|
নতুন সরকারের প্রথম এজেন্ডা হোক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
চিররঞ্জন সরকার
২৯
ডিসেম্বর
২০০৮-এ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ
নির্বাচনে এক অভূতপূর্ব গণম্যান্ডেট দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ।
এ-বিজয়
আওয়ামী লীগ বা
মহাজোটের যতখানি তার চেয়ে বেশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার।
তা না হলে এমন অকল্পনীয়
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ছিল অসম্ভব।
মহাজোট অবশ্যই বিজয়ী হতো।
কারণ চারদলীয় জোট শাসনের
পাঁচ বছরে যে নৈরাজ্য,
দুর্নীতি,
লুটপাট আর
ক্ষমতার নজিরবিহীন অপব্যবহার হয়েছে,
তাতে সারাদেশের
সাধারণ মানুষ ক্ষোভে উত্তপ্ত ছিল ভেতরে ভেতরে।
তবে এতবড়
মহা-বিজয়ের
পেছনে আরো বড় কারণ
চারদলীয় জোটে স্বাধীনতা
বিরোধী
একাত্তরের ঘাতক দালাল জামায়াতের
অন্তর্ভুক্তি।
এর যথেষ্ট কারণ আছে।
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন
‘সেক্টর
কমান্ডারস ফোরাম’
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটি
গণদাবিতে পরিণত করেছিল।
নব্বইয়ে এরশাদ সরকারের
পতনের পরও এদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে জেগে উঠেছিল
বাংলাদেশ।
তার মৃত্যুর পর সে আন্দোলন নানা
কারণে স্তিমিত হয়ে যায়।
কিন্তু চারদলীয় জোট
সরকারের দুই রাজাকার মন্ত্রী এবং তাদের দোসররা যখন প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে বলা শুরু
করে,
এ দেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি,
হয়েছে গৃহযুদ্ধ-
তখন তা মুক্তিযোদ্ধাদের শরীরে আগুন জ্বেলে দেয়।
যুদ্ধাপরাধী বলে কেউ এ
দেশে নেই,
এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তিও তারা
করেছে।
এমনকি ভারতে যারা ট্রেনিং নিতে
গিয়েছিল একাত্তরে,
সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের
চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করেও তারা অশ্লীল মন্তব্য করেছিল।
ফলে রুখে দাঁড়ানো ছাড়া
মুক্তিযোদ্ধাদের আর কোনো পথ ছিল না।
সেক্টর
কমান্ডারস ফোরামের নেতারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল,
পেশাজীবী সংগঠন,
সুশীল সমাজ,
সাংস্কৃতিক
সংগঠনসহ সমাজের বিভিন্ন স্তর ও পেশার মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় করেন।
বিভাগীয় এবং জেলা
শহরগুলোতে গিয়েও তারা মতবিনিময় করেন।
সর্বত্রই যুদ্ধাপরাধীদের
বিচারের দাবিতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়।
টেলিভিশন,
সংবাদপত্রসহ
গণমাধ্যমগুলো বিপুল জনমত তৈরি করে এ দাবির পক্ষে,
যা সারাদেশে একটা
বিরাট আলোড়ন জাগায়।
ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা অনুষ্ঠান প্রচার করতে থাকলে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের
সঠিক ইতিহাস জানতে থাকে।
ফলে এ প্রজন্ম
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হতে শুরু করে।
মুক্তিযুদ্ধকালে দখলদার
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার,
আলবদর,
আলশামস ও শান্তি
কমিটির সদস্যদের মানবতাবিরোধী গণহত্যা,
ধর্ষণ,
জ্বালাও-পোড়াও ও
নির্যাতনমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি প্রজন্মের মধ্যে চরম ঘৃণা পুঞ্জীভূত হতে থাকে।
প্রজন্ম নীরবে
স্বাধীনতাবিরোধী
জামায়াত এবং তাদের সহযোগী
সংগঠনগুলোর বিপক্ষে অবস্থান নিতে শুরু করে।
বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও
আলোচনা সভা থেকে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত হয়ে যুদ্ধাপরাধীমুক্ত
দেশ গড়ার আহ্বান জানানো হয়।
এ ব্যাপারে অকল্পনীয়
সাড়া পড়ে।
জোট
সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে জঙ্গি ধর্মান্ধ তালেবান গোষ্ঠী দেশে চরম শক্তি অর্জন করে
চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাঙালির আবহমানকালের লালিত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ওপর- যা
ধর্মানুরাগী কোনো মানুষই ভালো চোখে দেখেনি।
দেশের ৬৪টি জেলা সদরের
মধ্যে ৬৩টিতেই তারা একযোগে বোমা বিস্ফোরণের মহড়া দেয়।
রমনার বটমূলে নববর্ষের
অনুষ্ঠানে বোমা হামলা,
বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে
আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে গ্রেনেড হামলা,
হজরত শাহজালালের
(রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে গ্রেনেড হামলাসহ অসংখ্য জঙ্গি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিএনপি
নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গণঘৃণার মুখে পড়ে।
দেশপ্রেমিক জনতা এসব
ঘৃণিত কর্মকাণ্ডের সঠিক উত্তর দেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকে।
এবারের নির্বাচনে
উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হচ্ছে মোট ভোটারের ৩৩ শতাংশই ছিল তরুণ ভোটার- যারা প্রথমবারের
মতো ভোটার হয়েছিল।
গত দু’বছর
সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড,
সংবাদপত্র এবং
ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোর অনবরত প্রচারের মাধ্যমে এরা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস
জানতে সক্ষম হয়।
একইসঙ্গে
স্বাধীনতাবিরোধী
জামায়াতে ইসলামী এবং তাদেরই
সৃষ্ট পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর এদেশীয় দোসর রাজাকার,
আলবদর ও আলশামস
বাহিনীগুলোর বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের কথা জানতে পারে।
সংখ্যায়
দুই কোটির মতো এই নতুন ভোটারের সিংহভাগ যত না আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে,
তার চেয়ে বেশি
ভোট দিয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে।
ফলে নৌকার ভোটসংখ্যা
বেড়েছে অকল্পনীয়ভাবে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়
উজ্জীবিত এ দুই কোটি ভোটার ভোটের সব তথ্যউপাত্ত এবং হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে।
এ কারণে ১৯৭০-এর পর
এবারই আরেক ঐতিহাসিক গণম্যান্ডেট ঘোষিত হয়েছে নির্বাচনে।
এবারের নির্বাচন কোনো
সাধারণ নির্বাচন ছিল না,
এটা পরিণত হয়েছে
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রবল গণরায়ে।
এবারের
নির্বাচনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল নারী ভোটারদের ভূমিকা।
অতীতের দুটি নির্বাচনে
নারী ভোটাররা বিএনপিকেই অধিকসংখ্যক ভোট দিয়েছিলেন।
এবার হয়েছে ঠিক তার
উল্টো।
কারণ জামায়াতিরা নারী অধিকার বা
প্রগতিশীল নারী নীতি-২০০৮-এর বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিল।
ফলে বিপুলসংখ্যক নারী
ভোটার ঘৃণা প্রকাশ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে।
জামায়াতের শরিক দল হওয়ার
কারণে এর প্রভাব পড়েছে বিএনপি ওপরও।
চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতার
বাইরে নিয়ে গিয়েছিল জোট সরকার।
বাজার সিন্ডিকেটের সেই
দুর্নীতির বিরুদ্ধে দরিদ্র জনগোষ্ঠীও এবার নীরব বিপ্লব করেছে ব্যালটের মাধ্যমে।
আওয়ামী
লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে এই সত্যগুলো মনে রেখে মৌলবাদ,
জঙ্গিবাদ এবং
যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতেই হবে।
তা না হলে এই জনগণই আবার
বিদ্রোহ করতে পারে।
কারণ জনগণই যে সবচেয়ে বড়
অস্ত্র,
তা এবার প্রমাণিত হয়েছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন
চারদলীয় জোটের বিরুদ্ধে যেসব কারণে মানুষের এই ক্ষুব্ধ গণরায়,
সেসব কারণ মাথায়
রেখে সরকার যদি দলীয়করণ,
আত্মীয়করণ,
দুর্নীতি,
বিচার ব্যবস্থার
নামে প্রহসন বন্ধ করাসহ দরিদ্র মানুষের কল্যাণের লক্ষ্য নিয়ে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে
উঠতে পারে,
তাহলে একাত্তরের সেই ঐক্যবদ্ধ
বাঙালি আবারো একাত্ম হবে প্রগতিশীল রাজনীতির পক্ষে।
এ দেশে রাজাকার,
আলবদর আর
ধর্মান্ধ রাজনীতির কবর রচিত হবে চিরদিনের জন্য।
মনে রাখা
দরকার যে এবারের নির্বাচনে দেশের মানুষ বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম
স্বাধীনতাবিরোধীদের
বিপক্ষে অবস্থান
নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের
অসাম্প্রদায়িক ও
শোষণহীন প্রগতিশীল সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ভোটদানের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে।
এখন এই জনপ্রত্যাশা পূরণ
করা সরকারের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের
বিচারের প্রথম উদ্যোগ
স্বাধীনতার
পর পরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের
উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল,
যদিও সে উদ্যোগ সফল হয়নি।
১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকে
‘গণহত্যা
তদন্ত কমিশন’
গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এক্ষেত্রে হাইকোর্টের
কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতি বা সমপর্যায়ের কোনো মনোনীত ব্যক্তির নেতৃত্বে
কমিশন গঠন করে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের হাতে ক্ষতিগ্রস্তদের
মৌখিক ও লিখিত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে এই মর্মে ঘোষণা করা হয়।
১০ জানুয়ারী
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিন্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে
স্বদেশে
প্রত্যাবর্তন করেন এবং একই দিন
তিনি রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তার ভাষণে উল্লেখ করেন-
‘বিশ্বকে
মানবেতিহাসের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের তদন্ত অবশ্যই করতে হবে।
একটি নিরপেক্ষ
আন্তর্জাতিকদল এই বর্বরতার তদন্ত করুক এই আমার কামনা।’
তিনি জনসভায় তার
ভাষণে আরো উল্লেখ করেন যে, ‘যারা
দালালি করেছে,
আমার শত শত দেশবাসীকে হত্যা
করেছে,
মা-বোনকে বেইজ্জত করেছে,
তাদের কী করে
ক্ষমা করা যায়,
তাদের কোনো অবস্থাতেই ক্ষমা করা
হবে না,
বিচার করে তাদের অবশ্যই শাস্তি
দেওয়া হবে’ (দৈনিক
বাংলা,
১১ জানুয়ারি,
১৯৭২)।
সেসময় সারাদেশেই অপরাধীদের
বিচারের বিষয়টি গণদাবিতে পরিণত হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি দালাল আইন ১৯৭২ (বিশেষ
ট্রাইব্যুনাল) আদেশ জারি করেন।
এই আদেশ পরবর্তী সময়ে ৬
ফেব্রুয়ারি,
১ জুন ও ২৯ আগস্ট তিন দফা
সংশোধনীর পর চূড়ান্ত হয়।
এই আদেশের ভূমিকায়
উল্লেখ করা হয়েছে- ‘যে
সব ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠানের হয়ে বা ব্যক্তিগতভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরোক্ষ
বা প্রত্যক্ষভাবে গণহত্যা বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতা করেছে এবং অন্যান্য
অপরাধে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে তাদের বিচারের জন্য দ্রুতভাবে বিশেষ
ট্রাইব্যুনালসমূহ গঠন করা হলো।’
এর পর যুদ্ধাপরাধীদের তালিকাও
প্রণয়ন করা হয়।
তাদের অনেককে গ্রেফতারও করা হয়।
গণহত্যা এবং
স্বাধীনতা
বিরোধী ভূমিকার কারণে
স্বাধীনতার
পর ৩৭ হাজার ৪শ ৭১ জন রাজাকার,
আলবদর,
আলশামস ও পাক
সেনাদের সহযোগিকে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
এরমধ্য থেকে ১৮ জনকে
ফাঁসি দেয়া হয়।
অন্য অনেককে বিভিন্ন মেয়াদে
সাজা দেয়া হয়।
সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকে
মন্ত্রীও ছিলেন।
স্বাধীনতাবিরোধী
জামায়াত নেতাদের একাংশ তখন দেশের বাইরে পালিয়ে যায়।
যেমন- গোলাম আযম সৌদি
পালিয়ে গিয়ে প্রবাসীদের পুনরুদ্ধার কমিটি নামে একটি কমিটি করেছিল,
মঈনুদ্দিন পালিয়ে
যায় লন্ডনে,
এরকমভাবে নিজামী,
কামরুজ্জামান,
মুজাহিদ সবাই
অন্যদেশে পালিয়ে যায়।
‘৭৫
এর পট পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমানের সরকার দালাল আইনটি বাতিল করে।
এই সুযোগে যাদের সাজা
হয়েছিল এবং যাদের বিচার চলছিল তারা সকলেই তখন মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে যায়।
সে সময় যুদ্ধাপরাধীরা যেভাবে
রক্ষা পায়
আমাদের দেশে
স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের
বিচার ও শাস্তির দাবিটি যখনই সামনে চলে আসে তখনই দেখা যায় জামায়াত ও বিএনপি চক্রের
পক্ষ থেকে উদাত্ত গলায় বলা হয়,
দেশে কোনো
যুদ্ধাপরাধী বা স্বাধীনতা
বিরোধী
নেই,
তাছাড়া বঙ্গবন্ধু
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে এই ইস্যুটির ইতি টেনে গেছেন।
এই নিয়ে কথা বলা মানে
দেশকে বিভক্ত করা।
স্বাধীনতা-উত্তর
বাংলাদেশে
স্বাধীনতা
বিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের
সাধারণ ক্ষমা এবং মুক্তির বিষয়টি আসলে জামায়াত ও বিএনপি চক্র সবসময়ই বিকৃতভাবে
উপস্থাপন করে।
একথা ঠিক যে,
বঙ্গবন্ধু সাধারণ
ক্ষমা করেছিলেন সাধারণ যুদ্ধবন্দীদের।
হত্যা,
ধর্ষণ,
অগ্নিসংযোগ ও
লুটতরাজ- এই চার শ্রেণীর যুদ্ধাপরাধীদের বঙ্গবন্ধু ক্ষমা করেননি।
৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর
১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর
তৎকালীন প্রধান সামরিক
আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউর রহমান দালাল আইন প্রত্যাহার করে নেন।
ফলে হত্যা,
ধর্ষণ,
অগ্নিসংযোগ ও
লুটতরাজের সঙ্গে জড়িত যুদ্ধাপরাধীরা মুক্তি পেয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধু কখনই এই চার
শ্রেণীর যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেননি।
বরং ঐ সময় এসব অপরাধের
অভিযোগে অনেক যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়াধীন ছিল।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে
দেখা যায়,
জিয়াউর রহমান মুক্তিপ্রাপ্ত
যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতিতেও পুনর্বাসিত করেন।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রাষ্ট্রের দায়
যুদ্ধাপরাধ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে করা হয় না,
করা হয় রাষ্ট্র ও
জাতির বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশ একটি জাতিরাষ্ট্র।
একাত্তরে জামায়াতসহ ঘাতক
দালাল-রাজাকাররা যে অপরাধ করেছে তা করেছে বাংলাদেশ কনসেপ্টের বিরুদ্ধে।
সুতরাং এখন বাংলাদেশ
রাষ্ট্রের দায়িত্ব বিচারের ব্যবস্থা করা।
পৃথিবীর সব দেশে
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি সামষ্টিক বলে এর বিচারের দায়িত্বটি সরকারই গ্রহণ করে।
এ জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন
দেশে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়।
কারণ যুদ্ধাপরাধ হচ্ছে
বিশেষ ধরনের অপরাধ।
প্রচলিত আদালতে প্রচলিত
আইনে সাধারণত কোনো দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয় না।
এটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
স্বীকৃত
বিষয়।
সরকার উদ্যোগী না হলে
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব হয় না।
যুদ্ধাপরাধের প্রথম
ভিকটিম ব্যক্তি হলেও এই অপরাধের চূড়ান্ত ভিকটিম আসলে রাষ্ট্র।
কারণ
তারা ব্যক্তিকে নির্যাতন ও হত্যার মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা পালন করেছে
তৎকালীন মুজিবনগর সরকার ও
স্বাধীনতাকামী
বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জেনেভা কনভেনশন
স্বাক্ষরকারী
দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য
বাধ্যবাধকতা।
এ ব্যাপারে যা কিছু করার
রাষ্ট্রকেই করতে হবে।
আজ ৩৬ বছর পর রাষ্ট্র না
চাইলে কোনো অপরাধীর বিপক্ষেই পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যোগাড় করা কঠিন।
এ জন্য চাই বিশেষ উদ্যোগ,
বিশেষ ট্রাইবুনাল।
এটাকে ফৌজদারি অপরাধ
হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।
ঘাতকরা কাউকে ব্যক্তিগত
শত্রুতার বশে হত্যা করেনি।
তারা তাদের রাজনৈতিক
শত্রু হিসেবেই তা করেছে।
তারা চিরকাল জাতীয় শত্রু
হিসেবেই গণ্য হবে কারণ তারা রাষ্ট্র ও জাতিরই শত্রুতা করেছিল,
তাদের বিরুদ্ধে
দাঁড়িয়েছিল একাত্তরের ২৬ মার্চের পর।
তাই রাষ্ট্র যতক্ষণ না
তাদের বিচারের আয়োজন করছে,
ততক্ষণ রাষ্ট্রই
অপরাধী থেকে যাবে গণহত্যাকারীদের পৃষ্ঠপোষকতার দায়ে।
একাত্তরে যাঁরা শহীদ হয়েছেন,
যাঁরা
বিভিন্নমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন,
ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ,
শ্রেণি-পেশা ও
ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে যাঁরা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেও
যুদ্ধাপরাধের বিচার করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।
এ কথা
অনস্বীকার্য
যে,
যুদ্ধাপরাধীদের
বিচার না করে ইস্যুটিকে ঝুলিয়ে রাখা হলে এটি এদেশের গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ বিকাশের
পথে একটি বড়োসড়ো অন্তরায় হয়ে থাকবে।
বারবারই ইস্যুটি জাতীয়
বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হবে আর প্রকারান্তরে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের আপামর জনসাধারণ।
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা
এখনো বাস্তবায়িত না হওয়ায় নানা বাস্তব মৌলিক সংকটে নিপতিত আজ দেশের মানুষ।
এসব সংকট দূর করে তাদের
সুস্থ-সুন্দর জীবন দেয়া সমাজ-রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কিন্তু এ বিষয়ে পুরোপুরি
মনোযোগী না হয়ে একটি মীমাংসিত ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চালিয়ে যাওয়া শ্রম ও
সময়ের কেবলই অপচয়।
তাই যুদ্ধাপরাধীদের
বিচার নিশ্চিত করে ইস্যুটাকে একেবারেই নিঃশেষ করা দরকার।
যে বিচার প্রতিষ্ঠা করবে
সমগ্র জাতির মর্যাদা ও ন্যায়ের অধিকার।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য
প্রয়োজনে ১৯৭৩ সালের বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রণীত ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইম
(ট্রাইব্যুনাল),
এ্যাক্ট
’৭৩
সক্রিয় করা যেতে পারে।
১৯৭৫ সালের
ডিসেম্বর
মাসে বাতিলকৃত দালাল আইনও
পুনরুজ্জীবিত করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করেন অনেকে।
এটি বাস্তবায়নের জন্য
প্রধান প্রসিকিউটর অফিস বা সংশ্লিষ্ট কমিশন গঠন করা যেতে পারে।
সর্বোপরি অনুসরণ করা
যেতে পারে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল বা কমিশনের
অবকাঠামো।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম,
ওয়ার ক্রাইম
ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন ইতিমধ্যে জানিয়েছে,
তারা দেশের
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কিত গবেষণালব্ধ প্রামাণ্য তথ্যাদি দিয়ে সরকারকে
সহায়তা করিতে সর্বদাই প্রস্তুত।
একথা নির্দ্বিধায় বলা
যায়,
বিলম্বে হলেও দেশ ও জাতি
’৭১-এর
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য একতাবদ্ধ ও দৃঢ় সংকল্প।
এটা যথাযথ এবং সময়োপযোগী
দাবি বলেই মহাজোট এইবারের নির্বাচনী ইশতেহারে তার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে।
অতঃপর আইনানুগ
প্রক্রিয়ায় অচিরেই বিচারকাজ বর্তমান সরকার শুরু করবে বলে সকলেই প্রত্যাশা করে।
চিররঞ্জন সরকারঃ
কলাম লেখক
আপলৌডঃ ২০
জানুয়ারী,
২০০৯ |