|
সিকদার আমিনুল হকের কবিতা ও
কয়েকটি চিঠি
মিনার
মনসুর
আগামী
১৭ মে কবি সিকদার আমিনুল হকের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী।
দিনটি উপলক্ষ্যে
নিভৃতচারী এ-কবির প্রতি
kª×vÄwj-স্বরূপ
লিখেছেন কবি মিনার মনসুরঃ
১.
আমি
সিকদার আমিনুল হকের (১৯৪২-২০০৩) কবিতার অনুরাগী পাঠক।
তাঁর
'সতত
ডানার মানুষ'
কাব্যগ্রন্থটি আমাকে এতোটাই আলোড়িত করেছিলো
যে,
আমি একটি দীর্ঘ আলোচনা লিখে
ফেলেছিলাম তাৎক্ষণিকভাবে।
কাব্যগ্রন্থটি প্রথম
প্রকাশিত হয়েছিলো
১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারী
মাসে।
বইটি তখনই অনেকের দৃষ্টি
আকর্ষণ করেছিলো, আমার
ধারণা,
প্রধানত দুটি কারণে।
প্রথমতঃ
তখনকার প্রেক্ষাপটে
প্রকাশনাটি ছিলো
কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী ও
আকর্ষণীয়।
দ্বিতীয়তঃ
কবিতাগুলি ছিলো
ভিন্ন ধরণের এবং এর
আবেদন ছিলো
আগ্রাসী।
অবশ্য এখানে বলে রাখা
ভালো যে, জীবনানন্দ
দাশের ভাষায় কবিতা যেমন অনেক রকম,
তেমনি পাঠক-ভেদে
কবিতার আবেদনও ভিন্ন হওয়াটাই
স্বাভাবিক।
বলতে দ্বিধা নেই,
প্রকাশের দীর্ঘ ১৮ বছর পরেও,
সতত ডানার মানুষ
আমাকে এখনও সমভাবে আকর্ষণ করে।
মূলতঃ
উক্ত গ্রন্থের সূত্র ধরে
কবি সিকদার আমিনুল হকের সঙ্গে আমার সখ্য রূপানন্তরিত হয়েছিলো
গভীর বন্ধুত্বে।
বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও
আমাদের বন্ধুত্ব আমৃত্যু অটুট ছিলো।
কবির বন্ধুরা প্রায়
সকলেই জানেন কী অসাধারণ ছিলো
তাঁর বন্ধু-প্রীতি;
একই সঙ্গে তাঁর আত্ম-মর্যাদা-বোধ
এতোটাই প্রখর ছিলো
যে,
বন্ধু-প্রীতিও
সেখানে ঠাঁই পেতো না।
সাধারণতঃ
নিজের লেখালেখি নিয়ে সব
ধরণের আলোচনা তিনি এড়িয়ে যেতেন সচেতনভাবে।
খুব চাপাচাপি করলে লজ্জা
পেতেন।
তারপরেও আমার মনে হয়েছে
'সতত
ডানার মানুষ'
গ্রন্থটির প্রতি তিনি বিশেষভাবে দুর্বল ছিলেন।
অন্য-সব
গ্রন্থের তুলনায় এ-গ্রন্থটিকে যথেষ্ট উচ্চ মূল্য দিতেন।
'সতত
ডানার মানুষ'
প্রকাশিত হবার পর দেশে
একাধিক আলোচনা হয়েছে।
সিকদার আমিনুল হককে
দেখেছি বিশেষ আগ্রহ সহকারে আলোচনাগুলি পড়তে।
সে-সময়ে
বিশেষ-করে
দুটি ঘটনা তাঁকে বেশ নাড়া দিয়েছিলো।
প্রথম ঘটনাটি ছিলো
এ-রকমঃ
এক আড্ডায় বিশিষ্ট লেখক
ও অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গ্রন্থটির খুব প্রশংসা করে এ-নিয়ে লেখার আগ্রহ প্রকাশ
করেছিলেন।
পরে তিনি লিখেছিলেন কি-না
আমার জানা নেই।
তবে তাঁর প্রশংসাকে সিকদার খুব
গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিলো
নামজাদা সাহিত্যিক
শিবনারায়ণ রায়ের একটি চিঠি।
এ-চিঠি
তাঁকে এতোটাই উদ্বুদ্ধ করেছিলো
যে,
তিনি বিপুল উদ্যমে লেখা-লেখিতে
আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
এখানে বলা প্রয়োজন যে,
জাগতিক নানা ঝামেলায় তিনি তখন
চরমভাবে বিপর্যস্ত।
এ-বিপর্যয় তার
হৃৎযন্ত্রকেও আক্রান্ত
করেছিলো
এবং একবার ডাক্তারের
তীক্ষ্ণ ছুরির নিচে নিজেকে সঁপে
দিয়েও তিনি শেষ-রক্ষা
করতে পারেননি।
শিবনারায়ণ রায়ের চিঠিটি আমি সংগ্রহ করেছি তাঁর মৃত্যুর পরে।
সংক্ষিপ্ত কিন্তু
উদ্বুদ্ধ হওয়ার মতোই একটি চিঠি।
এখানে তা হুবহু উদ্ধৃত
করা হলোঃ
এএফ ৫৩৩ সল্ট
লেক
সেক্টর ১,
কলকাতা-৭০০ ০৬৪
রুদ্রপলাশ
৬৩
পূর্বপল্লী
শান্তি
নিকেতন-৭৩১ ২৩৫
২৬-৫-৯৩
কল্যাণীয়েষু,
গতকাল কবি
কালীকৃষ্ণ গুহ তোমার কাব্যগ্রন্থ সতত ডানার মানুষ
এবং
দুটি পত্রিকা- কিছুধ্বনি ও মাটি দিয়ে গিয়েছেন।
কলকাতায় দেখা হলে ভালো লাগত।
শরীর
এখন আশা করি সুস্থ অবস্থায় আছে।
সতত ডানার
মানুষ প্রথমেই নজর কাড়ে প্রচ্ছদ চিত্রণ,
ছাপা,
কাগজ,
বাঁধাই এই সবের অভিনবত্ব এবং উঁচু মানের জন্য।
এজন্য
প্রকাশকের রুচির তারিফ করি।
তোমার
কবিতায় চোখ বুলিয়েছি - কিন্তু আগাগোড়া যত্ন করে পড়তে সময় লাগবে।
যতটা
অল্প সময়ের মধ্যে পড়েছি তাতে মনে হল সুধীন্দ্রের মতো তুমি একটা বড় মাপের কাব্য
বুনে তুলেছো,
তাতে সুরের
ওঠাপড়া আছে,
পুরোটা
একসঙ্গে না পড়লে যার সম্পন্নতা এবং ঐক্য ধরা যাবে না।
ইচ্ছে
রইলো পরে বইটি নিয়ে জিজ্ঞাসায় বা অন্যত্র আলোচনা করবার।
জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশ সংখ্যা কি পেয়েছো?
তোমার একটি
কবিতা জিজ্ঞাসার জন্য পাঠালে খুশী হই।
কিছুধ্বনি
এবং মাটি কি তুমিই পাঠিয়েছো?
যদি
সম্পাদক বা প্রকাশকরা তোমার মারফৎ পাঠিয়ে থাকেন তাঁদের আমার ধন্যবাদ জানিও।
প্রীতি ও
শুভেচ্ছা রইলো।
ভবিষ্যতে
চিঠি ও লেখা শান্তিনিকেতনের ঠিকানায় পাঠিও।
শিবনারায়ণ
রায়
২.
চিঠি লিখেছিলেন কবি কালীকৃষ্ণ
গুহও।
দুটি চিঠির মধ্যে সময়ের ব্যবধান
প্রায় এক বছরের।
কিন্তু
তাঁর চিঠিরও অনেকটা অংশ
জুড়ে ছিলো
সতত ডানার মানুষ।
পুরো চিঠিটি উদ্ধৃত করা
হলোঃ
ফ্ল্যাট আর/আই ৮
ও ভি
আর সি হাউসিং এস্টেট
কলকাতা
৭০০০৩৮
প্রিয় আমিনুল,
চিঠি লিখতে
দেরি হয়ে গেল।
তবু
এই কথাটা জানানোর জন্যই এই চিঠি,
যে,
আপনার
বইটি আমার অসাধারণ লেগেছে।
এই
রকম মহৎ কাব্য-প্রচেষ্টা কদাচিৎ চোখে পড়ে।
প্রচেষ্টা
শব্দটি রাখলুম,
যেহেতু,
সময়ই
একমাত্র শিল্প-সাহিত্যর মহত্ব বিচার করতে পারে,
সমকাল
পারে না।
এটি
একটি মহৎ কাব্যগ্রন্থ হিশেবে পরিগণিত হবার সম্ভাবনা বহন করছে,
এইটুকু আপাতত নিঃসন্দেহে বলা যায়।
এবং
এইকথা সমকালীন বই সম্পর্কে বলা প্রায় অসম্ভব।
আমিও একবার
বাংলাদেশে যাওয়ার কথা ভাবছি- প্রধানত নিজের জন্মস্থানটা দেখে-আসার ছেলেমানুষিতে।
গেলে
যোগাযোগ করবো,
ইচ্ছে আছে।
আশা করি ভালো
আছেন এবং লিখছেন আরো আরো আসস্তিত্বিক
স্তরের কবিতা।
প্রীতি ও
শুভেচ্ছা জানবেন।
কালীকৃষ্ণ
৬ এপ্রিল ৯৪,
রাত্রি
আরও দুয়েকটি চিঠি আমি দেখেছি।
তন্মধ্যে একটি চিঠির
লেখক কল্যাণ সরকার।
তারিখ
বিহীন এ-চিঠিতে তিনি
লিখেছেনঃ
৫৭,
রাসবিহারী এভেনিউ
কলকাতা-২৬
১৪/১০৭
গল্ফ ক্লাব রোড,
কলকাতা- ৭০০০৩৩
প্রীতিভাজনেষু
আপনার
জ্যোতিদাকে লেখা চিঠির কথা জানলাম গল্ফ ক্লাবে তিতিরদের বাড়ীতে।
আপনি
যে-চিঠি
লিখেছেন,
তাও জানতে
পারতাম না;
পারলাম এই
কারণে যে জ্যোতিদা আপনার বইটা
আলোচনায় আগ্রহী।
আমায়
জানতে চাইলেন তোমার বইটি আছে নাকি।
আপনার সতত
ডানার মানুষ আমার পড়া হয়ে গেছে।
জ্যোতিদা
তার
স্বভাবসিদ্ধ
আচরণে নিজস্ব
বইটি হারিয়ে ফেলে এখন আমার দ্বারস্থ।
গত বইমেলায়
শতকরা ৮০ ভাগ ঝকঝকে বই একেবারে ফাঁপা,
রামধনু রঙ সাবান ফেনা,
নতুবা
গন্ধহীন মোরগঝুঁটি ফুল-রান্না,
কুকুর,
বাগান,
মোটর
গাড়ি,
রূপচর্চা
ইত্যাদি বিষয়ে সব চোখ ধাঁধানো প্রোডাক্শন।
কিন্তু ভাবনার কোঠায় জিরো।
এই
ধাপার মাঠে এক সুন্দর ফলবান গাছ - সতত ডানার মানুষ।
এই
বইটি বাংলা সাহিত্য বিষয়ে আমাদের ধারণা পাল্টে দেবে।
আপনার
বই বিষয়ে আপনাকে লিখলে আপনি হয়তো একটু বিব্রতই হবেন তাই এ বিষয়ে তিতিরকে
(কঙ্কাবতী) কোনো পত্রিকায় লিখতে বলেছি - জ্যোতি তো লিখছেই।
আবিদ
আজাদের চিঠি ও ফজল সাহাবুদ্দিনের চিঠি পেলাম দিন দুই আগে।
যুগলবন্দীর
বিষয়ে কতটা এগিয়েছেন?
আবিদকে
জানাবেন যে বিনয়ের সঙ্গে আমার লিখিত চুক্তি হয়ে গেছে- আপনার ব্যাপারটা করার
দায়িত্ব ওর।
আর
ফজল ও আবিদ ভাই এর যুগলবন্দীর কাজ আমি আমার তরফে করে ফেলেছি।
এবার
দরকার দু পক্ষের অর্থাৎ শিল্পতরু
ও
বদ্বীপের একটি চুক্তির।
ওঁদের
দুজনকেই পত্রপাঠ চিঠি লিখেছি।
যতক্ষণ বই না বেরম্নচ্ছে এই যুগলবন্দী বিষয়ে আলোচনা - আমাদের চারজনের (ফজল,
আপনি,
আবিদ
ও আমি) মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
এই
চিঠি প্রয়োজনে আপনি ওদের দুজনকে দেখাতে পারেন।
আপনার স্ত্রী
ও দুই পুত্রকে আমার শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাবেন।
ওঁর
chemistry (?) (evsjvq
এর
পরিভাষা রসায়ন?)
বইএর
কথা আমার মনে আছে।
তিতির
আমি ও আমাদের ছেলে (পুরব) সবাই ভালো।
প্রীত্যন্তে
কল্যাণ সরকার
পুনশ্চঃ
আমাকে
চিঠি লিখলে এই ঠিকানায় লিখবেন - কল্যাণ সরকার,
কবিতা
ভবন,
৩৬৪/১৯,
এন.
সি. সি. বোস রোড।
নাকতলা,
কলকাতা-৭০০০৪৭
লক্ষণীয়
যে, সব-ক'টি
চিঠিতেই উচ্চ প্রশংসা করা হয়েছে গ্রন্থটিকে নিয়ে।
আমি যতদূর জানি,
শেষ-পর্যন্ত
'সতত ডানার মানুষ'
সম্পর্কে লেখা হয়ে ওঠেনি
এঁদের কারও।
এ-নিয়ে সিকদারের মধ্যে একটা
অমোচনীয় কষ্ট ছিলো।
ছিলো
হাহাকারও;
যদিও এটা তাঁর কবি-ব্যক্তিত্বের
সঙ্গে একেবারে মানানসই নয়।
এটা শুধু কবি হিসেবে
সিকদার আমিনুল হকের নয়,
পাঠক হিসেবে আমাদেরও দুর্ভাগ্য বলতে হবে।
কারণ আলোচনাগুলো লেখা
হলে আমরা উপকৃত হতাম।
উপকৃত হতো আমাদের
সমালোচনা সাহিত্যও।
ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, 'সতত
ডানার মানুষ' নিঃসন্দেহে
অসাধারণ একটি কাব্যগ্রন্থ।
বাংলা কবিতার সেরা
সম্পদগুলোর সারিতে একে স্থান দেওয়া যায় বিনা দ্বিধায়।
এতে কবিসমগ্রকে একত্রে
পাওয়া যায়।
এখানে একাকার হয়ে গেছে জীবন ও
শিল্প।
জীবনবোধ ও শিল্পবোধের এমন
উচ্চমার্গের নান্দনিক একাত্মতা সহজে দেখা যায় না।
এ-নিয়ে আমার একটি দীর্ঘ
আলোচনা রয়েছে।
তাই এখানে তার পুনরাবৃত্তি
অনাবশ্যক মনে করি।
'শ্রষ্ঠ কবিতা'
(ফেব্রুয়ারী
২০০০) - এর ভূমিকায়
সিকদার লিখেছিলেন, 'আমার
কাজ কবিতা লেখা, শুধুই
কবিতা লেখা।
সৌভাগ্য একটাই,
আমার কলম এখনও থামেনি।
লেখাকে দৈব ব্যাপার বলেই
ছেড়ে দিয়েছি; ভালো লেখার
চেষ্টা থাকতে পারে -
কিন্তু সফলতা-অসফলতার হাতে কবিকে শেষ পর্যন্ত
নিঃশব্দে আত্মসমর্পণ করতে হয়।
এটা একান্তই আমার
অভিজ্ঞতা; অন্যদের ভিন্ন
ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকেও আমি মূল্য দিই।
সিকদার
আমিনুল হক মারা যান ২০০৩ সালের ১৭ মে।
মাত্র ৬১ বছর বয়সে।
বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু
যেখানে সত্তরের উপরে সেখানে একজন প্রকৃত কবির জন্য একে অকালমৃত্যু ছাড়া আর কীই বা
বলা যায়! মৃত্যুর আগের দিনও দেখা হয়েছে আমাদের।
ব্যাংকক থেকে ডাক্তার
দেখিয়ে মাত্র ফিরেছেন
তখন।
দ্বিতীয় দফা বাইপাস সার্জারীর
জন্যে
মুম্বাই
যাওয়ার কথা ভাবছিলেন।
বিষয়টি খুব জরুরী
হয়ে পড়েছিলো
তাঁর জন্যে।
বলছিলেন,
আর মাত্র পনেরটি বছর দরকার।
সেটুকু সময় নিশ্চয় পাবো'।
উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা
ছিলো
তাঁর।
সে-সঙ্গে আত্মজৈবনিক
ধরণের কিছু গদ্য রচনাও।
লিখছিলেন দু’হাতেই।
কিন্তু মৃত্যু এসে
মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছে তাঁর
স্বর্ণপ্রসূ।
৩.
তিনি
'কবিদের কবি'
কথাটি প্রথম উচ্চারিত
হয়েছিলো
তাঁর 'সতত
ডানার মানুষ'
কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের পরপরই।
কোনো ফরামায়েশি সমালোচক
নয়, বলেছিলেন খোদ কবিরাই।
আর কবিরাই-যে
কবিদের সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য বিচারক ও দ্রষ্টা,
গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া,
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেটি
প্রমাণিত সত্য।
কবি সিকদার আমিনুল হকের
ক্ষেত্রে, তাঁর সমকালের
ক্ষীণ-দৃষ্টি, চড়া-সুর ও
কূট-চারিত্র্য সত্ত্বেও,
তা আরও ব্যাপকভাবে প্রমাণিত হয়ে চলেছে।
প্রায়
সবদিক থেকে - কী জীবনে
কী কবিতায় - কবি সিকদার
আমিনুল হকের অবস্থান তাঁর সমকালের বিপরীত কেন্দ্রে ও শুদ্ধতায়।
চার দশকের প্রায়
অশিক্ষিত কোলাহল এবং প্রবলভাবে সুযোগ সন্ধানী একটি আবহের ভিতরে থেকেও বরাবরই তিনি
ছিলেন আশ্চর্য শান্ত
শিথিল ও নিরাসক্ত।
এ-অনুত্তেজিত,
অন্তর্মুখী ও অভিজাত
দৃষ্টিভঙ্গি যেমন তাঁকে,
তেমনি তাঁর কবিতাকেও দিয়েছে সমকালোত্তীর্ণ,
স্বতন্ত্র
ও মর্যাদাপূর্ণ এক
অবস্থান।
এ-অবস্থান
একদিকে যেমন অনন্যতার ঈর্ষণীয় মুকুটে অভিষিক্ত,
তেমনি ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার দ্বারা
পীড়িতও বটে।
কারণ দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়
ধরে ক্লান্তিহীন শিল্পসাধনার মধ্য দিয়ে যে-শুদ্ধতম কবিতার জগৎ তিনি নিজের জন্যে
ক্রমাগত নির্মাণ ও অধিকৃত করেছেন এবং চিরকালের যে-অক্ষয় আসনের দিকে তাঁর কবিতার
যাত্রা, তা কখনোই দর্শক
পরিবৃত নয়, মুখর নয়
সমকালের সঘন হাততালি ও জয়ধ্বনিতে।
তারপরও
খুব কম ক্ষেত্রেই,
প্রকৃত কবিরা সমকালের প্রতারক চারিত্র্য দ্বারা পরাস্ত
হন।
তাঁর প্রিয় কবি
হ্যেল্ডার্লিন, রিল্কে,
রাঁবো,
মালার্মে,
বোদলেয়ার,
ভেরলেন,
সাঁ জন পের্স ও হিমেনেথের মতো
তিনিও জনপ্রিয়,
পাঠক-নন্দিত ও প্রকাশক তাড়িত কবি নন;
বোধ করি হওয়াটা অভীষ্টও ছিলো
না তাঁর।
পদকে ও মানপত্রে
ভারাক্রান্ত
নয় তাঁর লেখার টেবিল।
পুরস্কৃত ও সংবর্ধিত
কবিদের মিছিল তাঁকে কখনোই চ্যুত করেনি তাঁর বিশ্বাস ও সাধনা থেকে।
এ-সবকে
শান্ত
উপেক্ষায় নিরাপদ দূরত্বে রেখে
অতি নিভৃতে তিনি অধিকার করে নিয়েছেন,
বাংলা কবিতার মূলধারায় নিজের
জন্যে একটি আসন;
কবিমাত্রের জন্যেই যা পরম আরাধ্য এবং সর্বাপেক্ষা জরুরী
বলে আমি মনে করি।
ফটৌ
পরিচিতিঃ
ঘরোয়া আড্ডাতে
বাঁ
দিক থেকে শামসুর রাহমান,
মারুফ
রায়হান,
মিনার মনসুর
ও
সিকদার আমিনুল হক
আপলৌডঃ ১৩ মে ২০০৯ |