|
সিধু-কানাই বলে হুল
জোবাইদা নাসরীন
সিধু-কানাই
বলে হুল,
মহাজনের বুকে শুল।
আজ ৩০ জুন,
সেই হুলের অর্থাৎ
সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৫৪ তম বার্ষিকী।
এই সাঁওতাল বিদ্রোহই
ছিলো বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ,
যদিও প্রাধ্যান্যশীল
ইতিহাস এটি স্বীকার
করতে নারাজ।
সে-সময়ের
৫০ হাজারেরও বেশি যোদ্ধা সাঁওতালই হলো ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পথ-প্রদর্শক।
সাঁওতাল বিদ্রোহ এমন
তীব্র ও প্রকট ছিলো যে,
ব্রিটিশ শাসন এবং শোষণের
ভিত কিছুটা হলেও নড়েছিলো।
সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণে
বিহার,
বীরভূম এবং মুর্শিদাবাদের বিশাল
অঞ্চল বৃটিশ শাসন-শূণ্য
হয়ে পড়েছিলো।
অনেক চেষ্টা হয়েছিলো সে-বিদ্রোহ
দমানোর;
কিন্তু পারা যায়নি।
সে-আন্দোলন
ছিলো ভূমি বাঁচানো,
ভূমির অধিকার ও ফসলের অধিকার
ফিরে পাবার।
সময়ের হিসেবে দেড়শো বছর পার
হয়েছে,
মহাজন কিংবা ইংরেজ প্রভূদের
প্রত্যক্ষ শাসন আর নেই।
সময় বদলেছে অনেক,
দিনেরও পরিবর্তন হয়েছে।
কিন্তু এখনও সাঁওতালদের
ভূমির লড়াই শেষ হয়নি।
কারণ,
শাসন-শোষণের
মালিকানা পাল্টেছে মাত্র,
কিন্তু এর ধরণ
রয়েছে আগের মতোই।
শেষ হওয়াতো দূরের কথা,
প্রতি-বছরই ভূমিকে
কেন্দ্র করে ভূমি-লোভী
সন্ত্রাসীদের দ্বারা হত্যা-সহ
বিভিন্ন ধরণের
নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশের বৃহত্তর উত্তর বঙ্গের বসবাসরত আদিবাসী
নারী-পুরুষেরা।
তবে এখনও তাদের মিল রয়েছে দেড়শো
বছর আগের পূর্বসূরীদের সঙ্গে।
এখনও সাঁওতালরা প্রতিবাদ
করছেন,
প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে
তীর-ধনুক ব্যবহার করছেন।
কিন্তু সেই তীর ধনুক
ঠেকাতে পারছে না নতুন যুগের নতুন অস্ত্রের
ও ষড়যন্ত্রের
দাপটকে।
যার ফলে পিছু হঠতে বাধ্য হচ্ছেন
সিধু-কানাই,
চাঁদ,
ভৈরবদের উত্তরসুরী লড়াকু
সাঁওতালরা।
সাঁওতাল
বিদ্রোহের গর্বিত মাসেই আবারও আক্রান্ত হয়েছে উত্তরবঙ্গের আদিবাসী গ্রাম,
গ্রামের বাসিন্দা বেশির
ভাগ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষ।
এ-মাসেরই
১২ তারিখে বিকেল বেলায় নঁওগার পোরশা উপজেলার ছাওর ইউনিয়নে খাতিরপুর গ্রামে প্রায়
৫৬টি আদিবাসী পরিবারের বাড়ী-ঘরে
হামলা এবং আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়।
তার সঙ্গে চলে লুটতরাজ,
ভাঙ্গচুর এবং আদিবাসী
নারী-পুরুষকে মারধর।
পরের দিনও দু-জন
সাঁওতাল নারীর উপর নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত রিপৌর্ট
থেকে জানা যায়,
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ আদিবাসীদের দীর্ঘ-দিনের
বসবাসের জায়গার উপরে দাবী কায়েমের লক্ষ্যে নূর হোসেন মাস্টারের লাঠিয়াল বাহিনী এ-হামলা
চালায় (সূত্রঃ
দৈনিক প্রথম আলো,
১৪ জুন)।
জানা যায়,
এখন পর্যন্ত ৭৩টি আদিবাসী পরিবার খোলা আকাশের নিচে
মানবেতর জীবন যাপন করছে।
এমনকি তারা পর্যাপ্ত
খাবার পানিও পাচ্ছেন
না।
ঘটনার প্রায় দু-সপ্তাহ
অতিক্রম হলেও,
এমন কি মামলা দায়ের করার
পরও এখন পর্যন্ত ঘটনার
সাথে যুক্ত কাউকে গ্রেফতার করেনি পুলিস
(সূত্রঃ
দৈনিক প্রথম আলো,
২৭ জুন)।
বরং উল্টোটি ঘটেছে।
অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে
দায়ের করা মিথ্যা মামলাকে গুরুত্ব দিয়ে সাঁওতালদের
বাড়ীতে-বাড়ীতে
তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিস।
বিভিন্ন সংগঠন
ও সাধারণ মানুষ স্থানীয়
এবং জাতীয় পর্যায়ে এ-ঘটনার
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,
মানব-বন্ধন প্রভৃতি হলেও
সরকারের পক্ষ থেকে আদিবাসীদের সহযোগিতা করার কোনো
ধরণের
উদ্যোগের কথা জানা
যায়নি, দেয়া হয়নি
কোনো ধরণের
ক্ষতিপূরণ কিংবা পূর্নবাসনের জন্য সহায়তা।
এ-ঘটনার
কয়েক দিন পরে,
১৮ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জের
নাচোলের দুলাহার গ্রামে ১৭টি আদিবাসী পরিবারকে খাস জমি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য
প্রভাবশালী মহল থেকে হামলা চালানো হয়।
এতে
দু-জন
আদিবাসী নারী মারাত্মকভাবে আহত হয়।
এ-ঘটনায়
জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিস
দু-জনকে
গ্রেফতার করলেও এখন পর্যন্ত সে-গ্রামের
আদিবাসীরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
(সূত্রঃ
দ্য ডেইলি স্টার,
২৩ জুন)।
এ-সে-নাচোল,
যেখানে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিলো দুর্বার কৃষক আন্দোলন।
শুধূ
এবারই-যে
এ-ধরণের
ঘটনা ঘটেছে, তা নয়;
গত বছরে সাঁওতাল
বিদ্রোহের মাসেই দিনাজপুরে দু-জন
সাঁওতাল কৃষককে হত্যা করা হয়।
১৯৯৮ সালের ১৮ আগস্ট
ভূমি দখলের
প্রতিবাদ করলে এ-একই
জেলার ভীমপুরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় আলফ্রেড সরেনকে।
গবেষণা তথ্যে জানা যায়,
১৯৯৮ সাল থেকে
২০০৯ সালের জুন পর্যন্ত বৃহত্তর উত্তরবঙ্গে প্রায় ১৮ জন আদিবাসীকে হত্যা করা হয়;
আর নির্যাতিত হয়েছেন ৫০-এরও
বেশি আদিবাসী নারী
এবং অপহৃত হয়েছেন ১৫-এরও বেশি।
এ-সবের
পেছনে অন্যতম কারণ
আদিবাসীদের ভূমি দখল।
এখানে আরও উল্লেখ করা
প্রয়োজন যে,
আদিবাসীদের ভূমি দখল এবং তাদের
উপর নানা-মুখী
নির্যাতন এবং চাপের কারণে
গত ১০ বছরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন আদিবাসী অধ্যুষ্যিত এলাকা থেকে
প্রায় ২১১টি পরিবার অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তু হয়েছে।
দেশান্তরী হবার কথাও
ভাবছেন অনেকে।
এদের কোনো তালিকা নেই সরকারের
কাছে;
এমনকি নেই তাদের পুনর্বাসন করার
কোনো ধরণের
উদ্যোগ।
যে-ভূমি
রক্ষা করার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন সিধু,
কানাই,
ভৈরব
ও চাঁদ-সহ
আরও অনেক
সাঁওতাল-যোদ্ধা,
সে-ভূমির
অধিকার এখনও সাঁওতালরা পায়নি।
বরং দিন-দিন ভূমি হাত-ছাড়া
হয়ে যাচ্ছে তাদের।
এর কারণ
তাদের অনেকেরই জমির আইনগত দলিল নেই এবং এর
কোনো প্রয়োজনও
ছিলো না তাদের
জীবনে।
এ-কারণে
তাদের জমি-দখল
সহজে করা যায় এবং
জমির জাল-দলিল তৈরী
করা যায় আরও সহজে।
বাঙালী এবং আদিবাসীদের
জমি-মালিকানার ধরণ
ভিন্ন হওয়ায় বঞ্চণা এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন আদিবাসীরা।
তাই পার্বত্য চট্টগামের
আদিবাসীদের মতো সমতলের আদিবাসীরাও দাবী তুলেছেন তাদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশনের
এবং এটি অতি জরুরীও।
লেখক
বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক
আপলৌডঃ ২৯ জুন
২০০৯ |