|
পূর্ণিমার
সোনারং শরীরে কেউটের ছোবল
শরীফা
বুলবুল
বড়ো হওয়ার পর
থেকে বাবা আমাদেরকে একটি কথা বারবার স্মরণ
করিয়ে দিতেন, আর তা
হচ্ছেঃ যে-মাটির উপর আমরা বসে আছি,
সে-মাটিটা আমাদের নিজের নয়।
জন্ম
থেকে সে-কথাটাই শুনে আসছি।
এ-আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজের সমারোহ, এর আনন্দ, এর সুখ অথবা সাগরের নোনা ঢেউয়ের বুক
চিতানো ওঠা-পড়া, এ-সবের কোনো কিছুই আমাদের নয়।
কোনো কিছুতেই নেই আমাদের কোনো অধিকার। এ-রকম কথা শুনতে-শুনতেই
শৈশব-যৌবন-কৈশোরে
দিনগুলো কেটে
গেছে এক অবর্ণনীয় ব্যাথায়।
বলা
যায়, সৌন্দর্যকে ধরতে না পারার বেদনায় কেটে গেছে আমাদের দিনগুলো।
কিন্তু
কেনো আমার কোনো অধিকার নেই, এ-প্রশ্নটা মগজের কোষে-কোষে
কেবল ঘুরপাক খেয়েছে শুধু।
কোনো উত্তর খুঁজে পাইনি।
এক ধরণের
গরীব প্রজার
মতো করে মাথা
নয়ে
থাকার প্রবণতা হয়ে উঠেছে যেনো আমাদের নিয়তি।
আমাদের
আনোয়ারা গ্রামের অনতিদূরে সমুদ্রের পাশাপাশি বাস করি আমরা প্রায় চল্লিশটির মতো জেলে
পরিবার।
তাই এটা জেলে-পাড়া
হিসাবেই চিহ্নিত।
জল, জাল ও নৌকা আমাদের
জীবন-যাপন প্রণালীর সাথে এক সূতোয় গাঁথা যেনো।
জেলে-পাড়ার
আঁশটে গন্ধ-ভরা বাতাসে ছেঁড়া-ফাটা দিন-রাতকে নাছোড় জীবনের সাথে গেঁথে দুঃখকে সুখ
ভেবে আমরা স্বপ্ন সাজাই বার-বার।
তুচ্ছ খড়-কুটোর মতো কিছু
আনা সঞ্চয় করে রাখি বুকের প্রান্তরে।
কিন্তু বার-বার তুখোড় ঝড় তছনছ করে দেয় সব সঞ্চয়।
স্বপ্নের হাটে হানা দেয় হায়নার দল।
লণ্ড-ভণ্ড করে মুছে ফেলতে চায় জীবন জীবিকার চিহ্ন।
তবুও জীবনের তাগিদ - পোড়া দগ্ধ ভিটায় আবারও ঘরবাঁধা ও বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিমর্ষতায়
আবারও দিনযাপন।
দেশের
কোনো রাজনৈতিক উত্থান-পতনে কিংবা ধর্মীয় উন্মাদনায় ভয়ের খড়গ ঝুলে পড়ে আমাদের ঘাড়ের
উপর। অকারণে একাত্তরে ও
নব্বইয়ে আমাদের উপর নগ্ন
কুৎসিত চেহারা দেখে আঁৎকে উঠেছি।
আমি
সুরবালা জলদাস। একাত্তরে আমার জীবনটা ছিলো অন্যরকম। আমরা স্বামী-স্ত্রী
আর আমাদের সন্তান প্রানেশকে নিয়েই ছিলো ছোট্ট পৃথিবী।
মনের এক কোণায়
খুঁদ-কুড়োর মতো স্বপ্নের সামান্য সঞ্চয়। রাতের অন্ধকারে সুখেন জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়লে
প্রানেশকে বুকে নিয়ে আমার ছিলো একাকী রাত্রি-বাস। কুকুর-শেয়ালের ডাকে আঁৎকে ওঠার
অস্বস্তি ও
ভোরে সুখেনের ডাকে
একঝাঁক রূপালী মাছের দাপট স্বপ্ন
থেকে টেনে নিয়ে আসতো
আমাকে চেনা সুখের বন্দরে। সে-স্মৃতির কথা মনে হলে মনে হয় আমার এখনও আমি যুবতী;
এখনও টগবগে তেজ।
যে-মানুষটা আমার জীবনে হাজার দুঃখেও শান্তির ওম ছড়াতো, ওরা তাকে নির্বাসিত করলো
মৃত্যুর দণ্ডকারণ্যে। তার অপরাধ একটাই, একাত্তরের অন্ধকার রাতে মাঝে-মাঝে তার
নৌকাতে উঠে আসতো দেবদূত।
খুব সাবধানে বিশ্বস্ততার
সাথে আমার স্বামী সুখেন এদের পারাপার করতো।
বিদেশী হায়নার দেশী চর
নিজ-হাতে দণ্ড দিলো সুখেনকে।
তার নৌকাতেই গুলি করে
লাশটা ফেলে দিলো পানির ভিতর।
আমার ছেঁড়া বৃক্ষের মতো
উপড়ে পড়ার দশা তখন। খেয়ে-না-খেয়ে ঝোঁপ-ঝাড়ে
লুকিয়ে প্রানেশকে নিয়ে পালিয়ে বাঁচলাম কোনো-মতে। যুদ্ধ শেষের অনিবার্য পরিণতির টানে
আবার ফিরে আসি দগ্ধ পোড়া ভিটেয়।
কিন্তু পোড়া-ঘরের দাহ
ক্ষুধা হয়ে, দারিদ্র্য হয়ে ভয়ঙ্কর দৈত্যের মতো প্রহার করতে লাগলো আমাকে। দিশেহারা
আমি একমাত্র সঞ্চয় জাল ও নৌকো বিক্রি করে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ফিরে পেলাম আবার।
সে-দিনগুলো ছিলো প্রচণ্ড খরার, মাটিতে বুক লেগে যাওয়ার কষ্টে দিশেহারা আমি অসহায়
চোখে দেখলাম শুধু সদ্য স্বাধীন দেশে সুযোগ সন্ধানীর দল এর সুখ সম্পদের শাখা
প্রশাখার বিস্তৃতি।
সবার মনের পর্দা থেকে
মুছে গেলো সুখেনের মুখ।
মুক্তিযুদ্ধে সুখেনের
এতো বড়ো ত্যাগের সামান্যতম স্বীকৃতিও মিললো না জাতির কাছ থেকে।
শুধুমাত্র আমারই বুকের
ভিতর ঠাঁই করে নিলো সুখেন।
স্মৃতির ঘোলা-জলে নৌকার
বৈঠায় ছলাৎ শব্দ তুলে ঢেউয়ের আগায় নেচে বেড়ায় সুখেন।
তখন উথলে ওঠা একটা কষ্ট
বুকের ভিতরটায় শ্বাসরোধ করতে প্রবল হয়ে ওঠে।
চারপাশের শূণ্যতা
অপ্রতিরোধ্য ঘূর্ণি হয়ে আঘাত করে আমাকে।
আমাদের
তবুও বেঁচে থাকা।
ধ্বংসস্তূপের আড়ালে ভাঙা ইটের
পাঁজার ভিতর চারাগাছটিকে লুকিয়ে বড়ো করা, একদিন তার ছায়া-বৃক্ষ
হবে প্রানেশ।
নিজের
সমস্ত পরিশ্রমের ক্লান্তি ও অবসাদকে নিজের ভিতর লুকিয়ে রেখে বুকে বুকেই বড়ো করছি
প্রানেশকে।
লেখা-পড়ার ঝামেলা-মুক্ত পরিবেশে
তাড়াতাড়ি সংসারের হাল ধরেছে আমার প্রানেশ।
প্রথম-প্রথম পরের নৌকায়
কামলা খাটা শেষে সব কিছু নিজের আয়ত্বে আনে করিৎকর্মা ছেলেটি।
আমি যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচি।
বিয়ের পর
জেলে-পাড়ার সবাইকে সচকিত করে দিয়ে প্রানেশের সংসারে আসে পূর্ণিমা।
আমি তো অবাক।
জেলেপাড়ায়-যে এরূপ
পূর্ণিমার আলো বেমানান।
বুকের তলানিতে এসে ঠেকে
যাওয়া সামান্য সুখ আবার চেটেপুটে নিই আমি। পূর্ণিমা এখন আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী।
সারাদিন তাকে আগলে রাখাই আমার কাজ।
মাঝে
মাঝে অবশ্য দুশ্চিন্তার মেঘ উঁকি মারে মনের কোণটুকুতে। আমার সুখের ভরা সংসারে আবার
যদি মত্ত হাতির পাড়া পড়ে। কারণ, দেশের কোনো পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে জেলেপাড়ার
কেউ সম্পৃক্ত না হলেও এর দায়ভার কিন্তু বহন করতে হয় আমাদের। আমার আশঙ্কাই সত্যি হলো
নব্বইয়ের এক রাতে। নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত ঘুমের ভিতর টুঁটি চেপে ধরলো হায়নার দল।
আগুনের হাত থেকে বাঁচতে
গিয়ে প্রানেশ আর তার বউ খুন হলো ওদের হাতে।
অন্য ঘর থেকে পূর্ণিমাকে
কোলে নিয়ে পালিয়ে প্রাণে বাঁচি।
তারপর
থেকে মাঝে-মাঝে নিজেকে পাগল-পাগল ঠেকে।
জীবনের বাঁকে-বাঁকে আর
কতো দুঃখ, কটু স্বাদের দিন-রাত্রিতে যেনো অসহ্য বসবাস। পূর্ণিমা বেড়ে উঠছে যেনো
লাউয়ের ডগার মতো।
ওর রূপ দেখে শিউরে উঠি আমি।
আমার প্রানেশের এ-আমানত পরের হাতে তুলে দিতে পারলেই কেবল আমার শান্তি ও স্বস্তি।
দেশে
কিছুদিন আগে ভৌট হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের আগুনের
হলকা এসে লাগতে পারে এ-নিরীহ জেলে-পাড়ায়।
এ-কথা
মনে এলে অন্তর-আত্মা কেঁপে ওঠে।
কারণ আমার ঘরে সোমত্ত
নাতনি - পূর্ণিমার আলো।
ওর রূপের এ-আগুন কোথায়
লুকাবো আমি? চারদিকে গুজ্ গুজ।
ফুস্ ফুস।
বাতাসে ভেসে আসে
দুঃসংবাদ।
নব্বইয়ের
মতো
আবার হামলা হবে না তো জেলে-পাড়ায়?
বুকের ভেতর আতঙ্ক আর আশঙ্কার যমজ ছায়া।
কোথায় যাবো আমি?
পুরুষ-হীন সংসার কবুতরের বাচ্চার মতো ডানার নিচে রেখে বড়ো করেছি পূর্ণিমাকে।
ঘর-পোড়া
আমি বিপদের সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাই, আমার ময়না পাখীটিকে কোথায় লুকাবো আমি? কালই
প্রানেশের বন্ধু পাশের গাঁয়ের সালামের বাড়ীতে রেখে আসতে হবে তাকে কিছুদিনের জন্য
- একটু নিশ্চিন্ত ঘুমের
আশা তবুও।
সামনের ফাল্গুনে পূর্ণিমাকে
পাড় করতে পারলেই বেঁচে যাবো।
পাড়ারই ছেলে নরেনের
সাথে বিয়ের কথা পাকাপাকি
- নগদ দশ হাজার টাকা
ও এক জোড়া দুল।
ধার-দেনা
করে এ-সব
জোগাড় করে ফেলেছি।
বাকী
যৌতুক আমার পূর্ণিমার
অসহ্য
সুন্দর
রূপে
শোধ হয়ে যাবে।
তারপর হবে আমার নিরাপদ
নিরুপদ্রব রাত্রিবাস।
এসব
ভাবনা দিয়ে মগজের খোড়লে বাসা বুনে চলি।
রাতটা একেবারে নিরাপদ নয়।
অন্ধকার মানুষকে বড়ো
বদলে দেয়।
কি দৈত্যের মতো
ভয় দেখায়, বাতাসে শোঁ-শোঁ
আওয়াজ রাক্ষসপুরীর রাক্ষসের দীর্ঘশ্বাস বলে ভ্রম হয় অন্ধকারকে।
এ-সব
এলো-মেলো
ভাবনা নিয়ে বালিশের নীচে দা'টা
রেখে পূর্ণিমাকে
জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ি।
অক্টোবর শেষ হয়ে আসছে।
বাইরে একটু একটু শীত
পড়তে শুরু করেছে।
ছেঁড়া ফাটা কাঁথাটাকে গলা
পর্যন্ত টেনে দিয়ে একটু ওম নেয়ার চেষ্টা করি।
ভয়ের বাধা নিষেধ সত্ত্বেও
ভাঙাচোরা শরীরটা নিয়ে ধীরে-ধীরে
একসময় ঘুমের ভেতর ডুবে গেলাম।
সেই ঘুমটাই পূর্ণিমার
এক হ্যাঁচকা টানে ঘুমের বাড়ি থেকে ঘুম উধাও।
ভয়ার্ত
স্বরে কাঁপা-কাঁপা
গলায় আমার ময়না পাখি বলে, ‘দিদি দিদি ওঠো,
ঘরে আগুন দেছে’।
কে আগুন
দিলো,
কেনো
দিনো,
কারা দিলো,
কী
অপরাধ এসব প্রশ্নকে দূরে ঠেলে দিয়ে ধরাস্ করে বিছানায় উঠে বসি।
বালিশের নিচে থেকে দা’টা হাতিয়ে নিই।
এক হাতে দা অন্য হাতে পূর্ণিমাকে
ধরে পিছনের বেড়া কেটে বাইরে বেড়িয়ে আসি।
হঠাৎ
হ্যাজাকের তীব্র আলোয় চোখ ঝলসে যায়।
বুক ধরফর করে ওঠে।
পরাণ-পাখী
ছটফট করছে।
সামনে ওরা কারা দাঁড়িয়ে? নব্বইয়ের
সেই চেনা শকুন যেনো।
হ্যাজাক জ্বালিয়ে উৎসব
মুখর পরিবেশে ভাগাড়ের খোঁজে নেমেছে।
আমার কোঠরাগত চোখদুটো
ভয়ে আতঙ্কে আবার চোখের কোঠরে ঢুকে পড়ে।
হৃদপিণ্ডটা যেন পাকা
আপেলের মতো
টুপ্ করে ঝরে পড়ে মাটিতে।
আমি এখন
কী
করবো? আগুনের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি এ কোন
আগুনের সামনে এসে পড়লাম! ওরা যে জানোয়ারের চেয়ে হিংস্র
- আগুনের চেয়েও নির্দয়।
আমার
ভিতর
তবুও প্রতিরোধের চেষ্টা।
পূর্ণিমাকে
পিছনে ঠেলে দিয়ে দা’টা বাগিয়ে ধরে খেকিয়ে উঠি।
‘তোরা এইখানে
কী
চাস্?’
ওরা দাঁত
কেলিয়ে বলে ওঠে, ‘তর নাতনিরে চাই বুড়ি।’
শেয়ালের
মতো
খ্যাক্ খ্যাক হাসে ওরা।
‘খবরদার
অর গায়ে হাত দিবি না।’
‘কেনো
হাত দিলে কি গায়ে ঠোসা পড়বো?’
ওদের
উন্মত্ত হাসিতে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে খান-খান
হয়।
ভয়ে পূর্ণিমাকে
ঝাঁপটে ধরি আমি।
‘তরা ওর
সর্বনাশ করিস না।
ফাল্গুনে অর বিয়া।
তরা পূর্নিমার সর্বনাশ
করলে অর বিয়া ভাইঙা যাইবো।
নরেন আর তারে ঘরে নিব না।’
আমার কথার পিঠে কথা সাজায় ওরা।
‘তোর আর
ভাবনা কি বুড়ি ? আমরা সবাই তোর নাত্ জামাই হইতে চাই।’
আমার
বুঝতে আর বাকি নেই আমার পূর্নিমা এখন হায়নার হাটে ঢুকে পড়েছে।
তার হাড় মাংস এখন নিলামে
উঠবে।
আমার ইচ্ছে করে ওদের লুঙ্গি
খুলে দেখতে পেছনে কোন লেজ গজিয়েছে কি-না।
প্রেত কায়ারা ভুতুড়ে
গলায় শাসায় আমাকে,-
‘বুড়ি
তগোরে কইছিলাম হেই পাড়ে চইলা যা।
গেলি
না।
এই দেশে থাকলে তো
টেক্শো দিতে অইবো।’
‘কিসের
টেক্শো?’
ওদের কথা
আমি বুঝতে পারি না।
ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে
থাকি?
‘এদেশে
অবৈধ বসবাসের টেক্শো।
আপাতত তর নাতনিরে দিয়া
শোধ কর।’
কথা বলতে
বলতে পূর্নিমার উপর হামলে পড়ে নরপিশাচরা।
‘আমার
ময়না পাখিরে ছাইড়া দে বাপ।’
আমার
শীর্ণ শরীরের প্রতিরোধ ক্ষণস্থায়ী, উদ্ধত পশুর কয়েকটা লাথি এসে পড়ে বুকের উপর, লাউয়ের
শূণ্য
খোলের মতো
আমি গড়িয়ে যাই অনেক দূর।
ভয়ে কুঁকড়ে থাকা জড়
মাংসপিণ্ডের মত পূর্ণিমাকে
উঠিয়ে নিয়ে যায় ওরা।
ওদের অর্থহীন তাণ্ডবের
দানবীয় উল্লাসের নিচে চাপা পড়ে যায় আমার আর্তনাদ।
ভোরের
আলোর স্পর্শে অথবা সালামের উচ্চকণ্ঠ আমার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়।
চোখ খুলে মাটির উপর
ধড়ফড়িয়ে উঠে বসি, গত রাতের দুর্ঘটনার দৃশ্যপট
স্বপ্ন হয়ে মুছে গেছে
হয়তো।
সালাম আমাকে হাত ধরে টেনে তোলে,
‘কাকী চলো
পূর্ণিমারে
খুঁইজে আনি তারে পাওয়া যাচ্ছে না, হুনছি সাগর পাড়ে অনেক মাইয়ারে ধইরা নিছে, চল হেই
দিকে যাই।’
আমি
সালামের কাধে ভর করে হাঁটতে থাকি।
ক্লান্তিতে উত্তেজনায়
ধপাস্ করে বালির উপর বসে পড়ি।
‘তুমি
এইখানে বস, আমি তারে খুইজা দেহি।’
সালাম
ঝোপঝাড়ের ওদিকে চলে যায়, কেয়ার বনে কয়েকটি নগ্ন, ক্ষত বিক্ষত দেহ।
জীবিত, মৃতের হিসাব
মেলাতে পারে না সালাম।
একটি মেয়ের সামনে এসে
থমকে দাঁড়ায় সে।
নগ্ন শরীরটা উপুড় হয়ে আছে, তাকে
ধরে উল্টে দেয় সালাম।
হ্যাঁ পূর্ণিমাই
তো।
সদ্য ফোটা ফুলের মতো
মুখটা ক্ষত বিক্ষত।
চোখ দুটো খোলা উর্ধ্বমুখী কিন্তু পলকহীন,
যেনো
আকাশচারী মানব-সভ্যতাকে
ধিক্কার দিচ্ছে সে।
পূর্ণমার
নগ্ন শরীরটা দেখে আমি ছুটে যাই, ‘আমার পূর্নিমা মইরে গেছে নারে সালাম?’ আমার ময়না
পাখি!
সালাম
মানুষের এ-নৃশংসতা
সইতে না পেরে দু’হাতে মুখ ডাকে।
পূর্ণিমার
নগ্ন দেহ তাকে লজ্জা দিচ্ছে।
আমার
কান্না কোথায় উধাও হয়ে গেছে যেনো।
কান্নার পরিবর্তে হঠাৎ
ভেতরে যেনো
আগুন জ্বলে ওঠে।
সালামের বাধা সত্ত্বেও শরীরের
সমস্ত শক্তি জড়ো করে আমি পূর্ণিমাকে
টেনে হিঁচড়ে পানিতে নিয়ে যাই।
‘সালাম
চেঁচিয়ে ওঠে, কি কর কাকী পূর্ণিরে
দাহ দেবে না?’
আমি
সালামকে বলি, ‘না, ও অনেক আগুনে পুড়ছে তারে একটু শেতল অইতে দে।’
আমার পূর্ণিমা,
আমার বেহুলা ‘ভাইসা যাক’।
সেই থেকে
এই সমুদ্রের মুখোমুখি বসে আছি।
আমি ভুলতে পারি না পূর্ণিমার
সোনারং শরীরে কালকেউটের ছোবলের দাগ ...।
সালাম
লজ্জা আর কুণ্ঠার বোঝা নিয়ে ফিরে যায়।
আমি বসে আছি, ঐ তো আমার
পূর্ণিমা
আলো ছড়িয়ে হাসছে।
আমি এখানেই বসে থাকবো বারুদের
স্তূপের
মতো।
উদ্ধত সঙ্গীনের মতো,
জ্বলজ্বলে পোস্টারের মতো।
আমি জানতে চাই আমার দেশ
কোনডা? আমার মাডি কোনডা কতো?’
আমি জানি না আমার এ-প্রশ্নের
জবাব কে দেবে।
আপলৌড
১৬ জুন ২০০৯ |