|
ফিচার
মন্দার বাজারে বাংলাদেশে মন্ত্রী-আমলা-চেয়ারম্যানদের জন্য
গাড়ী-বিলাস
মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান
একদিকে
অর্থনৈতিক মন্দা, নাগরিক সুবিধার হাজারো অনুপস্থিতি, কৃষক-শ্রমিকের বাঁচার লড়াই, আর
অন্যদিকে মন্ত্রী, সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান ও আমলাতন্ত্রের আরাম-আয়েশের জন্য
জনগণের টাকায় কেনা হচ্ছে বিলাসী গাড়ী।
দিন-বদলের নাম করে
ক্ষমতায় আসা মহাজোট-সরকারের শুরুটা হচ্ছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মধ্য দিয়ে।
সম্প্রতি সরকার মন্ত্রী,
সচিব, উপজেলা-চেয়ারম্যান ও উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের জন্য আট শতাধিক গাড়ী
কেনার প্রাথমিক কাজ শেষ করেছে।
সরকারী
যানবাহন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী-সচিবদের জন্য কেনা হচ্ছে ৯৯টি গাড়ী,
উপজেলা-চেয়ারম্যানদের জন্য ৪৭১টি গাড়ী এবং প্রাথমিকভাবে উপজেলার নির্বাহী
কর্মকর্তাদের জন্য ৯৮টি গাড়ী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে,
মন্ত্রীদের জন্য প্রতিটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সিডান ব্র্যান্ডের
গাড়ী এবং সচিবদের জন্য
প্রতিটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রটোন সাগা ব্র্যান্ডের গাড়ী কেনার জন্য ইতোমধ্যে গত ১
এপ্রিল যানবাহন অধিদপ্তর দরপত্র আহবান করেছে।
তবে উপজেলা-চেয়ারম্যান
আর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা পাবেন ৩৪ লাখ টাকার মূল্যের পাজেরো গাড়ী।
আর এ-সব গাড়ী ক্রয় করতে
সরকারের খরচ হবে ২০৩ কোটি ১ লাখ টাকা।
সরকারের
যানবাহন অধিদপ্তরের পরিচালক তপন কুমার সরকার ইউকেবেঙ্গলিকে জানান, মন্ত্রী ও
সচিবদের গাড়ীগুলো পুরনো হয়ে যাওয়ার কারণে নতুন গাড়ী কেনা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।
সর্বশেষ যানবাহন
অধিদপ্তর গাড়ী ক্রয় করেছিল ২০০৪ সালে।
সে-সময় ২৩টি ভৌলভো কেনা
হয়েছিল।
ভলভো গাড়িগুলোর বর্তমান অবস্থা
জানতে চাইলে তিনি অবশ্য কোনো কিছু বলতে রাজী হননি।
ঔপনিবেশিক আমলে করা নিয়ম অনুযায়ী চলছে সরকারের যানবাহন অধিদপ্তর।
সরকারী নিয়মে প্রতিটি
গাড়ির আয়ষ্কাল ধরা হয় ৮ বছর।
৮ বছর পার হবার পর
এ-গাড়িগুলো নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নিলামে উঠানো হয়।
ইউকেবেঙ্গলির
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত সব সরকারের আমলেই একাধিকবার মন্ত্রী-সচিবদের জন্য
বিলাসবহুল গাড়ী কেনা হয়েছে।
গাড়ী কেনাকে কেন্দ্র করে
কোটি-কোটি টাকার ঘুষ-দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চার-দলীয় ঐক্যজোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বিএনপি নেতা এম
মোর্শেদ খানের পুত্র মিতসুবিশি বাংলাদেশের এাজেন্ট।
ব্যবসায়ী পুত্রকে বিশেষ
সুবিধা দেয়ার জন্য রাব
ও পুলিসের জন্য প্রায় চারশো দামী গাড়ী সে-সময় ক্রয় করা হয় বলে অভিযোগ আছে।
এখন দেখা যাচ্ছে, আগের
পথেই হাঁটছে আওয়ামী লীগ সরকার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যে-সব ব্র্যান্ড-নিউ গাড়ী কেনা হচ্ছে, তা ১৫ বছরের অধিক
চালানো সম্ভব।
বিগত সরকারের সময়ে কেনা ভৌলভো
গাড়ীগুলো মাত্র ৪ বছরে কোনোভাবেই নষ্ট হতে পারে না।
মন্ত্রী,
এমপি ও উপজেলা-চেয়ারম্যানদের জন্য গাড়ী কেনার প্রস্তাব প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল
মাল আব্দুল মুহিত ইউকেবেঙ্গলির প্রতিবেদককে বলেন, 'অযথা এ-বিষয়টি নিয়ে বেশি আলোচনা
হচ্ছে।
অনেকে ভাবছেন, প্রয়োজন নেই
তারপরও সরকার গাড়ী কেনার উদ্যোগ নিয়েছে।
কিন্তু এ-ভাবনা মোটেই
ঠিক নয়।
খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বলেই
গাড়ী কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।'
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, 'দীর্ঘ-দিন পর একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে উপজেলা
চেয়ারম্যানরা নির্বাচিত হয়েছেন।
তারা দেশের উন্নয়নের
জন্য কাজ করবেন বলে শপথ নিয়েছেন।
এমনও অনেক উপজেলা আছে
১০/১৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত।
কিন্তু একজন উপজেলা
চেয়ারম্যানের যদি একটি গাড়ি না থাকে, তাহলে তিনি তার নির্বাচনী এলাকা ঘুরবেন কী
করে? সমস্যা চিহ্নিত করবেন কীভাবে? একজন জনপ্রতিনিধি বিশাল নির্বাচনী এলাকা পায়ে
হেঁটে মানুষের সমস্যার কথা শুনবেন, এটা আশা করা মোটেই সমীচিন নয়।'
আবুল মুহিত বলেন,
'বর্তমান
সরকার উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।
সে-সব প্রতিশ্রুতি
বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের সমস্ত প্রশাসনকে তড়িৎ গতিতে কাজ করতে হবে।
পরিবহণ সমস্যার কারণে
প্রশাসনের কাজ ব্যহত হবে, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।'
সাবেক
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ডঃ আকবর আলি খান ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন, 'বিশ্ব
মন্দার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকারের উচিত কৃচ্ছ্রতা সাধন করা।
সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয়
যথাসম্ভব কমিয়ে আনা উচিত।
মন্ত্রী-এমপিদের জন্য
গাড়ী কেনার বিষয়টি যদি এখন খুব প্রয়োজন না হয়, তাহলে তা আপাততঃ বন্ধ রাখা যেতে পারে।
পরিস্থিতির উন্নতি হলে
তখন কেনা যেতে পারে।'
এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ী
কেনার সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করে সাবেক অর্থ সচিব বলেন, 'এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ী
কেনার সুযোগ দিয়ে দুর্নীতিকে উস্কে দেওয়া হয়।
অনেক এমপির নামে
বিলাসবহুল দামী গাড়ী আমদানি হয় ঠিকই,
কিন্তু সে-গাড়ি চালায়
বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা।
তবে এজন্য এমপি সাহেব
অবশ্য মোটা অঙ্কের টাকা পান।
সরকার রাজস্ব থেকে
বঞ্চিত হয়।
এ-ধরণের অনৈতিক কাজ অবশ্যই বন্ধ
হওয়া উচিত।'
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র সাগর আহম্মদ ইউকেবেঙ্গলিকে
বলেন, দেশে ভয়াবহ বেকারত্ব, নতুন কোনো শিল্প-কলকারখানা হচ্ছে না।
দিন-দিন যখন বন্ধ হচ্ছে
দেশীয় শিল্প তখন আমাদের দেশের মন্ত্রী-সচিবদের জন্য গাড়ি কেনা হলো মানুষের সঙ্গে
বিশ্বাসঘাতকতা।'
তিনি আরও বলেন, 'ভারতের দিকে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন, ওরা কিন্তু পুরনো জীর্ণ
গাড়ি দিয়েই কাজ চালান।
আমরা কি ওদের চেয়ে ধনী?'
সাগর আহম্মদের বক্তব্যের রেশ ধরেই শাহবাগের চা বিক্রেতা মনির বলেন, 'এটা অনেক খারাপ
হবে।
তাদের উচিত ছিলো দেশের মানুষদের
আগে ভালো করা।'
ঢাকা থেকে
আবদুর রহিম হারমাছি
আপলৌডঃ ১৬
এপ্রিল
|