|
বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮
মুক্তিযুদ্ধঃ প্রাপ্তি ও
প্রত্যাশা
চিররঞ্জন সরকার
আমাদের
স্বাধীনতার মূল আকাঙ্খার মধ্যে ছিলো অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ
মুক্ত হয়ে স্বশাসন; স্বশাসনের মধ্য দিয়ে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা
গড়ে তোলা।
যেখানে ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠী
নির্বিশেষে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
দেশের সব মানুষের
অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে কারো
প্রতি কোনো রকম বৈষম্য করা হবে না।
সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা
হবে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে,
আমাদের স্বাধীনতার
সে-আকাঙ্খা আজও
বাস্তবায়িত হয়নি।
ক্ষমতায়
যারাই গেছেন, তারাই গণ-মানুষের আকাঙ্খাকে বিসর্জন দিয়ে ক্ষুদ্র দল ও গোষ্ঠী
স্বার্থে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছেন।
এতে-করে দেশের সব
মানুষের জন্য অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যায়নি।
এক শ্রেণীর মানুষ
ফুলে-ফেঁপে বড়োলোক হয়েছেন।
সামাজিক সাম্য
প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষুদ্র
জাতি-সত্তা ও ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু মানুষেরা চরম বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
ধারাবাহিকভাবে তাদের ওপর
অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হয়েছে।
তাদের জমি-জমা কেড়ে নেয়া
হয়েছে।
তাদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির
মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
থানা-পুলিস-আইন-প্রশাসন
কোনো কিছুই তাদের পক্ষে ভূমিকা পালন করেনি।
একাত্তরে
কাগজে-কলমে দেশ স্বাধীন হলেও মূলতঃ এদেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বৃহৎ
পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর।
ঋণ-সাহায্য-অনুদানের
নামে বিভিন্ন পুঁজিবাদী দেশ ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও
প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করেছে।
আইএমএফ ওয়ার্ল্ড ব্যাংক
ও এডিবি-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী দেশের রাষ্ট্রীয়
নীতি নির্ধারণ হয়।
কয়লা-তেল-গ্যাস-সহ দেশের
প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দখল প্রতিষ্ঠার জন্য বৃহত্তর পুঁজিবাদী দেশগুলো বাংলাদেশকে
অক্টোপাসের মতো চেপে ধরেছে।
আর ঘুষ-দুর্নীতিতে
সিদ্ধহস্ত আমাদের সরকারগুলো বিদেশী প্রভুদের কাছে নিজেদের বিবেক ও স্বাধীনতাকে
জলাঞ্জলি দিয়ে দাসত্বকেই অলঙ্কার হিসেবে মেনে নিয়েছে।
স্বাধীনতার পর গত সাড়ে
তিন দশকে এটাই আমাদের দেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা।
এ-কথা
বললে অত্যুক্তি হবে না যে,
বাংলাদেশ আজ বৃহত্তর
পুঁজিবাদী দেশগুলোর অবাধ বিচরণভূমিতে পরিণত হয়েছে।
আমাদের দেশের দেউলিয়া
রাজনৈতিক শক্তিই তাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে।
মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে,
নিজের শক্তি-সামর্থ্যের
ওপর নির্ভর করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর মতো শক্ত মেরুদণ্ড-সম্পন্ন রাজনীতিবিদ ও
রাজনৈতিক দলের আজ বড়োই অভাব।
আন্তর্জাতিক পুঁজির
পক্ষের শক্তিগুলো চায় বাংলাদেশ একটি ভঙ্গুর বা দুর্বল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত
হোক।
এতে-করে বাংলাদেশের ওপর তাদের
নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
পরনির্ভরশীলতা বিস্তৃত
হলে বাংলাদেশে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম রাখা সম্ভব হবে।
বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশ
নামক ভূখণ্ডটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক লুটেরাদের কাছে বড়োই আকর্ষণীয়।
এখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা
করা গেলে ভারত-পাকিস্তান-চীনকে শাসানো সহজ হবে।
আর ১৬ কোটি মানুষের
বিশাল শ্রমশক্তিকে ব্যবহার ও বাজার দখলের মাধ্যমে স্বার্থ হাসিলের প্রশ্নটি তো
রয়েছেই।
প্রকৃত
সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই;
কিন্তু গণতন্ত্র হতে হবে
সিভিল সমাজ বা দেশের নাগরিকদের দ্বারা গঠিত ও নিয়ন্ত্রিত নির্ভেজাল গণতন্ত্র।
এ-গণতন্ত্রের প্রধান
বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মনিরপেক্ষতা।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের
সব মানুষ ধর্ম-বর্ণ - এমনকি ভাষা - নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ
করবে,
রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের
পৃষ্ঠপোষকতা করবে না,
বরং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী
সব নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করবে,
রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে
পৃথক রাখতে হবে; এ-হলো আধুনিক যুগের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মাপকাঠি।
ধর্ম যার-যার,
রাষ্ট্র সবার, এ-হলো
ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল-কথা।
কিন্তু আমাদের
রাষ্ট্র-জীবন থেকে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
ধর্মকে ব্যবহার করে
বাংলাদেশে এক ধরণের মৌলবাদী সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে।
জাতীয়-আন্তর্জাতিক
ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশের গতিপথকে পেছনে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে।
দেশে মাদ্রাসা-শিক্ষার
নামে আসলে মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ বিকাশের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
এ-ব্যাপারে জাতীয় পার্টি,
বিএনপি ও জামায়াতের
অবদান প্রধান হলেও আওয়ামী লীগের আপোষকামী ও সুবিধাবাদী নীতিও কম দায়ী নয়।
যে-কোনো
উপায়ে ক্ষমতায় যাবার এবং ক্ষমতায় থাকার মোহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে
আপোষকামী হিসেবে গড়ে উঠতে ভূমিকা পালন করেছে।
রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের
রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেছে নিজ-নিজ স্বার্থ ও
সুবিধা অনুযায়ী।
বিএনপির সরাসরি আশ্রয়-প্রশ্রয়ে
যে-মৌলবাদী চক্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, তাদের ঘাটাতে সাহস দেখায়নি আওয়ামী লীগও।
তারাও মৌলবাদী চক্রের
সঙ্গে আপোষ করেছে।
তারাও মাদ্রাসা-শিক্ষার
জন্য অকাতরে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে।
সমাজে এর বিষফলও ফলেছে
অতিদ্রুতই।
মাদ্রাসা-শিক্ষার পশ্চাদপদ
ভূমিতে মৌলবাদী জঙ্গী রাজনীতি সহজেই বিকশিত হচ্ছে।
তাদের ওপর ভর করে একযোগে
সারাদেশে বোমা হামলার মতো ঘটনাও ঘটছে।
মুখে
ভালো-ভালো বুলি আওড়ালেও আন্তর্জাতিক চক্রও অবশ্য চায় বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা বজায়
থাকুক।
একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে
মৌলবাদ চাষাবাদ হোক।
কারণ গণতান্ত্রিক
ব্যবস্থা বা গণতান্ত্রিক চেতনা মৌলবাদ এবং আন্তর্জাতিক লুটেরা গোষ্ঠী উভয়ের জন্যই
ক্ষতিকর।
গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায়
মানুষ মুক্ত হয়ে গড়ে উঠার বা বেড়ে উঠার সুয়োগ পায়।
তারা নিজেদের হিস্যা
বুঝে নেয়ার জন্যও সোচ্চার হয়।
এমন অবস্থায় সাধারণ
মানুষের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়া সহজ হয় না।
নয়া-উপনিবেশবাদীরা তাই
তলে-তলে দুর্বল সমাজ কাঠামো ও অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা অধিকতর শ্রেয় মনে করে।
সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও
অস্থিরতা যদি প্রকট হয়,
সরকার যদি লুটেরা
শ্রেণীর প্রতিভূ হয়,
তাহলে আন্তর্জাতিক চক্র সহজেই
তাদের স্বার্থ-সিদ্ধি করতে পারে।
সে-জন্যই বাংলাদেশকে
ঘিরে আন্তর্জাতিক চক্রের এতো তৎপরতা ও আগ্রহ।
তারা চায় ঘোলা জলে মাছ
শিকার করতে।
এ-কাজে এ-দেশের প্রতিষ্ঠিত
রাজনৈতিক দলগুলো সব-সময়ই তারা সহযোগীর ভূমিকায় পেয়ে যায়।
দুর্বল
রাজনৈতিক কাঠামো এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সুবিধাবাদী মানসিকতার কারণে এদেশে
শুধু-যে মৌলবাদী চক্রেরই বাড়-বাড়ন্ত তাই নয়,
ক্ষমতা নিয়ে
মারামারি-কাড়াকাড়ির ফাঁক গলে সেনাবাহিনীও নিয়মিত বিরতিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় হস্তক্ষেপ
করে আসছে।
তাদের এ-অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপ
রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও বেশি দুর্বল করে দিচ্ছে।
মৌলবাদী চক্রকে
শক্তিশালী হতে সুযোগ করে দিচ্ছে।
অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর
এ-ব্যাপারে কোনো বক্তব্য নেই।
গণতন্ত্রের চির-শত্রু
মৌলবাদ ও সামরিকতন্ত্রকে চিরতরে উচ্ছেদ করার ব্যাপারে কোনো প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য
সংকল্প নেই।
এমন মেরুদণ্ড-হীন অসাড় রাজনৈতিক
শক্তির কাছে দেশের মানুষ কী আশা করতে পারে?
স্বাধীনতার সুফল তো দূরের কথা,
দেশের
স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার ব্যাপারেই বা তাদের ওপর কতোটা ভরসা রাখা যায়?
বাংলাদেশ
বর্তমানে আন্তর্জাতিক লুটেরা গোষ্ঠী,
সামরিক বাহিনী ও
মৌলবাদীদের দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
নীতি-বিবর্জিত
দেশপ্রেমহীন রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রটি-বিচ্যূতি দুর্বলতার কারণে বার-বার
সেনা-হস্তক্ষেপ ঘটছে।
সেনা-হস্তক্ষেপের কারণে
রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে।
দুর্বল সামাজিক-রাজনৈতিক
ব্যবস্থার কারণে গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আর অস্থিতিশীলতা,
দুঃশাসন ও অপশাসকের হাত
ধরে মৌলবাদী চক্র ক্রমেই সবল হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক লুটেরা চক্র
অপ্রতিরোধ্যভাবে দেশের রাজনীতি ও নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছে।
দেশের স্বার্থ বা
গণ-মানুষের স্বার্থ ক্রমেই বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ নাম-কা-ওয়াস্তে
স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও বিদেশী শক্তিই এর মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত
হয়েছে।
রাজনীতিতে যে-সুবিধাবাদ ও
দেশপ্রেম-বর্জিত আখের
গোছানোর যে-প্রবণতা আমাদের দেশে চলছে, তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে চাইলে অবশ্যই বর্তমান
ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিদ্যমান রাজনৈতিক
দলগুলো-যে সে-পরিবর্তন করবে না, তা আমরা স্বাধীনতার ৩৬ বছরে বুঝে ফেলেছি।
অন্ধ-বিশ্বাস, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক কুসংস্কারকে মূলধন করে ক্ষমতায় যাওয়া এবং
ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতি কখনোই দেশের কল্যাণ সাধন করতে পারে না, এ-সত্য বুঝা ও
বোঝানো এ- মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
প্রয়োজন নতুন চেতনার,
নতুন সংগঠনের ও
নতুন কর্মীবাহিনীর।
অভ্যস্ত স্লৌগান,
চিনা রাজনীতিকদের বুলি
আমাদের কাছে ক্লিশে হয়ে গেছে।
এখন বিকল্পের অন্বেষণ
করতে হবে।
এ-বিকল্প মৌলবাদ নয়,
অবশ্যই গণ-মানুষের
পক্ষের শক্তির।
এ-শক্তির সন্ধান করতে হবে।
এ-শক্তিকে গড়ে তুলতে হবে।
তরুণ প্রজন্মকেই
এ-দায়িত্ব নিতে হবে।
আপাততঃ চিন্তার শুদ্ধতা
চাই।
চাই নতুন আদর্শ ও চেতনা।
এ-আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে
হলে দেশে এক নব-জাগরণের প্রয়োজন।
এ-জন্য প্রয়োজন আরেক
যুদ্ধের।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে
শিক্ষা নিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মকে আরেক মুক্তিযুদ্ধের জন্য তৈরী করতে হবে।
তা না-হলে, দেশে
নির্বাচন হবে এবং
ফি-বছর ঘটা-করে বিজয়-দিবস ও
স্বাধীনতা-দিবস পালন করা হবে,
কিন্তু দেশের
সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না।
চিররঞ্জন
সরকারঃ কলাম লেখক
আপলৌডঃ ১৬ ডিসেম্বর ২০০৮ |