|
বাংলাদেশের খুলনায় আহমদীয়া মসজিদে গ্রেনেড
হামলার
সাক্ষ্যঃ জবানবন্দি-১
-
আবুল হোসেন খোকন
[১৯৯৯ সালের
৮ অক্টোবর বাংলাদেশের ইসলামী জঙ্গিরা খুলনার আহমদীয়া মসজিদে জুম্মার নামাজের সময়
বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলো।
এ-হামলায় নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় নিহত হয়েছিলেন ৬ জন এবং আহত হয়েছিলেন ৩০ জন।
এ-ঘটনার পর সরকারী মহল থেকে তদন্ত হয়েছিলো, হামলাকারীদের চিহ্নিতও করা হয়েছিলো।
কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর ফলে ওই
বোমা হামলাকারীদের ব্যাপারে পরবর্তী-কালে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ-প্রেক্ষাপটে বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে গঠিত হয় গণতদন্ত কমিটী।
এ-কমিটী থেকে একটি দল ২০০৫ সালের ২৭ মে খুলনার আহমদীয়া মসজিদে বোমা হামলার ব্যাপারে
গণতদন্ত চালায়।
এ-সময় সাক্ষ্য নেয়া হয় হামালার শিকার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের।
এ-সাক্ষ্য নিয়েছিলেন তদন্ত টীমের প্রধান বিচারপতি কেএম সোবহান এবং সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ
করেছিলেন লেখক-সাংবাদিক আবুল হোসেন খোকন।
সাক্ষ্য গ্রহণের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক কূটনীতিক ও কলাম লেখক মহিউদ্দিন
আহমেদ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটীর সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল ও কাজী
বিপ্লব।
খুলনা শহরে অবস্থিত আহমদীয়া মসজিদ কমপ্লেক্সে এ-সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছিলো।
দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৪ বছর পর অপ্রকাশিত ১৩ জনের সাক্ষ্য সম্বলিত একটি প্রতিবেদন
ইউকেবেঙ্গলির জন্য পাঠিয়েছেন আবুল হোসেন খোকন।
পাঠকদের জন্য এটি আমরা সিরিজ আকারে প্রকাশ করছি]
জবানবন্দি-১
[মোহাম্মদ নুরুল্লাহ]
বিচারপতি কে
এম সোবহানঃ আপনার নাম?
উত্তরঃ
মোহাম্মদ নুরুল্লাহ।
প্রশ্নঃ
পিতার নাম?
উত্তরঃ মৃত
আফসার উদ্দিন।
প্রশ্নঃ
আপনার পেশা?
উত্তরঃ
চাকুরি।
প্রশ্নঃ
আপনার ঠিকানা?
উত্তরঃ
কোর্ট কলোনী, খালিশপুর, খুলনা।
প্রশ্নঃ
আপনি ঘটনার দিন কোথায় ছিলেন?
উত্তরঃ
মসজিদে প্রথম কাতারের দক্ষিণ পাশে।
প্রশ্নঃ
আপনার ডান পাশে বাম পাশে যারা আহত হয়েছিলেন, তাদের কথা আপনার মনে পড়ে?
উত্তরঃ আমার
ডান পাশে মরহুম আবদুস সোবহান ছিলেন।
উনি
ইন্তেকাল করেছেন।
এ-(বোমা বিস্ফোরণ) ঘটনায় উনি শহীদ হয়েছেন।
আমি
আহত হয়েছিলাম।
প্রশ্নঃ
ঘটনার সময় আপনি বোমাটি দেখেছিলেন? অর্থাৎ, যেটা রাখা ছিলো সেটার প্রতি আপনার দৃষ্টি
আকর্ষিত হয়েছিলো?
উত্তরঃ আমার
দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছিলো।
৮-১০-৯৯ তারিখে আমাদের জামাতের একজন শিক্ষক শেখ আবদুল ওয়াদুদের এ-দিন বিদায়
অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিলো।
মসজিদে আমাদের যার যার পারসোনাল কিছু জিনিস-পত্র যেমন কাগজ-পত্র, বই-পত্র, কারো
কারো টিফিন-ক্যারিয়ার সব সময়ই থাকতো।
এ-দিন আমার কাছেও একটি টিফিনবক্স ছিলো এবং একটা ব্যাগও ছিলো।
আরও
অনেকের কাছেই এরকম অনেক কিছু থাকতো।
এগুলো নামাজের সময় সামনে রাখা হতো।
সেদিন এরকম অনেক কিছুর মধ্যে একটা প্যাকেটে উপর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ হয়।
সেটা
ছিলো একেবারে ওয়েল-ডিজাইনড, থিন পেপারে মোড়ক করা ছিলো - আকর্ষণীয়।
প্রশ্নঃ
সেটার রং কী ছিলো?
উত্তরঃ
প্রেজেনটেশনের জন্য যেরকম ওয়েল-ডিজাইনি হয় সে-রকম থিন পেপারের মোড়ক।
এটা
আমি দেখেছি তখন সম্ভবতঃ একটা পাঁচ-টাচ বাজে।
প্রশ্নঃ
ওটার সাইজ কী-রকম ছিলো?
উত্তরঃ ওটা
আঁড়ে হয়তো ৬-৭ ইঞ্চি, আর হাইট ৮-১০ ইঞ্চির মতো হবে।
আমি
ধারণা করেছিলাম আমাদের শিক্ষকের (আমরা মোয়াল্লেম বলি) তো আজ বিদায় অনুষ্ঠান,
আগামীকালই উনি চলে যাবেন।
৯-১০-৯৯ তারিখে ওনার চলে যাবার কথা।
৮-১০-৯৯ তারিখে ওনার একটা ফেয়ারওয়েল ছিলো, নামাজের পরে।
আমি
মনে করেছিলাম, ওনার জন্যই বোধহয় এ-প্রেজেনটেশনটা কিনে এনে রাখা হয়েছে, নামাজের পরেই
হয়তো আমরা সেটা জানবো বা দেখবো।
আমার
যতোদূর খেয়াল হয়, ১টা ২০/৩০-এর দিকে বোধহয় আমার একটু ঝিমুনি এসে গিয়েছিলো, আবার
সজাগও হচ্ছি, এরকম অবস্থা।
এদিকে খুৎবা চলছে।
আমাদের খুৎবা নরম্যালী শুরু হয় ১টায়, সম্ভবতঃ ওইদিন ১টাতেই শুরু হয়েছিলো, ২/১ মিনিট
আগে-পরে হতে পারে।
মওলানা ইমদাদুর রহমান সিদ্দিকীর (উনি আমাদের ধর্মপ্রচারক, আমরা তাঁকে মোবাল্লেক
বলি) খুব গুরুত্বপূর্ণ খুৎবা হচ্ছিলো।
উনিই
এদিন খুৎবা দিচ্ছিলেন এবং নামাজ পড়াচ্ছিলেন।
খুৎবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমার শরীর কিছুটা অসুস্থ ছিলো, চিনচিন করে মাথা
ঘুরছিলো, সে-কারণেই ঝিমুনি এসে গিয়েছিলো।
ওই
অবস্থায় যতোদূর সম্ভব ১ টা ২০-এর দিকে ওই প্যাকেটার ওপর আবার একটু নজর পড়ে।
তখন
দেখলাম থিন পেপারের কোণাটা ছিঁড়ে গেছে এবং বাতাসের কারণে সেটা শব্দ করছে।
তখন
সামনেই থাকা আমাদের ডাক্তার আবদুল মাজেদ সাহেব (আমি তাঁর থেকে ৫/৬ জন দক্ষিণে/বামে
ছিলাম) তাঁর চোখের চশমাটা খুলে যে-জায়গাটায় পতপত শব্দ করছিলো, সেই ছেঁড়া জায়গাটায়
রাখলেন।
তখন
সময় ১টা ২০ থেকে ১টা ২৫ হবে।
চশমা
রাখার ফলে পতপত শব্দ আর হলো না।
এরপর
আরও ৫/৭ মিনিট গেল।
তারপর ঘটনা যখন ঘটেছে তখন আমার সেন্স ছিলো আবার ছিলোও না, কারণ ফিজিক্যালী আমি ৮
জায়গায় আহত হই।
প্রশ্নঃ
বোমা ফাঁটার ঠিক আগ মুহূর্তে আপনি কী শুনলেন? আওয়াজ?
উত্তরঃ
জ্বী, আওয়াজ শুনলাম।
তখন
সময় সম্ভবত ১টা ৩০ থেকে ৩৫/৩৬।
প্রশ্নঃ কী
রকম আওয়াজ হলো?
উত্তরঃ
আওয়াজটা খুব বিকট হয়েছে, কিন্তু আমি অতোটা ফীল করতে পারিনি।
যেহেতু আমি উন্ডেড হয়ে যাই।
আমি
শুধু ফীল করলাম যে, মাথার ওপর থেকে একটা ফ্যান ছুটে আমার গায়ের ওপর পড়লো।
কিছু-যে আমার গায়ের ওপর পড়লো, এটা আমি বুঝতে পারলাম।
প্রশ্নঃ
আপনার কোথায় কোথায় লেগেছিলো?
উত্তরঃ আমার
ডান হাতে, এ-জায়গায়, এখানে পুরো গর্ত হয়ে গিয়েছিলো।
আমার
পায়ে আঘাত আছে, শরীরের ভিতরে ৪/৫ জায়গায় আঘাত আছে।
একটা
স্প্লিন্টার আমার শরীরে আটকে ছিলো (আঁড়ে আধা ইঞ্চি
লম্বায়
এক ইঞ্চি),
যখন অপারেশন করা হয়, তখন ওটা বের করে আমার কাছে সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম (বছর খানেক
আগে বাসা শিফ্ট করার সময় অবশ্য ওটা হারিয়ে গেছে)।
প্রশ্নঃ ওটা
লোহার ছিলো?
উত্তরঃ
ইস্পাতের হবে।
খুব
শক্ত ছিলো।
প্রশ্নঃ
আপনি মোট কয় জায়গায় আঘাত পেয়েছিলেন?
উত্তরঃ মোট
৮ জায়গায়।
প্রশ্নঃ
আপনাকে হাসপাতালে কে নিয়ে গেলো?
উত্তরঃ আমি
যখন আহত হলাম, তখন পুরো মসজিদ তো অন্ধকার, চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম না, কানেও শুনতে
পাচ্ছিলাম না, কারণ কানও এ্যাফেকটেড হয়ে যায়।
তাই
কিছু বুঝতে না পারলেও আইডিয়া করছিলাম কোথাও কোনো ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট হয়েছে,
যে-কারণে ফ্যান খুলে পড়েছে আমার মাথায় বা ঘাড়ে।
প্রশ্নঃ
বোমা ফাঁটার পর দেয়ালে আপনি গর্তটি দেখতে পেয়েছিলেন?
উত্তরঃ না,
তখন আমি কিছুই দেখিনি।
আমাদের যে-দুটো লোক মারা গেছে, তাও আমি দেখিনি।
আমি
শুধু এইটুকু শুনছিলাম যে, হইহট্টগোল হচ্ছে, চিৎকার হচ্ছে এ-বলে যে, বোমা ছুঁড়ে
মেরেছে।
এটা
আমি কানে শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু বোমা ছুঁড়ে মেরেছে না কী হয়েছে, আমি বুঝতে পারিনি।
প্রশ্নঃ
এ-অবস্থায় জ্ঞান ছিলো তখন?
উত্তরঃ
জ্বী, আমার জ্ঞান ছিলো।
প্রশ্নঃ আর
কিছু বলতে পারবেন ঘটনা সম্পর্কে?
উত্তরঃ আমার
কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এইটাই যে, আমি প্যাকেটটা দেখেছিলাম ওয়েলডিজাইন থিন পেপারে
মোড়ক করা।
বিস্ফোরণের পর আমি কিছুই চোখে দেখছিলাম না।
অন্ধকার।
এদিকে আহত হয়েছি বলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও দাঁড়াতে পারছিলাম না।
তখন
বসে-বসে এগুনোর চেষ্টা করছিলাম।
কে
যেনো আমার ঘাড়ের ওপর দিয়ে চলে যায়, এতে আমি ঘাড়ে ব্যাথা পাই।
আমি
পড়েও যাই।
আবার
উঠে পড়ি।
দরজা
কোথায় আমার ধারণা ছিলো।
সেই
সোজা এসে আমি আলো দেখি।
তখনই
আমি আলো সম্পর্কে সজাগ হই, বাইরেটায় আলো ছিলো।
এ-অবস্থায় আস্তে-আস্তে আমি সব দেখতে পেলাম।
দেখলাম দরজাটা পড়ে আছে।
দরজার ওপর দিয়ে আমি কষ্ট করে দাঁড়ালাম।
এরপর
ডরমেটরী রুমে এসে আহত জায়গায় বাঁধা-ছাদার চেষ্টা করতে থাকি।
হাতের আঘাতটা চোখে পড়ে আগে।
সেটাই বাঁধার চেষ্টা করি, কিন্তু বাঁধতে পারিনি।
এ-সময় তাকিয়ে দেখি, শহীদ নামে আমাদের একজন টেলিফৌন করছে।
তখন
আমি বুঝতে পারি যে, ব্যাপার গুরুতর।
নিশ্চয়ই আমার চেয়েও অন্যদের বেশিকিছু হয়েছে।
চিৎকার-আহাজারি শুনতে পাচ্ছিলাম।
তাতে-করে বুঝতে পারছিলাম, ব্যাপার খুবই গুরতর - হয় বোমা মেরেছে অথবা পেতে রেখেছিলো।
বোমার ব্যাপারটা তখনই আমার আইডিয়ায় আসে।
আর
তখনই আমার ব্রেইনে ক্লীয়ার হয় যে, প্যাকেটটা আমি দেখেছি সেটা প্রেজেনটেশন ছিলো না,
ওটাই ফেঁটেছে।
প্রশ্নঃ
আপনি যখন বাইরে এলেন তখন কি বহিরাগত কাউকে দেখেছিলেন?
উত্তরঃ না,
তখনও কাউকে দেখিনি।
ডরমেটরীতে আসার পর আমার মেয়ে-স্ত্রী এঁদের খোঁজ করছিলাম।
প্রশ্নঃ
আপনার পরিবারও মসজিদে ছিলো?
উত্তরঃ
হ্যাঁ, তারাও নামাজ পড়তে মসজিদে ছিলো।
এরপর
ছেলে কাছে আসলে আমাকে খালিশপুর ক্লিনিকে নিয়ে যেতে বলি (ওটার মালিক আমার বিয়াই)।
এ-সময় আর কার কী অবস্থা জানতে চাইলে কোনো ছেলে যেনো বলেছিলো, 'খুব সিরিয়াস অবস্থা,
এখন আপনি এসব শুনেন না, আগে জীবন বাঁচান, পরে সব শুনবেন।'
প্রশ্নঃ
আপনার ছেলেরা কেউ আহত হয়নি?
উত্তরঃ না,
ছেলেরা কেউ আহত হয়নি।
শুধু
ছোটো ছেলে সামান্য আঘাত পেয়েছিলো।
প্রশ্নঃ ওরা
কোথায় ছিলো?
উত্তরঃ ওরা
দু-তিন কাতার পিছনে ছিলো।
প্রশ্নঃ আর
কিছু জানেন?
উত্তরঃ
প্রথমে আমি আহতর ঘটনা ছাড়া কিছুই জানতে পারিনি।
কেউ-যে মারা গেছে, তাও জানতে পারিনি।
প্রশ্নঃ
পুলিস আসতে দেখেননি?
উত্তরঃ না,
দেখিনি।
যখন
আমাকে বাইরে বের করে ক্লিনিকের পথে নেয়া হচ্ছিলো, তখন দেখেছিলাম বাইরে অসংখ্য লোকের
ভীড়।
প্রশ্নঃ
ঘটনার কতোক্ষণ পর আপনি বের হয়ে গিয়েছিলেন?
উত্তরঃ
অন্ততঃ বারো মিনিট পর।
আপলৌডঃ ৩ ফেব্রুয়ারী ২০০৯
জবানবন্দি-১ (শেখ
আব্দুল ওয়াদুদ) আগামী কাল |