|
যুদ্ধাপরাধ ঊনিশশো একাত্তরঃ
সাধারণ
ক্ষমা ও এর অপব্যাখ্যা
মোহাম্মদ
আরিফুজ্জামান ও সৌরভ রহমান
[বাঙালী
জাতির জীবনে বার-বার ফিরে আসে ’৭১-এর চেতনা।
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য
দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা
সব-সময় প্রেরণা
জোগায় জাতিকে। দুঃখের
বিষয়, একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের হোতাদের বিচার এখনও করতে পারেনি বাংলাদেশ রাষ্ট্র।
বরং সাধারণ ক্ষমাকে
অপব্যাখ্যা করে সবসময়ই পার পেতে চায় অভিযুক্তরা।
ভৌটের রাজনীতি করা রাজনৈতিক দলগুলোও সময়ে- সময়ে নস্যাৎ করেছে
বিচারের সম্ভাবনা।
এ-সুযোগে
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তরা এদেশে রাজনীতি করেছে, ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান ও
দেশ-বিরোধী বক্তব্য দিয়েছে।
তবু তাদের বিচার হয়নি।
বিচার নিয়ে আইনী
জটিলতার কথা প্রচার করা হয়।
অথচ বিদ্যমান আইনেই এদের
বিচার সম্ভব।
সংবিধানেও এ-রকম নির্দেশনা
রয়েছে। বিচারের
অতীত, স্থগিতাদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ও
সৌরভ রহমান।]
যারা
গণহত্যা
করেছে তাদের এর পরিণতি
থেকে রেহাই দেয়া যায় না।
এরা
আমার ত্রিশ লাখ মানুষকেকে হত্যা করেছে।
এদের
ক্ষমা করলে ভবিষ্যৎ বংশধররা আমাদের ক্ষমা
করবেন না।’
দিল্লির
স্টেইটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক কুলদীপ নায়ায়ের
সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবর
রহমান এ-কথা বলেছিলেন।
১৯৭২ সালের ২৬ এপ্রিলের
সাক্ষাৎকারটি ৩০ এপ্রিল ছাপা হয় ঢাকার দৈনিক বাংলায়।
যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা
করা নিয়ে শেখ মুজিবর রহমান যে-আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তা মিথ্যে হয়নি।
তাঁর ঘোষিত সাধারণ ক্ষমা
নিয়ে অনেকের মধ্যে আজও বিভ্রান্তি রয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের
বিষয়টি আলোচনায় আসলে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণাটি বির্তক সৃষ্টি করে
।
এ-ক্ষমা ঘোষণার আওতায় পার পেয়ে
যেতে চায় যুদ্ধপরাধীরা।
কিন্তু বাস্তবে তাদের
পার পেয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই।
দালাল আইন ও
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারী ‘দালাল আইন (বিশেষ
ট্রাইব্যুনাল) আদেশ’ জারী করা হয়।
একই বছরের ৬
ফেব্রুয়ারী, ১ জুন ও ২৯ আগস্ট তারিখে তিন দফা সংশোধনীর পর আইনটি চূড়ান্ত হয়।
দালাল আইন জারীর পর ১৯৭৩
সালের ৩০ নভেম্বর
পর্যন্ত সারা দেশে ৩৭ হাজার ৪৭১
দালালকে গ্রেফতার করা হয়।
৭৩টি বিশেষ
ট্রাইব্যুনালে এদের বিচার কাজ চললেও ২২ মাসে মাত্র ২ হাজার ৮৪৮টি মামলার বিচার
সম্পন্ন হয়।
এ-রায়ের মাধ্যমে ৭৫২ জন বিভিন্ন মেয়াদে
দণ্ডিত হন।
১৯৭৩ এর ৩০ নভেম্বর
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়।
এ-ঘোষণার মাধ্যমে ২৬
হাজার ব্যক্তি
মুক্তি পান।
বাকীদের বিচার অব্যাহত থাকে।
সাধারণ ক্ষমার প্রেস-নৌটে
স্পষ্ট ভাবে বলা
হয়, ‘ধর্ষণ.
খুন, খুনের
চেষ্টা, ঘর-বাড়ী
অথবা জাহাজে অগ্নি সংযোগের দায়ে দণ্ডিত
ও অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন
প্রযোজ্য হবে না।’
এরপরও বার-বার উদ্ধৃত হয় সাধারণ ক্ষমার কথা।
করা হয় অপব্যাখ্যা।
শুধু
দালাল আইন নয়, আরও কিছু আদেশ জারী করা হয় সে-সময়ে।
নিজ-নিজ জেলা আদালতে
গোলাম আজম ও তার সঙ্গীদের হাজির হওয়ার নির্দেশ জারী হয় ১৯৭২ এর ১৪ ফেব্রুয়ারী
।
একই বছরের ১৫
ডিসেম্বরে
জারী করা হয় বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন।
এরপর ১৯৭৩ সালের ১৮
এপ্রিল
গ্যাজেট-বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গোলাম আজমদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়।
এর আগে ১৯৭২ সালের ৪
নভেম্বর সংবিধানের ১২ ও ৩৮ অনুচ্ছেদ মোতাবেক ধর্ম নিয়ে রাজনীতি রহিত করা হয়।
একটা চলমান প্রক্রিয়ার
মধ্য দিয়ে অব্যাহত
থাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম।
গোলাম আজমরা এ-সময় দেশ
ছেড়ে পালিয়ে যান।
শুধু পালিয়ে যাওয়া নয়, অভিযোগ
আছে বাইরে বসে দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র্র অব্যাহত রাখেন।
আইন বাতিল ও
বিচার প্রক্রিয়া থেমে যাওয়া
১৯৭৫ এর
১৫ অগাস্ট
শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্যে দিয়ে পাল্টে যায় বাংলাদেশের রাজনীতি।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে
সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন
জিয়াউর রহমান।
১৯৭৫ এর ৩১
ডিসেম্বর
জেনারেল জিয়া সামরিক অধ্যাদেশ জারী করে দালাল আইন বাতিল করেন।
থেমে যায় যুদ্ধাপরাধের
বিচার কার্যক্রম।
শেখ মুজিবর রহমান সরকারের জারী
করা আইনগুলো একের পর এক অধ্যাদেশ জারী মধ্য দিয়ে রহিত করা হয়।
১৯৭৬
সালে 'Second
proclamation order no. 2 of 1976'
জারী করে ধর্ম-ভিত্তিক
রাজনীতি করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাদি তুলে দেয়া হয়।
১৯৭৬ এর ১৮ জানুয়ারী
নাগরিকত্ব
ফিরে পাবার জন্য মন্ত্রণালয়
থেকে আবেদন করতে বলা হয় গোলাম আজমকে।
এছাড়াও
'proclamation
order no. 1 of 1977'
দ্বারা সংবিধানের ১২ নম্বর
অনুচ্ছেদ তুলে দেয়া হয়।
মার্শল ল'র
আওতায় এসব অধ্যাদেশ জারী করে জেনারেল জিয়ার সরকার।
এসব অধ্যাদেশে
স্বাক্ষর
করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম।
আন্তর্জাতিক
অঙ্গনে যুদ্ধাপরাধের বিচার
যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারটি প্রাচীন-কাল থেকেই
চালু
আছে।
গ্রীক
পুরানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিবরণ
আছে।
মধ্যযুগেও বিচারের নমুনা রয়েছে।
১৪৭৪ সালে হাগেনবাখের
স্যার পিটারকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড
দেয়া হয়েছিলো।
১৮১৫ সালে পরাজিত ফরাসী সম্রাট
নেপোলিয়ানকে অপরাধী ঘোষণা করে বৃটিশ সরকারের কাছে তুলে দেয় ভিয়েনা কংগ্রেস।
পরে তাকে সেইন্ট
হেলেনা দ্বীপে নির্বাসন দেয়া হয়েছিলো।
প্রথম
বিশ্বযুদ্ধের জন্য দায়ী জার্মানদের বিচারের দায়িত্ব জার্মান সরকারের ওপর ন্যস্ত করে
মিত্র শক্তিসমূহ।
১৯২০ সালে ৪৫টি মামলার
দায়িত্ব নিয়ে ১২ জনের বিচার করে জার্মানী এবং ছ'জনকে মৃত্যুদণ্ড
দেয়।
এ-বিচার ‘লাইপজিগ ট্রায়াল’ নামে
পরিচিত।
যুদ্ধাপরাধীদের লঘুদণ্ড
প্রদানের কারণে
এ-রায় মেনে নেয়নি মিত্র শক্তি।
মিত্র দেশগুলো নাৎসি
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৪৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল মিলিট্যারী ট্রাইবুন্যাল গঠন
করে।
এটা নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল
নামে পরিচিত।
জাপানের যুদ্ধপরাধীদের বিচারের
জন্য গঠিত হয় টোকিও ট্রাইবুন্যাল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
যুদ্ধাপরাধীদের এখনও যেখানে পাচ্ছে, সেখানে থেকে ধরে আদালতে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে।
দেশে-দেশে
যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির অনেক নমুনা রয়েছে।
হিটলারের সহযোগী আইখম্যানকে
১৯৬২ সালে আর্জেটিনা
থেকে ধরে বিচারের কাঠগড়ায় আনা হয়।
১৯৯০ সালে বসনিয়া,
ক্রৌয়েশিয়া ও কসোভোয় গণহত্যার
জন্য মিলেসোভিচকে ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের সামনে দাঁড় করানো
হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের এ-দীর্ঘ ইতিহাসে শুধু পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।
মোহাম্মদ
আরিফুজ্জামান ও সৌরভ রহমান
আপলৌডঃ
১৬ ফেব্রুয়ারী
২০০৯ |