বাংলাদেশের বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যা ২০০৮

London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮

আমরা ধরণের স্বাধীনতা পেয়েছিঃ কে দিচ্ছে স্বাধীনতা

এনুমা এলিস

স্বাধীনভাবে আমরা খবরগুলো জানতে পাই (দেশে তথ্য-অধিকার আইন আছে), কিন্তু যা কিছু ঘটে বলে আমরা জানি, তার সাথে আমাদের মানে আম-জনতার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেইকোথাও থাকেও নাচারপাশে যা-যা ঘটবে, তার সাথে জনগণ হিসেবে আপনার আমার কোনো জানাজানির অধিকার নেইদাম বাড়বে, আপনি কিনতে পারলে খাবেন, না-হলে না খেয়ে থাকবেনআপনার ওপর ব্যক্তিগতভাবে বা সরাসরি প্রতিষ্ঠানের ওপর ধামকি আসবে; তাতে কী? দেন-দরবার করতে পারলে টিকবেন, নাহলে বিদায়বিদায় মানে প্রতিষ্ঠানের শুধু না, একগাদা কর্মীর বিদায়তারপরও নিজেকে গুরুত্বহীন ভাববেন নাআপনার কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে, সরকার-যে কতো কামেল তার 'প্রমাণ ' দেয়া হবে সবসময়আপনি খুশি থাকার চেষ্টা করবেন সরকার ইয়াবা ধরবে, আমরা খুশিসরকার ইন্টারনেটে হ্যাকার ধরবে, আমরা খুশিআরও কতো কি!

নব্বই-এ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তার চর্চা হয়েছে কি-না, সেটা বড়ো পরিসরের আলাপএ-লেখায় কেবল গত দু-বছরের তত্বাবধায়ক সরকারের আমলের কয়েকটি সংবাদ উল্লেখ করে আজকের সময়ে আমাদের স্বাধীনতার, আমাদের বিজয়ের ধরণটা দেখতে চাই

অপ্রয়োজনীয় লাল ভীতি!

২৫ অক্টোবর দিবা-গত রাতে বাগেরহাটে নয়া বাংলার লাল পদক্ষেপ (নবালাপ) নামে একটি সংগঠনের উদ্যোক্তা-সহ ছয়জনকে একজন এসপির নেতৃত্বে আটক করা হয়অপরাধ? নবালাপ মোরেলগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার সেঁটেছিলো এবং লিফলেট বিতরণ করেছিলোআসল অপরাধ কিন্তু সংগঠনের ভিতর লাল শব্দসংগঠনের নাম নয়া বাংলার সবুজ পদক্ষেপ দিলে এদের আদৌ ধরা হতো কি-না আমার সন্দেহ আছে পত্রিকা মারফত জানতে পারি, গ্রেফতারের সময় পুলিস তাদের কাছ থেকে সন্দেহজনক কিছু পায়নি (প্রথম আলো ২৭ অক্টোবর ২০০৮) কয়েকজন তরুণ (ছেলে-মেয়ে উভয় অর্থে) মিলে স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন ট্রাকটরের ব্যবস্থা করে তাদেরকে ভাড়া দেয়া, একটা স্কুল খুলে সুবিধা-বঞ্চিত শিশুদের প্রতিদিন ১ টাকার বিনিময়ে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেয়ার কাজগুলো করছিলো কেনো করবে? স্থানীয় কৃষকদের নানা সমস্যা নিয়ে (সার সঙ্কট ও বীজ সঙ্কট) তারা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাজ করতোকেনো করবে? আরও তো কতো কাজ আছেরাষ্ট্রের মনোঃপুত হলো না, তাই আপনি আটক। স্বাধীনতা দেয়ার অধিকার আমার কিন্তু কিছু তো পাওয়া গেলো নাছাই নাই, পিছলা মাছ ধরি ক্যামনে? জরুরী অবস্থাকে ছাই হিসেবে ব্যবহার করি

এ-তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরী অবস্থার মধ্য দিয়ে গঠন হয়ে দায়িত্ব নিয়েছেফলে কিসে জরুরী অবস্থার ভাঙে বা ভাঙে না তার নির্ধারক আর কে হবে? কোন্‌ ধারা কেনো লাগবে? তারাই সব নির্ধারণে সক্ষম!

কতো কি করা গেলো!

এ-দুই-বছর প্রতিটা দিন বাঙালী আক্ষরিক অর্থে খবর পেতে থেকেছেসংবাদপত্রের কাটতি বেড়েছে, টিভিতে খবর দেখা-তার বিশ্লেষণাত্মক অনুষ্ঠান দেখা, বুদ্ধিজীবীদের ব্যাখ্যা শুনে খবরগুলো বুঝতে গিয়ে বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছেআমার বিবেচনায় বিশেষ খবরগুলোয় চোখ বুলাতে থাকিএ-সরকার হাতে তারেক জিয়া ও আল মামুনের মতো বাপেশ্বর (গডফাদার) ধরা পড়েছেন এবং শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া-সহ প্রায় সব-নেতাই জেল বেড়িয়ে এসেছেদেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জেলে পুরেও সরকার ক্ষমতা কারে কয় বুঝিয়ে ছেড়েছেন নেতা কিনেছেন, কাজে না লাগলে নিলামে তুলে দিয়েছেন এ-সরকারকে এতোটাই 'গ্রহণ' করেছিলো এ-দেশের মানুষ যে, গানের জগতের স্টাররা সেনাবাহিনীর গান গাইতে পেরে কৃতার্থ হয়েছেনজলপাই রঙ যে-আতঙ্কের বিষয়, সেটা যে-বাঙালী ভুলতে বসেছিলো, এ-সরকার তা স্মরণ করিয়ে দিতে পেরেছেন শিক্ষা-ব্যবস্থাকে বিশ্বব্যাঙ্কের হাতে ছেড়ে দিতে পেরেছেনআরও কতো-কিছু করে দেখাতে পেরেছেন, তা আপনাকে না জানলে জানার উপায় কি? বিশেষ বাহিনীর বিপক্ষে রিপৌর্ট করলে সাংবাদিককে পিটিয়ে কীভাবে তাদের পক্ষে রিপৌর্ট করতে, হয় সে-শিক্ষা দিয়েছেন

লালন ভাস্কর্য বানানো-সরানো ও মুফতি আমিনীর সব ভাস্কর্য গুড়িয়ে ফেলার হুমকি

জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান-বন্দরের সামনের গোল-চত্বর বছরখানেক ধরে ঘিরে রাখা হয়েছিলোভিতরে কী চলছে দেখা যেতো না শুধু এটুকু জানা যায়, কোনো একটি ভাস্কর্য স্থাপনের কাজ চলছেকাজ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, তখন ঢাকনার ওপর দিয়ে একতারার একটা অংশ বাইরে থেকে দেখা যাওয়ায় বুঝা গেছে এটি লালনের প্রতিকৃতি হতে পারেএ-জানাজানি হওয়ার আগেই মাদ্রাসার কিছু ছাত্রকে দিয়ে মোল্লারা প্রতিকৃতি ভাঙার চক্রান্ত করলোএকবছরের বানানো স্থাপনা একদিনে সরকার সরিয়ে ফেললোশুধু সরিয়ে ফেললেই তো হবে না, ব্যাখ্যা দিতে হবেমোল্লাদের না-জায়েজ জিনিস হজ্ব ক্যাম্পের সামনে স্থাপন করার আন্দোলনের বিপক্ষে সরকারের সাফাই ছিলো এরকমঃ স্থাপনাটা যে-রকম হওয়ার কথা ছিলো, তেমন হয়নিফলে, সরকার এটা সরিয়ে ফেলার কথা ভাবছিলো (মনে-মনে অনেক কথাই সরকার ভাবে, জ্যোতিষী হলে মিলিয়ে দেখা যেতো আসলেই ভাবছিলো কি-না) সেটা তারা ভাবতেই পারেন কিন্তু ভাবনা কার্যকর আর মোল্লাদের দাবীর সময় যখন মিলে-মিশে একাকার হয়, তখন আতঙ্কিত হই আমরা - বাধ্য হই আতঙ্কিত হতে

মান্দার নাটকের চরিত্র নিয়ে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্চস্থ হওয়া একটি নাটকে ইসলামের নবী মুহম্মদকে অবমাননা করা হয়েছে বলে অভিযোগ এনে মুফতি আমিনী উদীচী ও ধুমকেতুকে নিষিদ্ধ করার দাবী করেতিনি অভিযোগ করেন, উদীচী ও ধুমকেতু নামে দুটি সংগঠনের যৌথ প্রযোজনায় সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্চস্থ হওয়া মান্দার নামে একটি নাটকে একটি চরিত্রের নাম দেওয়া হয়েছে রসুলনাটকের এক দৃশ্যে ওই চরিত্রটিকে গালি দেওয়া হয়েছেতিনি আহলাদ করে বললেন, বর্তমান সরকারের আমলে ইসলামের বিরুদ্ধে একের পর এক আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র চলছেএ-ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা কেনো নেয়া হচ্ছে নাকিন্তু আপনি-আমি যারা শুধু চোখ দিয়ে দেখি, তারা কি এ-আহলাদের ভিত্তি খুঁজে পাই? এর কি কোনো বাস্তবতা দেখা গেছে? এরা চেয়েছেন ভাস্কর্য হবে না, তাই এক বছরের গড়ে তোলা কাজ একদিনে সরিয়ে নেয়া হয়হাসিনা-খালেদাকে ধরে নেয়া যায় আর মুজাহিদ সাহেব মাথায় গ্রেফতারী পরোয়ানা নিয়ে সরকারের সাথে বসে দেন-দরবার করেন পুলিস বলে, তারা মুজাহিদকে পান না, তাই ধরেন নাসরকার কাদের পক্ষে কাজ করছে বুঝতে এর চেয়ে বেশি কোনো প্রমাণের খোঁজে মাথা ঘামানোর দরকার আছে কি?

কয়েকটি টুকরো খবরঃ সবাই জানি, তবু স্মরণে নেয়ার চেষ্টা মাত্র

২১ এপ্রিলঃ আদিবাসীদের ঘর-বাড়ী পুড়ে গেলো (কে পুড়ালো কেউ জানলো না; দেশের নাগরিক হিসেবে আপনি সেখানে যাবেন? নিরাপত্তবাহিনী আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে - যেতে দিবে না); ৩ নভেম্বর আর্মি উঠিয়ে নেয়ার ঘোষণা। (কিন্তু নির্বাচনের নামে আবারও সেনা-সদস্যদের মাঠে থাকা এবং সারাদেশের পুলিসী তৎপরতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানানো হয়);

১৩ নভেম্বরঃ সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকৌর্ট। (এতোদিন জানতাম ভুল বুঝানোকে হাইকোর্ট দেখানো বলা হয়ে থাকে, সরকার তার পুরো আমলেই আমাদের হাইকৌর্ট দেখিয়েছেন); ১০ নভেম্বরঃ সাইফুর-নিজামী-মুজাহিদ জেলে (সরকারকে কঠিন আন্দোলনের ভয় দেখাতেই জামাত ও চারদলীয় জোটের আল্টিমেটাম শেষ হবার আগেই মুক্ত হলেন তারা)

গত ২ বছরে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা অন্তবর্তী-কালীন সরকার বা সঙ্কট-কালীন সরকার যাই বলি না কেনো, সরকার যা কিছু করেছে, তার সাথে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা ছিলো নাবরং যা কিছুতে জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তার পুরোটাই নিজেদের হালাল করার জন্য করাসমৃদ্ধ দেশ গড়ার কথা বলে সারাদেশে গাড়ী-বহর ঘুরলোসচেতনতা-মূলক বাণী নিয়েসে-বাণী মানুষকে জোর করে শোনানোর চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি সরকারসাইক্লৌন সিডরে কতোটা ভয়াবহ পরিস্থিতি হয়েছিলো, কীভাবে সেটা থেকে আক্রান্তরা বের হয়ে আসলেন, তার চিত্র স্পষ্ট হয়নি আমাদের সামনেকিন্তু আমরা গণমাধ্যম মারফত জেনেছি, সরকার খুব শক্ত হাতে ও দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করেছে। সাইক্লৌন সিডরের সে-তাণ্ডব জন-জীবনে সুদূর-প্রসারী যে-প্রভাব ফেলেছে, তার উচ্চারণ এ-সরকার করতে পারেনি

বর্তমান বাংলাদেশী বাস্তবতায় এ-হচ্ছে মোটা দাগে আমাদের স্বাধীনতা। বিজয়ের যে-গন্ধ নিতে চেয়েছিলো বাঙালী, সেটা ৩৮বছরেও সুগন্ধ ছড়াতে না পারার কস্ট কাদের? wbw™©^avq বলা যায়, আমাদের মতো আম-জনতাররাজনৈতিক নেতৃত্ব জনতার কথা ভাবেননি না কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় না কোনো সিদ্ধান্ত বাতিলের সময়। স্বাধীন দেশে স্বাধীনতা শ্বাস নেয়ার পরিস্থিতি বাংলাদেশের বাস্তবতায় নেইরাষ্ট্র-কাঠামোয় যদি জনতার অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে আদপে কিছু দাঁড়ায় না

এনুমা এলিসঃ কলাম লেখক

আপলৌডঃ ১৬ ডিসেম্বর ২০০৮

-এ ফিরতি

-তে ফিরতি

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.