|
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র আমাদের গর্বঃ ঢাকায় আদিবাসী উৎসব অনুষ্ঠিত
আরিফুজ্জামান
সাংস্কৃতিক
বৈচিত্র্য আমাদের গর্ব
শীর্ষক শ্লোগান ধারণ
করে ঢাকায় সম্প্রতি শেষ হয়ে গেলো আদিবাসী সাংস্কৃতিক উৎসব।
বাংলাদেশ শিল্পকলা
একাডেমীর চিত্র মিলনায়তনে ১২-১৪ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় এ-উৎসব।
উৎসবে প্রায় ১৫টি
ভাষাভাষীর আদিবাসী মানুষ অংশ-গ্রহণ করেন।
১২ মার্চ উৎসবের উদ্বোধন
করেন বাংলাদেশ সরকারের পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর
তালুকদার এমপি, উন্নয়ন কর্মী খুশি কবির, আদিবাসী নেতা সুদত্ত তঞ্চঙ্গ্যা ও অন্যান্য
আদিবাসী নেতা।
প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিলো চোখে পড়ার মতো।
এ-ছাড়া আদিবাসী মানুষের
ভাষা ও জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম-সহ বিভিন্ন বিষয়ে আয়োজিত সেমিনারে আলোচনা করেছেন দেশের
বিশিষ্টজনেরা।
বালাদেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চল এবং পার্বত্য
চট্রগ্রামে বাস করেন আদিবাসী বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ।
সরকারী হিসাব অনুযায়ী
আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা সাতাশ।
তবে আদিবাসী এবং
গবেষকেরা এই সংখ্যা পঁয়তাল্লিশের বেশি বলে দাবী করেন।
নিজ-নিজ জাতিতাত্ত্বিক
বৈশিষ্ট্য এবং বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে এসব জাতিসত্ত্বার মানুষ বাংলাদেশের
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনকে বৈচিত্র্যময় করে রেখেছেন।
এবারের
আদিবাসী সাংস্কৃতিক উৎসবে সান্তাল, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, মুনিপুরী, মান্দি, খাসি,
মারমা, ওরাঁও, চাকমা ও খিয়াম-সহ পনোরোটি ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার শিলপীরা প্রতিদিনই
নেচে গেয়ে হল ভর্তি দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন।
বাংলাদেশের উত্তারাঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে সান্তালরা প্রধান।
সান্তালদের নানাবিধ
লোকাচার এবং উৎসব বৈচিত্র্যময় নাচগানে ভরপুর।
বছর শেষে পালিত প্রধান
উৎসব সোহরায়ে দেবতা সিঞ্চ চান্দোকে (সূর্য) গান আর নাচের ছন্দে ফসল উৎসর্গ করেন
সান্তালরা।
বসন্ত উৎসব 'বাহা পরবে' সান্তাল
নারীরা খোঁপায় বনফুল গুঁজে পূজা মণ্ডপে মাতেন নাচে-গানে।
রোগ-শোক-মহামারী থেকে
বাঁচার জন্য পালিত দাসায় উৎসবে সান্তাল নারী-পুরুষ নেচেগেয়ে পূজার অর্ঘ্য দেন।
বন-রক্ষার জন্য দেবীর
কৃপা প্রার্থনা করা হয় শারজম উৎসবে।
এ-উৎসবে শাল গাছকে শাড়ি
আর সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে দেয়া হয়।
আর গাছের পাশে হাঁড়িয়া
(ঘরে তৈরী এক প্রকার মদ) ভাড় রেখে সারা রাত চলে নাচ গান।
সমতল
ভূমির উত্তরাঞ্চলে আরও রয়েছে ওঁরাও, মুণ্ডা, পাহাড়িয়া, মালো, মাহাতো, কোচ ও
রাজবংশী-সহ বেশ কিছু নৃ-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী।
তাদের সবারই রয়েছে
নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, কাব্য ও গান।
কারাম উৎসব ওঁরাওদের
প্রধান উৎসব।
কারামকে
তাঁরা
মিলনের উৎসব মনে করে।
ভাদ্র মাসে চাঁদ দেখার
একাদশ দিনে এ-উৎসব শুরু হয়।
গারো পাহাড়ের পাদদেশে
ময়মনসিংহ জেলা ও টাঙ্গাইলের মধুপুর গড় অঞ্চল জুড়ে মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত এ-অনন্য
মাতৃতান্ত্রিক জাতি মান্দিদের (গারো) ভূবন।
বনের সাথে তাদের সম্পর্ক
নিবিড়।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে
খাসি ও মনিপুরী জাতির বাস।
বৃহত্তর সিলেটে
বাঙালীদের পাশাপাশি বসবাসরত খাসিদের রয়েছে পালাগান ও নাচের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য।
তাদের পালাগান লিখিত নয়,
বরং বংশানুক্রমিকভাবে মুখে-মুখেই তার চর্চা হয়ে এসেছে।
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয়
পাহাড় ঘেরা রাজ্য মনিপুর মনিপুরিদের আদি নিবাস।
মনিপুরি নৃত্য এখন শুধু
দেশেই নয়, বিশ্ব সংস্কৃতিতেও তার একটা বিশেষ কদর লক্ষ্য করা যায়।
মনিপুরীদের রয়েছে
পঞ্চাশেরও বেশি নাচ।
বাংলাদেশের অনন্য জাতি বৈচিত্র্যপূর্ণও এলাকার নাম পার্বত্য চট্রগ্রাম।
এখানে এগারোটি
জাতিসত্ত্বার বসবাস।
প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর
রয়েছে নিজস্ব ভাষা, গান, কাব্য ও নৃত্যসমৃদ্ধ সংস্কৃতি।
পার্বত্য অঞ্চলের
আদিবাসীদের প্রধান উৎপাদন জুম-চাষ।
আর এ-জুম-চাষকে কেন্দ্র
করে গড়ে উঠেছে তাদের বিচিত্র্য ধরণের সাংস্কৃতিক ভিন্নতা।
বর্ষ
বিদায় ও বর্ষ বরণের বৈসাবি পাহাড়ী জনপদের সবচেয়ে বড়ো উৎসব।
পুরানো
বছরকে বিদায় আর নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে মারমারা এ-উপলক্ষ্যে আয়োজন করে জল উৎসবের।
বর্ণাঢ্য এ-উৎসবে মারমা
তরুণ-তরুণীরা 'সাংগ্রাই-মা' গানটি গেয়ে জল ছিটিয়ে নৃত্য করে।
সাংগ্রাই ছাড়াও মারমাদেও
রয়েছে রুবা আঁকা, ওয়া-গ্যায় আকাঁ নৃত্য।
আদিবাসী
সাংস্কৃতিক উৎসবে এবার সকলে উপভোগ আদিবাসী মানুষের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক
পরিবেশনাগুলো।
শিলপীদের নিটোল পরিবেশনার গুণে
উপস্থিত দর্শকরা যেনো মূহুর্তের মধ্যে চলে গিয়েছিলেন আদিবাসী গ্রামগুলোতে
।
উৎসবের
আয়োজক বেসরকারী উন্নয়ন সংগঠন সেডের পরিচালক ফিলিপ গাইন ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন,
'আদিবাসী
মানুষকে প্রান্তে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বাংলাদেশ খুব বেশি দূর এগুতে পারবে না।
প্রকৃতির এ-সব সরল
মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে বাঙালীদের মতো সমান সুযোগ দিতে হবে।'
উৎসবে প্রবন্ধ পাঠ করতে
আসা সুদত্ত বিকাশ তঞ্চঙ্গ্যা ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন,
'আদিবাসীদের
এ-মুহূর্তের প্রধান সম্যসা হলো ভাষা ও জমির লড়াই।
এক দিকে রাষ্ট্র প্রবল
আধিপত্যকারী হিসাবে বাংলা ও ইংরেজীকে আমাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের
বসবাস ও চাষাবাসের জমি কেড়ে নিচ্ছে সম্পত্তিবানেরা।'
আদিবাসী
এ-বর্ণাঢ্য আয়োজনে যোগ দিয়েছিলো সাধারণ অনেক বাঙালী।
উৎসব উপলক্ষ্যে তিনদিনের
আদিবাসী মেলাও বসেছিলো একাডেমী প্রাঙ্গণে।
সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠান-শেষে উৎসবে আগত সকল আদিবাসী এক মঞ্চে এসে 'আমরা করবো জয়' গানটি গেয়ে
অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি টানেন।
আপলৌডঃ ২২
মার্চ ২০০৯ |