লোস গুইটীরেজ।
জানান, প্রবৃদ্ধির
ক্ষেত্রে অবনমনের একটি ঝোঁক পরিলক্ষিত হলেও বৈশ্বিক সঙ্কট বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব
লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
প্রদত্ত
ভাষণে পাশ্চাত্যের প্রভাবাধীন বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ারও কড়া সমালোচনা করেছেন মেদভেদভ।
তিনি উল্লেখ করেন ২০০৭
সালজুড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে নাটকীয় পালাবদলের পরিণতিতে বিশ্বব্যাপী মিলিয়ন-মিলিয়ন
মানুষ দারিদ্রের করালগ্রাসে আটকে পড়েছে।
এ-প্রসঙ্গে তিনি জানান,
বিশ্বায়নের চলতি ধারাটি সারা বিশ্বজুড়ে প্রত্যক্ষ হচ্ছে।
এর কারণে বিশ্বজুড়ে
অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের ব্যাপারটি হুমকির মধ্যে আছে বলেও মত প্রকাশ করেছেন
মেদভেদভ।
বিশ্বায়নের চলতি প্রক্রিয়ার
সমালোচনা হিসাবে তিনি জানান, এ-প্রক্রিয়াটিতে অপারপর রাষ্ট্রগুলোকে ধর্তব্যের মধ্যে
না রেখে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের জনগণের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দিকে
নজর দেয়া হয়।
মেদভেদভ চলতি প্রক্রিয়াটিকে
'অর্থনৈতিক অহংবাদ' হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
এ-প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
'আধুনিক পৃথিবী ইতোমধ্যেই বিশ্বায়িত কিন্তু কতিপয় রাজনৈতিক নেতার ভুল-ভ্রান্তি এবং
তাদের গৃহীত অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উপরে।'
চলতি ধারা অক্ষুন্ন
রাখার মাধ্যমে বিদ্যামান সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয় বলেই মনে করেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
মেদভেদভের বক্তব্য সম্পর্কে ক্রেমলিনের প্রাক্তন উপদেষ্টা আলেক্সানদার নেক্রাসভ
মিডিয়াকে জানান, রুশ প্রেসিডেন্টের জন্য এ-বৃক্ততাটি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, 'আমরা তার [
মেদভেদভ] কথা শুনছি এবং রাশিয়ার ভবিষ্যত বিকাশকে তিনি কীভাবে দেখছেন তা বুঝার
চেষ্টা করছি।'
মেদভেদভকে উদ্ধৃত করে নেক্রাসভ
রাশিয়ার অর্থনীতি সম্পর্কে বলেন, 'এটি এখন শক্তিশালী এবং বিশ্ব পরিমন্ডলে সমান
অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে [যুক্তরাষ্ট্রের] সমান মর্যাদাপ্রাপ্ত হওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, পশ্চিমা
অর্থনীতি যখন মার্কিন অর্থনীতির মন্দার কারণে সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, রাশিয়া
সে-তুলনায় বেশ শক্ত অবস্থানে আছে বলে অর্থনীতি-বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
তাদের মতে, প্রাক্তন রুশ
প্রেসিডেন্ট পুতিনের আমলে রাশিয়ার অর্থনীতি এনার্জী রফতানি থেকে অর্জিত আয়ের মধ্যে
দিয়ে দৃঢ়তার সাথে বিস্তৃতি লাভ করেছে।
গত অর্থ-বছরে দেশটির
জিডিপি ৮.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মেদভেদভের ভাষণ ছাড়াও রাশিয়ার ফাইন্যান্স মিনিস্টার আলেক্স কুদরিনের ভাষণে
ন্যাটৌ-জোটের অস্তিত্ব বহাল থাকার কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।
বৈশ্বিক চ্যালেইঞ্জগুলো
মোকাবেলার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর প্রক্রিয়াতে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা
উল্লেখ-কালে কুদরিন জানান, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ন্যাটৌ একটি অপ্রয়োজনীয়
সংস্থা।
তিনি মনে করেন, ন্যাটৌকে অতীত
ইতিহাসের একটি সংগঠন হিসাবে বিবেচনা করাটাই বিধেয়।
উল্লেখ্য, দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের পরে মূলতঃ কমিউনিজম ঠেকানোর লক্ষ্যে মার্কিন নেতৃত্বে আটলান্টিকের
এপার-ওপারের নিরাপত্তা জোট হিসাবে ন্যাটৌ গঠন করা হয়েছিলো।
দু'দিন আগে বার্লিন
সফরকালে প্রেসিডেন্ট মেদভেদভের পক্ষ থেকে ন্যাটৌর বিস্তারের ব্যাপারে কড়া হুশিয়ারী
জানানো হয়েছিলো।
তিনি জানিয়েছিলেন পূর্ব ইউরোপের
ইউক্রেইন ও জর্জিয়ার মতো দেশগুলোকে ন্যাটৌভূক্ত করার যে-চেষ্টা অব্যাহত আছে, তা বাস্তবায়িত হলে
পাশ্চাত্যের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক অনিবার্যভাবেই অবনতির দিকে যাবে।
রাশিয়া মনে করে, তার
উপরে প্রভাব বিস্তারের বাসনা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিম ইউরৌপীয় মিত্র পূর্বে
ইউরৌপে ন্যাটৌর আরও বিস্তার ঘটাতে চায়।
সারা
বিশ্ব থেকে আগত প্রায় দশ হাজার রাজনীতিক, ব্যাঙ্কার ও ব্যবসায়ী
সেইন্ট পিটার্সবার্গের সম্মেলনটিতে যোগ দিচ্ছেন।
লন্ডনঃ ৭
জুন ২০০৮
আর্কাইভ8 |