বাংলাদেশের বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা ২০০৮

London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮

ওরা এদেশের নয়

কামাল লোহানী

প্রিয় দেশবাসী, এ-যে ডিসেম্বর মাস। এইতো সেই সময়, যখন খানে দজ্জালরা বুঝতে পেরেছিলো এ-দেশের কুলাঙ্গার, বিশ্বাসঘাতক নরককীটগুলো ওদের যতই সাবাশী দিক না কেনো, যতই কেঁউ-কেঁউ করে লেজ নাড়ুক না কেনো, মুক্তিবাহিনীর গাড়েমারেওরা একেবারে পেরেশান। এবার বুঝি পাত্‌তাড়ি গোটাতেই হবে। লালচ্‌ ছাড়তে হবে এদেশকে শোষনের ও সম্পদ অপহরণের। ওই যে-নরখাদক পিশাচের দল, ওদের খাবার আমরা কেড়ে নিচ্ছি। লালসার জিভ্‌টাকে টেনে ছিঁড়ে ফেলছে এ-দেশের নরোম মাটিতে জন্ম নেয়া কঠিন মুক্তিসেনার দল।

এ-ডিসেম্বরেই অপমানিত-রোরুদ্যমান রক্তিম বাংলা দেখেছিলো খাণ্ডব-দাহন। কিন্তু শেয়াল-শকুনীর বীভৎস মেলার অকল্পনীয় সেই রক্তস্রোতেই হয়েছিলো রক্ত স্বাক্ষরের নবারুনোদয়। সে-অরুণ আলোতে উদ্ভাসিত হবার কথা ছিলো সোনার বাংলার শিশির-স্নিগ্ধ সবুজ ঘাসের লিক্‌লিকে ডগায় আপামর জনসাধারণের লালিত স্বপ্ন। রক্তলাল সূর্যোদয়ে অমলিন এ-মাটির বুকে তবুও উড়েছিলো লাল সবুজের উজ্জ্বল পতাকা। এ-বিপুল রক্ত-খরচে বিশাল ক্যানভাসে এঁকেছিলাম মুক্ত স্বাধীন সত্য এক বাংলার রক্তোৎপল মানচিত্র। রচিত হয়েছিলো নতুন রক্তাক্ত প্রান্তর। আশা ছিলো যে-মাটিতে আশার বীজ বুনে চোখের জলে সেচ দিয়েছিলাম, সে-মাটিই এবার সোনালী ফসলে ভরে ঊঠবে, শান্তিতে-সম্প্রীতিতে গড়ব এ-বাংলা।

কিন্তু অলক্ষ্যে বসে সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি চক্রান্ত এঁটে এ-দেশটাকে নতুন এক ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিলো। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তার সহজ সাফল্য মিললো না যখন, তখনও তারা হন্যে হয়ে আমাদের মুক্তির সংগ্রামকে ‘বেপথু’ করার নানা কৌশল এঁটেছিলো। মার্কিনী মহাপ্রভুরা নতুন দেশেরই যেনো অভ্যূদয় না হয়, সে-লক্ষ্যে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে ভয় দেখাতে চেয়েছিলো। কিন্তু দেশের মানুষের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে যে-মুক্তিযুদ্ধ শুরু, তার নায়ক অগ্রসেনানী তাজউদ্দীন আহমদকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা যায়নি সে-দিন। তিনি কঠোর ভাষায় এর কড়া জবাব দিয়েছিলেন। হুমকিতে কাহিল করতে না পেরে ইসরায়েলকে লেলিয়ে দিয়ে প্রথম স্বীকৃতির লোভে দুর্বল করতে চেয়েছিলো ওরা। তাতেও যখন অটলচিত্ত মুক্তিফৌজ, তখন সাম্রাজ্যবাদী চক্র টোপ ফেলেছিলো পাকিস্তানের সাথে ‘কনফেডারেশন’ গঠনের প্রস্তাবের। সেটাও গিলাতে পারল না। দেশ প্রায় মুক্ত হয়েই গেলো। তখন পাকিস্তানী শাসক চক্র পরাজয় মেনে নেয়ারই সিদ্ধান্ত নিলো।

মারের চোটে চোখে যখন তারা দেখছে হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসরেরা, তখনই মার্কিনী মস্তিষ্ক উদ্ভূত নতুন হত্যা-পরিকল্পনা রচিত হলো। জেনারেল রাও ফরমান আলী নীলনক্সা অনুযায়ী হত্যা তালিকা প্রণয়ন করে ফেললো। নুরুল আমীন, গোলাম আজম, ফরিদ আহমদ, মওলানা আতাহার আলী প্রমুখের সাথে শলা-পরামর্শ করলো। বসলো শিল্প-সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিক্ষকদের সাথে। তারা উর্দূ ভাষায় সেনা-শাসকদের সামনে বক্তৃতা করে তাদের সমর্থন জানিয়েছিলো। এ-পরিকল্পিত গণ-হত্যার পাশাপাশি মুক্তির এ-বিপুল আয়োজনকে যখন রক্তস্নাত করেও ক্ষান্ত হতে পারলো না, তখন তারা বুদ্ধিজীবী হত্যার তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছিলো স্থানীয় পদলেহনকারী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির মদদে। জামাতে ইসলামী ও ওদের সহযোগী মৌলবাদী অপশক্তির দল ও গোষ্ঠী মিলে তৈরী করেছিলো আল-বদর, আল-শামস্‌ এবং ছোটদের নিয়ে গঠন করেছিলো শাহিন ফৌজ রাজাকার বাহিনী।

ওদের কাজই ছিলো পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সাথে মিলে অপকর্ম সাধন করা, লাম্পট্যের যোগান দেয়া, লুট করা, আগুন লাগিয়ে সব ভস্ম করে দেয়া ও সম্পদ অপহরণ করা। মদদ দিয়েও নিজেরা রেহাই পায়নি। এসব কাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে নিজেদের পরিবারের মা, মেয়ে বা যুবতী সদস্যাদের ওই পাক নরপিশাচদের খোরাক হিসাবেও তুলে দিতে হয়েছ। তারপরও এরাই ছিলো ওদের কসাই, জল্লাদ ও সহযোগী।

এরাই তো জামাতের সৃষ্টি। মতিউর রহমান নিজামী ছিলো এদের আল-বদর বাহিনীর নেতা। সহযোগী ছিলো কামরুজ্জামান, কাদের মোল্লা, মুজাহিদ, সাইদী প্রমুখ। যুব কমান্ডের নেতা ছিলো দৈনিক পূর্বদেশে কর্মরত রিপোর্টার চৌধুরী মইনুদ্দিন। তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যরা এর সাথে জড়িত ছিলো। বাংলাদেশ হবার পর ওরা নাম পাল্টে ইসলামী ছাত্র শিবির হয়েছে। ওরা সবচেয়ে ঘৃণ্য অপকর্মটি করেছে। মার্কিনী ও স্থানীয় পাকিস্তানী দালালেরা বুদ্ধিজীবী হত্যার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাদেরই শিক্ষকদের বাড়ী-বাড়ী গিয়ে ধরে-ধরে নিয়ে আসতো। চোখ বেঁধে আড়মোড়া করে হাত বেঁধে নিয়ে যেতো। তারপর চালাতো অকথ্য অত্যাচার। নির্যাতন-নিপীড়নের পর চক্ষু চিকিৎসকের চোখ উপড়ে ফেলতো; হৃদরোগ চিকিৎসকের বুক ফেঁড়ে কলজে খুবলে তুলে ফেলতো এবং শিক্ষক-সাহিত্যিক-সাংবাদিকের হাত কেটে ও পা ভেঙ্গে হত্যা করে বিভিন্ন বধ্যভূমিতে ফেলে দিয়ে আসতো শেয়াল কুকুরের জন্য। দিনের বেলায় শকুনীর ঝাঁ‌ককে যখন লড়তে দেখতো পরষ্পরের মধ্যে, তখন বুঝতো অবরুদ্ধ ঢাকার মানুষ, ঐখানে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে ফেলে রেখে গেছে।

২৫ মার্চের রাত্রে অপারেশন সার্চ লাইটের আলোর আগুনে পুড়েছে বস্তি, জনবহুল পাড়া, মহল্লা। কতো-যে মানুষ মরেছে ওইখানে! মর্টারের শেলে পুড়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছন কতো অজানা মানুষ! সেই থেকে কত-যে স্থানে-পাড়া মহল্লা ছাড়াও রেল কলোনী, পুলিস আস্তানা রাজারবাগে, ইপিআর সদর দফতরে প্রতিরোধ হলেও শক্তিমত্তায় শুরুতে ব্যর্থ হয়েছেন বাঙ্গালী কিংবা বাংলার মুক্তিকামী মানুষ। তবুও প্রতিরোধের যে-আগুন জ্বলেছিলো সে-দিন, তা যেনো দাবানলের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিলো সারা বাংলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টার্গেট ছিলো যেমন পাকিস্তানীদের, তেমনি ওই মার্কিনীদের পরামর্শে প্রণীত হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় দালাল জামাত ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীদের টার্গেট ছিলো তাদের শিক্ষকরা। ১৪ ডিসেম্বর সে-পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুত হত্যা তালিকা দেখে একেক করে ধরে এনেছে। পাকিস্তানী ও দোসরদের হাতে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা ছিলেন এদেশের বরেণ্য জন। হানাদাররা ভেবেছিলো তাঁদের যদি হত্যা করতে পারে, তবে নব অভ্যূদয়ে অর্জিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ পরিচালনা ও গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। তাই দার্শনিক গোবিন্দ চন্দ্র দেব (জিসি দেব), বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় শিক্ষক ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুঁহঠাকুরতা, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী এবং ডঃ আনোয়ার হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসক ডাঃ মোর্তুজা, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, ডঃ মহী, সাংবাদিক সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজ উদ্দীন হোসেন, খোন্দকার আবু তালেব, ক্রীড়া লেখক এসএ মান্নান (লাডু ভাই), তরুণ সাংবাদিক লেখক আজম গোলাম মোস্তফা, বিবিসি প্রতিনিধি নিজাম উদ্দীন আহমদ; হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ফজলে রাব্বি, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ আলীম চৌধুরী, ক্রীড়া সংগঠক মুশতাক ও ক্রিকেটার জুয়েল- এমন কতজনের নাম লিখবো। এ-তো শেষ হবার নয়।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনী্র পদলেহনকারী জামাত-শিবির, আল-বদর, আল-শামস্‌ ও রাজাকারারা আত্মগোপন কিংবা দেশ ত্যাগ করেছিলো। এটাই ছিলো স্বাভাবিক। কারণ ওরা ভেবেছিলো, বাংলাদেশ প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের বিরুদ্ধে এ্যাকশন নেয়া হবে। শুরু হয়েছিলো গ্রেফতার। ১১ হাজারকে দালাল আইনে গ্রেফতারও করা হয়েছিলো। সাতশোর উপরে শাস্তিও হয়ে গিয়েছিলো। বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা করায় কেবল মাত্র হত্যা, লুট, অগ্নি সংযোগ, ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধীদেরই কেবল আটকে রেখে বিচার চলছিলো। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে এমনি সময় ‘ভুলের মাশুল’ দিতে হলো বড়ো রকমের। সপরিবারে হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধুকে। পট পাল্টে গেলো। শুরু সামরিক শাসন। কী দুর্ভাগ্য! মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত একটি দেশে আবার সে-পাকিস্তানের মতো সামরিক শাসকের আবির্ভাব ঘটলো। এ-সময় শাসন-ভার হাতে তুলে নিলো জেনারেল জিয়া। কী মর্মান্তিক পরিণতি লক্ষ্য করলাম জাতীয় জীবনে। ক্যূ ও পাল্টা-ক্যূ’র ঘটনায় বন্দী জিয়াকে সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানের মাধ্যমে উদ্ধার করে ক্ষমতায় বসালেন বিপ্লবী বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কর্ণেল (অবঃ) আবু তাহের। জিয়া তাকেই হত্যা করলেন গ্রেফতার করে বিচারের প্রহসনের মাধ্যমে এক বিশেষ ট্রাইব্যুনালে, যার কোনো আইনগত ভিত্তিই ছিলো না। হত্যার পরেই সে-আইন করা হয়েছিলো বলে অভিযোগ রয়েছে। এ-তাহের-হত্যাই শেষ ঘটনা নয়, দালাল যারা আইনে কারাদণ্ড ভোগ করছিলো ঘৃণিত অপরাধের জন্যে, জিয়াউর রহমান তাদেরও ছেড়ে দিলেন দালাল আইন সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে।

সেই-যে প্রশ্রয় পেলো বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী জামাত ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তিগুলো, তারপর থেকে ক্রমাগতভাবে ওদের স্পর্দ্ধাই বেড়ে যেতে থাকলো। কারণ কোনো সরকারই ওদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। উদ্দেশ্য গোপন ছিলো না, আমরা সবাই বুঝতে পারলাম, ওদের সহযোগিতা নিয়ে ক্ষমতার লোভ পূরণ করতে চায় সবাই। রাজনৈতিকভাবে এ-আশ্রয় মিলে গেলো মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত এবং রক্তের দামে কেনা এ-বাংলাদেশে। তখন থেকেই সংগঠিত হবার সুযোগ পাবার ফলে সহজ সরল বাংলার মানুষের জীবনে যোগ হলো এক অভিশপ্ত অধ্যায়। গ্রামে-গঞ্জে গরীব ঘরে ঢুকে পড়তে থাকলো যাঁর ঘরের চালে টিন নেই তাঁকে টিন দিয়ে, কিংবা হালের গরু নেই যাঁর, তাঁকে গরু কিনে দিয়ে, দুঃস্থ ছাত্রদের বই-পত্র যোগান দিয়ে।

এ-সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যুদ্ধাপরাধী জামাত আর ওদেরই তৈরী করা নানা ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অপতৎপরতার কলঙ্কিত পথ পরিক্রমায় আমাদের প্রিয় স্বদেশ আজ বিপন্ন। স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি মুহূর্তে-মুহূর্তে ওরা হুমকি দিচ্ছে আমাদের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে। ওরা নিয়মিত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অপরাধ অস্বীকার করে সিনাজুরি দেখিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এমন পরিস্থিতিতে জনগণের কাছে দাবী যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচিত করবেন না। ওদের সামাজিকভাবে বয়কট করুন। ওদের শাস্তি চাই। ওদের বাদ দিন। ওরা এদেশের নয়। বিজয়ের মাসের নির্বাচনে ওদের ভোট দেবো না, এ-হোক অঙ্গীকার।

আপলৌডঃ ১৬ ডিসেম্বর, ২০০৮

কামাল লোহানীঃ বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক

-এ ফিরতি

-তে ফিরতি

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.