|
বই আলোচনাঃ
মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত
প্রতিচ্ছবি
জাহাঙ্গীর
নকীর
মুক্তিযুদ্ধের
উপেক্ষিত বীর যোদ্ধারা।
সম্পাদনাঃ
মিনার মনসুর;
সহযোগী সম্পাদকঃ
কুমার প্রীতীশ বল,
মামুন সিদ্দিকী;
প্রকাশকঃ
অনুপম প্রকাশনী;
প্রকাশকালঃ
ফেব্রুয়ারী
২০০৮,
প্রচ্ছদঃ
ধ্রুব এষ;
পৃষ্ঠাঃ
১৫৯,
মূল্যঃ
দুশো
টাকা।
বাঙালির
সহস্র বছরের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য অর্জন মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যাপক
লেখালেখি হলেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে বিভিন্নভাবে।
কয়েকদফায়
মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন করতে গিয়ে প্রকৃত যোদ্ধাদের খুঁজে বের করা দুরূহ হয়ে
উঠেছে।
ফলে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস
আমরা আজ হারাতে বসেছি।
অথচ জাতীয় মুক্তির জন্যে
ইতিহাস পাঠ খুব জরুরি।
সত্যি আমরা দুর্ভাগা
জাতি।
পৃথিবীর ইতিহাসের এমন অনন্য
সাধারণ অর্জনকেও সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারিনি।
বেসরকারী
উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সংগঠন এডাব একটি উদ্যোগ হাতে নিয়েছিলো
১৯৯৭ সালে।
এই সংস্থাটি তৃণমূল
পর্যায়ের প্রায় দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাকে সংবর্ধিত করেছিলো।
সে-সব
মুক্তিযোদ্ধার অভিজ্ঞতার লিখিত সাক্ষাৎকারই মুক্তিযুদ্ধের উপেক্ষিত বীর যোদ্ধারা
গ্রন্থটির উপজীব্য।
আমরা
জানি,
মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা
শেখ মুজিবুর রহমানকে এখনও মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডারের সম-পর্যায়ে
নামিয়ে আনার ধৃষ্টতা দেখান কেউ-কেউ।
অথচ তৃণমূলের অকুতোভয়
মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতৃত্বের প্রশ্নে শেখ মুজিবুর
রহমান ছাড়া অন্য কারও
নাম একবারও উচ্চারণ করেননি।
তাতে মুক্তিযুদ্ধের
প্রকৃত সত্য ধরা পড়ে।
৭৫ পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পট
পরিবর্তনে বারবার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-বিরোধী
অপশক্তি।
কখনো সামরিক লেবাসের সাথে,
কখনও
জোটবদ্ধ হয়ে।
তারা দেশী-বিদেশী
nxb-স্বার্থ
চরিতার্থ করতে
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বারংবার কলঙ্কিত করেছে।
এমনকি আলোচ্য গ্রন্থটি
প্রণয়নের সময়ও বহুবার ব্যাঘাত সৃষ্টি করা হয়েছে।
গ্রন্থটির সম্পাদকীয়তে
তা স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছে।
গ্রন্থটির মুখবন্ধ
লিখেছেন অধ্যাপক ডঃ
আনিসুজ্জামান।
তিনি যথার্থই লিখেছেন,
অসংখ্য সাধারণ মানুষের
অকৃপণ প্রয়াসে ও অপরিসীম আত্মত্যাগে মুক্তিযুদ্ধে আমরা বিজয় লাভ করেছিলাম।
দুঃখের বিষয় ইতিহাস
সাধারণত জনসাধারণের প্রয়াসকে উপেক্ষা করে এসেছে এবং একথা কমবেশি সকল দেশের ইতিহাস
সম্পর্কে সত্য।
এমন অবজ্ঞার বিরুদ্ধেও গড়ে
উঠেছে সচেতনতা,
চেষ্টা হয়েছে ভ্রম সংশোধনের,
এ-গ্রন্থটি
তার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।
গ্রন্থটি সম্পর্কে এটিই
খাঁটি কথা।
মুক্তিযুদ্ধের
উপেক্ষিত বীর যোদ্ধারা
গ্রন্থে ১৪৩ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার সন্নিবেশিত হয়েছে,
যারা বিভিন্ন জেলা,
শ্রেণী ও পেশার শুধু নয়,
সকল ধর্মের প্রতিনিধি।
আদিবাসী ও নারী
মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন।
এরা দেশের প্রত্যন্ত
অঞ্চলে বাস করেন এবং আর্থিকভাবে কেউ
স্বচ্ছল নন।
এ-গ্রন্থে যে-মতামত
প্রতিফলিত হয়েছে,
তা একদেশদর্শী নয়,
বহু ভঙ্গিম এবং সার্বিক
পরিচয়বাহী।
দশটি প্রশ্নমালার আলোকে এ-সাক্ষাৎকার
গৃহীত হয়েছে।
প্রশ্নমালা মুক্তিযুদ্ধের
স্বপ্ন, যুদ্ধ-কালীন
সময়ের প্রেক্ষাপট এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সার্বিক চিত্র বিষয়ক।
বস্তুতঃপক্ষে,
এ-গ্রন্থের
মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন
বিবৃত হয়েছে,
যুদ্ধ-কালীন
পরিস্থিতি সংক্ষিপ্তভাবে হলেও প্রমূর্ত হয়েছে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের চিত্রও
আমাদের সামনে ভেসে ওঠে।
একজন সাক্ষাৎকারদাতা যখন
সংক্ষিপ্তভাবে হলেও তার স্মৃতি ও মতামত ব্যক্ত করেন তখন ইতিহাসের আয়নায় তা
প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
গ্রন্থের
সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণে দেখা যায়,
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা
৭১এর স্বপ্ন
বাস্তবায়ন দেখতে পাননি।
বরং মুক্তিযুদ্ধের
বিরোধী অপশক্তির শিবিরে
পৌঁছেচে
রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা।
আর বঞ্চিত হয়েছেন
রণাঙ্গনের বীর সেনারা।
কিন্ত এসব বীর সেনাদের
কাউকে হতাশার কথা ব্যক্ত করতে দেখা যায়নি।
উপরন্তু এরা প্রত্যেকে
এখনো স্বপ্ন
দেখেন সুন্দর একটি রাষ্ট্রের,
যা ছিলো
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফসল।
আর এ-চেতনাকে
কাজে লাগাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে ব্যাপক কাজ হওয়া দরকার বলে মনে করি।
সাক্ষাৎকারগুলো বিশ্লেষণ করে গ্রন্থের ভূমিকায় সার্বিক বিষয় চমৎকারভাবে তুলে ধরা
হয়েছে।
প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তরের
সারাৎসার উল্লেখ করা হযেছে।
এর আলোকে সিদ্ধান্তে
উপনীত হওয়া গেছে।
তাই গ্রন্থের ভূমিকাংশটি পড়লে
বইটির মূল-সুর ভেসে ওঠে পাঠকের মানসপটে।
তাতে গ্রন্থের
সম্পাদকমণ্ডলীর যত্নশীলতা ফুটে উঠেছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের
গবেষকদের জন্য এই গ্রন্থ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হবে।
মুক্তিযোদ্ধাদের
আলোকচিত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গনের বিশেষ মুহূর্তের কিছু ছবি সংযোজন করা হলে
গ্রন্থটি আরও
প্রাণবন্ত হতো নিঃসন্দেহে।
প্রকৃত
মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে এখনও
বেঁচে আছেন।
তাদের কাছ থেকে
মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার চিত্র জানা সম্ভব।
কয়েক বছর পর হয়তো
হাজার চেষ্টা করেও তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তাই যতো
দ্রুত সম্ভব সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় আলোচ্য গ্রন্থটি একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
এ-জন্য
সম্পাদকমণ্ডলীকে ধন্যবাদ জানাই।
সুন্দর,
নির্ভুল
ছাপা,
বাঁধাই ও আঙ্গিকশৈলী গ্রন্থটিকে
মর্যাদাবান করেছে।
গ্রন্থটির বহুল প্রচার
কামনা করি।
জাহাঙ্গীর নকীরঃ
কর্মকর্তা,
সামাজিক উন্নয়ন বিভাগ,
হীড বাংলাদেশ,
ঢাকা
আপলৌডঃ ৩১
জানুয়ারী ২০০৯ |