বাংলাদেশের বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা ২০০৮

London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

নিও লিবারাল দুনিয়ায় সন্ত্রাসবাদের বীজ এবং আমাদের লড়াইয়ের প্রশ্ন

তানজিনা ফেরদৌস তাইসিন বাধন অধিকারী

লিখতে বসে শিরোনামটা ঠিক করলাম এমন করেকিন্তু শিরোনামে আলোচ্য নয়, এমন একটি বিষয়কে সামনে রেখেই আলাপ শুরু করতে হচ্ছেসেটা হলো মার্কিন নির্বাচন নিও লিবারাল দুনিয়ায় সন্ত্রাসবাদের বীজ রোপিত হয় ঠিক কোন প্রক্রিয়ায়, মার্কিন নির্বাচনকে সামনে রাখলে সেই বীজ রোপনের শর্ত বুঝবার কাজটি সহজ হয়ে ওঠেসুতরাং মার্কিন নির্বাচন দিয়েই শুরু করছি আমরা

ইতিহাসের নজীরবিহীন ঘটনা ঘটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন অশ্বেতাঙ্গ ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বারাক ওবামাবর্ণবাদের চেতনা যে-ভবনটির নামেই প্রকাশিত, আগামী ৪ বছরের জন্য সেই হোয়াইট হাউসের দখলিস্বত্ব পেয়েছেন বারাক ওবামা, যিনি একজন কালো মানুষঘটনাটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে ঘটে গেলোঘটে গেলো  ৬০-এর দশকের ছাত্র আন্দোলন সহ বহু-বহু জন-সক্রিয়তার ফলে অর্জিত শ্রেয়তর চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখ রক্ষা হলো বিশ্ব-চৈতন্যের কাছেআমরাও আনন্দে গেয়ে উঠতে পারলাম কবীর সুমনের গান ‘শান্ত-শীতল-সন্ধ্যে তন্বী গাছের ছায়ায় ঢালো/ রাত্রি নামবে যখন আহা আমার মতোই কালো...’ কিন্তু এ-ঐতিহাসিকতা তখনই কেবল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারতো,যদি বারাক ওবামা নামের এ-অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিটি সমগ্র অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর এবং সাথে-সাথে যাবতীয় শ্রমজীবী-মধ্যবিত্ত মানুষের মতামতের ভিত্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করতেন কিন্তু তার কোনো লক্ষণ আমাদের চোখে পড়েনি নির্বাচনের আগে যে-প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বারাক ওবামা জনগণের কথা-মতো দেশ পরিচালিত হবে বলে নিশ্চয়তা দেবার চেষ্টা করেন, নির্বাচনের পরে সেই প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এমন কিছু শোনাননি যা শ্বেতাঙ্গ দিন শেষ করতে পারে

শোনাতে পারবেন, এমন আশাও আমরা সবাই করিনিমার্কিন নির্বাচন নিয়ে বলতে গিয়ে চৌমস্কী উদ্ধৃত করেছেন থমাস ফার্গুসনের রাজনীতির ‘বিনিয়োগ তত্ত্ব’কে [চৌমস্কী, ২০০৮] ফার্গুসন দেখিয়েছেন কীভাবে ৪ বছর পর-পর নির্বাচনে অর্থলগ্নি ঘটে এবং রাষ্ট্র-পরিচালনায় অর্থ বিনিয়োগকারীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটেপাঠক, আপনি জানেন, তবুও উল্লেখ করবার প্রয়োজন মনে করছি এবারের নির্বাচনে ম্যাককেইনের সাথে-সাথে বারাক ওবামারও নির্বাচনী-ব্যয়ের ৩৬% বহন করেছে ফিনান্সিয়াল কৌর্পোরেশনগুলোসুতরাং স্বভাবতই ‘বিনিয়োগ তত্ত্ব’ বারাক ওবামাকেও দায়বদ্ধ রাখবে ঐ-ফিনান্সিয়াল কৌর্পোরেশনগুলোর কাছে মানে মুনাফাবাজ কৌর্পোরেশনগুলো যেমনটা চায়, তেমন করেই চলবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবরাবরের মতোই উপেক্ষিত হতে থাকবে স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষাখাত, কর্মসংস্থান, শ্রম আইন মানা না মানার প্রশ্ন পররাষ্ট্রনীতিও পাল্টাবে না, কৌশল পরিবর্তিত হতে পারে সর্বোচ্চ ইরাক যুদ্ধ বারাক ওবামার কাছে যতোটা না অমানবিক-অন্যায্য, তার থেকে অনেক বেশি কৌশলগত ভুল হিসেবে প্রতিপন্ন

বস্তুতআমেরিকা সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ের মাঝ দিয়ে বিশ্ব-সন্ত্রাসবাদ জারী রেখেছে সেই শুরু থেকেইসোভিয়েত ইউনিয়ন থাকাকালে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের নাম করে রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়াজোড়া আধিপত্য বজায় রেখেছে দু-পরাশক্তির উভয়ই দেশে-দেশে তাদের আগ্রাসনের যুক্তি হিসেবে হাজির করেছে ঠাণ্ডা যুদ্ধকেসন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধের কালে, মধ্য আমেরিকা আর মধ্যপ্রাচ্যে কী নিদারুণ সন্ত্রাস চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্ররৌনাল্ড রিগ্যানের সে-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিলো দুনিয়া-জোড়া মার্কিন সন্ত্রাসের এক ভয়াবহ নমুনাসেবারই প্রথম শুরু হয় নরম লক্ষ্যবস্তুর উপর আক্রমণচৌস্কী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দলিল-পত্র ঘেঁটে দেখিয়েছেন, স্নায়ু-যুদ্ধ শেষ হবার বহু আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জেনে গিয়েছিলো যে, সৌভিয়েত ইউনিয়ন শেষ, তবু তারা সৌভিয়েতকে ভয়াবহ শক্তিশালী শত্রু হিসেবে জারী রেখেছিলো ৮০র দশকের আগ পর্যন্ত৮০র দশকে রৌনাল্ড রিগ্যান রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হবার পর, যখন সোভিয়েত রাশিয়ার আর কিছুই অবশিষ্ট নাই সেই সময় ঠাণ্ডা-যুদ্ধকে প্রতিস্থাপিত করে রিগ্যান নিয়ে আসেন নতুন প্রত্যয়নতুন নামে আভির্ভূত হয় পুরোনো অধিপতি-মতাদর্শ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধমধ্য-আমেরিকা আর মধ্য-প্রাচ্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া সে-যুদ্ধেমানে সে-সন্ত্রাসী তাণ্ডবে পিষ্ট হয় নিকারাগুয়ানিকারাগুয়ায় সন্ত্রাসী সেনা-বাহিনী না থাকায় চলে মার্কিন সেনাবাহিনীর নির্মম অত্যাচারআর মধ্য-আমেরিকার অপরাপর দেশে - এল সালভাদোর, গুয়েতমালা ও হৌন্ডুরাসে - দেশীয় তাবেদার সেনাবাহিনীর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ মার্কিন মদদে জারী থাকে প্রাতিষ্ঠানিক সন্ত্রাসের ভয়াবহতাওদিকে মধ্য-প্রাচ্যেও সমান-তালে চলে সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের নামে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী তৎপরতাইসরায়েল ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস চালায় মধ্য-প্রাচ্যে - বলাবাহুল্য, যুক্তরাষ্ট্রের মদদেআর ইসলামী জঙ্গীদের উত্থান-পর্বের সেটাই শুরু অরুন্ধতী বুঝতে চেয়েছেন সেই ‘সীমাহীন ন্যায়ের বীজগণিত’কে।

`In 1979, after the Soviet invasion of Afghanistan, the CIA and Pakistan's ISI (Inter Services Intelligence) launched the largest covert operation in the history of the CIA. Their purpose was to harness the energy of Afghan resistance to the Soviets and expand it into a holy war, an Islamic jihad, which would turn Muslim countries within the Soviet Union against the communist regime and eventually destabilise it. When it began, it was meant to be the Soviet Union's Vietnam. It turned out to be much more than that. Over the years, through the ISI, the CIA funded and recruited almost 100,000 radical mojahedin from 40 Islamic countries as soldiers for America's proxy war. The rank and file of the mojahedin were unaware that their jihad was actually being fought on behalf of Uncle Sam. (The irony is that America was equally unaware that it was financing a future war against itself.)

In 1989, after being bloodied by 10 years of relentless conflict, the Russians withdrew, leaving behind a civilisation reduced to rubble.

Civil war in Afghanistan raged on. The jihad spread to Chechnya, Kosovo and eventually to Kashmir. The CIA continued to pour in money and military equipment, but the overheads had become immense, and more money was needed. The mojahedin ordered farmers to plant opium as a "revolutionary tax". The ISI set up hundreds of heroin laboratories across Afghanistan. Within two years of the CIA's arrival, the Pakistan-Afghanistan borderland had become the biggest producer of heroin in the world, and the single biggest source of the heroin on American streets. The annual profits, said to be between $100bn and $200bn, were ploughed back into training and arming militants.

In 1995, the Taliban - then a marginal sect of dangerous, hardline fundamentalists - fought its way to power in Afghanistan. It was funded by the ISI, that old cohort of the CIA, and supported by many political parties in Pakistan. The Taliban unleashed a regime of terror. Its first victims were its own people, particularly women. It closed down girls' schools, dismissed women from government jobs, and enforced sharia laws under which women deemed to be "immoral" are stoned to death, and widows guilty of being adulterous are buried alive. Given the Taliban government's human rights track record, it seems unlikely that it will in any way be intimidated or swerved from its purpose by the prospect of war, or the threat to the lives of its civilians.Õ [Arundhati, 2002]

আর ওদিকে ক্ষমতাচাটা বুদ্ধিজীবী হান্টিংটন ঠাণ্ডা-লড়াই শেষ হবার আগেই পয়দা করেছিলেন ‘ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশন’ কিংবা সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বএরই মাঝে হঠাৎই, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও পুঁজির মূর্ত প্রতীক টুইন টাওয়ার উড়িয়ে দিলো আত্মঘাতী জঙ্গীরামার্কিন কৌর্পোরেট মিডিয়া ঐতিহাসিক নৃসংশতা হিসেবে প্রতিপন্ন করলো এ-ঘটনাকেদৃপ্ত কণ্ঠে (কিন্তু যে-মিডিয়া চৌমস্কীর লেখা প্রকাশ করে তা আর কতোদূর পৌঁছায়!) চৌমস্কী বললেন, ‘বন্দুকের নল ঘুড়ে গেছে’ এটা একটা ঐতিহাসিক পরিবর্তনসরল বাংলায় বললে, এতোদিন যারা হামলাকারী, এবার তারাই আক্রান্ত হয়েছেতো, যা-হবার তাই হলো জর্জ বুশ ঘোষণা করলেন সন্ত্রসাবাদের বিরুদ্ধে নয়া-যুদ্ধএবারের বলি আফগানিস্তানযুক্তিলাদেন টুইন টাওয়ারের হামলাকারী; আর সেই লাদেন তোমাদের দেশে আছেতালেবান সরকার যখন বললো, ন্যূনতম তথ্য-প্রমাণ ছাড়া তারা লাদেনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবে না। তখন আফগানিস্তানের একটি সমৃদ্ধ সভ্যতা ধূলোয় মিশিয়ে দেওয়া হলোএর আগেই অর্থনৈতিক অবরোধে মেরে ফেলা হয়েছে সেখানকার লাখ-লাখ শিশুকেতারপর এলো ইরাকগণ-বিধ্বংসী অস্ত্র আছে বলে ইরাককে তামা করে দেওয়া হলো এখানে তথ্য প্রমাণের কোনো দরকার হলো না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরাকে গিয়ে জুতো খেয়ে বিচলিত না হওয়ার কথা বলেছেন, জুতোতো ঐ তথ্য-প্রমাণহীন অন্যায্য হামলারই প্রতিশোধ-প্রচেষ্টাকুর্দি হত্যার অপরাধে সাদ্দামকে ফাঁসিতে ঝোলালেন জর্জ ডব্লিউ বুশ কিন্তু বিচার করলেন না নিজের বাপের, যিনি কি-না ওই হামলায় মদদ দিয়ে গেছেন সাদ্দামকে-হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের নামে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসের নমুনাআর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধের আর দ্বিতীয় যুদ্ধে কী আশ্চর্য মিল! মিলটা হলো ইচ্ছে করলেই আমি তোমাকে সন্ত্রাসী বলবো, আর তোমার উপর হামলা চালাবোআমারটা হলো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকিন্তু তুমি কিছু করলেই তুমি সন্ত্রাসী একটা অমিলও আছেসেটা হলো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে ইসলামী জঙ্গীদেরকে সৃষ্টি করে তাদের ব্যবহার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর দ্বিতীয় যুদ্ধটা ঘোষণা করা হয়েছে ইসলামী জঙ্গীদেরকে বিরুদ্ধেইউল্টোদিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাদেরকে বানিয়েছে, সে-তারাই এবার নেমেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের - আরও বিস্তৃতভাবে বললে - সমগ্র পাশ্চাত্যের আধিপত্যের বিরুদ্ধে পাল্টা-আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে

একেবারে জনবিচ্ছিন্ন নিছক ক্ষমতার বিপরীতে পাল্টা ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে এরা বিশ্বায়িত অস্ত্রশস্ত্রের আধুনিকতম উপকরণ নিয়ে নেমেছে পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধেএকাডেমীতে স্থান পেয়েছে পলিটিক্যাল ইসলামপাশ্চাত্যের বিশ্বায়িত বাজারের বিপরীতে এরা যেনো সন্ত্রাসবাদেরই একটা বিশ্বায়ন ঘটিয়ে দিতে চায়এদের দেশ নেই, কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য নেই, ধ্বংস করাই যেনো তাদের লক্ষ্য (বলে রাখি, এলটিটি-হামাসের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনও এলিটিস্ট কৌর্পোরেট মিডিয়ার দ্বারা সন্ত্রাসবাদ হিসেবে পরিচিত, আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করি, আর স্বভাবতই মোটেও আমরা সেই প্রসঙ্গে আলাপ করছি না)সেই লক্ষ্যকে আরও গতিশীল করতে ধেয়ে আসে দুনিয়া-জোড়া মুসলমানদের উপর নিপীড়নআধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র আসে বিশ্বায়িত বাজারের শর্ত মেটাতেবেসরকারী সন্ত্রাস পুষ্ট হয় সুবিধাবঞ্চিত, নিপীড়িত জনতার তীব্র রোষকে, ক্ষোভকে ধর্মের ধ্বজা পড়িয়ে জিহাদী জোশে পরিণত করা যায়তাই আত্মঘাতী প্রবণতা বাড়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বাইরে কখনও বা আবার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসেরই ছায়াতলে বেড়ে ওঠে বেসরকারী সন্ত্রাসের নানান বন্দোবস্ত তাই জঙ্গী বাড়েবাড়ে সন্ত্রাসকিন্তু সুগংগঠিত সরকারী সন্ত্রাস সহ্য করতে পারে না বেসরকারী সন্ত্রাসকেতৃতীয় বিশ্বে এই সন্ত্রাসের বিস্তৃতি, নিও লিবারাল বাজারের মসৃণ চলাফেরাকে অমসৃণ করেবিনিয়োগ উৎসাহিত হয় নাআর তাই আজ নিও লিবারাল বাজারের বিস্তৃতির এ-ঐতিহাসিক ক্ষণে, যখন অসম ক্ষমতা সম্পর্কের তীব্রতা মানুষের দীর্ঘশ্বাসের তীব্রতাকেও বাড়িয়ে তুলেছে তখন সেটাকে রুখে দিতে আরও জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী যুদ্ধের প্রসঙ্গ

দেশে-দেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তাবেদার সরকার দ্বারা জারি রাখা আছে এনিও লিবারাল প্রক্রিয়াযে-রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব তাবেদারী করতে অস্বীকার করেছে, তারই ভাগ্যে জুটেছে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধআমরা ইরাক আর আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে এ-কথা সত্যি হতে দেখেছি (ব্যতিক্রম ল্যাটিন আমেরিকাপাশ্চাত্যের নিও লিবারাল বাজারে বিপরীতে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত এগিয়ে চলেছে সেখানে)মানে, আমি সরকারী সন্ত্রাস চালাবো, এমনকি বেসরকারী সন্ত্রাসকেও দরকার পড়লে কাজে লাগাবো আমার স্বার্থ হাসিলের জন্যকিন্তু তুমি এর বাইরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে মসৃণ বাজারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে নানৈরাজ্য’ সৃষ্টি করতে পারবে নাআরও পরিষ্কার বাংলায় বললে, ‘আমি যা-ই করি সেটা সন্ত্রাস নয়, কিন্তু আমার বিরুদ্ধে তুমি যা-ই করো সেটা সন্ত্রাস’ কিন্তু কে শোনে কার কথা? বাজার অর্থনীতির যুগে অস্ত্রশস্ত্রও যখন একটি মুনাফা-লব্ধ বিক্রয়যোগ্য পণ্য, তখন স্বভাবতই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিপরীতে বাড়তে থাকে বেসরকারী সন্ত্রাসের নানান বন্দোবস্তপাল্টা-ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লড়াই অস্ত্রশস্ত্রের বিশ্বায়িত বাজারের মুনাফা চাঙ্গা হয় চাঙ্গা হয় সন্ত্রাসীরাপাল্টা লড়াইটা যাদের, তাদের লক্ষ্যও একক্ষ্যটা কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা

ক্ষোভ থেকে ক্ষমতা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বাইরের (যদিও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সাথে এর ঐক্যও লক্ষ্য করা যায় হরহামেশাই) এ-সন্ত্রাস একটু কম শক্তিশালীরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মতো - মানে সেনাবাহিনী-রাব-চিতা-কোবরা দিয়ে গড়া সন্ত্রাসী বাহিনীর মতো - সুসংগঠিত নয়তাই তাদের সন্ত্রাস হয় আকস্মিক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মতো প্রতিদিনের নয় আর আকস্মিক বলেই বোধকরি অনেক বেশি ব্যাপ্ত পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বিপরীতে তারা যেনো সন্ত্রাসবাদের বিশ্বায়ন ঘটিয়ে দেবার চেষ্টা করছেদেশে-দেশে এদের সন্ত্রাসী তৎপরতার সুযোগ নিয়ে আবার এক একটি দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র অকার্যকর রাষ্ট্র বলে তার উপর প্রত্যক্ষ আধিপত্য জারীর সুযোগ লুফে নিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা-ব্রিটেআর দেশে-দেশে সন্ত্রাসবাদের উৎস-মূলে থাকছে সে-রাষ্ট্রের মানুষের আর্থ-সামজিক অবস্থানবাংলাদেশে জেএমবি-সহ ইসলামী জঙ্গীগোষ্ঠীর জয়-জয়াকার-যে শুধুই সাম্রাজ্যবাদী-মৌলবাদী ষড়যন্ত্র না, বরং সামাজিক শর্তের মধ্যেই-যে নিহিত ছিলো জঙ্গীবাদের বীজ, সে-কথা আমরা কে না জানি? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার প্রতিরোধহীন গ্রাহক হিসেবে আত্মসমর্পণ করে সমাজে-যে ক্ষুধা-দারিদ্র্য-হতাশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠী কোনো রকমে বেঁচে থাকতে পারে না, আর বিশ্বায়িত বাজার টাকার বিনিময়ে অস্ত্রশস্ত্রের যে বিপুল সমারোহ ঘটায়, আর দুনিয়াজুড়ে পুঁজিবাদী কেন্দ্রগুলোর নেতৃত্বে ও মদদে দেশে-দেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের যে- ভয়াবহতা তৈরী হয়, জঙ্গীরা তো তারই সন্তানআর তাই একদিন সকালে - b‡f¤^‡ii ২৯তারিখে - কৌর্পোরেট মিডিয়া মারফত জানা যায় মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার খবর

প্রাথমিকভাবে, সিআইএর তৈরী করা আইএসআইকে মুম্বাই হামলার জন্য অভিযুক্ত করা হয় ভারত সরকারের পক্ষ থেকেমার্কিন সিনেটর জন কেনেডী মুম্বাইয়ের হামলার সাথে ৯/১১ সমিল খুঁজে পেয়ে বলেন, ‘এখন ভারত যদি পাকিস্তানে হামলা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে করার কিছু থাকবে না; কেনো-না ৯/১১ পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও আফগানিস্তানে হামলা করেছিলো’ এ-কথাটার তর্জমা করলে দাঁড়ায়, আফগানিস্তানে সন্ত্রাস চালানো যুক্তরাষ্ট্র এ-উপমহাদেশে তার প্রহরাদার ভারতীয় সরকারের সন্ত্রাসকে মদদ দিচ্ছেনকিন্তু ভারতীয় এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান স্বতপ্রণোদিত হয়ে গ্রেফতার করলো কিছু সন্ত্রাসীযুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া বোধকরি আর সম্ভব হবে নাসেটা ইতিবাচককিন্তু সমস্যা এতে মিটবে কি? মিটবে না৪৭-এর দেশ-বিভাগে সর্বস্ব হারানোর  যন্ত্রণা যারা বহন করে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়ে তারা অনেকেই এখনও বেঁচে আছে, কিংবা ঐ কাশ্মীরে যে-মুসলমান স্বাধীনতার দাবীতে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন তার ভাই-সন্তান-মা-বোন আছেআছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার গুজরাটবাসী, সমাজের সুবিধা-বঞ্চিত শ্রেণী বেকার জনগোষ্ঠীতারা যে-দীর্ঘশ্বাস ফেলবে, তাদের কান্না যে-আগুন জ্বালাবে, সেখান থেকে এমনি করে আবার জ্বলে উঠতে পারে উপমহাদেশের অন্য কোনো স্থান আর তাতে আবারও অপচয় হতে পারে আরও আরও রক্তএখনকার মতো রাষ্ট্রীয়-সন্ত্রাসের পথে ঠেকানো যাবে না তাদেরঠেকাতে গেলে বরাবরের মতোই আরও বেড়েই যাবে সন্ত্রাসভিন্ন পথ ভাবতে হবেসন্ত্রাস দিয়ে সন্ত্রাস ঠেকানো পথ নয়

পরিশেষআমরা দাঁড়াবো কীসের বিরুদ্ধে, কীসের জন্য

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ না থাকলে যুদ্ধ-সহিংসতাই থাকে নাঅস্ত্র বিক্রি হয় নাআধিপত্য করা যায় না সহজেতাই জারী থাকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইআমরা দেখেছি আমরা, বিরোধীতার ঐ মিথ্যা দোহাই দিয়েও থামানো যায় না ক্ষোভবৃহৎ কর্পোরেশনগুলো যখন প্রার্থীদের প্রচারণা-ব্যয়ের বড়ো অংশটাই বহন করেন, তখন আমাদের বুঝতে সমস্যা হবার কথা নয় যে, -ব্যয়ের বিপরীতে তাদের অভিলাষ থাকেপ্রার্থীদের থাকে মৌন সম্মতি তারপর বিজয়ী প্রার্থী ঐ কৌর্পোরেশনগুলোর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে থাকে কৌর্পোরেট পুঁজি যুদ্ধবাজ নিজেকে স্ফীত করতে সে-যুদ্ধবাজ দুনিয়া কায়েম করতে চায়আর তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই জাতীয় শত্রুর রূপকল্প দাঁড় করায় কৌর্পোরেট মিডিয়ার মাঝ দিয়ে আদায় করা হয় সামরিক খাতের ব্যয় বৃদ্ধির পক্ষের সম্মতিসোভিয়েত ইউনিয়ন থাকা-কালে এ-জাতীয় শত্রুর ভূমিকা পালন করেছে কমিউনিজমআর তারপর থেকে আজ পর্যন্ত সেই ভূমিকা নিয়েছে ইসলামী মৌলবাদ কিংবা সন্ত্রাসবাদহান্টিংটনের পয়দা করা ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব (ফিলিস্তিনী নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর লড়াইয়ের সঙ্গী ক্ষমতার বিপরীতে নিঃসঙ্গ একাকী বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাঈদ, হান্টিংটনের এ-তত্ত্বকে অজ্ঞতার সংঘাত বলে উপহাস করেছেন) এবং পরবর্তীতে টুইন টাওয়ার হামলার পর পশ্চিমা কৌর্পোরেট মিডিয়ার প্রচারণা মাফিক মুসলমানের যে-পরিচয় নির্মিত হয়, সেটা ঐ মার্কিন দেশের জনগণকেও অবশেষে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী, মৌলবাদী, গণতন্ত্রহীন, পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণা নিক্ষেপকারীএরা যেকোনো মুহূর্তে হামলা করতে পারে

আর এ-প্রচারণাই স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষাখাত ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন থেকে জনগণের চোখ সরিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করবার পক্ষের সম্মতি আদায় করেআর এভাবেই জাতীয় নিরাপত্তার নাম করে সামরিক-খাতে ব্যয় বাড়ে আর সামরিকতা মানেই অস্ত্র-শস্ত্র-গোলা-বারুদমানে জনগণের করের টাকায় দেশের বৃহৎ অস্ত্র-উৎপাদন কারখানাকে পুষ্ট করাবাজার অর্থনীতির এই যুগে বেচাই যখন মূল লক্ষ্য তখন মেলামিন মিশিয়ে যেমন গুড়ো দুধ বিক্রি করা হয় তেমনি করে বিক্রি করা হয় যুদ্ধ আর সহিংসতাদেখেছি আমরা ইতিহাসের পাঠে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মন্দা কাটাতে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে যুদ্ধসেই যুদ্ধবাজী বন্ধ হবে না ওবামার যুগেও সেটা আমরা জেনে গেছি মুম্বাইয়ের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানে হামলার যে-সম্ভাবনা তৈরী হয়েছিলো, যুক্তরাষ্ট্র তাতে উস্কানি দিতে কার্পণ্য করেনি।  অরুন্ধতী রায় সতর্ক করে দিয়েছেন

But November isn't September, 2008 isn't 2001, Pakistan isn't Afghanistan and India isn't America. So perhaps we should reclaim our tragedy and pick through the debris with our own brains and our own broken hearts so that we can arrive at our own conclusions. [Arundhati, 2008]

অরুন্ধতী সতর্ক করে দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেআমরাও ভারতের জন্য টুকে রাখলাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসসতর্ক করে দিলাম ফাঁদে না পা দেওয়ার জন্যসে তো গেলো অন্য কথাতাহলে যুদ্ধ আর সন্ত্রাস ঠেকাবো কীভাবে? আমাদের লড়াইয়ের পথ কী হবে?

একটু আগেও বলেছি, বাজার অর্থনীতি, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা - মানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বন্দোবস্ত - যতোদিন থাকবে, সন্ত্রাসবাদ ততোদিন থাকবেইঅসম বাজার টিকিয়ে রেখেদেশে-দেশে সে-বাজারের পক্ষে সেনা-কৌর্পোরেট বন্দোবস্ত গড়ে তুলে অন্যদিক থেকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াই জারী রেখে সন্ত্রাস থামানো যাবে নাআমরা যারা সন্ত্রাস চাই না, আমরা যারা ‘যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ নয়’ বলে আওয়াজ তুলতে বলি, তাদের সম্মিলন দরকারআমাদের বারবার এ-কথাটা বলা দরকার যে, বিদ্যমান অসম-ক্ষমতা-সম্পর্ক সন্ত্রাসের জননী এর বিপরীতে আমাদের লড়াই করতে হবে গণতন্ত্রের জন্যলড়াইটা অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের লড়াই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় জনগণের পরিপূর্ণ অংশীদারিত্বের প্রশ্ন নিয়ে লড়াই জারী রাখতে হবেপ্রতিটি নাগরিকের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র-পরিচালনার নীতি তৈরীতে বাধ্য করতে হবে ক্ষমতাওয়ালাদেরজনগণের ক্ষমতায় সরকার চললে, জনগণের কথামতো রাষ্ট্র চললে সেনা-বাহিনীর দরকার পড়ে নাঅস্ত্রেরও দরকার পড়ে নাতারমানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসেরও দরকার পড়ে নাআর যখন রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী কার্যকম পরিচালনা করতে হয় না তখন বেসরকারী সন্ত্রাস পুষ্ট হবার মতো ক্ষোভ-হাহাকার-ক্ষমতা আসবে কী করে! অস্ত্রেরই বা দরকার পড়বে কীসের জন্য! অস্ত্রহীন পৃথিবী গড়বার কাজটি তাহলে শুরু করা যায়সেটাই আমাদের কাজঅস্ত্র থাকলে তা যেমন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পক্ষে ব্যবহৃত হবে, তেমনি ব্যবহৃত হবে বিরুদ্ধবাদীদের দ্বারাওএর ব্যতিক্রম ঘটবে না

তথ্যসূত্র

Arundhati, 2002: The Algebra of Infinite Justice

www.fantasticfiction.co.uk/r/arundhati-roy/algebra-of-infinite-justice.htm - 13k -

Arundhati, 2008: The Monstar of The Mirror 

http://www.guardian.co.uk/world/2008/dec/12/mumbai-arundhati-roy

Noam Chomsky 2008: The Election, Economy, War, and Peace, http://www.zcommunications.org/znet/viewArticle/19749

তানজিনা ফেরদৌস তাইসিন ও বাধন অধিকারীঃ  লেখক

আপলৌডঃ ২৫ ডিসেম্বর ২০০৮

-এ ফিরতি

-তে ফিরতি

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.