London:

Home

About us

Contact

Archive

সম্পাদকীয়

কলাম

সাক্ষাতকার

সাময়িকী

ঘুরে দেখি লন্ডন

পাঠকের কলম

কী-কখন-কোথায়

পত্র-পত্রিকা

 রেডিও

টেলিভিশন

ফটো-গ্যালারী

ফিচার

ইউকেবেঙ্গলির দেখায় ইউএস বাঙালীঃ ওয়াশিংটন মেট্রৌ ও নিউ ইয়র্ক

শান্তনু মজুমদার

ফেব্রুয়ারীর শেষ আর মার্চের প্রথম সপ্তাহটিতে ওয়াশিংটন মেট্রৌ আর নিউইয়র্ক শহরে বেশ কিছু বাঙালীর সাথে ইউকেবেঙ্গলির হয়ে আলাপচারিতার সুযোগ হয়েছিলো শান্তনু মজুমদারের যাদের সাথে আলাপ হয়েছে পেশাগত দিক থেকে তাদের কেউ ক্ষুদে চাকুরে, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ ওয়াইট কলার প্রফেশনাল কবি, গদ্যকার, আবৃত্তিকার, চলচ্চিত্র-নির্মাতা, সংস্কৃতি-কর্মী ও সংগঠক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ইয়েলো ক্যাবের ড্রাইভার আর গৃহবধুর সাথেও হয়েছে দফায়-দফায় আলাপ কথা হয়েছে শিক্ষার্থী আর শিক্ষার্থী হিসাবে এসে শিক্ষা-জীবন শেষ করতে না পারা লোকেদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আবাস তৈরী করা নানা মতের নানা ভাবনার বাঙালীর সাথে আলাপের ভিত্তিতে লেখা ইউকেবেঙ্গলির ঘুরে দেখায় ইউএস বাঙালীঃ ওয়াশিংটন মেট্রৌ ও নিউ ইয়র্ক  শীর্ষক প্রতিবেদ পড়ুন নিচে

একঃ ওয়াশিংটনে বাঙালী

ওয়াশিংটন ডিসি থেকে কিছু দূরে মেরিল্যান্ডের নিটোল এক শহরতলীতে ভয়েস অফ আমেরিকার শামীম চৌধুরীর ছবির মতো সুন্দর বাড়ীতে মার্চের প্রথম দিনটিতে জড়ো হয়েছিলেন জনা বিশেক বাঙালী সে-দিন রোববার ছিলো ভয়ানক ঠাণ্ডা ছিলো ছুটির দিনে ঘরের ভিতরে আটকে থাকার চেয়ে, বাঙালীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ আড্ডায় যোগ দেয়াটাকে শ্রেয় জ্ঞান করেছেন বিভিন্ন বয়েসের এ-সব বাঙালী - বুঝতে অসুবিধা হয় না বাঙালীর আড্ডা দীর্ঘজীবী হোক, পুষ্পে-পত্রে-বর্ণে-গন্ধে আরও বিকশিত হোক সে-দিন আড্ডার আবহে কতগুলো সিরিয়াস বিষয়ে খোলামেলা মত দিয়েছেন স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ওয়াশিংটন ডিসি, মেরিল্যান্ড ও ভার্জিনিয়ার কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত ওয়াশিংটন মেট্রৌর বাঙালীরা বাঙালী বলতে বাংলাদেশের বাঙালী পশ্চিমবঙ্গের একজন মাত্র বাঙালী ছিলেন দুই বাংলার মধ্যেকার প্রায় 'জল অচল' পরিস্থিতির এই চিত্র অবশ্য দেখা যায় প্রায়-সর্বত্র

এলিট আর নন-এলিট ও দলা-দলি

বাংলাদেশের বাঙালীদের নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা শুরু করে সৈয়দ মোহাম্মদ শামীম ইকবাল জানান, ওয়াশিংটন মেট্রৌ এলাকাতে বাংলাদেশের মানুষদের অনেকগুলো সংগঠন আছেশুনা যায় এ-সব সংগঠনের নেতৃত্ব আর পরিচালনা নিয়ে বেশ একটা দলা-দলির দেশী-আবহ বিরাজ করে প্রায়ইদলা-দলিতে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে কেউ-কেউ আবার এ-সব থেকে দূরে সরে থাকেনএ-ধরণের তথ্য উল্লেখিত হতেই নিজেদের উদাহরণ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের আশি বছরের প্রাণোচ্ছ্বল 'তরুণ' অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য জানালেন মজার এক তথ্য তিনি যখন এসেছিলেন, তখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা বাঙালীদের মধ্যে পিকনিকে যেয়ে বিয়ার খাওয়া আর বিয়ায় না-খাওয়ার খরচের মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়েও দলা-দলি হতে দেখা যেতো! যারা বিয়ার খেতেন না, তাদের ভাষ্যঃ আমাদেরকে কেনো বিয়ার-খাওয়া লোকেদের সমান চাঁদা দিতে হবে? অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্যের ধারণা এ-সবের মূলে ছিলো অভাবঅবস্থা ফিরে গেলে দলা-দলি থাকবে না বলেও তার আশাবাদ

তবে ওয়াশিংটনে আলাপ হওয়া একাধিক বাঙালী মনে করেন, শুধু অর্থনৈতিক কারণ দিয়ে প্রবাসে বাঙালীদের দলা-দলির ব্যাপারটি পুরো ব্যাখ্যা করা যাবে না কেউ-কেউ সংগঠন নিয়ে দলা-দলির বাইরে প্রবাসীদের মধ্যে এলিট ও নন-এলিট বিভাজনটিকে গুরুত্ব দিতে চান ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসার ঝাড়া দশ বছরের মাথায় প্রথমবারের মতো দেশে যাওয়া শামীম ইকবালের মতে, ‘প্রফেশনাল’ বাঙালীদের অনেকে এলিট মানসিকতা থেকে নিজেদেরকে বাকীদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখেনএই বাকীরা কারা? জানতে পারি, এরা হচ্ছেন সাম্প্রতিক বছরগুলো লটারী ভিসাতে যুক্তরাষ্ট্রে পা দেয়া মানুষ-জন লটারী ভিসাতে আসা লোকজনের একটি অংশ আবার যোগত্যা থাকুক বা না থাকুক, নেতা হয়ে ওঠার মরীয়া প্রচেষ্টাতে সংগঠন করতে শুরু করেন বলেন তথ্য পাওয়া গেলো তবে দুয়েকজন এটাও জানালেন যে, লটারী ভিসাতে আসা মানুষ-জনের মধ্যে বিদগ্ধ মানুষের সংখ্যা কম নয় এর বাইরে বাঙালীদের মধ্যে আছেন পড়ালেখা করতে আসা শিক্ষার্থীরা

শামীম ইকবালের মতের সাথে কড়া অমিল থাকা মানুষের সাথেও কথা বলার সুযোগ হয়েছেএকাধারে আইটি ও রিয়েল এস্টেইট ব্যবসার সাথে সফলভাবে জড়িয়ে থাকা কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানালেন, পুরো ব্যাপারটির মধ্যে এলিট আর নন-এলিট বিভাজন খোঁজাটা মানে-হীন বাংলাদেশ ছেড়ে একত্রিশ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বসবাসকারী এ-বাঙালী মনে করেন, কে কার সঙ্গে মিশবে বা মিশবে না, তা নির্ভর করে ‘শেয়ারড ভ্যালুস' বা ‘ শেয়ারড ইন্টারেস্ট’ এর উপরে; এখানে এলিটিজমের কিছু নেই হবে হয়তো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের ট্যাক্সি-স্ট্যান্ডে যাত্রীর আশায় অপেক্ষমান তরুণ বাঙালী কিংবা জ্যাকসন হাইটের রাস্তায় দেখা পাওয়া 'অড জব' করা প্রৌঢ় বাঙালীর কাছ থেকে অবশ্য শামীম ইকবালের মতেরই প্রতিধ্বনি শুনা গেছে

বাঙালীত্ব-আমেরিকানত্ব আর নতুন প্রজন্ম

এলিট আর নন-এলিট নিয়ে যাই হোক, বাঙালীত্ব আর আমেরিকানত্ব নিয়ে ওয়াশিংটনের আড্ডার বাঙালীদের মধ্যে কিন্তু তেমন কোনো ভেদ লক্ষ্য করা যায়নি এরা জানালেন, বাঙালীত্ব বা বাঙালী সংস্কৃতি নিয়ে নতুন প্রজন্মের উপরে তেমন কোনো চাপা-চাপি নেই এখানে

পয়লা মার্চের আড্ডায় আলোচনার অনানুষ্ঠানিক সূত্রপাতটি অবশ্য ঘটিয়েছিলেন অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য অন্য কোনো কারণে নয়, নিজের হাতে বানানো দুই-ভাণ্ড মিষ্টি নিয়ে সব্বার আগে এসে হাজির হবার কারণে তার সাথেই দেখা হয়ে যাওয়া আর কথা শুরু হয়ে যাবার ব্যাপারটি আগে-আগে ঘটে যায় গোটা তিনেক ঔপেন সার্জারীকে বুড়ো আঙ্গুলটি দেখানো পেশায় প্রকৌশলী মানুষটি সেই ১৯৬৯ সালে ইমিগ্রেশন নিয়ে সস্ত্রীক মার্কিন মুল্লুকে আসেনতখন থেকে আছেন; জানালেন ভালো আছেনতার স্ত্রী অধ্যাপনার সাথে যুক্তএদের দু-মেয়ে বাংলা জানেনঅনিরুদ্ধ ভট্টাচার্যরা কখনও বাংলা শিখানো কিংবা বাঙালী সংস্কৃতির নামে সন্তানদের উপরে চাপ দেননি। কন্যারা যেটুকু নিয়েছে, তাতেই খুশী কন্যারা এক সময় ভারতীয় নাচের শিক্ষা নিতো বলেও জানালেন সবে মিলে বড়ো করে যখন আড্ডাটি শুরু হয়, তখনও দেখেছি সন্তান-সন্ততির ব্যাপারে এ-ভাবটিই ওয়াশিংটনের বাঙালীদের মূলভাব

‘মেইন স্ট্রীম’ হওয়ার ব্যাপারটিকে একান্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মানেন সবাই এরা আমেরিকান হিসাবে নিজেদের স্বচ্ছন্দই বোধ করেন বলে মনে হয় প্রায় তিন দশক লন্ডনে কাটানোর পরে গত প্রায় অর্ধ-যুগ কর্ম-উপলক্ষ্যে ওয়াশিংটনে বাসকারী শামীম চৌধুরীর মতে, ব্রিটেইনে বাঙালীদের প্রথম প্রজন্ম ব্রিটেইনে কখনও নিজের দেশ মনে করতে পারেনি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রজন্মের বাঙালীদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের দেশ ভাবতে পারছে প্রত্যক্ষ বর্ণবাদের অনুপস্থিতি, ইউরৌপের তুলনায় পরিবার-প্রথার শক্ত উপস্থিতি, সাধারণ মানুষ-জনের মধ্যে বন্ধু-সুলভ 'হাই-হ্যালো' সংস্কৃতির উপস্থিতির মতো ব্যাপারগুলো এক্ষেত্রে বাঙালীদের জন্য সহায়ক হয় বলে মানেন তিনি তবে ভিন্ন-জাতের ভিন্ন বর্ণের মানুষ-জনকে আপন করে দেখতে না পারা এমনকি নিজেদের মধ্যে তাদের ব্যাপারে অপমানসূচক শব্দ বা উক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাঙালীদের কারও-কারও মধ্যে বেশ আগ্রহ থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে ওয়াশিংটনের এক বাঙালীর মুখ থেকেই কেউ-কেউ জানালেন, বাঙালীত্ব কোনো জোরাজুরির বিষয় নয়, বরং সন্তানের মনে মূল্যবোধ প্রবিষ্ট করানোটাই জরুরী এ-পর্যন্ত মোটাদাগে সহমত থাকলেও এর পরে ফারাক আছে যেমন, ত্রিশের ঘর না পেরুনো ফারুক পাটোয়ারীর কাছে মার্কিন সংস্কৃতির পরিচয় হচ্ছে পর্নৌগ্রাফী, যৌনতা আর বিবাহ-বিচ্ছেদের মতো ব্যাপারগুলো এসবের তুলনায় বাঙালী সংস্কৃতিকে উচ্চে স্থান দিতে চান ফারুক নব্বুইয়ের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন এমন একজন পূর্বা মাসুমের পক্ষ থেকে আসে ফারুক পাটোয়ারীর বক্তব্যের বিরোধিতা তিনি জানান পর্নৌগ্রাফী, যৌনতা আর বিবাহ-বিচ্ছেদের মতো বিষয়গুলো দিয়ে দেখলে মূলধারার মানুষদের সংস্কৃতির খণ্ড-চিত্র পাওয়া যায় তিনি মনে করেন, শ্বেতাঙ্গ মানুষদের মধ্যে অত্যন্ত উন্নত মূল্যবোধের উপস্থিতি সহজেই চোখে পড়ার মতো

নতুন প্রজন্মের সাথে সম্পর্কের ধরণ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে কথা শুরু হলে একজন আলাপকারী জানান, বাচ্চারা দিনে চৌদ্দ ঘন্টা 'আমেরিকান কালচারে' কাটালেও তাদেরকে শেষ পর্যন্ত অভিভাবকদের কথা শুনতেই হবে আরেক জনের মতে, মার্কিন সংস্কৃতির নামে সন্তানের ডেইটিং, গার্লফ্রেন্ড কিংবা বিবাহ-পূর্ব যৌনতা কোনোভাবেই মেনে নেয়া সম্ভব নয় এ-সব ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধি-বিধানের জোরালো প্রয়োগের পক্ষে মত দেন কেউ-কেউ এ-সব ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণকারীরা জানান, এ-ধরণের চেষ্টার ফল ভালো হবে না সন্তানের উপর প্রয়োজন-মাফিক মনিটরিংয়ে মাধ্যমে বরং ভালো ফল পাওয়া যাবার সম্ভাবনার কথাও শুনতে পাওয়া গেলো মার্কিনীদের পরিবার-প্রথা বা একুশ বছরের কম বয়েসীদের এলকৌহল কিনতে না পারার আইনের মতো কিছু ব্যাপার বাঙালী অভিভাবকদের কিছুটা স্বস্তি দেয় বলেও জানা যায় ধর্মকে শুধু শাস্ত্রের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্ম সংক্রান্ত বোধের সঞ্চার করাটাকেও প্রয়োজনীয় মনে করেন কেউ-কেউ আবার একটি অংশ এও মনে করেন যে, সন্তান যখন প্রাপ্ত-বয়স্ক হবে, তখন ধর্ম-বিষয়ক যে-কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার সন্তানের হাতে থাকাটাই শ্রেয়

বাংলাদেশ ও বাঙালী সংস্কৃতি প্রসঙ্গে

বাংলাদেশ ভাবনা নিয়ে আলাপের সময়েও ওয়াশিংটনের বাঙালীদের কাছে থেকে শুনতে পাওয়া গেছে আকর্ষণীয় বক্তব্য এদের অনেকে মধ্যে এ-ধারণা দৃঢ় যে, বাংলাদেশকে বিশ্ব-পর্যায়ে পাল্লা দিতে হলে ইংরেজী শিক্ষাকে জোরেশোরে গুরুত্ব দিতেই হবে তবে দ্বিমত ছিলো এ-ব্যাপারেও চীনা বা জাপানীরা-যে নিজেদের ভাষাতেই জ্ঞান-চর্চা করে বিশ্ব-পর্যায়ে পাল্লা দিচ্ছে, সে-তথ্যটি তখনই নতুন করে শুনতে পাওয়া গেলো এমনকি একাধিক ব্যক্তি মনে করেন, একবিংশ শতাব্দীর উদীয়মান দু-পরাশক্তি চীন ও ভারতের কথা মাথায় রেখে ম্যান্ডারিন এমনকি হিন্দী শিক্ষার দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার মাতৃভাষার ভিত্তিতে শিক্ষালাভের গুরুত্বের বিষয়টি অবশ্য কেনো যেনো গুরুত্ব পায়নি আলাপে

বাংলাদেশের ইমেজ নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করেন ওয়াশিংটনের বাঙালী শুনতে পাওয়া গেলো এ-তথ্য যে, বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকানদের মধ্যে ক্রমশঃ আগ্রহ বাড়ছে বাংলাদেশ শুধুই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দেশ হিসাবে পরিচিত হোক, এটা ওয়াশিংটনের বাঙালীর মোটেই কাম্য নয়তারা চান, একটি ইতিবাচক ইমেজ, যা কি-না নতুন প্রজন্মের কাছেও বাংলাদেশকে করে তুলবে আকর্ষণীয় জানা যায়, ওয়াশিংটনে এখন বাঙালী সংস্কৃতির খুব ভালো চর্চা হচ্ছে বাঙালীর সংখ্যা বেড়ে যাবার সাথে-সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলো পালনের ব্যাপ্তিও বেড়েছে রবীন্দ্র সঙ্গীতের রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা থেকে শুরু করে ব্যান্ড-গানের আইয়ুব বাচ্চু সবাই এখন অনুষ্ঠান করতে ওয়াশিংটনে আসেন তবে নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালী সংস্কৃতি ঠিক কতোটা আদৃত হবে, সে-ব্যাপারে সবার মধ্যেই স্বাভাবিক প্রশ্ন আছে কেউ-কেউ মনে করেন, এখন সারা দুনিয়াতে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে ‘ব্লেন্ডিং’ চলছে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বাঙালী সংস্কৃতিতে তার স্পষ্ট উপস্থিতি থাকবে বাঙালী সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে দু-পার বাংলার বাঙালীর মধ্যে সে-অর্থে কোনো যোগাযোগ নেই ওয়াশিংটনে

ক্যাবল টিভি আর ইন্টারনেটের বদৌলতে বাংলাদেশের সর্বশেষ খবরটুকু চব্বিশ ঘন্টাই এখন থাকছে অন্যান্য জায়গার বাঙালীর মতো ওয়াশিংটনের অনেক বাঙালীরও নখ-দর্পণে তথ্য-প্রযুক্তির বদৌলতে আপ-টু-ডেইট থাকা ওয়াশিংটনের বাঙালীরা, বাংলাদেশ বিষয়ক প্রত্যেকটি ইস্যুতেই নিজস্ব একটি মত দেয়ার মতো অবস্থানে আছেন। স্বল্প সময়ে বিভিন্ন জায়গায় বসে কথাবার্তাতে এ-রকমই মনে হয়েছে দু-একবার মনে হয়েছিলো, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, নীতি-নির্ধারক বা রাজনীতিকদের করণীয়-বর্জনীয় প্রসঙ্গে দুয়েকজনের বক্তব্য বুঝি অতি-মাত্রায় কঠোর তবে বক্তার শব্দ-চয়ণ বা বাচন-ভঙ্গী ঠিকঠাকভাবে বুঝার ক্ষেত্রে এ-প্রতিবেদন লিখিয়ের সীমাবদ্ধতার কারণেও এমনটি মনে হতে পারে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের উপরে চাপ তৈরী করার ব্যাপারটিকেও প্রয়োজনীয় মনে করেন অনেকে ভার্জিনিয়াতে এক বাড়ীর ড্রইং রুমে দেখা গেলো বাংলা ইংরেজীতে লেখা বাংলাদেশ বিষয়ক নানান দাবী-দাওয়া সম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড এগুলো নিয়ে নানা সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নানান ডিপার্টমেন্টের সামনে দাঁড়িয়েছেন বাঙালীরা এছাড়াও ড্রইংরুমটিতে প্রদর্শন করা আছে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধানতম সংগঠক তাজউদ্দীন আহমেদের দুর্লভ আলোকচিত্র, তাঁকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র আর প্রকাশিত লেখালেখির সম্ভার

মন্দার দিনগুলো

পয়লা মার্চের আড্ডার বাইরেও যে-ক'জন বাঙালীর সাথে আলাপ হয়েছে, তাদের মোটাদাগের ধারণা ওয়াশিংটনের বাঙালীরা বেশ ভালো আছেনগত কয়েক বছর বিভিন্ন জায়গায় কাজ-কর্ম করার অভিজ্ঞতা-সম্পন্ন এক বাঙালী জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাঙালীরা সুনামের সাথে কাজ-কর্ম করছেন এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ-জনের কাছ থেকে সম্মান কুড়িয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছেন বাঙালীরা সকলে বিলাস-বহুল জীবন-যাপন না করলেও স্বচ্ছল জীবন-যাপন করছেন বলে জানিয়েছেন কয়েক-জনঅর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব নিয়েও খুব একটা ভাবনার কিছু নেই বলে জানালেন এমএম করিম আহমদ তার কথা হচ্ছে, মন্দার ফলে ক্রেডিট কার্ড পাঞ্চ করে একবারে পাঁচশো ডলারের বিলাস-দ্রব্য কিনে নিয়ে আসার প্রবণতা যাদের মধ্যে ছিলো, তারা হয়তো একটু চাপ বোধ করছেনকিন্তু স্বাভাবিক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত লোকেদের মধ্যে মন্দার তেমন কোনো প্রকোপ পড়েছে বলেও মনে করছেন না তিনি

তবে মন্দা বিষয়ে শামীম চৌধুরীর ভাবনা ভিন্ন তার মতে, বাঙালীদের উপরে মন্দার প্রভাব বেশ ভালোভাবেই পড়তে শুরু করেছে বিশেষ করে স্থায়ী চাকুরীতে না থাকা বা ক্ষুদে চাকুরী করে জীবন চালানো লোকেদের জীবন এখন বলতে গেলে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে মন্দার প্রকোপ সইতে না পেরে শামীম চৌধুরীর জানাশোনার মধ্যেই কয়েকজন মানুষ বাংলাদেশে ফিরে গেছেন আর পরিস্থিতির সহসা উন্নতি দেখা না গেলে, ফিরে যাবার কথা ভাবছেন কেউ-কেউ তিনি আর ও রেস্টুরেন্ট, ফ্যাক্টরীতে কাজ-কর্ম করা লোকজন, কিংবা দু-বেলা দু-জায়গায় ক্ষুদে-কাজ করা লোকেরা আছেন সবচেয়ে বিপদে এসব জায়গাতে আসলে ছাঁটাইয়ের মা-বাপ নেই সকালের কাজ চলে গেলে শুধু বিকেলের কাজ দিয়ে সব দিক সামাল দেয়া সত্যিই মুশকিলের কিংবা বিকেলেরটি চলে গেলে সকাল দিয়েআর যারা শুধু একটাই কাজ করেন, তাদের বিপদের কথাতো বলাই-বাহুল্য মন্দার আঘাতে বেশ বড়ো ধরণের হেনস্তার মধ্যে আছেন কোনো-কোনো বাড়ী-মালিক এমনকি আগের বাজার দামের চেয়ে অনেক কম দামে বাড়ী বেচে দিতে চেয়েও ক্রেতা না পেয়ে নিরাশ হয়ে দিন বদলের দিন গুনতে থাকা বাঙালীর দেখাও পাওয়া গেছে ওয়াশিংটনে

কেনো বারাক ওবামা?

পয়লা মার্চের আলাপচারিতার সবশেষ আইটেম ছিলো বারাক ওবামা এর আগে অবশ্য বাঙালীয়ানাতে ভরপুর মধ্যাহ্ন ভোজ আর আবৃত্তির মতো পর্বগুলো ছিলো

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত সাব্বির মিয়ার মতে, বারাক ওবামা হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি ওয়াইট হাউসে আসার পর থেকে ডুবন্ত অর্থনীতি বাঁচানোর লক্ষ্যে ওবামা যে-সব পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তার ফলে 'কর্ম-সংস্কৃতির' প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে বলেও মনে করেন তিনি তবে খরচার দিক থেকে সাধারণ মানুষ-জনের জন্য দুর্বিষহ হয়ে ওঠা সরকারী স্বাস্থ্য- ব্যবস্থার সংস্কারের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ওবামা যতো আগ্রহই দেখান না কেনো, তা বাস্তবায়ন করাটা এত সহজ হবে না বলেই অনেকের ধারণা কেনো-না, সংষ্কার করতে গেলে ইন্স্যুরেন্স কৌম্পানী, ডাক্তার আর ওষুধ-কোম্পানীগুলোর কায়েমী স্বার্থে আঘাত লাগবে ওবামা পারবেন কি তাদের পাল্টা-আঘাত সইতে? ওয়াশিংটনের বাঙালীর মধ্যে ওবামার জন্য মায়া আর উৎকন্ঠা

কেনো ওবামাকে ভালোবাসেন? ভালো কি আর এমনি-এমনি বাসেন! ওয়াশিংটন বাঙালীদের কারও মনে হয়, ওবামা হচ্ছেন আসলে একটা প্রতীক ওবামাকে দেখে হদ্দ-গরীব দেশ থেকে আসা একজন অভিবাসীও আজ স্বপ্নের জাল বুনতে পারেন; ভাবতে পারেন একদিন তার সন্তানও হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেণ্ট স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হোক, স্বপ্ন দেখার সুযোগটুকু এনে দিয়েছেন ওবামা ওয়াশিংটনের বাঙালীদের সাথে আলাপে বসার সুযোগ পাবার আগে-আগে একটি কনফারেন্স উপলক্ষ্যে কানেকটিকট বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়ো হওয়া বেশ কিছু লোকজনের সাথে-সাথে চায়ের ফাঁকে-ফাঁকে আলাপ হয়েছিলো ওবামা প্রসঙ্গে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতো বটেই, এর বাইরে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ইউরৌপ আর কানাডার নানান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আসা লোকেদের সাথে ওবামা বিষয়ক টুকরো আলাপে পাওয়া গেছে ওয়াশিংটনের বাঙালীর মতোন ভাবনাযুক্তরাষ্ট্রের বর্ণগত-জাতিগত সংখ্যালঘু আর আয়-স্তরের নিচের দিকের মানুষগুলোর মধ্যে আশার একটা আলো জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন ওবামা, এটাই মোটাদাগে ভাবছেন সকলে এছাড়াও উদারনীতিবাদী মার্কিনীদের কাছে বারাক ওবামা হচ্ছেন জর্জ বুশের অপশাসন আর বিশ্ব-অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক ইমেজ থেকে উত্তরিত হবার সোপান ওয়াশিংটনের বাঙালীর ওবামা-ভাবনাও অনুরূপ এরা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট পদটির ব্যাপারে জনমনের যে-আস্থা নষ্ট করে দিয়েছিলেন জর্জ বুশ, ওবামার আমলে সে-আস্থা আবার ফিরে আসবে ওবামার আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মুসলিম দেশগুলোর সম্পর্ক উন্নত হবার ব্যাপারেও আশাবাদী ওয়াশিংটনের বাঙালী ওবামা-বিষয়ক ভাবনায় বাড়াবাড়ি আছে কি-না, তা অবশ্য বলে দেবে সময়

ওয়াশিংটনের বাঙালীদের সাথে আলাপে এটাই মনে হয়েছে, এদের বেশির ভাগই নিজেদের বৃত্তের মধ্যে সিঁটিয়ে থাকা জুবুথুবু এশিয়ান ইমিগ্র্যান্টের ভাবমূর্তিতে আবদ্ধ হয়ে নেই বাঙালীত্বের নামে বৃত্ত-বন্দী হয়ে থাকার মানসিকতা থেকে এদের অনেকেই মুক্ত হয়েছেন আলোচ্য আড্ডাটির বাইরেও বিশ্বের প্রধান শক্তিমান দেশের রাজধানী ও আশেপাশের স্থানগুলোর যে-কয়জন বাঙালীর সাথে সীমিত সময়ের মধ্যে কথা বলার সুযোগ হয়েছে, তাদের মধ্যেও দেখা গেছে আত্ম-বিশ্বাসের একটা ছোঁয়া

দুইঃ নিউইয়র্কে বাঙালী

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধানতম শহর নিউইয়র্কে বাস করেন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বাঙালীর বড় অংশটি নিউইয়র্ক শহরটি মোট পাঁচটি বরোতে বিভক্তঃ কুইন্স, ব্রুকলিন, দ্য ব্রনক্স, ম্যানহাটান ও স্ট্যাটান আইল্যান্ড বিভিন্ন জনের দেয়া তথ্যমতে কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস, এস্টোরিয়া, জ্যামাইকা, ওজোন পার্ক এলাকায় বাঙালীদের মূল বসত এর মধ্যে জ্যাকসন হাইটসকে বলা চলে ইউএস-বাঙালীর প্রধানতম মিলন-কেন্দ্র সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য এটিই বাংলাদেশের বাঙালীর প্রধান স্থল জ্যাকসন হাইটসে ব্যবসা-বাণিজ্যেও বাঙালীদের বেশ প্রাধান্য আগে ছিলো ভারতীয়দের অধুনা নেপালীদের বেশ দেখা যাচ্ছে ব্রুকলিন বরোতে মূলতঃ চার্চ ম্যাকডৌনাল্ড, ডাহিল, নিউকার্ক এলাকাতে বাঙালীদের বসবাস ব্রংক্সের মধ্যে শুধুমাত্র স্টার্লিং এলাকাতে চোখে পড়ার মতো বাঙালীর বাস থাকার কথা জানা গেছে স্ট্যাটান আইল্যান্ড আর ম্যানহাটানে সেভাবে আলাদা করে বাঙালী বসতি গড়ে ওঠেনি

শান-শওকত, জৌলুস আর গুরুত্বের দিক থেকে ম্যানহাটানকে আসলে নিউইয়র্কের বাকী অংশগুলোর সাথে তুলনা করাটা অবান্তর ম্যানহাটন আবার নিউইয়র্কের অন্য বরোগুলো থেকে নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন টানেল-সাবওয়ে-ব্রীজের মাধ্যমে সংযুক্ত অন্যদেশ থেকে টুরিস্টের কাছে কুইন্স বা ব্রুকলিনে অনেক স্থানকে ম্যানহাটানের তুলনায় 'তৃতীয় বিশ্ব' মনে হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে প্রতিদিন সকালে কুইন্স আর ব্রুকলিন থেকে কাজে-কর্মে যোগ দিতে ম্যানহাটান অভিমুখে দৌড়ান অসংখ্য বাঙালী এদের বেশির ভাগ ক্ষুদে-চাকুরে এছাড়া নিউইয়র্কের বিখ্যাত ইয়েলো ক্যাব চালিয়ে জীবীকা নির্বাহ করা বাঙালীদের কাস্টমার পাবার মূল জায়গা ম্যানহাটন নিউইয়র্কের বাসিন্দা চিলমারীর আবু রায়হানের বসত পারে নিউইয়র্ক (২০০৮) আর নিউইয়র্কে বসতি (২০০৯) বই দুটিতে ম্যানহাটানের বুকে বাঙালীর জীবন সংগ্রামের অনেক চিত্র আছে উত্তর আমেরিকাতে বাঙালী সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশের অন্যতম কেন্দ্র জ্যাকসন হাইটসের মুক্তধারাতে বসে ছোট্ট-আলাপের সময় আবু রায়হান জানিয়েছিলেন, পাণ্ডিত্য দেখানোর ক্ষমতা তার নেই কিংবা ইচ্ছাও তার নেই তিনি বলেছিলেন, ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর থেকে যা দেখেছেন, যা বুঝছেন তাই নিয়ে লিখেছেন লন্ডনে ফিরে বই দুটো পড়ে দেখা যায় বাড়িয়ে বলেননি আবু রায়হান বড়ো কথা, আবু রায়হানের শব্দ-জালে বন্দী হওয়া ভাবনাগুলোর অনেকগুলোর সাথেই পরিচিতি ঘটে গেছে নিউইয়র্কের বাঙালীদের সাথে হরেক আলাপে ফাহিম রেজা নূরের প্রবাসের পাঁচালী (২০০২) তেও পাওয়া যাবে নিউইয়র্ক বাঙালীর জীবনের সংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা, ক্ষোভ ও লাঞ্ছনার বেশ কতোগুলো খণ্ড-চিত্র বইটিতে আমরা আরও পাই বাঙালীর মহৎ তুচ্ছ হয়ে ওঠার টুকরো-কাহিনী ছেড়ে আসা দেশের জন্য দীর্ঘশ্বাসের শব্দটিও আমাদের শুনিয়ে দেয় প্রবাসের পাঁচালী

দেশ-ভাবনা ও মূলধারা

যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া প্রজন্মের ব্যাপারটি স্বভাবতই আলাদা, কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নিউইয়র্কের বেশির ভাগ বাঙালীর দিন-রাত্রির বড়ো একটি সময় নিশ্চিতভাবেই ব্যয় হয় বাংলাদেশ বিষয়ক ভাবনাতে দেশ নিয়ে আবেগে ডুবে থাকা মানুষের সংখ্যাই আসলেই বেশি নিউইয়র্কের বাঙালীর মধ্যে মানব-সৃষ্ট কিংবা প্রাকৃতিক যাই হোক না কেনো, বাংলাদেশের যে-কোন দুর্বিপাকে নিউইয়র্কের বাঙালী ক্রিয়া করে দ্রুতগতিতে ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুতদের জন্য সহায়তা পাঠানো থেকে শুরু করে কোনো রাজনৈতিক ঘটনার ব্যাপারে নিন্দা বা সাধুবাদ জানাতে বিলম্ব হয় না এক্ষেত্রে ঘরে বসে বাংলা টিভি চ্যানেলগুলো দেখতে পাওয়ার সুবিধার ব্যাপারটি ছাড়াও ইন্টারনেটের ব্যবহার ব্যাপকতর হচ্ছে প্রতিদিন অনেকের আশাবাদ, টিভি আর ইন্টারনেটের ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহের জন্ম দেয়ার একটা ভালো সুযোগও তৈরী হয়েছে কোনো-কোনো মা-বাবা গুগলের মতো সার্চ-ইঞ্জিনের সুবিধা ব্যবহার করে নিজেদের জন্মস্থান থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক স্থানে সন্তানকে ভার্চুয়াল ভ্রমণ করাচ্ছেন।

দেশ নিয়ে আকুল হয়ে থাকা বাঙালীদের একজন মোহাম্মদ গোলাম সারোয়ার ১৯৭৯ সালে সানফ্রান্সিসককো বন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখা গোলাম সারোয়ার বাংলাদেশ নিয়েই মাতোয়ারা দেশের প্রত্যেকটি ঘটনাবলীর ইতিউতি বলতে গেলে তার নখ-দর্পণে প্রত্যেকটি ব্যাপারে নিজের মতো করে ব্যাখ্যাও আছে তার মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া ও রাজনীতি করা মানুষটি নিজের এলাকায় বিশ্বমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন ভাবতে অবাক লাগে গোলাম সারোয়ার শেষবার দেশে গেছেন ১৯৮৮ সালে বলতে কি, আসার পরে মাত্র দু-বার দেশে যাওয়া পড়েছে তার এতো-যে দেশের কথা ভাবেন, আর দেশের কথা বলেন, তাহলে দেশে যান না কেনো মাঝে-মধ্যে? এ-প্রশ্নের উত্তরে খানিক গুম মেরে থাকার পরে এ-কথা সে-কথা বলতে থাকেন গোলাম সারোয়ার ভালো করে চেপে ধরলে সামনে রাখা কফির কাপে চোখ রেখে বলেন, দেশের ব্যাপারে এতো আবেগ কাজ করে-যে, কি বলবো! দেশটাকে যেমন দেখে এসেছিলাম, ফিরে গিয়ে আর তেমন করে পাবো না এটা ভাবলেই ভয় লাগে খালি মনে হয়, দেশে যেয়ে কষ্ট পাবার চেয়ে না যেয়ে কষ্টের মধ্যে থাকাও অনেক ভালো

'কাগজ ঠিক হয়ে গেলে' প্রথম কাজ হিসাবে দেশে ঘুরে আসার কথাই মূলতঃ মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে বেশির ভাগের 'কাগজ না থাকা' লোকেদেরতো কথাই নেই থাকবার কাগজ-পত্র নেই, কিন্তু থাকছেন, এমন একজনের সাথে আলাপ হয় ম্যানহাটানের রাস্তায় কাছাকাছি সাবওয়ের খোঁজ জানতে চাইলে উত্তর আসে বাংলায় প্রশ্নকারী-যে বাঙালী, তা বুঝলেন কেমন করে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরদাতা জানান, বাঙালী চিনতে তার অসুবিধা হয় না হঠ্যাৎ রাস্তার আলাপে ভদ্রলোক জানান, বহু দিন দেশে যেতে পারছেন না, কিন্তু মন পুরোটা সময় পড়ে থাকে দেশে দেশের সর্বশেষ ঘটনা-প্রবাহের ব্যাপারেও ছুঁড়ে দিলেন কিছু মন্তব্য। যথারীতি রাজনীতিকদেরও খানিক বকে দিলেন ওবামা 'এমনেস্টী' ঘোষণা করবেন, এমন এক আশার জালে আবদ্ধ হয়ে স্বজন আর স্বদেশের ভাবনা ভেবে-ভেবে জীবন কাটাচ্ছেন এখন ক্ষুদে-চাকুরী করে টিকে থাকা এ-বাঙালী বিদায়ের সময় বললেন, আবার দেখা হবে হবে কি? কে জানে? কিন্তু তাকে মনে থাকবে

তবে ছেড়ে আসা দেশের ব্যাপারে অত্যধিক ব্যস্ত থাকার নেতিবাচক দিক নিয়েও চিন্তা করেন অনেকে বিশেষ-করে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শাখার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে শাহীন মিয়ার মতো দুয়েকজন বাসায় সারাক্ষণ বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো চালু থাকার প্রবনতায় বিরক্ত হতে-হতে রাগ করে দুয়েকবার টিভি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবার কথা শুনিয়েছেন নিজের মুখে এছাড়াও শাহীন মিয়ার প্রশ্নঃ যুক্তরাষ্ট্রে বসে বাংলাদেশের রাজনীতি করলে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আসলেও কিছু করা হচ্ছে কি? কেউ-কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, অঞ্চল-ভিত্তিক সংগঠনগুলোর যৌক্তিকতা নিয়েও তবে সাধারণ বাঙালীদের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শাখা নিয়েই আপত্তিটা বেশি এ-ব্যাপারে কয়েকটি নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ পাওয়া গেছে যেমনঃ এর ফলে কমিউনিটিতে বিভেদ-বিভক্তি বাড়ে, মূলধারার রাজনীতিতে ঢুকার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে যায়, মূলধারার রাজনীতিতে ঢুকলে বাংলাদেশকে যতোটা হাই-লাইট করা সম্ভব হতো, তা হয়ে উঠছে না একজন সাংবাদিক জানান, নিউইয়র্কের বাংলা পত্রিকাগুলোতে বেশির ভাগ লেখক বাংলাদেশ নিয়েই লেখেন তার মতে, বাংলাদেশ নিয়ে সারাক্ষণ লেখালেখি না করে, স্থানীয় লেখকরা যদি ইমিগ্রেশন, হেলথ কেয়ার বা শিক্ষা-ব্যবস্থার মতো বিষয়াদি নিয়ে লেখেন, তাহলেই বাঙালী কমিউনিটির লাভ হবে লন্ডনের মতো শহরেও যেমন দেখা যায়, নিউইয়র্কেও কিছু মানুষ আছেন, যাদের মধ্যে সম্ভবতঃ নারীদের সংখ্যাই বেশী হবে, যারা বলতে গেলে কমিউনিটি-ভিত্তিক জীবন-যাপন করছেন ভাষাগত বা সংস্কৃতিগত প্রতিবন্ধকতা-সহ নানা কারণেই এদের সাথে মূলতঃ নিজ-কমিউনিটীর মানুষ-জনেরই উঠা-বসা, লেনা-দেনা স্বভাবতঃই বাঙালীদের এ-অংশটির পক্ষে মূলধারার রাজনীতির দিকে যাবার সম্ভাবনা নেই

অবশ্য মূলধারার রাজনীতির ঢুকার ব্যাপারে কম বা একেবারেই আগ্রহ না থাকার ব্যাপারে বাস্তব কারণও আছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজনের মতে, মূলধারার রাজনীতিতে ঢুকবার জন্য যে-দক্ষতা দরকার, তা বাংলাদেশ থেকে বড়ো হয়ে আসা অধিকাংশ বাঙালীর সঙ্গত কারণেই নেই আর এ-কারণেই কেউ-কেউ দলীয় রাজনীতিতে জড়িত হলেও দলের 'ইনার সার্কেলে' ঢুকার সুযোগ করে নেয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে থাকেন ২০০৬ সালে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্টেইট এসেম্বলীতে সেনিট-সদস্য পদের জন্য ডিস্ট্রিক্ট ২৫ থেকে ডেমৌক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মোরশেদ আলম হচ্ছেন এখন পর্যন্ত সম্ভবতঃ পুরো যুক্তরাষ্ট্রের বাঙালীদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানে যাওয়া রাজনীতিক তিনি অবশ্য নির্বাচনে জিতেননি আর এখন রাজনীতিতে সেভাবে সক্রিয়ও নন এর বাইরে মূলধারার রাজনীতিতে নিউইয়র্কের বাঙালীদের মধ্যে মেজবা উদ্দীনের একটি অবস্থান আছে শ্রমিক নেতা হিসাবে তিনি এশিয়ান প্যাসিফিক আমেরিকান লেবার এলায়েন্সের কার্যনিবার্হী পরিষদের সদস্য নিউইয়র্কের বাইরে লস এঞ্জেলসে রিপাবলিকান পার্টিতে জয়নুল আবেদিন, কানসাসে ডেমৌক্র্যাটিক পার্টির রেহান রেজার নামও বলেছেন দুয়েকজন

বাংলাদেশ থেকে বড়ো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া বাঙালীরা মূলধারার রাজনীতিতে খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন না বলে মনে করলেও, নতুন প্রজন্মের সাফল্যের সম্ভাবনার ব্যাপারে প্রায় সকলেই নিশ্চিত ভাষাগত সমস্যা না থাকা, নিজেদেরকে আমেরিকান ভাবার ক্ষেত্রে তেমন কোনো টানা-পোড়েন না থাকা আর মূলধারার সংস্কৃতির সাথে পরিচিতি থাকার কারণে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পূর্ববর্তী প্রজন্মের মতো পিছ-টান দেয়ার মনোভাব বা নিজেদেরকে বহিরাগত ভাবার প্রবণতা কাজ করে না নতুন প্রজন্মের বাঙালীদের পরিচালনায় বেশ কিছু প্রৌ-ডেমৌক্র্যাটিক ক্লাব এখন নিউইয়র্কে সক্রিয় আছে এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাঙালী শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের নামেই নানান ধরণের সংগঠন পরিচালনা করছে এখন পর্যন্ত নতুন প্রজন্মের কোনো নাম সে-ভাবে শুনতে পাওয়া না গেলেও, অচিরেই এদের মধ্যে থেকে অনেকেই উঠে আসবেন বলে আশাবাদী নিউইয়র্কের বাঙালী

অনেক ব্যাপারে আপত্তি থাকলেও মার্কিন মুল্লুকের মূলধারার সংস্কৃতির ব্যাপারে নিউইয়র্কের বাঙালীর মধ্যে বেশ একটা ইতিবাচক মনোভঙ্গীও লক্ষ্য করা যায় বিশেষ-করে কাউকে ছোটো করে না দেখার সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকার কথা জানিয়েছেন একাধিক মানুষ এ-প্রসঙ্গে উদাহরণ দিতে গিয়ে একজন জানান, মার্কিনীরা মানুষকে ছোটো করে কথা বলে না; একজন ট্যাক্সি - চালকের সাথে আলাপের সময় তার আত্ম-সম্মানবোধ যাতে আহত না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে জিজ্ঞেস করে, তোমার ট্যাক্সি ব্যবসা কেমন চলছে? আরেক জন জানালেন বছরে দু-লক্ষ ডলার আয়কারীর এক কন্যার ট্যাক্সি ড্রাইভার বয়ফ্রেন্ড থাকার গল্প মূলধারার সাথে মানসিকতার তফাৎ নিয়ে আলাপ-কালে অমর অধিকারী ও কয়েকজন জানান, বাঙালীদের মধ্যে কেউ-কেউ নিজেদেরকে একটু বড়ো করে দেখাতে চান এদের মতে যারা একটু বেশি আয়-ইনকাম করেন, তাদের কারও-কারও মধ্যে এ-ধরণের প্রবণতা দেখা যায় 'বড়ো-বড়ো' চাকরী-বাকরী করা বাঙালীদের কারও-কারও মধ্যেও একটু 'এলিট' ভাব থাকার তথ্য পাওয়া গেলো বাঙালী কমিউনিটিতে সর্ব-মহলে পরিচিত এক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আক্ষেপ করে বলেন, 'এলিটরা কমিউনিটীতে আসেন সম্মান নিতে এরা আসলে কমিউনিটীকে তেমন কিছুই দেন না।' তার মতে, 'নন-এলিট' একটিভিস্টদের কেউ-কেউ ভীষণ রকমের প্রচার-পিয়াসী হলেও, এসব 'নন-এলিট' একটিভিস্টরাই মূলতঃ কমিউনিটীর সঙ্গে আছেন এসব 'এলিট'দের ব্যবহারে হতাশ বিরক্ত হওয়া থেকে বাঁচার জন্য স্থায়ী-ব্যবস্থা নেয়ার কথাও শুনালেন একজন জনৈক বাঙালী ডাক্তারের ব্যবহারে চূড়ান্ত ত্যক্ত হয়ে আর কোনো বাঙালী ডাক্তারের সাথে এপয়ন্টমেন্ট না দেয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে রেখেছেন এ-বাঙালী অন্যকে ছোটো করে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না কেনো কিছু মানুষ। এটা একটা প্রশ্ন বটে

ওয়াইল্ড ওয়েস্ট কায়দায় মারের বদলে পাল্টা মারের গল্পও পাওয়া গেছে নিউইয়র্কের বাঙালীর মুখ থেকে এক দশকের বেশি সময় ধরে নিউইয়র্ক-বাসী তুমুল তরুণ এসএম সোবহান (সোহাগ) দুবলা-ভেতো বাঙালী নয়, দস্তুরমতো নিয়ম করে জিমে শরীর বানানো বাঙালী ফেব্রুয়ারীর শেষদিকে একদিন পায়ে-হাঁটা অবস্থাতে পেছন দিক থেকে গোটা চারেক স্প্যানিশ ভাষাভাষী তরুণের হামলার শিকার হন সোহাগ প্রথম দফায় রক্তাক্ত হলেও, পরবর্তী মিনিট পনেরো সময় ধরে সমানে লড়ে যাওয়া ছাড়াও হামলাকারীদের বাংলা 'মাইর' কাকে বলে বুঝিয়ে ছাড়েন! তবে এ-চিত্র ব্যতিক্রমী সাম্প্রতিক সময়ে নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানে বিপথগামী কিছু স্প্যানিশ ভাষাভাষী বিশেষতঃ ডৌমিনকান ও পুয়েরতোরিকান এবং কৃষ্ণাঙ্গদের হাতে বাঙালীদের আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া গেছে এদের মধ্যে অনেকে 'কোনো কিছু হবে না' ধরে নিয়ে এমনকি পুলিসের কাছেও যায়নি আর যাদের বৈধ কাগজ-পত্র নেই, তারা আক্রান্ত হওয়া বা নাজেহাল হবার মতো ব্যাপার নিয়ে পুলিসের কাছে যাবার কথা ভাবনাতেও আনেন না পথে-ঘাটে মারামারি দেখার কিংবা সময় খারাপ হলে নিজে আক্রান্ত বা নাজেহাল হবার অভিজ্ঞতা অনেকের থাকলেও, রাজনীতিতে হানাহানী-মারামারি না থাকার ব্যাপারটি যুক্তরাষ্ট্রে আসার অনেক দিন পর্যন্ত আশ্চর্য মনে হয় অনেকের কাছে বাংলাদেশে রাজনীতির নামে যে 'কর্ম-কীর্তিকে' মনে হতো অমোঘ, যুক্তরাষ্ট্রে এসে সেগুলোর অনুপস্থিতি দেখে বিস্ময় জাগে এদের মনে এক পর্যায়ে এসে দেশের রাজনীতিকদের উপরে রাগ জন্মে অনেকের মনে এরা সম্ভবতঃ বাংলাদেশে রাজনীতির নামে যা চলতে দেখা যায়, তাতে রাজনীতিকদেরই একচেটিয়া দায় বলে মনে করেন

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি

চির-হতাশাবাদীদের কথা মাথা থেকে নামিয়ে ফেললে, এটা বলতে এতটুকু অসুবিধা হ্য় না যে, নিউইয়র্কে বাংলা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চার অবস্থা বেশ ভালো সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে লেখক, সাহিত্যমোদী থেকে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যার সাথেই আলাপ, তার কাছ থেকেই শুনতে পাওয়া গেছে নিউইয়র্কের মাটিতে বাঙালী শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চার ব্যাপারে বেশ ইতিবাচক মন্তব্য মানের ব্যাপারে প্রশ্ন রেখেছেন কেউ-কেউ থাকতে পারে কিন্তু দুনিয়ার অপর প্রান্তে নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও অবিরাম বাঙালীত্বের চর্চাকে সালাম না দিয়ে উপায় কি?

এসব নিয়ে কথা হয় বিশ্বজিত সাহার সঙ্গে বিশ্বজিত সাহা এবং তার প্রতিষ্ঠান মুক্তধারা, সময়ের পরিক্রমায় উত্তর আমেরিকায় বাঙালী সংস্কৃতির জগতে গুরুত্বপূর্ণ দু'টি নামে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয় শুধু নিউইয়র্ক নয়, পুরো উত্তর আমেরিকাতেই বাঙালী শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত খুশী বিশ্বজিত সাহা এ-প্রসঙ্গে ১৯৯২ সাল থেকে মুক্তধারার বই-মেলা আর ২০০৭ সাল থেকে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত বইমেলা ও আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসবের মতো বড়ো আয়োজনগুলোর কথা উল্লেখ করেন তিনি উল্লেখ্য, এসব অনুষ্ঠানে নিয়মিত যোগ দিচ্ছেন দু-বাংলার শীর্ষ-স্থানীয় সাহিত্যিকরা প্রত্যেক বছর এভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে বাসরত প্রতিষ্ঠিত ও অপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সাথে দু-বাংলার সাহিত্য-স্রোতের মেশামেশি গভীরতর হচ্ছে বিশ্বজিত সাহা মনে করেন, এসবের ফলে নতুন-নতুন লেখক তৈরী হবার বাস্তবতা তৈরী হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরী হচ্ছে, যদিও অনেক সময় বাংলা পড়তে না পারার সমস্যার কারণে সাহিত্যের পরিবর্তে গান-বাজনার ব্যাপারেই এদের মধ্যে আগ্রহটা বেশি লক্ষ্য করা যায় নতুন প্রজন্মের কোনো-কোনো শিল্পী এখন বাংলা লোকগানকে মেইন-স্ট্রীমে ঢুকানোর নিরীক্ষা করছেন বলেও জানালেন তিনি

শিল্প-সাহিত্য আর সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সাথে জড়িতদের কেউ-কেউ নিজেদের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জানান, নতুন প্রজন্মের উপরে হঠাৎ করে বাঙালীত্বের চাপ দেয়ার ফল নেতিবাচক হতে পারে এরা মনে করেন, বাঙালী সংস্কৃতির নামে জবরদস্তি চালানো হলে, তা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া বা বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের ব্যাথিত করে, আর এভাবেই মা-বাবার সাথে তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাঙালীত্বের ব্যাপারে উদাসীনতা নিয়ে নিউইয়র্ক বাঙালীদের অনেকের মধ্যেই আছে এক ধরণের চাপা উদ্বেগ ও আক্ষেপ বাঙালীর ঘরের নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাঙালীত্বের ব্যাপারে আগ্রহ না থাকা বা কম থাকার ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা আছে সর্ব-মহলে বাঙালী-ঘরের সন্তানের মধ্যে বাঙালীত্বই থাকবে প্রধান হয়ে, মার্কিন মুল্লুকে বসে এ-রকমটা কেউ না ভাবলেও সন্তানের মধ্যে বাঙালীত্বের চর্চা না দেখে, কে জানে হয়তো কিছু একটা হারিয়ে ফেলার কিছু একটি গুঁড়িয়ে যাবার ব্যাথা বুকের মধ্যে বেজে ওঠে কি-না

এসব ব্যাপারে অবশ্য সংগঠকদের মধ্যে চিন্তার ছাপ মননশীলতা লক্ষ্য করা গেছে যেমন, গত বছর মুক্তধারার আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসবে নতুন প্রজন্মের জন্য আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতার বিষয় ছিলো 'আমার মা-বাবা আমাকে বুঝে না' আগামী জুনের উৎসবেও বাঙালী টীন-এইজদের জন্য আলাদা করে থাকছে একটি সেমিনার এছাড়াও নতুন প্রজন্মের বাঙালীদের পরিচালনা অংশগ্রহণে একটি পর্বের প্রস্তুতিও চলছে উৎসবকে সামনে রেখে এ-ধরণের প্রয়াসগুলো ফলদায়ী হচ্ছে উদাহরণ-স্বরূপ, ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগের আয়োজনে একুশের তাৎপর্য নিয়ে অত্যন্ত সুন্দর বক্তব্য রাখতে পেরেছে বেশ কয়েকজন নতুন প্রজন্মের বাঙালী শুধু বছরে একবার বই-মেলা নয়, নিউইয়র্কে বাঙালী সংস্কৃতির চর্চারত আছে এমন সংগঠনের সংখ্যা সত্যিকার অর্থেই অনেক পয়লা বৈশাখ, রবীন্দ্র- নজরুল জয়ন্তী পালন থেকে শুরু করে কবিতা পাঠের আসর, আবৃত্তি প্রশিক্ষণশালা। কী নেই? বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলোকে ঘিরেও চলে অনেক আয়োজন খারাপ আবহাওয়া উপেক্ষা করে প্রতিবারের মতো এবারও একুশের প্রথম প্রহরে জাতিসংঘের সামনে আয়োজিত রাত্রী-কালীন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন অজস্র বাঙালী একুশকে নিয়ে একুশের দিনটিতেই এবার অনুষ্ঠান হয়েছ বিশটির কাছাকাছি

আসলে নিউইয়র্কের বাঙালীর মধ্যে বাঙালীত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে সচেতনা এখন আগের চেয়ে বেশি সন্তানকে বাঙালী শিল্প-সংস্কৃতির কোনো একটি মাধ্যমের সাথে যুক্ত করতে চাওয়া মা-বাবাদের এখন ভালোভাবেই চোখে পড়ে আন্তঃসংগঠন সম্পর্কের ক্ষেত্রে কখনও কখনও কিছূটা চিড় দেখা যায় বলে জানালেন কোন-কোন আলাপকারী বাইরে থেকে যাওয়া এ- প্রতিবেদকের মনে হয়েছে, তাতে কী? কাজ করতে গেলে এসব হতেই পারে অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে না গেলে, সংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও খানিক টেনশন বরং সৃষ্টিশীলতার জন্য ভালো আসল কথা হচ্ছে, বাঙালী সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে ভিন-দেশের হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যে এ-মানুষগুলো কাজ করে যাচ্ছেন ডলার সংগ্রহ আর শ্রম-ক্লান্তি উপেক্ষা করছেন এর বেশি আর কী হতে পারে?

কথা হয় নিউইয়র্ক ফিল্ম সেন্টারের প্রেসিডেন্ট এনায়েত করিম বাবুলের সঙ্গে, যিনি মনে করেন, আর সব কিছু বাদ দিলেও 'নিজেকে শুদ্ধ রাখার জন্য' সংস্কৃতি চর্চা করা প্রয়োজন এনায়েত করিম বাবুলের মতে, নিউইয়র্কে বাঙালী-সংস্কৃতি চর্চার সাথে জড়িত আছে দু'টি ধারা। একটি ধারার লোকেরা দেশে থাকতে সংস্কৃতি চর্চার সাথে জড়িত ছিলেন, কিন্তু নিউইয়র্কে এসে তেমন একটা লাইম লাইটে নেই অপর একটি অংশের বেশির ভাগ লোকজন যুক্তরাষ্ট্রে আসার পরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতা হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করলেন বাঙালীদের মধ্যে সুষ্ঠু চলচ্চিত্রের দর্শক সংখ্যা বৃদ্ধিতে তৎপর এ-সংগঠক দ্বিতীয় গ্রুপটির ব্যাপারে কিছুটা উষ্মা থাকলেও, চাইলে সার্বক্ষণিকভাবে বাঙালীত্বের মধ্যে থাকতে পারার সুবিধার কারণে নিউইয়র্ক বাসকে আরেকটি বাংলাদেশে থাকার সাথেই তুলনা করলেন তিনি

অনেকের মতো আবৃত্তি প্রশিক্ষক ইভান চৌধুরীও মনে করেন, নিউইয়র্কে বাঙালী-সংস্কৃতি চর্চার পারদটি মূলত উর্দ্ধমুখী বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাঙালী সংস্কৃতির ব্যাপারে ভালো রকমের আগ্রহ তৈরী হয়েছে বলেই তিনি মনে করেন এ-প্রসঙ্গে দীর্ঘ- প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান 'শব্দ রিসাইটেশন ইন্সটিটিউট ন্ড কালচারাল মিডিয়া আইএনসি' এর শিক্ষার্থীদের কথা উল্লেখ করেন ইভান চৌধুরী শব্দ রিসাইটেশনের শিক্ষার্থীরা এখন নিউইর্য়কের ভারতীয় সংগঠনগুলোতে যেয়ে প্রতিযোগিতা করছে, বাংলাদেশে যেয়ে প্রতিযোগিতা করছে এক সময় নিউইয়র্ক শহরে বাঙালীদের বাড়ীতে-বাড়ীতে আবৃত্তির টিউশনী করা ইভান চৌধুরী নিউইয়র্কেই একটি পূর্ণাঙ্গ আবৃত্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান

নিউইয়র্কে বাংলাদেশের বাঙালীদের প্রচুর সংগঠন থাকার কথা জানা যায় হাতেগোনা কয়েকটি উদ্যোগের কথা বাদ দিলে এ-সব সংগঠনের সাথে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া অভিবাসী বাঙালীর সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের যোগাযোগ তেমন একটা নেই এক্ষেত্রে মুক্তধারা বইমেলা, কবিতা জার্নাল শব্দগুচ্ছ, এশিয়া টিভির 'প্রবাস বাংলা' অনুষ্ঠান, আর নিউইয়র্ক সংলগ্ন নিউজার্সীর এপিক থিয়েটারের মতো উদ্যোগগুলো হচ্ছে ব্যতিক্রম

শুধু শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির আসর শুধু নয়, নিউইয়র্কের বিভিন্ন বাঙালী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এখন আছে বাংলা বই-সাময়িকী, সিডি-ভিডিওর বিপুল সংগ্রহ সিডি-ভিডিওগুলোর মান নিয়ে কখনও-কখনও ক্রেতাদের মধ্যে বিরক্তির জন্ম হলেও, সুলভে এগুলো সংগ্রহ করতে পারার সুবিধা থাকায় সবাই খুশী আছেন নিউইয়র্কের সাধারণ বাঙালীর বাড়ীতে বাংলা ভিডিও সিডির মোটামুটি ভালো রকমের একটা সংগ্রহ না দেখতে পাওয়াটাই এখন ব্যতিক্রমী ব্যাপার অভিভাবকদের অনেকের আশা বই-পত্রের মাধ্যমে না হলেও সিডি-ভিডিওর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বাঙালী সংস্কৃতির ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলা যাবে ঢাকা ও কোলকাতা থেকে প্রকাশিত বই-পুস্তক, সাময়িকী-সাপ্তাহিকী, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিনোদন ম্যাগাজিনগুলোর চাহিদাও ব্যাপক জনপ্রিয় লেখকদের বই যেমন বিক্রি হয়, বোধসম্পন্ন-মননশীল লেখকদের বাজারও ভালো নিউইয়র্কে মুক্তধারার মোহাম্মদ এ আজাদের কাছ থেকেও এ-তথ্যের সমর্থন পাওয়া গেলো

লেখক-সভা

মার্চের পাঁচ তারিখে র সন্ধ্যায় মুক্তধারা ছিলো নিউইয়র্কে বাসরত বাঙালী কবি, গদ্যকার, প্রবন্ধকারদের উপস্থিতিতে উজ্জ্বল এসেছিলেন সামস আল মোমেন, ফাহীম রেজা নূর, খিজির হায়াত, ফকির ইলিয়াস, হাসান আল আব্দুল্লাহ ও দিলরুবা রায়হান অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন আল আমিন, বিশ্বজিত সাহা, মাসুদ রহমান, আবু রায়হান, অমর পাল ও সোহাগ সোবহান-সহ কয়েকজন সাহিত্যামোদী

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা সাহিত্য চর্চার ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনার সূত্রপাতে ফকির ইলিয়াস জানান দেশে থাকতে যারা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সংস্পর্শে থাকেন, তারাই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা চর্চাকে ধরে রাখছেন বা ধরে রাখবেন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া বাঙালীর হাতে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির চর্চা বা অগ্রগতির তেমন কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন না তিনি এক্ষেত্রে আশাবাদী হাসান আল আব্দুল্লাহঅষ্টম-নবম শ্রেণীতে পড়া কিছু বাঙালী ছেলে-মেয়ের কবিতা লেখার কথা জানান তিনি। এদের মধ্যে অবশ্য বাংলায় লেখালেখি করা শিশু-কিশোরের সংখ্যা কমইংরেজীতে লেখালেখিকে ইতিবাচক হিসাবে ধরে নিয়ে হাসান আল আবুদল্লাহর কবিতা জার্নাল শব্দগুচ্ছ টীন-এইজ বাঙালীদের উৎসাহিত করে তার মতে, বাংলা পড়তে বা লিখতে না পারলেও নতুন প্রজন্ম যদি বাঙালী সংস্কৃতিকে ধরে রাখে তাহলে, সেটাই হবে খুশীর ব্যাপার

খিজির হায়াতের মধ্যেও আছে নতুন প্রজন্মের বাঙালীদের বাংলা চর্চার ব্যাপারে আশাবাদ নিজ-পরিবারের ভিতরই এ-ধরণের কবিতা-লিখিয়ের উপস্থিতির কথা জানান তিনি ইনি মনে করেন, নতুন প্রজন্মকে লেখালেখিতে হাত পাকানো অবস্থায় দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে দিলরুবা রায়হানের মতে, সন্তানকে ভালোভাবে বাংলা শেখানোর ব্যাপারে অভিভাবকরা মনোযোগী হলে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া বাঙালীর মধ্যে বাংলায় সাহিত্য চর্চার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে নিজের সন্তানকে বাংলা ভাষার জন্য বাঙালীর লড়াইয়ের কাহিনী শুনানোর মধ্য দিয়ে বাংলার প্রতি আগ্রহী করে তোলায় সফল হবার কথাও জানালেন তিনি উপস্থিতি সাহিত্যামোদীদের দুয়েকজনের কন্ঠ থেকেও নতুন প্রজন্মের বাংলা চর্চার ব্যাপারে ভেসে আসে আশাবাদ ফাহিম রেজা নূর মনে করেন, সামগ্রিকভাবে নিউইয়র্ক তথা যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা চর্চার ভবিষ্যত ভালো বাঙালীর নানান পালা-পার্বন আর জাতীয় দিবসগুলোতে নতুন প্রজন্মেরপক্ষ থেকে উপহার দেয়া সুন্দর-সুন্দর অনুষ্ঠানের উদাহরন টানলেন তিনি

সামস আল মোমেন অবশ্য প্রধান গুরুত্ব দিলেন মানের ব্যাপারটিকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাহিত্য-চর্চার ব্যাপারে তার প্রশ্নঃ ইংরেজীতে লিখছে বলেই আমরা ভালো বলে ফেলছি নাতো? তার কথা হলো, ক্রিয়েটিভ রাইটিং ভিন্ন জিনিষকেউ একজনের লেখা লাইনগুলো আসলেই কবিতা হয়ে উঠছে কি-না, তা সাহস করে বলতে হবে নতুন প্রজন্মের বাংলা