London:

Home

Archive

Contact

About us

সম্পাদকীয়

কলাম

সাক্ষাতকার

সাময়িকী

ঘুর দেখি লন্ডন

পাঠকের কলম

কী-কখন-কোথায়

পত্র-পত্রিকা

 রেডিও

টেলিভিশন

ফটো-গ্যালারী

আয়েশা ফিরে আসছে

মূলঃ কুদরত উল্লাহ শাহাব

অনুবাদঃ জাফর আলম

[প্রখ্যাত উর্দু লেখক কুদর উল্লাহ শাহাবের জন্ম ১৯১৭ সালে গিলগিটেতার বাবা ছিলেন গিলগিটের গভর্ণর শাহাব ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (আই সি এস) এর সদস্য ছিলেন১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় করাচী চলে যানষাটের দশকে পাকিস্তানের শিক্ষা সচিব, সর্বশেষ নেদারল্যান্ডে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেনইয়াহিয়া খানের সময় ইংল্যান্ড চলে যেতে বাধ্য হনইংল্যান্ডে বসে তিনি রচনা করেন আত্নজৈবিক গ্রন্থ 'শাহাবনামা'১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডে থেকে ফিরে এসে পাকিস্তানে মারা যানমৃত্যুর পর 'শাহাবনামা' প্রকাশ হলে তার খ্যাতি পাক-ভারত উপমহাদেশে ছাড়িয়ে পড়েশাহাবনামা ভারত ও পাকিস্তানে বহুল পঠিত ও সুপরিচিত পাঠক নন্দিত উর্দু গ্রন্থ

উল্লেখ্য, কুদরতউল্লাহ শাহাব ঢাকা সহ করাচী, লাহোর, পেশোয়ার এবং কোয়েটায় পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশে 'রাইটার্স গিল্ড' প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করেনতিনি ছিলেন রাইটার্স গিন্ডের প্রথম মহাসচিব]

খুকরাপার সীমান্ডে ভারতীয় কাষ্টমস বিভাগের লোকজন ফাঁড়ি দিয়ে আবদুল করিম ও তার স্ত্রীকে পার হতে অনুমতি দেন কিন্তু ভারতীয় কাষ্টমস কর্তৃপক্ষ তার তিনটি জিনিস আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রেখে দেনসেই তিনটি জিনিস হল, একটি সেলাই মেশিন, একটি হারকুলাস সাইকেল এবং আবদুল করিমের যুবতী কন্যা আয়েশাদু'দিন একরাত পর্যন্ত অনেক আরজ ও মিনতির পর তিনটি জিনিস ফেরত পেলেনতন্মধ্যে সাইকেলের গদি আর টায়ার টিউব লা পাত্তা, সেলাই মেশিনের কয়েকটি পার্টস নেই, আর আয়েশা........অবশ্য আল্লাহ চাইলে সেলাই মেশিনের পার্টস নতুন সংগ্রহ করা যাবে, সাইকেলের নতুন টায়ার ও টিউব পাওয়া যাবেকিন্তু আয়েশার কি হবে.... সব আল্লাহর হাতেআবদুল করিমের উপর স্বর্গীয় প্রেরণা যেনো সেদিন ভর করেছিল

সে যখন রেলওয়ে ষ্টেশনে পৌঁছায়, স্থানীয় স্বেচ্ছা-সেবকরা তাকে মাংসের একটি পেয়ালা এবং চারটি গরম-গরম নান রুটি খেতে দেয়সাদা-সাদা নরম সুগন্ধিযুক্ত নানরুটি দেখে আবদুল করিম তার স্ত্রীকে উরুতে চিমটি কেটে চুপি চুপি বলল, 'দেখো আয়েশার মা, কেমন খাঁটি এবং টাটকা নানরুটিশালার বোম্বাইয়ে এমন কি আছে? চার বছর মোটা আটার রুটির জন্য ছটফট করেছিআহ্‌ কি মাখনের মতো রুটি আমাদের সৃষ্টিকর্তা সরবরাহ করেছেন'

যখন ওরা ট্রেনে চড়েছে, তখন ট্রেনের বগীতে কয়েকজন যাত্রী জানাশুনা লোকজনের মাঝে সালাম বিনিময় করছে। 'আসসালামু আলাইকুম, ও আলাইকুম সালাম, আসসালামু আলাইকুম ওরহমতুল্লাহে ও বরকাতহু' আবদুল করিম আবার স্ত্রীকে বলল, 'আয়েশার মা শুনছো? কেমন উৎসাহের সাথে দোয়া সালাম বিনিময় হচ্ছেএখানে ইসলামের জয় জয়কারঅথচ বোম্বেতে বন্দে মাতরম শ্লৌগান শুনতে- শুনতে কান ঝালাপালা হয়েছিলআল্লার নামে শপথ করে বলছি, আমার বুক ফুলে উঠছেআহ্‌ সৃষ্টিকর্ত্তার কি অপার মহিমা' আর আবদুল করিম আশেপাশে উপস্থিত মুসাফিরদের সাথে উৎসাহের সাথে হাত মেলাতে থাকে এবং আসসালামু আলাইকুম বলে সালাম বিনিময় করেতার স্ত্রী তার হাত ধরে বসিয়ে না দিলে হয়তো দীর্ঘক্ষণ এই তৎপরতা অব্যাহত থাকতো

রেলগাড়ী যাত্রা শুরু করলে, এর গড়গড় শব্দ সে গুরুত্ব সহকারে শুনতে থাকেবাইরে বিদ্যুতের তারের খুঁটি গণনা করে সে ট্রেনের গতি পর্যালোচনা করেতারপর তার স্ত্রীকে বললো, 'তুফান মেইল এর তুলনায় কিছুই নাগাড়ীতে বসে বেশ মজা পাচ্ছি আয়েশার মাতুমি ও তসবিহ বের করে প্রকাশ্যে অত্যন্ত আরামের আসে আল্লার নাম জপ করোকার ও কি এমন সাহস আছে যে পেছনে এসে তোমার গর্দান কেটে নেবে'

একটি ষ্টেশনের পর আর একটি ষ্টেশন আসেট্রেন থামে আবার চলতে শুরু করে যাত্রীরা উঠানামা করছেআবদুল করিম জানালা দিয়ে মুখ বের করে বাইরের পরিবেশ মন দিয়ে দু'চোখে উপভোগ করছেসাদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোষাক পরিহিত ট্রেনের গার্ড মাথায় জিন্নাহ্‌ টুপি, হাতে সবুজ-লাল পতাকা আর মুখে বাঁশি প্লাটফরমে কুলিদের ভীড়, খাবার ও মিষ্টির ঝুড়িতে মাছি ভন্‌ভন্‌ করছেবাইরে অনেক দূরে পর্যন্ত খোলা ময়দান দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, ইতস্ততঃ গ্রামের মাঝে পাকা কাঁচা ঘরবাড়ি থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে, ঝুপড়িতে মেয়েরা কলসিতে পানি ভরছে আর কাপড় ধুইছেধুলো বালিতে খেলারত ন্যাংটা ছেলে-পেলেআকাশের দিকে শূন্যে তাকিয়ে কান্নারত কুকুরের দল, বিড়াল, শকুন, অনেক জায়গায় মৃত গাভী, গরু এবং মহিষের পচা লাশ পড়ে আছে

ট্রেন যখন হায়দারবাদ ষ্টেশনে পৌঁছে, তখন ষ্টেশনে বোর্ডে টাঙানো মনোরম একটি রঙিন সিনেমার পোষ্টারের দিকে আবদুল করিমের নজর পড়েএই পোষ্টার দেখে সে হাসতে থাকে প্লাটফরমে কয়েকজন সিপাহী দশবারো জন কর্মচারী পরিবেষ্টিত দাঁড়িয়ে আছেএকজন ম্যাজিষ্ট্রেট প্রকাশ্য আদালত বসিয়েছে, তিনি চেয়ারে বসে আছেন আর বিনা টিকেটে ভ্রমণকারীদের জরিমানা করে জরিমানা আদায় করছেনএই সরকারী পদক্ষেপ দেখে আবদুল করিম এর মাঝে দারুন প্রতিক্রিয়া হয়সে তার স্ত্রীর উরুতে টোকা দিয়ে বলল, 'আয়েশার মা, প্রশাসন হলে এমনিই হওয়া উচিত, বোম্বেতে টিকেট বাবুর সাহসই হয়না বিনা টিকিটওয়ালাকে পাকড়াও করবেবাহ সরকারী প্রশাসন এমনি হওয়া উচিত মুসলমানদের রক্তে প্রশাসনিক দক্ষতার প্রভাব বিদ্যমানআমি তো আগেই বলেছি প্রশাসন পরিচালনা সহজ ব্যাপার নয়'

আয়েশার মা বেশ আরামের সাথে ট্রেনের আসনে বসেছিলসে তার পোটলা থেকে এক হাজার এক দানাওয়ালা তসবিহ বের করে আল্লাহর নিরান্নব্বই নাম জপ করছেআবদুল করিম মেয়েকে ডাক দেয়। 'মা আয়েশা, দেখেছ তোমার মায়ের অবস্থা দেখোতুমি সিন্দুক থেকে আমার টুপি বের করে দাওএখানে কিসের ভয় ?' আয়েশা সিন্দুক খুলে তার বাবার টুপি বের করে হাতে তুলে দেয়সেটা ছিল সুরমা রং এর একটি জিন্নাহ্‌ টুপিআবদুল করিম এই টুপি মাথায় দিয়ে বোম্বের তরকারীর বাজার থেকে বের হওয়া মিছিলে অংশ নিতোএখন চার বছর পর্যন্ত এই টুপি সিন্দুকে পড়ে আছে

মাথায় টুপি দিয়ে বুক ফুলিয়ে আবদুল করিম ট্রেনের আসনে বসে আছে আর জানালা দিয়ে আশে পাশে চারিদিকে তাকায় আয়েশাও বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলতাদের কোনো গন্তব্য নেইসে মনে মনে দোয়া 'গাঞ্জেল আরশ' আওড়ানোর চেষ্টা করেএই দোয়া পাঠের ফলে ইতোপূর্বে তার অনেক মুশকিল আসান করেছিলকিন্তু আজ এই দোয়া পাঠ করতে গিয়ে তা তার ঠোঁটে আটকে যাচ্ছেমুখ দিয়ে বের হচ্ছে নাসে পেছনের ঘটনা ভাবছে, যখন আয়েশা খুকরাপার ভারতীয় সীমান্ত এর কাছে কাষ্টমস ফাঁড়ির কাছে পৌঁছেনি

এখন করাচী পৌঁছে সবচেয়ে প্রথম সমস্যা হল মাথা গুঁজার ঠাই খুঁজে বের করাঅন্যান্য শরণার্থীদের দেখাদেখি আবদুল করিম তার আসবাপত্র ষ্টেশনের বাইরে ফুটপাতের উপর স্তূপীকৃত করে রাখেআয়েশা ও তার মাকে মালপত্রের কাছে বসিয়ে সে বাসস্থানের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েসারাদিন ঘুরাফেরার পর সে যখন ফিরে আসে, তখন সে দারুণ ক্লান্তকিন্তু তার চেহারায় প্রশান্তির ছাপ

আবদুল করিম ফুটপাতে পা ছড়িয়ে বসে পড়ে, বলল, 'আয়েশার মা করাচীর তুলনায় বোম্বাই নস্যিতোমার মাথার শপথ করে বলছি, এত বড়-বড় প্রসাদতুল্য দালান আছে যা কোনো দিন দেখিনিঅনেক ধনী শেঠ ও আছে এখানে একজন শেঠ বোম্বের চার চারজন শেঠকে পকেটে ভরে রাখতে পারেতাছাড়া মোটর গাড়ী? এত সুন্দর সুন্দর গাড়ী বোম্বেতে দেখাই যায়নিগাড়ী তো নয় যেনো রেশম কাপড়ের থান খুলে সড়কে বিছিয়ে দেয়া হয়েছেআগে একটি ঠিকানা খুঁজে পাই, তারপর তোমাকে ও ঘুরিয়ে নিয়ে আসব তখন বেশ খুশী হবে করাচীর চাকচিক্য দেখে'

'থাকার জন্য বাড়ীর ব্যবস্থা হয়েছে?' প্রশ্ন করে আয়েশার মা

'আরে এতো তাড়া কিসের? আল্লাহ চাইলে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবেআমি ঘুরে- ঘুরে পাগড়ীর দাম যাচাই করে এসেছিআল্লার নামে শপথ করে বলছি, করাচীর তুলনায় বোম্বাই কি ছার'

আবদুল করিম দৈনিক যথারীতি বের হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়কখন ও বাসে, কখনও ট্রামে কখনও বা রিক্সায় আর কখনও পদব্রজে ক্লিফটন, বন্দর রোড, সদর, ফেয়ার পার্ক,এ্যাসেম্বলী হল, চীফ কোর্ট, জেলখানা, পীর ইলাহী বক্স কলোনী, খোদাদাদ কলোনী, নাজিমাবাদ, মঙ্গোপীর, কায়েদে আজমের মাজার....... এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে সে ঘুরে বেড়ায়নিআবদুল করিমের কাছে করাচীর ভিক্ষুকদেরও আজব মনে হয়েছেএরা দিয়াশলাই এবং সংবাদপত্র বিক্রি করে আবার ভিক্ষা ও করেএরা বোম্বের মতো ভিক্ষুক নয় বোম্বের ভিক্ষুক বিশাল দেহ আর হাতে লাঠি নিয়ে ভিক্ষা করে যেনো জোর করে ঋণ আদায় করছে

একদিন আবদুল করিম জুমার নামাজ আদায় করতে জামে মসজিদে গেলমসজিদে নামাজীদের ভীড়মিশর, সিরিয়া, ইরাক, সউদী আরব এবং ইরান থেকে অনেক নামকরা ব্যক্তিত্ব একটি সম্মেলনে যোগদানের জন্য করাচী এসেছে নামাজের পর ওনারা পাকিস্তান সম্পর্কে অত্যন্ত প্রশংসাসূচক বক্তৃতা করেনআল্লাহু আকবর শ্লৌগান দেয় নামাজীরা উঠে গিয়ে তাদের হাতে চুমো দেয় অনেকে তাদের সাথে কোলাকুলি করছে আর চারিদিকে দারুণ উৎসাহ উদ্দীপনাএই দৃশ্য দেখে আবদুল করিমের দু'চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু দেখা দেয়লোকজন সব মসজিদ ত্যাগ করলে সে দু'রাকাত শুকরানা নফল নামাজ আদায় করে

বোম্বেতে আবদুল করিমের বাসা তরকারী বাজারের পেছনে একটি অন্ধকার কামরা, কোনো বারান্দা বা উঠান ছিল না, মুক্ত বায়ু ও নেই, রোদ ও পাওয়া যায় নাভাড়া মাসিক সাড়ে দশ রূপী আর শেঠের ধমক ও বকাবকি ভিন্নকিন্তু তার তুলনায় করাচীর ফুটপাত অনেক ভালফুটপাতের বারো ফুট দীর্ঘ এবং দশ ফুট চওড়া জায়গা ঘেরাও করে অন্যান্য শরণার্থীদের মতো কাঠের টুকরো জুড়াতালি দিয়ে, পুরানো চটের পর্দা ঝুলিয়ে একটি ছোট কামরা তৈরী করেখোলা বাতাস, রোদ আর আলো সব আছে পাশে বিদুতের থাম, আলো ও পাওয়া যায় অদূরে পানির পাইপএখানে বাড়ী ভাড়ার ঝামেলা নেই, প্রতিমাসে শেঠজীর গোমস্তার চীৎকার ও নেইতদুপরি আশেপাশের প্রতিবেশীরা ও ভদ্র, সকলে নির্ভয়ে আরামের সাথে বসবাস করছে

বোম্বাইয়ে আবদুল করিম ব্যবসায় পেশা অনেক বদল করেছিলযখন কংগ্রেস ক্ষমতায় এলো, সে তখন মদ বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেতখন আবদুল করিম জীবিকা নির্বাহের জন্য স্থায়ী আয়ের পথ খুঁজে বের করেঅবশ্য তার সাথে আবগারী শুল্ক বিভাগের লোকজন, মদ বিক্রেতা, পারমিট ছাড়া মদ বিক্রেতাদের বেশ যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা দিন এদের সাথে যোগাযোগের কারণে তার মাসিক দুই আড়াইশ রূপী আয় হতোকরাচীতে এসে সে খোঁজ-খবর নিয়ে সে জেনেছে, এখানে সরকারীভাবে মদ বিক্রি নিষিদ্ধ করে কোনো আদেশ জারী করা হয়নি। এই পরিস্থিতি দেখে তার মনে বাজে কাজ-কারবারের ইচ্ছা জাগেসে কালোবাজারে মদের ব্যবসা করতো কিন্তু সে জানে মদের ব্যাবসা হারামকোনোদিন জীবনে সে মদ স্পর্শ করেনি এখন করাচীতে এসে সে অনেক লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে মদের ব্যাপারে সুষ্পষ্ট বক্তব্য পায়নি

অবশেষে একদিন হাকিম নজিবুদ্দৌলার ক্লিনিকে বসে গল্প-সল্প করছিলো, কথায় কথায় মদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় হাকিম সাহেব তার মহল্লায় একজন নাম করা আলেম হিসেবে পরিচিততিনি ইউনানী ঔষধ বিক্রি ছাড়া সামাজিক সমস্যা নিয়ে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী মতামত দিয়ে মানুষের সেবা করতেনমেয়েদের হিষ্টিরিয়া রোগের চিকিৎসা তিনি ঔষধ ছাড়া আধ্যাত্মিক পদ্ধতিতে আরোগ্য করতেনআবদুল করিমের জানার আগ্রহে হাকিম সাহেব মদ সম্পর্কে কোরানের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করতে থাকেনতিনি বললেন, মানুষের উচিত পাপ থেকে বিরত থাকা এবং সৎ পথে চলামদের অপকারিতা ও পাপ মানুষকে বুঝতে হবেএটা মানুষের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। মদ আইনের দ্বারা নিষিদ্ধ করে মানুষকে পাপ-পূন্যের পরীক্ষার মোকাবিলা করা থেকে বঞ্চিত করা সঠিক নয়

আবদুল করিমের উপর হাকিম সাহেবের হাদিসের তফসিরের বয়ানে বেশ প্রতিক্রিয়া হয়কোরানের রহস্য তার কাছে ক্রমশ উন্মুক্ত হতে থাকেতার স্ত্রীকে বলল, 'আয়েশার মা গোলামীর জীবন কি আর জীবন হল ? বোম্বেতে পঞ্চাশ বছর ছিলামনমাজ পড়েছি, কোরান শরীফ শিখেছি কিন্তু বুকে কখনও ঈমানের আলো সৃষ্টি হয়নি এখানে এসে কোরানের নতুন নতুন রহস্যের দ্বার আমার সামনে খুলে যাচ্ছেপ্রকৃত পক্ষে স্বাধীনতার সাথে ঈমানের স্বাদই আলাদাতাই পবিত্র হাদিসে আছে, 'গোলামীর দেশে জুমার নামাজ পর্যন্ত জায়েজ নয়'

মদের পরিবর্তে অন্য পেশায় সে কয়েকবার চেষ্টা করে বিফল হয়অন্যদিকে চোরা-কারবারীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর কোনো উপায় দেখছেনাসেখানে মদ প্রকাশ্যে বিক্রি হয় আটা চারআনা সের পাওয়া যায়কাপড় সস্তা, চিনি ও বাজারে প্রচুর সরবরাহ আছেআইসক্রীম ও ফল বিক্রি করে ও সুবিধা হল নাতারপর কাপড়ের দোকান ছিল, তাতে ও পেট চলে কিন্তু লাভ হয় নাতাই তার সর্বদা দুশ্চিন্তা লেগেই আছে

বোম্বেতে থাকাকালে আবদুল করিম কোনো ধর্মশলায় গান শুনতে যেতোএখানে করাচীতে সে আনাচে-কানাচে খোঁজ নিয়েছে, কোথাও মনের প্রশান্তির জন্য কিছু সময় কাটানোর আড্ডা খুঁজে পায়নি সে খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছে পতিতাদের ব্যাপারে কড়াকড়ি আইন রয়েছেতাই করাচীতে পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধ আবদুল করিম এই সংবাদ আয়েশার মাকে শুনিয়েছে আর ফুটপাতে ঝুপাড়ির সামনে বসে কোরান ও ঈমানের বিষয়ে মনের প্রশান্তির জন্য আলাপ আলোচনা করে

অবশ্য গোপনে পতিতাদের দালালিতে দারুন-অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছেএতে ভাল কমিশন ও পাওয়া যায় আবদুল করিমের সাথে বেশ কয়েকজন দালালের পরিচয় হয়একজন এক চোখ কানা দালাল তাকে আয়েশাকে দেহের বেশাতির পেশায় নিয়োজিত করার প্রস্তাব দেয়, তার দৃষ্টি আয়েশার দিকে পড়েছিল আবুদল করিম কানা দালালের প্রস্তাব শুনে তাকে প্রকাশ্যে জুতা পেটা করে এবং মসজিদে গিয়ে সারারাত কান্নাকাটি আর আল্লার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেআয়েশার ব্যাপারে লোকের মনে বাজে ধারণা জাগছে এটাই তার দুঃখভোরে সে যখন বাড়ী ফেরে, তার স্ত্রী তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে চাটাই এ শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেতার মেয়ে আয়েশা কোরান তেলাওয়াত করছিল ধীরে-ধীরে তার কোরান পাঠের আওয়াজে চারিদিকে বিচিত্র পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিলআবদুল করিম নীরবে এক কোনায় বসে মেয়ের কোরান পাঠ শুনছিলতার মেয়ে যেনো এক নিষ্পাপ ফেরেস্তা অথচ তার ব্যাপারে একজন দালাল বিশ্রী কাজের চিন্তা-ভাবনা করছিল

আবদুল করিমের কাপড়ের দোকান বেশ চালু হয়েছিলকিছুদিনের মধ্যে সে পীর বক্স কলোনীর পাশে দুটি পাকা কামরার বাড়ী সাড়ে চার হাজার টাকায় ক্রয় করেআয়শার মা সারাদিন এই ঘর পানি দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেআয়েশা কোরান তেলোয়াত করেসকালে মাছি তাড়ানোর জন্য ফিনাইল দিয়ে মেঝে ধুয়ে ফেলেআবদুল করিম আনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে আরাম করেতারপর ডিম ভাজা আর পরাটা আর চা সহ সকালের নাস্তা খেয়ে দোকানে গিয়ে বসেতাকে বেশ উৎফুল্ল মনে হয়

মাঝে-মাঝে আয়েশার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসেসেদিন আয়েশার বাগদান সম্পন্ন হবে সেদিন সারারাত আয়েশা জায়-নামাজে বসে কান্নাকাটি করেছে, আর অজ্ঞান হয়েছে কয়েক বার আবদুল করিম ও আয়েশার মায়ের অবস্থা ও কাহিল আয়েশার স্বামী বিজনোর থেকে পাকিস্তানে আসা মুহাজির আর টেন্ডো আদম খানে তাদের আড়ত আছেযেদিন আয়েশা শ্বশুর-বাড়ী গেল, তার বাড়ী যেনো বিরান ভুমিরাতে তার ঘুম হয়নিসকালে অনেক দেরীতে ঘুম থেকে জেগে উঠে আবদুল করিম নাস্তা সেরে দোকানে গিয়ে বসেসেখানে তার মন ভাল নেইদোকান আগে-ভাগে বন্ধ করে সে মনে শান্তির জন্য এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে, অনেক রাতে বাড়ী ফিরে আর রাতের আহার না করেই ঘুমিয়ে পড়ে

এখন সকালে ঘুম থেকে দেরীতে উঠা আর দেরীতে দোকান খোলা নিয়মে পরিণত হয়েছেদোকান দেখাশুনার জন্য আবদুল করিম একজন কর্মচারী রেখেছেসারাদিন ঘুমানো আর বাইরে ঘুরে বেড়ানো তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছেবাড়ীর বারান্দায় নানা ধরনের দালালের আড্ডা বসে, তন্মধ্যে কানা দালাল ও ছিলদুএকবার আয়েশার মা এসব লোকজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কিন্তু আবদুল করিম নানা বাহানায় তার কথা কানে তোলেনি

আবদুল করিমের নতুন ব্যবসায় দারুন প্রসার জমেছেসে পীর ইলাহী বক্সকলোনীর বাড়ী ত্যাগ করে বন্দর রোডে একটি দু'তালা বাড়ী কিনেছেসদর দরজায় 'শেঠ আবদুল করিম বোম্বাইওয়ালা' সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেগাড়ী কিনেছে, বাড়ীর কাজ কর্মের জন্য চাকর রেখেছেএখন আয়েশার মায়ের অনেক ফুরসত হাতে, অর্ধেক রাত পর্যন্ত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে আর হাজার দানার তসবিহ জপ করে। স্বামীর ব্যবসা-বাণিজ্যে আয় বরকতের জন্য দোয়া কামনা করে

একদিন রাতে আবদুল করিম বাড়ী ফিরলে আয়েশার মা তার পা টিপতে টিপতে বলল, 'ওগো শুনেছ?' সারাদিন পরিশ্রমের ক্লান্তি তার দেহে, আবদুল করিম বলল, 'কি ব্যাপার আয়েশার মা?'

'টেন্ডু আদম খাঁ থেকে লোক মারফত সংবাদ এসেছে, খোদার রহমতে তোমার মেয়ের আগামী মাসে সন্তান হবে তুমি নানা হবে'

'আল্লার কাছে শোকরিয়া আদায় করছিআয়শার মা, আগামী বৃহস্পতিবার এতিম খানার বাচ্চাদের এনে আহার করাবেআমার কাজে কর্মের ধান্ধায় মনে না ও থাকতে পারে, তুমি অবশ্যই মনে রাখবেকিছু অলঙ্কার ও জামা কাপড় কিনে রাখবে তুমি নাস্তা পানি নিয়ে মেয়ের শ্বশুর বাড়ীতে যেও, খালি হাতে যেওনাআমাদের টাকা-পয়সার অভাব নেই, মেয়ের জন্য কিছু খরচ করতে হবে'

আয়েশার মা কর্কশ স্বরে বলল, 'এসব কি বলছ ? আমি তো মেয়েকে সন্তান প্রসবের আগে এখানে আসতে বলেছিখোদা চাইলে আগামী পরশু আয়েশা দুপুরের ট্রেনে বাড়ী ফিরবেতুমি গাড়ী নিয়ে আয়েশাকে রেলষ্টেশনে আনতে যাবে'

এ-সংবাদ শুনে আবদুল করিম হকচকিয়ে বিছানায় উঠে বসে, যেনো চোখে বালি পড়েছেতার মনে হল, চারিদিকের দেয়াল থেকে যেনো ধ্বনি হচ্ছে, এবার আয়েশা আসছে, আয়েশা ফিরে আসছে, ফিরে আসছে

সারারাত আবদুল করিম বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কাটায়সকালে যথারীতি ঘুম থেকে জেগে উঠে গোসল সেরে পোষাক পরিধান করে নাস্তা সেরে সরাসরি কাপড়ের দোকানে গিয়ে হাজির হয় দীর্ঘ ১৮ মাস যাবত কর্মচারী দোকান পরিচালনা করছিলমালিককে আসতে দেখে কর্মচারীটি ঘাবড়ে যায়কিন্তু আবদুল করিম দোকানের হিসাব-পত্র নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করেনিসারাদিন সে দোকানে কেমন জানি উদাস বসে কাটায়তার অনেক বন্ধু-বান্ধব তার খোঁজে দোকানে এসে হাজিরকিন্তু নানা কাজের অজুহাতে তাদেরকে বিদায় জানায়বিকেলে সেই কানা দালাল যথারীতি তার খোঁজে দোকানে এসে হাজিরতাকে দেখে আবদুল করিম ক্ষেপে আগুন লোহার রড় নিয়ে পাগলের ন্যায় তাকে আঘাত করতে ছুটে যায় বলল, 'সাবধান, তুমি আমার দোকানে ঢুকলে ঠ্যাঙ্গ ভেঙ্গে দেবশালা হারামী করাচীর পরিবেশ নোংরা করেছযাও এখান থেকে নচেৎ পুলিশ ডাকবো, শালা দালাল............'

সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে আবদুল করিম সরাসরি মসজিদে চলে যায় আর অনেকক্ষণ সেজদায় পড়ে ফুপিয়ে-ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে

কলেমা দোয়া-দরূদ সে ঘন-ঘন আওড়াতে থাকে কিন্তু মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হয়নি আটকে যাচ্ছে, যেনো কবুতর তার নীড়ে ফিরে এসে বিরান দেখে ফরফর করতে করতে ফিরে যাচ্ছে

সম্ভবতঃ আবদুল করিম সেজদায় পড়ে থাকতে-থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছিলএকজন মুসল্লি যখন তাকে জাগিয়ে তোলে তখন ফজর হয়েছেমোয়াজ্জিন ফজরের আজান দিচ্ছিলনিদ্রার ঘোরে আবদুল করিমের মনে হল যেনো ফজরের আজানের ধ্বনি নয় কেউ দূর থেকে চীৎকার করে আওয়াজ দিচ্ছে, 'এখন আয়েশা আসছে, আয়েশা ফিরে আসছে, আয়েশা ফিরে আসছে।'

আপলৌডঃ ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

-তে ফিরতি

-তে ফিরতি

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.