|
শিক্ষানীতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ
আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া
এক
বিগত দিনগুলোতে
আমরা লক্ষ্য
করেছি এদেশের
জনগণ শিক্ষা নিয়ে যতোটা সংবেদনশীল,
আন্তরিক
- সে-তুলনায়
রাষ্ট্র ততোটা আন্তরিকতা প্রদর্শন করেনি।
শিক্ষা
নিয়ে শাসক-গোষ্ঠী বরাবরই নিস্প্রভ,
অন্য-পক্ষের
ভূমিকায়।
গত
তিনশো
বছরের ব্যবধানে
প্রত্যেকটি দেশী-বিদেশী শাসক-শ্রেণীই
আমাদের শিক্ষা নিয়ে কপটতার আশ্রয় নিয়েছে।
রাষ্ট্রকে,
জাতিকে
শিক্ষা-বিমুখ
জাতিতে পরিণত করার কারসাজিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
আমরা
এটাও দেখেছি,
শাসকশ্রেণীর এ-কপটতার
বিরুদ্ধে শিক্ষাবিদ,
শিক্ষানুরাগী ও
ছাত্রদের সোচ্চার হবার ক্ষেত্রেও সততার কোনো ঘাটতি ছিলো
না।
প্রশ্ন
হলো
শিক্ষা নিয়ে
শাসক-শ্রেণীর
এতো ভয়ের কারণ
কী?
কিংবা শিক্ষা
ধ্বংসের মধ্যে শাসক শ্রেণীর লাভটা কোথায়?
২০০৯
সালে শিক্ষা-নীতি
প্রণয়নের পূর্বে নীতিনির্ধারকদের এ-প্রশ্নের
উত্তর অনুসন্ধান করা জরুরী।
এ-অনুসন্ধানের
ভিতর দিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যাবার পথ-পরিক্রমা বের করতে হবে।
আমাদের
বুঝতে হবে নাগরিকদের শুধু দক্ষ ও কৌশলী করে তুললেই হবে না।
তাদের
মধ্যে দায়িত্বশীল নাগরিক-বোধ,
নাগরিক
সম্প্রীতি,
মানবিক-বোধ
ও উপলব্ধি জাগিয়ে তোলারও প্রয়োজন রয়েছে।
এ-তাগিদের
কারণেই পর-মত
সহিষ্ণুতা অর্থে,
পরস্পরের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করার অর্থে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ
আমাদের
পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা বাঞ্ছণীয়।
দুই
কেনো
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ?
আমরা লক্ষ্য
করে
দেখবো
জাতীয় পর্যায়ে
রাষ্ট্রীয় লুট-পাটের
জন্য ব্যক্তি-বিশেষের ক্ষমতায় থাকা খুব জরুরী হয়ে পড়ে।
এ-প্রয়োজনই
ক্ষমতাসীনদের অগণতান্ত্রিকতার আশ্রয় নিতে দেখা যায়।
আর
অগণতান্ত্রিকতার আশ্রয় নিয়ে অন্যকোনো শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়।
এ-অগণতান্ত্রিক
রাজনৈতিক আদর্শের অংশ হিসাবেই শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রকে কলুষিত করার মহড়া শুরু হয়।
কেন এ-মহড়া?
ক্ষমতার
চৌহদ্দিকে নিরুপদ্রব,
নিষ্কন্টক তথা
হুমকি-হীন
রাখতে হলে প্রয়োজন এমন এক জনগোষ্ঠী,
যারা
দ্রোহে-বিদ্রোহে বিস্ফোরিত হবে না;
এমনকি লুটপাটের
হিসাব-নিকেষ বুঝতে সক্ষম হবে না।
এ-ধরণের
নিষ্প্রভ জন-অধ্যুষিত রাষ্ট্র সৃষ্টির জন্যই প্রয়োজন শিক্ষার উপর খবরদারী,
শিক্ষাকে অথর্ব,
শৃঙ্খলিত করে
রাখা।
কারণ
অশিক্ষা,
কু-শিক্ষায়
ভারাক্রান্ত জাতিগোষ্ঠীকে শোষণ-বঞ্চনার শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা সব-থেকে
নিরাপদ।
এ-জন্যই
লক্ষ্য
করা যায় আমাদের
শাসক-গোষ্ঠী বার-বার
শিক্ষা-কাঠামো তথা শিক্ষার ভিতকে বিশৃঙ্খল অবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
শিক্ষা-ক্ষেত্রে
বিরাজমান এ-সঙ্কট
নৈর্ব্যক্তিক বা অন্য-নিরপেক্ষ
ভাববার কোনো কারণ নেই।
এ-সঙ্কট
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের অন্যান্য সঙ্কটের সঙ্গেও
জড়িত।
অর্থনীতি,
রাজনীতি
ও
রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনোকিছুই এ-সঙ্কট
থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।
শ্রেণী-বৈষম্য,
শ্রেণী-শোষণ,
নিপীড়ন
ইত্যাদি-সব
বিষয়তো রয়েছেই।
এ-সব
দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে সমকালীন সংযোজন হলো মৌলবাদী আস্ফালনকে পৃষ্ঠপোষকতা করা।
বিগত
জোট সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে এ-দুর্বৃত্তায়নের
পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলো।
শিক্ষা-নীতি
প্রণয়নের পূর্বে তাই বিগত সরকারের শিক্ষা-বিরোধী
কর্মকাণ্ডসমূহ পর্যালোচনা করা উচিত।
শিক্ষা
নিয়ে চারদলীয় জোট সরকারের কয়েকটি গণ-বিরোধী
তৎপরতা এ-পর্যালোচনায়
গুরুত্ব পেতে পারে।
উচ্চ-শিক্ষা
সংস্কার নিয়ে ইউজিসির সংস্কার পত্র,
আলীয়া ও কওমী
মাদ্রাসা শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সম-মান
দেবার আনুষ্ঠানিকতা,
শিক্ষাকে এক-মুখীন
করার নামে ইসলামী শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা এ-সবই
ক্রিটিক্যাল ইস্যু।
এ-সব
সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিগত চারদলীয় জোট সরকার শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করা অপেক্ষা
শিক্ষা-বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে বেশি উচ্ছ্বসিত ছিলো।
সে-সব
উচ্ছাসে রাজনৈতিক ফায়দা থাকার কারণে তাদের শিক্ষা-ভাবনায়
শিক্ষাবিদ,
শিক্ষানুরাগী
কিংবা শিক্ষার্থীদের চাহিদার দিকটি প্রতিফলিত হয়নি।
একটু পিছন থেকে
বিষয়টি তলিয়ে দেখা যাক।
গত এক
দশক ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জঙ্গী
তৎপরতার
সঙ্গে যে-সব
প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া যায়,
সে-সব
প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কওমী ধারাকে জোট সরকার আরবী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম-মান
দেবার ঘোষণা দিয়েছিলো।
প্রায়
আট সহস্রাধিক কওমী-কমিউনিটী
সদস্য ও তাদের
পারিবার পরিজন মিলিয়ে আরও
বিশাল একটি
গাণিতিক সংখ্যাকে এ-ঘোষণার
মধ্য দিয়ে নির্বাচনে সম্পৃক্ত করা তাদের লক্ষ্য ছিলো।
জোট
সরকারের রাজনৈতিক দোসর,
একাত্তুরের গণ-হত্যাকারী শক্তি জামাত-শিবিরের ভিত্তি-যে
আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠান,
তা নিয়েও জোট
সরকার বিলাসী
স্বপ্ন
দেখেছিলো।
এ-স্বপ্ন
অংশ
হিসাবে
আলিয়া
মাদ্রাসার ফাজিল ও কামিলকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের সমমান দেবার
সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এ-সবকিছুর
মধ্য দিয়ে জঙ্গী
তৎপরতায়
সম্পৃক্ত মধ্য-প্রাচ্যের
রাষ্ট্রসমূহের পরোক্ষ আস্থাভাজন হবার চেষ্টাও ছিলো।
রাষ্ট্র,
রাষ্ট্রের ভবিষ্যত এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি-যে
শিক্ষা,
সে-শিক্ষাকে
ধ্বংস করার অশুভ তৎপরতারই মধ্য দিয়েই এ-সব
পদক্ষেপ গ্রহণ
করা হয়েছে।
শিক্ষাধ্বংসের এ-তৎপরতার
পেছনে অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চাই উৎসাহত করেছে।
এ-জন্যই
আগামী শিক্ষা-নীতি প্রণয়নের সময় জোট সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ প্রত্যাখ্যান করার
পাশাপাশি শিক্ষাসূচিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রাসঙ্গিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া
উচিত।
তিন
কী
রকম হতে
পারে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ
প্রতিনিয়ত আমরা
জনগণের
স্বার্থ
পরিপন্থী
কাজ করছি।
যে-জনগণের
জন্য রাষ্ট্র,
সে-জণগণের
স্বার্থকে
জলাঞ্জলী দিয়ে
রাষ্ট্রীয় লুটপাট,
দুর্বৃত্তায়ন
এবং দুর্নীতির মহড়াকে অভিবাদন জানানোর হচ্ছে তার পেছনে মূলতঃ
আমাদের
অগণতান্ত্রিক বোধ-বুদ্ধিই কাজ করছে।
আমাদের
বুঝতে হবে,
গণতান্ত্রিক
মূল্যবোধের বহুমাত্রিক প্রকাশ রয়েছে।
গণতন্ত্র মানেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া নয়।
নির্বাচন নাগরিকের মত-প্রকাশের
একটি শর্ত মাত্র।
গণতন্ত্রের আরও
সহযোগী শর্ত
রয়েছে।
গণতন্ত্র একাধারে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ,
একটি
প্রতিষ্ঠান।
এ-মতাদর্শ
এমন যে,
তা রাষ্ট্রের
কল্যাণের জন্য,
নাগরিকদের
সবথেকে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তরিত করার জন্য,
রাষ্ট্রকে আধুনিকতার দোরগোড়ায় পৌঁছে
দেবার
জন্য কাজ করে থাকে।
আবার
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো জনগণের হিসাব-নিকেষ কড়ায়-গণ্ডায়
শোধ করা।
নাগরিকের মতামত প্রকাশের
স্বাধীনতাকে
উপভোগ
করা,
তার শিক্ষা,
চিকিৎসা,
নিরাপত্তা এবং জীবন-যাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে সুখময় করে তোলা।
সুতরাং
গণতন্ত্রের অর্থ শুধু ভোট প্রদান করে সরকার নির্বাচন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
গণতন্ত্র একটি দীর্ঘ-প্রক্রিয়া,
রাষ্ট্রের চোখ দিয়ে জনগণকে দেখা নয়,
বরং জনগণের চোখ
দিয়ে রাষ্ট্রকে দেখার অনুশীলনটিই গণতন্ত্রের লক্ষ্য।
গণতন্ত্রের এ-মহান
বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টিপাত করে শিক্ষাবিদ হর্ন বলেনঃ
It [democracy] is also a way of life of
seeing and knowing. It is an attitude of mind under which exploitation of man by
man is abhorred, it is a way of life in which the human personality is judged as
supreme and of measureless worth; it is an order of social relationship, … it is
the spirit of understanding, sympathy and co-operation...’
সুতরাং শিক্ষাবিদদেরও দাবী
শুধু ভৌটে
নির্বাচিত হবার শর্তকে গণতন্ত্র বলা যাবে না।
গণতন্ত্রকে বুঝতে হবে কতগুলো শর্তের মধ্য দিয়ে।
একে
উপলব্ধি করতে হবে জীবনকে দেখা ও জানার পন্থা হিসাবে।
ব্যক্তিকে মূল্যায়ন করতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে।
গণতন্ত্রকে কাজে লাগাতে হবে সুস্থ্য ও মানবিক মনোভাব সৃষ্টি করার হাতিয়ার হিসাবে।
গণতন্ত্রের একমাত্র অভিলক্ষ্য হতে পারে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের
আন্তঃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা,
পারস্পরিক
বোঝাপড়া
বৃদ্ধি করা,
সাহায্য-সহযোগিতা ও সহানুভূতির মনোভাব সৃষ্টি করা।
আর এ-মনোভাবই
পারে মানুষ দ্বারা মানব-শোষণকে অবমুক্ত করতে।
সুতরাং
গণতন্ত্রকে বুঝতে হবে সামাজিক সম্পর্কেরই বিশেষ মাত্রা হিসাবে।
গণতন্ত্র
হলো
উপলব্ধি,
সহানুভূতি ও
সহযোগিতার এক সম্মিলিত উদ্দীপনা।
যে-গণতন্ত্র
এবং
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এতো-কিছু
করতে পারে,
সে-গণতন্ত্রকে
আমরা খুঁজে পাই না আমাদের প্রতিদিনকার কর্মকাণ্ডে,
আচর-আচরণে তথা রাষ্ট্রীয় জীবনে।
আমাদের
রাজনৈতিক নেতা,
রাষ্ট্রের প্রতিভূ-শক্তি সকলের আচরণে লক্ষ্য
করি
ঔদ্বত্য
ও
দম্ভ।
এ-সবের
মধ্যে আমরা গণতান্ত্রিক শিক্ষার কোনো ছিটেফোঁটা খুজেঁ পাই না।
খুঁযে
পাই
মিথ্যাচার,
কলুষিত
রাজনৈতিক বোধ-বুদ্ধি।
এ-সবই
কিন্তু
গণতান্ত্রিক
বোধ-হীনতা।
এ-বোধ-হীনতার
কবল থেকে রেহাই পাবার জন্যই শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে গণতান্ত্রিক শিক্ষাকে পাঠক্রমে
অর্ন্তভুক্ত করা জরুরী।
একজন
গণতান্ত্রিক বোধ-উপলব্ধি সমৃদ্ধ ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব অন্যের অনুভবকে শ্রদ্ধা করা
যা নিরপেক্ষভাবে মানব-কল্যাণকে
ত্বরান্বিত
করতে পারে।
অন্যের
প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর জন্য প্রয়োজন সততার প্রতি আনুগত্য,
প্রেম ও
সাহস।
রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে,
কোনো
দাবী-দাওয়ার প্রশ্নে রাষ্ট্রকে অপ-ব্যবহার করার মধ্যে এ-সততা,
প্রেম ও
সাহস খুঁজে পাওয়া যাবে না।
কেবল
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের যথার্থ চর্চার মধ্যে এ-গুণাবলী
বিদ্যমান।
চার
গণতান্ত্রিক
মূল্যবোধ ও চিন্তাবিদদের ভাবনা
আধুনিক
শিক্ষাতত্ত্ব ও রাষ্ট্র-তত্ত্বের সুবাদে আমরাও জেনেছি
‘মানব
ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ’
ও
‘সামাজিক-উন্নয়ন
ও সামাজিক-মূল্যবোধ’
সৃষ্টির
জন্য গণতান্ত্রিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
বিখ্যাত
শিক্ষাবিদ জন ডিউঈ তিনিও তৎকালীন আমেরিকান জীবনাচরণে বিদ্যমান
ব্যক্তিসর্বস্বতা,
স্থূল-ভোগবাদী
ভাবনা দেখে শঙ্কিত হয়েছিলেন।
এ-আশঙ্কা
থেকে তিনি লিখেছিলেন Democracy and
Education (1916)।
গ্রন্থটি প্রায় এক শতাব্দী আগে রচিত হলেও
আমাদের
রাজনৈতিক বাস্তবতায়,
ক্ষয়িষ্ণু
মূল্যবোধের প্রেক্ষাপটে এ-গ্রন্থের
শিক্ষা মানানসই হতে পারে।
তিনি
জনগণকে নাগরিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শেখাতে চেয়েছেন।
গণতন্ত্রের মধ্যে তিনি লক্ষ্য
করেছেন
সহনশীলতা,
সহিষ্ণুতা,
ভ্রাতৃত্ব-বোধ
ও সমতার মতো
সামাজিক
বৈশিষ্ট্যসমূহ।
গণতান্ত্রিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে নাগরিকগণ ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাবে,
পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে শিখবে।
পাশাপাশি নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি যে-সমস্যার
মুখোমুখি হবে,
তার সমাধানের
পথও এ-গণতন্ত্রই
বাতলে দিতে পারে।
ব্যক্তির সহনশীল ও সৌহাদ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাসের জন্য যে-সুস্থ
ও সামাজিক পরিবেশের প্রয়োজন তা গণতন্ত্রের ভিতর দিয়ে অর্জিত হতে পারে।
গণতন্ত্রের
আরেকটি শর্ত হলো নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শের অনুশীলন।
নিয়ম
বহির্ভূতভাবে কোটি-কোটি
টাকা উপার্জন করে বাইরে বিনিয়োগকারী বনে যাওয়ার মধ্যে এ-নৈতিকতাকে
খুজেঁ পাওয়া যাবে না।
রাষ্ট্রকাঠামোকে ব্যবহার করে গোষ্ঠী-প্রীতি,
দুর্নীতি,
কোটারীকরণ এ-সবই
নৈতিক-স্খলনকেই উৎসাহিত করা হয়।
নৈতিক
স্খলনের
মধ্য
দিয়ে বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়া যায়,
কিন্তু
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
কারণ
ন্যায় ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা ব্যতীত গণতন্ত্র অর্জন করা যায় না।
সুতরাং
সামাজিক মূল্যবোধ,
নৈতিক মূল্যবোধ
ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ গণতন্ত্রের এ-সব
বহুমুখী রূপায়নকে বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক হবার দাবী হাস্যকর বটে।
আমাদের
মনে রাখা উচিত,
লুটপাটের
মানসিকতা,
ব্যক্তিসর্বস্ব
রাজনৈতিক মনস্কতা হল গণতন্ত্র-বিরুদ্ধ।
এজন্যই
আমাদের লুম্পেন-চরিত্রের
রাজনৈতিক নেতাদের যতো ভয় গণতন্ত্রকে।
আমাদের
রাজনৈতিক বাস্তবতার এ-পরিসরে
তাই যে-কোনো
নীতি-পরিকল্পনা প্রণয়নের পূর্বে তাকে টেকসই করার চিন্তাও থাকাও উচিত।
এ-লক্ষ্যকে
বাস্তবায়িত করার জন্যই প্রয়োজন
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ-জনিত
শিক্ষা।
অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রোধ করার জন্যই আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হল শিক্ষা
বাচাঁও আন্দোলনকে
ত্বরান্বিত
করা।
কারণ
শিক্ষাই হয়ে উঠতে পারে গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নির্দেশক।
শিক্ষক,
শিক্ষার্থী,
শিক্ষালয়,
সমাজ,
রাষ্ট্র
সকলের সমবেত চেষ্টায় এ-উদ্দেশ্য
বাস্তবায়ন
করা সম্ভব।
আমরা
প্রত্যেকেই যদি গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করি,
দায়িত্ব-বোধ
দ্বারা উজ্জীবিত হই,
তাহলেই কেবল
সম্ভব জীবনে সমাজে
গণতান্ত্রিক
আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।
আর
গণতান্ত্রিক-মূল্যবোধ সমৃদ্ধ শিক্ষাই পারে একটি সহনশীল রাষ্ট্র তৈরী
করতে।
তাই
রাজনৈতিক উন্নতির জন্য,
ব্যক্তির
উন্নতির জন্য,
সমাজের উন্নতির
জন্য গণতান্ত্রিক-মূল্যবোধ-সমৃদ্ধ
শিক্ষাই আমাদের কাম্য।
সুতরাং
২০০৯ সালে প্রণীত শিক্ষানীতির স্লৌগান হওয়া উচিতঃ
শিক্ষা
হোক গণতন্ত্রের জন্য,
শিক্ষা
হোক গণতন্ত্রের হাতিয়ার।
লেখকঃ
শিক্ষক,
দর্শন
বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়।
anwarullah1234@yahoo.com |