|
ফিচার
গাফফার-সুনীল-মতিনঃ তিন
বরেণ্য বাঙালীর
সংবর্ধনায় লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব
শান্তনু মজুমদার
গত
২৬ এপ্রিল, রোববার লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে আবদুল
গাফফার চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও আবদুল মতিনকে। ছুটির দিনের সান্ধ্যকালীন
এ-আয়োজনটি উপভোগে পূর্ব-লন্ডনের ব্রিকলেইন সংলগ্ন ব্রাডী আর্টস সেন্টারে জড়ো
হয়েছিলেন শিল্প-সাহিত্য-সংষ্কৃতি ও রাজনীতি-সহ বিভিন্ন স্তরের বাঙালীরা। আবদুল
গাফফার চৌধুরী ও আবদুল মতিনকে ২০০৯ সালের স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করেছে বাংলাদেশ
সরকার।
নির্ধারিত সময়ে ঘন্টা দুয়েক পরে শুরু হওয়া
তিন বরেণ্য বাঙালীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের
শুরুতে মিলনায়তন ভর্তি দর্শকের উপস্থিতিতে তিন শিশু - কঙ্কা, তারিন ও রাফা -
পুষ্প-স্তবক তুলে দেন সংবর্ধিতদের হাতে। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আগুনের পরশমনি'
গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করে টুসি ব্যানার্জী। এরপরে স্বাগত বক্তব্য পাঠ করেন
আয়োজক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তার। তার বক্তব্যে আবদুল গাফফার
চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও আবদুল মতিনকে বিশ্ব-বাঙালীর 'বাতিঘর' হিসাবে আখ্যায়িত
করা হয়। এঁদের সৃষ্টিকর্মকে উপজীব্য করা হলে বাঙালীর ঐক্য ও বাঙালীর উত্থান নিশ্চিত
হবে বলেও উল্লেখ করেন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। স্বাগত বক্তব্যে
একুশে গানের রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরী, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও গবেষক আবদুল মতিনের জীবন-কর্ম-সহ ও রচনাবলীর বিবরণ পাঠকদের
উদ্দেশ্যে পড়ে শুনানো হয়।
তিন কৃতী
বাঙালীর সম্মানে লন্ডন
বাংলা প্রেস ক্লাবের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করা হয়েছিলো
ব্রিটেইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত
আল্লামা সিদ্দিকীকে। সংবর্ধিত
বরেণ্য-ত্রয় আবাসে-প্রবাসে বাঙালীর মানস-গঠন ও রুচি নির্মাণে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে উল্লেখ্য করেন রাষ্ট্রদূত। বক্তব্য শেষ করার
অল্প-সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান-স্থল ত্যাগ করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রাষ্ট্রদূত
আল্লাম সিদ্দিকী।
আয়োজক ও
প্রধান অতিথির ভাষণ-পর্ব শেষ হলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কেউ কথা রাখেনি' কবিতা
আবৃত্তি করেন মুনীরা পারভীন। আবদুল মতিনের 'কাস্তে' গল্প পাঠ করেন শাহীন
সালাউদ্দীন। আবদুল গাফফার চৌধুরীর 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানের সাথে নৃত্য
পরিবেশন করেন শাম্মী দাস। এছাড়াও শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি' কবিতা পাঠ করে
শোনান মুনীরা পারভীন।
বেশ
দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা-অন্তে দর্শক-শ্রোতার প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুরু হয় সংবর্ধিত
তিন কৃতী বাঙালীর বৃক্ততা-পর্ব।
বক্তব্যের সূচনাতে দর্শক সারিতে উপবিষ্ট চলতি বছরের অনন্যা সাহিত্য পুরষ্কারে ভূষিত
ব্রিটেইনবাসী সাহিত্যিক সালেহা চৌধুরীকে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন বিশিষ্ট
কলামিস্ট ও সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী। দর্শকরা হাততালির মাধ্যমে সালেহা
চৌধুরীকে অভিনন্দিত করেন। মূল বক্তব্যে আবদুল গাফফার চৌধুরী বাংলাদেশের
স্বাধীনতা-পদক-দানের ব্যাপারটি শুধুই বাংলাদেশের মানুষের জন্য সংরক্ষিত করে রাখার
ধারা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, একাত্তরে পৃথিবীর নানান স্থানের নানান
দেশের মানুষ নানানভাবে বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছেন, নিজের
জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন, এমনকি প্রাণ-দান করেছেন। এ-সব মানুষ-জনকে স্বাধীনতা
পদক দেয়া হলে স্বাধীনতা পদক আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত হয়ে উঠবে বলে
মত-প্রকাশ করেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনতা-বিরোধীদেরকে
স্বাধীনতা পদক দানের ঘটনার কড়া নিন্দা জানান তিনি।
আবদুল
গাফফার চৌধুরী তার বক্তব্যে জানান, সামনে একটি সময় আসবে যখন পশ্চিমবঙ্গের লেখকদেরকে
বাংলাদেশের পাঠকদের উপরে নির্ভর করে থাকতে হবে। কোনো-কোনো ক্ষেত্রে এখনই এ-ধরণের
প্রবণতা বেশ স্পষ্ট বলে মত দেন তিনি। আবদুল গাফফার চৌধুরী মনে করেন, বাংলা ভাষা,
হাজার বছরের পুরোনো লোকজ সংষ্কৃতি ও রবীন্দ্রনাথ, এ-তিন রক্ষা-কবচের কারণে তালেবানী
বা মৌলবাদীরা কখনও বাংলাদেশে সফল হতে পারবে না।
দর্শক-শ্রোতার করতালি-পূর্ণ ভাষণে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান
ব্যক্তিত্ব সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জানান স্বাধীন বাংলাদেশে নৈরাশ্যের কোনো স্থান থাকতে
পারে না। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ সব বাধা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাবে এবং
বিশ্ব-অঙ্গনে সম্মান আদায় করে নেবে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ভাষার ও
সংষ্কৃতির যোগাযোগ অটুট থাকার উপরেও গুরুত্ব দেন এ-শীর্ষ সাহিত্যিক।
২৫ কোটি
বাঙালীকে বিশাল এক শক্তি হিসাবে চিহ্নিত করার সাথে-সাথে বাংলা সাহিত্য প্রসঙ্গে
আবদুল গাফফার চৌধুরীর সাথে একমত পোষণ করে তিনি। বেশ কিছু দিনের পুরোনো অবস্থানের
পুনরুল্লেখ করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জানান, ভবিষ্যতে ঢাকা হবে বাংলা শিল্প-সাহিত্যের
রাজধানী। পশ্চিমবঙ্গে ইংরেজী ভাষার চাপে বাংলা ভাষার পিষ্ট হয়ে যাবার বাস্তবতা নিয়ে
আক্ষেপ প্রকাশের সাথে-সাথে ঘরের ভিতরে গল্প-গৌরব গাঁথা আর উপকথায় মধ্য দিয়ে
সন্তানের সাথে বাংলা চর্চা করার জন্য প্রবাসী অভিভাবকদের পরামর্শ দেন সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়।
শেষ
বক্তা হিসাবে ভাষণ দিতে এসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলা-কালে ব্রিটিশ শাসকদের
সিদ্ধান্তের দ্বারা সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে বাংলায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের প্রাণহানির দুঃসহ
দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন আবদুল মতিন। এছাড়াও উপনিবেশিক শাসনামলের শেষ বছরগুলোতে
বাঙালী সমাজ-ব্যবস্থার ভাঙ্গন ও নারী সমাজের দুরাবস্থা খণ্ড-চিত্র উপস্থাপন করেন
তিনি। মূলতঃ স্মৃতিচারণ-ধর্মী ভাষণটিতে পাকিস্তান আমলে নাচোলে তেভাগা আন্দোলনের
নেত্রী ইলা মিত্রের উপরে নির্মম পুলিসী অত্যাচার, তার লেখার উপরে রনেশ দাশগুপ্তের
মূল্যায়ন-সহ 'জেনেভাতে বঙ্গবন্ধু' গ্রন্থ লেখার বিভিন্ন দিক শ্রোতাদের সামনে তুলে
ধরেন আবদুল মতিন।
সংবর্ধিতদের বক্তব্য শেষে সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর-পর্বে অংশ নেন সাংবাদিক ইসহাক কাজল,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আশফাক হোসেন ও টাওয়ার হ্যামলেটসের মালবেরী স্কুলের
সাবেক শিক্ষক আনোয়ারা বেগম। সভার শেষ-প্রান্তে সমাপনী বক্তব্য দান-কালে লন্ডন বাংলা
প্রেসক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ বেলাল আহমদ জানান, বরেণ্য তিন বাঙালীকে সংবর্ধনা দিতে
পেরে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব গর্বিত। বাংলাকে জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষা হিসাবে
স্বীকৃতি-দানের উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারে
ব্রিটেইনের বাঙালীদের পক্ষ থেকে জোরালো
প্রচেষ্টার উপরে জোর দেন মোহাম্মদ বেলাল আহমদ। এছাড়াও ব্রিটেইনে বাংলা ভাষার
বিকাশের লক্ষ্যে ব্রিটিশ কারিকুলামে বাংলা
অন্তর্ভুক্তির দাবী তোলার উপরেও গুরত্ব দেন
তিনি।
সংবর্ধনা
অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন আবৃত্তিকার রুপা চক্রবর্তী। অনুষ্ঠান শেষে অভ্যাগতদের
রাতের খাবারে আপ্যায়িত করেন আয়োজকরা।
ফটৌঃ সাইফুল
ইসলাম মিঠু
আপলৌডঃ ১ মে
২০০৯
|