|
ফিচার
বাংলাদেশে কোচিং সেন্টারের আদলে গড়ে উঠা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের হালচাল
বাংলাদেশের
রাজধানী ঢাকায় শপিংমল কিংবা
গার্মেন্টসের মাথার উপর-সহ আজব-সব জায়গাতে গড়ে উঠছে বেসরকারী বিশ্বববিদ্যালয়।
অভিযোগ আছে,
বলতে গেলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিই সরকারের ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী চলছে না।
যে-যেমন পারছে,
চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধমে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে।
শিক্ষা নিয়ে রীতিমতো
ব্যবসায় নেমেছে একটি বিশেষ সিন্ডিকেইট।
শিক্ষার মান,
ক্লাস-রুমের পরিবেশ,
তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সাথে এ-সব প্রতিষ্ঠানে তেমন কোনো সম্পর্ক দেখা যায় না।
তবু উচ্চশিক্ষার নামে
বছর-বছর বেড়ে চলছে টিউশন ফী।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী
কমিশনের পক্ষ থেকে অধিকাংশ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়কে কালো তালিকা-ভুক্ত করার পরও
দাপটের সাথেই চলছে শিক্ষার নামে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেইটের বাণিজ্য।
উল্লেখ্য,
দুর্নীতি দমন কমিশন ৪০টি
বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্নীতির জন্য কালো তালিকা-ভুক্ত করে।
তবে বাস্তবতা হলো,
অদৃশ্য ক্ষমতাবানদের আশির্বাদে কালো তালিকা-ভুক্ত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যাগুলোর
বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
বাংলাদেশের বেসরকারী
বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান
বিভাগ খুলতে
অনুমোদন লাগে না
বেসরকারী
বিশ্ববিদ্যালয়ে নীতিমালা অনুযায়ী কোনো বিভাগ খুলতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকার এবং
মঞ্জুরী কমিশুনের কাছ থেকে অনুমোদন নেয়ার বিধি রয়েছে।
কিন্তু বেসরকারী
বিশ্ববিদ্যালয় চলে ফ্রী-স্টাইলে অনুমতি-বিহীন খোলা হচ্ছে একের পর এক বিভাগ।
যেমন,
২০০২ সালে ফার্মাসী বিভাগ
থেকে পাশ করা স্টামফোর্ড
বিশ্ববিদ্যালয়ালয়ের শিক্ষাথীরা জানতে পারে যে,
তাদের সনদপত্রের কোনো দাম নেই।
কারণ স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তপক্ষ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি
ব্যতিরেকে ফার্মাসী অনুষদ খুলেছে।
এ-ঘটনা ফাঁস হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০০৬ সালে ছাত্রদের ব্যাপক
বিক্ষোভের মুখে পড়ে।
রাজনৈতিক বিবেচনা এবং
শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনের কথা বিবেচনা করে তৎকালীন সরকার সমস্যার সমাধান করে।
কিন্তু দায়ীদের বিরুদ্ধে
কোনো রূপ ব্যবস্থান নেয়নি সরকার।
যত্র-তত্র
যেমন-তেমন বিশ্ববিদ্যালয়
বেসরকারী
বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবশ্যই নিজস্ব ক্যাম্পাস থাকতে হবে।
উচ্চ শিক্ষার গবেষণার
জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো,
লাইব্রেরী সহ খেলার মাঠ থাকতে হবে।
বাংলাদেশে এসন
নিয়ম-কানুন আসলে আছে কাগজে-কলমে।
এমনও দেখা যাচ্ছে,
ঢাকা শহরের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকার কোনো একটি বাণিজ্যিক ভবনের কয়েকটি ফ্ল্যাট
ভাড়া নিয়ে গড়ে উঠছে বিশ্ববিদ্যালয় নামের কৌচিং সেন্টার।
আবার এ-সব
বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে একাধিক ক্যাম্পাস।
বিশ্ববিদ্যালয় তৈরীর
এ-দৌড়ে নেপথ্যে রাজনৈতিক নেতাদের থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আওয়ামী লীগের এক সাবেক
সাংসদের স্ত্রী কয়েক বছর আগে ঢাকায় রয়্যাল ইউনিভার্সিটি নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠা করেন।
দেশে জরুরী অবস্থা জারী হলে ওই
'বিদ্যোৎসাহী'
প্রতিষ্ঠাতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
এরই মধ্যে তার বা
তাদের অনুপস্থিতে বনানী ও উত্তরা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টির আরও দুটো ক্যাম্পাস খোলা
হয়।
নতুন দুটি ক্যাম্পাসে দুজন
পরিচালকও নিয়োগ দেয়া হয়।
তিনটি ক্যাম্পাস মিলে
বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট শিক্ষার্থী ৭৫০।
কিন্তু এক-পর্যায়ে
বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়
।
এক পক্ষ আরেক পক্ষকে
‘দখলবাজ’
বলে দাবী করে।
মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব
চলার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির নামে সনদ বাণিজ্যও চলতে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির বৌর্ড
সভাপতি শোয়েব আহমদ ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন,
'এ-বিশ্ববিদ্যালয়
এখন দখল হয়ে গেছে।
চলছে সনদ বাণিজ্য।'
তবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসায় সাবেক ঐ সাংসদের স্ত্রী আবার দাপটে ফিরেছেন
ক্যাম্পাসে।
ধানমন্ডি
৪ নম্বর থেকে ১৫ নম্বর পর্যন্ত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১০টির উপরে।
তবে একটি
বিশ্ববিদ্যালয়েরও নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই।
নেই বেসরকারী
বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী অবকাঠামো।
ইউকেবেঙ্গলির
অনুসন্ধানে দেখা গেছে,
দেশের ৫২ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশেরই অনুমোদন নেয়া হয়েছে বিধিমালা না-মেনে
ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বা অর্থের বিনিময়ে।
শহরের কোনো শপিংমলে অথবা
বাসা বাড়ীতে গড়ে উঠেছে এ-সব বিশ্ববিদ্যালয়,
যার পরিসর কৌচিং সেন্টার থেকেও অনেক ক্ষেত্রে কম।
নিজস্ব ভবন,
প্রয়োজনীয় শ্রেণী-কক্ষ,
সেমিনার রুম,
গ্রন্থাগার,
খেলাধুলার স্থান ও সর্বোপরি নিজস্ব ক্যাম্পাসতো নেই-ই,
বরঞ্চ কিছু-কিছু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্দিষ্ট
সময়ের জন্য ভাড়া নিয়ে শিক্ষা-কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
৫২টি
বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশই বিএনপি এবং বিএনপি জামাত জোটের সময়ে অনুমোদন
পেয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে,
উক্ত সময়ের মধ্যে অনুমোদন পাওয়া বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে
রাজনৈতিক বিবেচনায়।
জামাত ইসলাম বাংলাদেশ
বিগত চারদলীয় ঐক্যজোটের আমলে আনত্মর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্রগ্রাম-এর
অনুমোদন নেয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্কিত সংগঠনের অর্থে পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ আছে
এ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে।
নির্দিষ্ট সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য-মতে মুসলিম এইড-ইউকে এবং নর্থ আমেরিকান ইসলামী
ফ্রন্টের অর্থে এ-বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালিত হয়।
মালিকানা
নিয়ে এক দ্বন্দ্ব চর-দখল ছাড়িয়ে গেছে
দারুল
ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়ে ঝুট-ঝামেলা চর দখলকে ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদ
নিয়ে শুরু হয় এ-দ্বন্দ্ব।
ভিসি-পদ নিয়ে সৃষ্ট
জটিলতায় এ-পর্যন্ত ৪০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
রাজধানীতে ৪টি শাখা
ছাড়াও এ-বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশজুড়ে শাখা রয়েছে
।
এর মধ্যে রাজধানীর মিরপুর,
উত্তরা,
পল্টন ও ধানমণ্ডির ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০ হাজারের ওপরে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন
দুজন উপাচার্যের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
উভয়পক্ষই পরস্পরের
বিরুদ্ধে অনুমোদন না নিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ করে যাচ্ছে।
এ-অবস্থায় সরকার এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে দিয়ে
বলেছে,
এ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে তার দায়-দায়িত্ব সরকারের থাকবে না।
এ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্যাম্পাস মিলে মোট শিক্ষার্থী প্রায় ১০ হাজার।
এ-১০ হাজার
ছাত্র-ছাত্রীর এখন মাথায় হাত।
তারা এখন কী করবেন?
কাগজপত্র জালিয়াতি করেই সংশ্লিষ্টরা ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে
এ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন নিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সনদ
বিক্রির জম জমাট ব্যবসা
সরকারী
নিয়মের তোয়াক্কা না করে ঢাকা-সহ দেশের নানা স্থানে গজিয়ে উঠা অনেকগুলো বেসরকারী
বিশ্ববিদালয়ের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ বিক্রির।
তবে একদিনও ক্লাস না করে
বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখন সনদ পাওয়া যাবার ব্যাপারটি ঢাকায় এখন ঔপেন সিক্রেট।
শুনা যায়,
বিভিন্ন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অধিক-হারে টিউশন
ফী দাবী করে।
বিশেষ-করে,
এমএমবিএ বা ইভিনিং এমবিএ নিয়ে জম-জমাট সনদ বিক্রির ব্যবসাটি মিডিয়া থেকে শুরু করে
সাধারণ লোকদের অনেকেরই জানা।
ইমএমবিএর একজন
শিক্ষার্থী ক্লাসতো করেই না,
এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বাসায় বসে পরীক্ষার খাতা লেখারও অভিযোগও শুনা যায়।
ঢাকা-সহ সারা দেশে প্রায় প্রত্যেকটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ইমএমবিএ।
দুদকের
তালিকায় ৪০ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়
দুর্নীতি
দমন কমিশন (দুদক) ৫২টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টি বেসরকারী
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাতিল করে দেয়ার সুপারিশ করেছে।
দুদকের অভিযানের প্রথম
পর্যায়ে ৪০টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে পরিচালনার নীতিমালা অনুসরণ না
করা-সহ বিভিন্ন ধরণের অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য উঠে আসে।
সে-অনুযায়ী সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাতিলের সুপারিশ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি
কমিশনকেও চিঠি দিয়েছে দুদক।
এদিকে এসব
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাতিল করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি
কমিশনকে চিঠি দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে,
দুদকের কর্মকর্তারা কিছু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে বহুমুখী
অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে।
এসবের মধ্যে অযোগ্য
শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ ও শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো না
cড়ানো
থেকে শুরু করে অর্থের বিনিময়েই সার্টিফিকেইট দেয়া-সহ নানা ধরণের অভিযোগ আছে।
দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ
শিক্ষা
মন্ত্রণালয়ে এবং মঞ্জুরী কমিশনে পড়ে আছে।
উচ্চ-মহলের অনিচ্ছার
কারণে দুদুকের সুপারিশ কার্যকর করা যাচ্ছে না বলে অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন সদস্য নাম না প্রকাশ করার শর্তে
ইউকেবেঙ্গলিকে জানান,
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয় করার অনুমতি পাচ্ছেন,
যার ফলে শিক্ষার মান অনেকাংশে ব্যহত হচ্ছে।
উক্ত সদস্যের মতে
মুঞ্জরি কমিশনের এখানে করণীয় তেমন কিছু নেই।
কেনো-না,
সব-কিছু চলে সরকারের প্রভাবশালীদের ইশারায়।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি
কমিশনের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন,
বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে মঞ্জুরি কমিশনের কেউ
জড়িত নয়।
প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দেশের বিদ্যমান বেসরকারী
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ধরে রাখার ব্যাপারে কমিশন বদ্ধপরিকর বলে জানান তিনি।
তবে দুদুকের তালিকার
ব্যাপারে কিছু বলতে রাজী হননি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।
আপলৌডঃ ১
জুন ২০০৯ |