London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

বাংলাদেশে হরিজনদের ছট উৎসবে মেতেছিলো কুষ্টিয়া

হরিজন একটি অবহেলিত ও অধিকার বঞ্চিত সম্প্রদায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শহর-বন্দর কিংবা গ্রাম-গঞ্জে যারা পেশাগতভাবে আবর্জনা পরিষ্কার ও মলমূত্র নিষ্কাশনের কাজে নিয়োজিত, সে-সকল মেথর, ধাঙ্গড়, ভূঁইমালী বা ঝাড়ুদারকে হরিজন বলা হয়ে থাকে হরিজন অর্থ ঈশ্বরের একান্তজন হলেও তারা বিভিন্নভাবে অবহেলিত এবং সামাজিক মর্যাদা হতে বঞ্চিত নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন, রোগ বালাই দূরীকরণ ও সন্তানদের মুসিবত দূরীকরণ-সহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রতি-বছর কালী পূজার পর শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠীতে ছট পূজা উদযাপন করে হরিজন সম্প্রদায় সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তর সময় নদীর পাড়ে সূর্য-দেবতার উদ্দেশ্যে মনের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন হরিজনেরা এ-সম্প্রদায় বিশ্বাস করে সূর্য-দেবতা সন্তুষ্ট থাকলে মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়

এবার ছট পূজাকে ঘিরে হরিজনদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো সামনে আনার লক্ষ্যে কুষ্টিয়া-ভিত্তিক সংগঠন হরিজন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় ছট উৎসব ২০০৮ হরিজন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠিকে নানামুখী সহায়তা দান করেছে ফেয়ার ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন দু-দিন-ব্যাপী (৫-৬ নভেম্বর) অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিলো শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা এবং কুষ্টিয়া-সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা হতে আগত হরিজন শিল্পীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পড়ুন মোঃ সাইফুল ইসলামের প্রতিবেদন

ছটপূজা

প্রতিবারের মতো এবারও মনের আশাগুলো পূরণের আকাঙ্খা নিয়ে কুষ্টিয়ার হরিজন সম্প্রদায় ছটের অনুষ্ঠানিকতা শুরু করে ছটের প্রথম দিন বিকেলের দিকে বাড়ীর উঠানে গরুর গোবর ও আলো মাটি দিয়ে লেপে, আটা ও হলুদ মিশিয়ে আলপনা তৈরী করে পূজার সামগ্রীর সামনে রেখে প্রার্থনায় বসেন পূজারীরা এ-সময় মেয়েরা নিজস্ব ভাষায় ভক্তিমুলক গানের মাধ্যমে ভক্তি প্রদর্শন করেন এরপর বাড়ীর পুরুষরা পূজা-সামগ্রীর ডালা মাথায় নিয়ে নদীর ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হন তাদের সাথে মান্নতকারীরা আমপাতা দিয়ে পথ পরিস্কার করে মাটিতে গড়াতে-গড়াতে ঘাটে উপস্থিত হন পূজারীরা নদীতে গোসল করে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে সূর্যদেবতার উপাসনা করেন সূর্য-দেবতাকে খুশি করতে ঘটিতে করে দুধ ঢালেন আর মনের বাসনা পূর্ণ হওয়ার কামনা করেন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর সবাই নিজ-নিজ বাড়ীতে ফিরে আসেন ঠিক এ-নিয়মে পরের দিন সকালে সূর্য দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে নদীতে স্নান এবং সরবত পানের মধ্য দিয়ে ছট পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় হরিজনদের এ-অনুষ্ঠানে যোগ হয় স্থানীয় মাড়ওয়ারী হিন্দু সম্প্রদায়

এবার ছট জমে উঠেছিলো প্রথম দিন থেকেই ছটের আনুষ্ঠানিকতা দেখার জন্য শহর কুষ্টিয়ার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গড়াই নদীর তীরে জমা হয়েছিলেন বহু মানুষ ছটের ঢাক-বাদ্যি আর আকর্ষণীয় আনুষ্ঠানিকতায় কুষ্টিয়াবাসীর মধ্যে সাড়া জাগায়

ছট উৎসবের প্রথম দিন

হরিজন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির আয়োজিত ছট উৎসবের প্রথমে ছিলো হরিজন, এনজিও প্রতিনিধি এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা ছট পূজার প্রার্থনা দেশবাসীর সান্তনা; ছট উৎসবের অঙ্গীকার বর্ণ বৈষম্য নিপাত যাক, এ-শ্লোগান

ধারণ করে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন সাবেক সাংসদ, পৌর-চেয়ারম্যান ও এ্যাডভোকেসী গ্রুপের সদস্য এ্যাডভৌকেইট বদরুদ্দোজা গামা শোভাযাত্রাটি কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরী মাঠ হতে বের হয়ে প্রধান-প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে পুনরায় পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে গিয়ে শেষ হয়

হরিজন সম্প্রদায়ের তিন শতাধিক শিশু, নারী-পুরুষ তাদের সংস্কৃতি সাধার জনগকে জানানো ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য শোভাযাত্রায় যোগ দেন হরিজন ঐক্য পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাংগাঠনিক সম্পাদক গোপাল চন্দ্র বিশ্বাস-সহ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কৃঞ্চা লাল এবং মহাসচিব নির্মল চন্দ্র দাস শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন

শোভাযাত্রা শেষে হরিজন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সভাপতি পান্নালাল জমাদারের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা শুরু হয় ছট উৎসবের আলোচনা সভাতে অংশ নেন বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ মহাসচিব নির্মল চন্দ্র দাস, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী রেজিষ্টার আমানুর রহমান আমান, কুষ্টিয়া পূজা উদযাপন কমিটির যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক জয়দেব কুমার, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ সভাপতি কৃঞ্চা লাল, এ্যাডভৌক্যাসী গ্রুপ টীম লীডার নজরুল ইসলাম, এ্যাডভৌকেইট বদরুদ্দোজা গামা প্রমুখ

হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য সাংবিধানিক অধিকারের নিশ্চয়তা, সামাজিক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে করণীয় ও বিঘ্নগুলো নিয়ে বক্তারা বিস্তারিত আলোচনা করেন নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আরও দৃঢ়তার সাথে সামনে এগিয়ে আসার জন্য হরিজন জনগোষ্ঠীর প্রতি আহবান জানানো হয় বক্তাদের পক্ষ থেকে

বক্তারা উল্লেখ করেন নানামুখী লাঞ্ছনার শিকার হরিজনদের পরিস্থিতি উন্নয়নে নাগরিক সমাজ ও মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম

ছট উৎসবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হরিজন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ছাড়াও কুষ্টিয়ার হিন্দোল শিল্প গোষ্ঠী, সুর সপ্তক একাডেমী, রিদোম মিউজিক্যাল ব্যান্ড দল (হরিজন) অংশ গ্রহণ করেন এছাড়াও, স্থান থেকে আসা হরিজন শিল্পীরা নাটক, গান ও নৃত্য পরিবেশন করেন

হরিজন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির ব্যানারে প্রথমে হরিজনদের বাস্তবজীবন সম্পর্কীয় নাটক প্রদর্শন করে চৈতন্য পল্লী হরিজন শিশু ফৌরাম নাট্যদল এবং জগৃতি হরিজন শিশু ফৌরাম নাট্য দল নৃত্য পরিবেশন করে জিকে হরিজন শিশু ফৌরামের তপন এছাড়াও দেশের গান, লালন-গীতি এবং আধুনিক গান পরিবেশন করেন মামুন, লক্ষ্মী, আশা, শিখা, ছায়া প্রমুখ

হরিজনদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠনের করণীয় বিষয়ক একটি মত বিনিময় সভায় হিন্দোল শিল্পী গোষ্ঠী জানায় হরিজনদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য তারা সব ধরণের সহযোগিতা করে যাবেন অনুষ্ঠানে সর্বশেষ পরিবেশনায় ছিলো আমন্ত্রিত হরিজন শিল্পী এবং রিদোম মিউজিক্যাল ব্যান্ড দল (হরিজন), পিরোজপুর তারা হিন্দি, লালন গীতি, রবীন্দ্র সংগীত-সহ বিভিন্ন ধরণের গান পরিবেশন করেন হরিজন শিল্পীদের গানে কুষ্টিয়ার হাজার-হাজার সাধারণ দর্শক মুগ্ধ হয় প্রথম দিনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন ফেয়ার-এর সহকারী প্রকল্প কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম এবং নিমেটর নিরঞ্জন কুমার বিশ্বাস

দ্বিতীয় দিন

ছট উৎসবের দ্বিতীয় দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হরিজন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, সুরসপ্তক সঙ্গীত এ্যাকাডেমী, দেশের বিভিন্ন জেলা হতে নিমন্ত্রিত হরিজন শিল্পী ছাড়াও রিদোম মিউজিক্যাল ব্যান্ড দল (হরিজন), পিরোজপুর গান পরিবেশন করেন

মিললাইন হরিজন শিশু ফোরাম এবং জিকে হরিজন শিশু ফৌরাম আমাদের কথা এবং এভাবে আর কত দিন নামক নাটক প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে হরিজন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির দ্বিতীয় দিন শুরু হয় বাংলাদেশের এক তারা সুর গানের সাথে নৃত্য করেন হরিজন শিশু তপন, বাসন্তী, জয়, আদুরী, ডলি এবং লক্ষ্মী দেশের গান, লালন গীতি এবং আধুনিক গান পরিবেশন করেন তাপস, প্রিয়া, রঞ্জিতা, আশা, বিউটি প্রমুখ এছাড়াও পাবনার হরিজন শিল্পী হেমন্ত, দিপা এবং লতা গান পরিবেশন করেন সুরসপ্তক সঙ্গীত একাডেমী গানে-গানে কুষ্টিয়ার ঐতিহ্য তুলে ধরে এছাড়া তাদের পরিবেশনার মধ্যে ছিলো দেশের গান, লালন-গীতি ছাড়াও আধুনিক গান

দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে সর্বশেষ পরিবেশনা ছিলো রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা হতে নিমন্ত্রিত হরিজন শিল্পী এবং রিদোম মিউজিক্যাল ব্যান্ড দল (হরিজন), পিরোজপুর তারা হিন্দি, লালন-গীতি-সহ বিভিন্ন ধরণের গান পরিবেশন করেন

অংশগ্রহণকারীদের মতামত

ছট উৎসবের অংশ নেয়া কয়েকজন শিপী ছাড়াও এ-প্রতিবেদকের সাথে অনুষ্ঠান উপভোগকারী বহু মানুষজনের সঙ্গে আলাপ হয় এদের কয়েকজন অনুভূতি এখানে তুলে ধরা হলোঃ

রতন, পিরোজপুরঃ আমাদের সম্প্রদায়ের এই ধরণের একটি অনুষ্ঠানে আমি এবং আমার দলের অন্য সদস্যরা অংশগ্রহণ করতে পেরে খুবই ভাল লাগছে এ-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কুষ্ঠিয়ার হরিজনরা সাধারণ মানুষদের কাছ হতে বিভিন্ন ধরণের সহায়তা পাবে বলে মনে করি

জীবন, ফরিদপুরঃ আমি অনেক অনুষ্ঠানে গান করেছি, তবে এ-অনুষ্ঠানে গান গাইতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত হরিজন হিসেবে আমার মনে অনেক সাহস সঞ্চয় হয়েছে

দীপা, পাবনাঃ আমি একজন হরিজন, অনার্স পড়ি কিন্তু কখনও হরিজনদের অনুষ্ঠানে গান গাইনি আমার খুব ভালো লাগছে

মিলন, দর্শকঃ শুধু এ-অনুষ্ঠানই না, ফেয়ার যেভাবে হরিজনদের উন্নয়নে কাজ করছে, তাতে বলা যায়, হরিজনরা সফল হবে

আক্তারী সুলতানা, এনজিও প্রতিনিধিঃ হরিজনদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুনে দেখতে এলাম, সত্যিই এদের প্রতিভা আছে এ-প্রতিভা দিয়ে নিশ্চয় তারা সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন

সভাপতি, হিন্দোল শিল্প গোষ্ঠীঃ হরিজনেরা আমাদের মতোই মানুষ, মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই উচিৎ হরিজনদের সামাজিক-ভাবে মুল্যায়ন করা উদ্যোক্তা ও সহায়তা দানকারী সংগঠনগুলোর মতে, এবারের ছট উৎসবের মধ্য দিয়ে হরিজন সম্প্রদায়ের সমস্যাদি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে মূলধারার মানুষেরা কিছুটা হলেও অবহিত হতে পেরেছেন এছাড়াও উৎসবের ফলে দেশের নানান স্থানের হরিজন শিল্পীরা সংগঠিত হয়েছে ও উজ্জীবিত হয়েছেন প্রথমবারের উৎসব আয়োজনে কিছু-কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও, সামনের দিনগুলোতে এসব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আরও বৃহৎ পরিসরে উৎসব আয়োজনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে

২ ডিসেম্বর ২০০৮

-এ ফিরতি

-তে ফিরতি

 
 

2007 Confidence Services Ltd.