বাংলাদেশের বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা ২০০৮

London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮

আমরা কি চলতে ভুলে যাবো

মাসুম রেজা

নাট্য-সমালোচক মফিদুল হক দু-বাংলার থিয়েটার পত্রিকায় এক প্রবন্ধে ঢাকার মঞ্চ নাটকের উত্থান ও বিকাশের কথা লিখেছেনতিনি দাবী করেছেন, স্বাধীনতার পর শিল্পের যে-শাখায় সবচেয়ে বেশি উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, তা হচ্ছে মঞ্চ- নাটক চলচিচত্র নয়, সে-অর্থে সাহিত্য নয়, নাটক মঞ্চ-নাটক১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতার ভিতর দিয়ে স্বাধীনতার-উত্তর বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের ভ্রুণের সঞ্চার হয়সে-নাট্য-প্রতিযোগিতার একটি বড়ো শর্ত ছিলো, নাটকের পাণ্ডুলিপি হতে হবে দলের নিজস্ব নাট্যকারের লেখাএ-বিশেষ একটি শর্তই সেদিন বদলে দিয়েছিলো প্রতিযোগিতার চেহারাআমরা পেয়েছিলাম বেশ কয়েকজন নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক ও অভিনেতাসেলিম আল দীন, আল মনসুর, হাবিবুল হাসান, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচচু, ম হামিদ, রাইসুল ইসলাম আসাদ, পিযূষ বন্দোপাধ্যায় এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যবিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক এ-নাট্য-চর্চা মুদ্রার এক পিঠ

মুদ্রার অন্য পিঠে ছিলেন নাটকে নিবেদিত প্রাণ আরও অনেকে। স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই যারা নাটকের সাথে নানাভাবে যুক্ত ছিলেনবাংলার মঞ্চ নাটকের জন্যে একটা সুগম পথ যারা রচনা করে চলেছিলেনআব্দুলাহ আল মামুন, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, মামুনুর রশীদ, আলী যাকের, ফেরদৌসী মজুমদার এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পর এঁদের হাতেই গড়ে উঠলো গ্রুপ থিয়েটারের ভিত্তি

অনেকগুলো নাট্যদল জন্ম নিলোথিয়েটার, আরণ্যক, নাগরিক, নাট্যচক্র, ঢাকা থিয়েটারএকাত্তুরে যুদ্ধ জয় যেনো বিশেষ এক ভূমিকা রাখলো বাংলাদেশের থিয়েটারেগ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের জোয়ার বয়ে গেলো ঢাকার মঞ্চেএ-সময়ে গ্রুপ থিয়েটারে সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় অনুসঙ্গ হলো বেশীরভাগ নাট্যযোদ্ধাই আসলে মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার সাময়িক স্বপ্ন-পূরণের পর থিয়েটার তাদের কাছে নতুন স্বপ্ন হয়ে ধরা দিলোথিয়েটারের প্রতি অভূতপুর্ব নিবেদন নিয়ে তারা শুরু করলেন তারামঞ্চের পাদ-প্রদীপের আলোয় নিজেকে উজাড় করে দেওয়া, থিয়েটার নিয়ে ভাবনা, থিয়েটারে নিজের শ্রম-ঘাম-মেধার নিঃশর্ত বিনিয়োগ - এসব দিয়েই তারা গড়ে তুললেন বাংলাদেশের নিজস্ব থিয়েটারের কাঠামোঅনেক নতুন নতুন কর্মী তৈরী হতে থাকলো আর তৈরী হলো অসংখ্য নাটক

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকসেনাদের এক দোসরকে কেন্দ্র করে সৈয়দ শামসুল হক রচনা করলেন পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়এটিকে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম কাব্য নাটক হিসাবেও বলা যায়এছাড়াও এখানে এখন নাটকেও সৈয়দ হক উপজীব্য করলেন মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়টাকেআব্দুল্লাহ আল মামুন রচনা করলেন আয়নায় বন্ধুর মুখ, তোমরাই দেশের মানুষ-সহ আরও কয়েকটি নাটক মামুনুর রশীদের নাটক জয়জয়ন্তির মুল কেন্দ্রিকতা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে গ্রামের মানুষ বিশেষ করে শিল্পীদের জীবন ও সংগ্রাম ডঃ এনামুল হক রচনা করলেন সেইসব দিনগুলো এসএম সোলায়মান এর নাটকেও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন আর মুক্তিযুদ্ধের প্রাপ্তির বিষয়টা উঠে আসলো এ-দেশে এ-বেশে নাটকেএছাড়াও মুক্তিযুদ্ধকে পথ-নাটকর বিষয়বস্তু করলেন তিনি রচনা করলেন ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাচালএসএম সোলাইমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনুবাদ করলেন কৌর্ট মার্শাল নাটকটি, যার বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীতে বীরাঙ্গনার সন্তানদের সামাজিক অবস্থান কেন্দ্রিক

নাট্য-নির্দেশক নাসিরউদ্দিন ইউসুফকেও রচনায় আসতে দেখা গেলো একাত্তুরের পালা আর টিটোর স্বাধীনতাÕ নিয়েমমতাজউদ্দিন আহমেদের অনেকগুলো নাটকের ভিত্তিমূলে স্বাধীনতার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিটা বিশেষভাবে উঠে এলোএর মধ্যে সাতঘাটের কানাকড়ি কি চাহো শঙ্খচিল Ôস্বাধীনতা আমার স্বাধীনতাÕ আর বর্ণচোরা উল্লেখযোগ্যমান্নান হীরার একাত্তুরের ক্ষুদিরাম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি বহুল প্রদর্শিত পথ-নাটকনব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য নাট্য নির্দেশকদের একজন শামসুল আলম বকুল রচনা করলেন ঘর লোপাট, যেখানে তিনি হানাদার বাহিনীর দোসরের উত্থানকে তুলে আনলেন

এরপর অনেক সময় গেছে সময় গেছে, সংগে করে নিয়ে গেছে থিয়েটারের জৌলুস কিংবা হয়তো আমরাই ধরে রাখতে পারিনি স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের সেই প্রাণ দিয়ে থিয়েটারকে ভালবাসার উচছ্বাসএকসময় আমরা থিয়েটারের কাছে দ্বারস্থ ছিলাম আর এখন থিয়েটার আমাদের কাছে দ্বারস্থক্রমে আমরাই থিয়েটারের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি

আমাদের থিয়েটার এখন নাট্যকারের দ্বারস্থনাট্যকারদের এখন অনেক ব্যস্ততা টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখতে হয়, এনজিওদের জন্য নাটক লিখতে হয়, বিজ্ঞাপন চিত্র লিখতে হয়জীবিকার বিপরীতে প্রাপ্তিশূন্য মঞ্চ নাটক রচনার বিষয়টা এখন অনেকের কাছে বোঝার মতোআমাদের থিয়েটার এখন অভিনয় শিল্পীদের দ্বারস্থটেলিভিশনে অভিনয় ও নির্মাণ কাজে ব্যস্ততম শিল্পীরা এখন আর মঞ্চ-নাটক করতে পারেন নাতাদের অন্তরটা হয়তো কেঁদে যায় মঞ্চের জন্য কিন্তু সবকিছু সামলে তারা মঞ্চের আলোয় আর আসতে পারেন নাঐ অন্তর কেঁদে যাওয়া পর্যন্তই থিয়েটারকে দ্বারস্থ করে নিজেরা তারকা খ্যাতি অর্জন করেছেন, কিন্তু থিয়েটারের প্রতি তারা কোনো দায় বোধ করেন নাআমাদের থিয়েটার দ্বারস্থ মিলনায়তনের কাছে নাটকের জন্যে এখন ঢাকাতে একটি মাত্র মিলনায়তন। দুটো ছিলো, সংস্কারের কাজে একটি বন্ধ আছেকবে চালু হবে কেউ জানে না আদৌ হবে কিনা সে-প্রশ্নও আছেযখন ইচ্ছা, চাইলেই মহিলা সমিতিতে নাটক করা যায় নাকোনো-কোনো দল মাসে দুটো প্রদর্শনীর সুযোগ পায়কোনো দল একবার, কোনো দল দুমাসে একবারঅবশ্য শিল্পকলা এ্যাকাডেমীর দুটো মঞ্চ এখন ব্যাবহার করা যায় তবে ছোট কোনো দলের পক্ষে ঐ হল দুটোর ব্যয়ভার বহন করা প্রায় অসাধ্য

আর সব কিছুর পরে থিয়েটার দ্বারস্থ দর্শকের কাছেপিটার ব্রুকের কথায় একজন দর্শকই থিয়েটারের শর্ত পূরণ করেথিয়েটারের পরিভাষায় একথা সত্য হলেও আমাদের বাস্তবতা অন্যরকমদর্শক কমছে আমাদের থিয়েটারের এ-অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাবার উদ্দেশ্যে কিছুদিন ঢাকার নাটকে এক ধরণের প্রবণতা দেখা দিয়েছিলোআর তাহলো হাসির নাটকহাসির খোরাক খুঁজতেই যেনো দর্শক নাটক দেখেন এমন এক বোধ থেকে নেওয়া হল মঁলিয়ের ও মৌলিক হাসির নাটকের আশ্রয় কৌশলটি স্থায়ী হলো না, কারণ নাটকের খাঁটি দর্শক তৈরী হলো না এ-পন্থায়

জঙ্গীবাদের উত্থানও আমাদের সারা দেশের নাটককে ব্যাহত করলোএটা খুবই দুঃখের কথা যাদেরকে পরাজিত করে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছিলাম, পেয়েছিলাম মুক্ত দেশে মুক্তবুদ্ধির চর্চার সুযোগ, যার ফলশ্রুতিতে গড়ে উঠেছিলো আমাদের থিয়েটার চর্চা, আজ তাদের জন্যেই দেশের কত জায়গায় নিরাপদে নাটকের প্রদর্শনী করা যাচ্ছে নানাটকের উপর একটা অলিখিত সেন্সর চেপে বসেছেনাটকের গল্প, চরিত্রের নাম, নির্দেশনার ধরণ সবই যেনো এখন একটা গোষ্ঠিকে মাথায় রেখে নির্ধারণ করতে হয়থিয়েটার হচ্ছে মুক্তচিন্তার শিল্প-মাধ্যমমুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেও থিয়েটার সাধনায় যদি মুক্তচিন্তার প্রকাশ না ঘটাতে পারি তবে কিসের থিয়েটার করবো? দেশে লালনের প্রতিকৃতিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেওয়া হয়নি; ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে বলাকার পাগুলো আমরা কি চলতে ভুলে যাবো একদিন?

থিয়েটার বেঁচে না থাকলে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য বাঁচানো যাবে নাযে-কোনো মূল্যে থিয়েটারকে চলতে হবেই

আপলৌডঃ ১৬ ডিসেম্বর ২০০৮

মাসুম রেজাঃ নাট্যকার

-এ ফিরতি  

-তে ফিরতি

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.