বাংলাদেশের বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা ২০০৮

London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮

মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও বাংলাদেশ

মানিক মাহমুদ

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিলো এ মুক্তিযুদ্ধ কিন্তু হঠ্যাৎ করে হয়নি এটি ছিলো তদানীন্তন পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালি জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি

আমরা সবাই জানি, পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তার নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের বিরাট ভূমিকা ছিলোপাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র হবে, এ-আনন্দে যারা বগল বাজিয়েছিলেন, তাদের হতাশ করে এ-জিন্নাহ সাহেবই ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেন, পাকিস্তান একটি ধর্মীয় অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্র হবে নাপাকিস্তানের বিভিন্ন ag©vej¤^x লোকদের Avk^vm দিয়ে জিন্নাহ বলেন : "... you may belong to any religion or caste or creed : that has nothing to do with the business of the state. We are starting with the fundamental principle that we are all citizens and equal citizens of one state."(Quaid-i-Azam Mohammad Ali Jinnah, Speeches as Governor General of Pakistan 1947-48 Karachi n.d. c. 9)

সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার সপক্ষে এর চেয়ে পরিস্কার কথা আর কী হতে পারতো? পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক জিন্নাহর এ-গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা বাস্তবায়ন করা হয়নিপাকিস্তানের জন্মের কিছুদিন পর (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮) জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেনপাকিস্তানের নতুন শাসকরা যারা ছিলো অধিকাংশই পশ্চিম পাকিস্তানী ও অবাঙালী, তারা গোটা পাকিস্তানের ওপর নিজেদের আধিপত্য সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ইসলাম ধর্মকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করতে থাকেনতারা সুপরিকল্পিতভাবে পূর্ব বাংলাকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করার চক্রান্তে মেতে ওঠেতারই ধারাবহিকতায় ১৯৭১ সালে সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হয়

বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ফলেই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটেছেএ-কারণে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে সন্নিবেশিত করা হয়েছিলোকিন্তু পরম দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধর্মনিরপেক্ষতাকে তারা নেহাত একটি শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেছেনধর্মনিরপেক্ষতাকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে-উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিলো, সেটা তারা নেননিযেমন প্রথমেই প্রয়োজন ছিলো আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা, যার ফলে দেশের গোটা জনগোষ্ঠীকে সৃজনশীল জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব হতোআধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্ক এ-কাজটি করেছিলেনকিন্তু আমাদের নেতাদের মধ্যে এ-ধরণের কোনো ভাবনা-চিন্তা ছিলো নাক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে চাননি তারাজনপ্রিয় কুসংস্কার, জনপ্রিয় অন্ধবিশ্বাস, জনপ্রিয় পশ্চাৎমুখী মনোভাবকে প্রশ্রয় দিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে চেয়েছিলেন

বাংলাদেশে মান্ধাতা আমলের মাদ্রাসা-শিক্ষা ব্যবস্থা যা যুগের প্রয়োজন মেটাতে অসমর্থ সে-ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে তাকে যুগোপযোগী করার কোনো চেষ্টা না করে তাকে জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছেশুধু তাই নয়, এ-ধরণের ধর্ম-ভিত্তিক শিক্ষা-ব্যবস্থাকে সরকারের পক্ষ থেকে মাত্রাধিক পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছেএর ফল-যে কী ভয়ানক হতে পারে, সেটা তো এখন আমরা পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিএ-কথা কি A¯^xKvi করা যায় যে, এ-ধর্ম-ভিত্তিক মাদ্রাসা-শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনো অবদান তো রাখেইনি, বরং ইসলামী জঙ্গীবাদ বিস্তারের আদর্শ এক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছেএকথা Ab¯^xKvh© যে, বর্তমান বাংলাদেশে চরম দুরবস্থার জন্য অদূরদর্শী ও নীতিজ্ঞান-বিবর্জিত রাজনীতিবিদরা প্রধানতঃ দায়ীবাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন মহান নেতা ছিলেন; এক বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন তার সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব হলো তার সম্মোহনী নেতৃত্ব, যার গুণে এ-দেশের সব সম্প্রদায়ের মানুষ প্রথমবারের মতো এক ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হয়েছিলোকিন্তু তার মধ্যে মনুষ্যোচিত যে-দোষ-ত্রুটি ছিলো, সেগুলোকে তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননিবরং ক্ষমতায় গিয়ে এ-দোষ-ত্রুটিগুলো মাত্রাধিকভাবে দেখা দিয়েছিলো, যেটা তার নিজের জন্য এবং দেশের জন্য মারত্মক হয়ে পড়েছিলোএ-দোষগুলোর মধ্যে ছিলো অহমিকা, চরম আত্মতুষ্টি ও পরম আত্মবিশ্বাস|

আমাদের সংবিধানে ধর্ম-নিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করলেও ধর্ম-নিরপেক্ষতাকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বরং পাকিস্তান আমলের মতো ধর্মকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হয়েছেএর ফলে প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি বহুল পরিমাণে শক্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেযুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করাটা ছিলো মুজিব সরকারের মস্ত বড়ো ভুলআমি বলবো মস্ত বড়ো অপরাধএর পরিণাম হয়েছিলো ভয়াবহ

রাষ্ট্রের আরেকটি মূলনীতি গণতন্ত্রের প্রতিও আমাদের নেতারা চরম অবহেলা প্রদর্শন করে এসেছেন দুর্ভাগ্যবশতঃ সে-ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে আমাদের নেতারা যদিও জনসমর্থন লাভের জন্য গণতন্ত্রের কথা সবসময় জোরেশোরে বলে এসেছেন, তাদের অনেকের জীবনযাত্রায় ও আচরণে স্বৈরাচারী ও একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব প্রকটভাবে বিদ্যমানকোনো ধরণের সমালোচনা তারা পছন্দ করেন নাদলের মধ্যে কোনোরকম মতপার্থক্য তারা বরদাশত করেন নাক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা ডিক্টেটরের মতো আচরণ করেনতারা কারও সঙ্গে - এমনকি নিজের দলের অন্য নেতার সঙ্গে - ক্ষমতা ভাগ করতে রাজী ননবলা যায়, আমাদের রাজনীতিবিদরাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে গড়ে উঠতে দেননিদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তাদের চরম ব্যর্থতার ফলেই সামরিক বাহিনী একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করার সুযোগ পেয়েছেকিন্তু সামরিক শাসন বা সামরিক বাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত শাসন তো কখনো চিরস্থায়ী হতে পারে নাসামরিক বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হলো বহিঃশত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করা, দেশ শাসন করা নয়একথা তাদের বোঝানোর মতো নেতৃত্ব দেশে আদৌ আছে কি?

আমাদের বড়ো দুর্ভাগ্য, এ-বিজয়ের মাসে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে স্বাধীনতা-বিরোধী মৌলবাদীরা আবারও বিএনপির কাঁধে সওয়ার হয়েছেখালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি দাবী করে, তাদের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেনএকাত্তরের পক্ষ-বিপক্ষ অর্থাৎ মিত্র-শত্রুর এ-কেমন ঐক্য? শুধু কি বিএনপিকে দায়ী করলে চলবে? একাত্তরে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ এইচএম এরশাদের সঙ্গে ঐক্য করার জন্য অনেক ছাড় দিতে রাজী হয়েছে এরশাদ আশির দশক জুড়ে স্বাধীনতার মূল্যবোধ নস্যাতের জন্য একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি কি? একাত্তরে স্বাধীনতার জন্য যে-তরুণ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলো, যে-মানুষ মরণ-ভয় তুচ্ছ করে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলো, যে-কোটি-কোটি নারী-পুরুষ সুদিনের প্রত্যাশায় ভয়াবহ গণহত্যার দিনগুলো অতিক্রম করেছেন, তারা এমন বাংলাদেশ চাননি

মানিক মাহমুদঃ কলাম লেখক

আপলৌডঃ ১৬ ডিসেম্বর ২০০৮

-এ ফিরতি

-তে ফিরতি

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.