|
নারী উপাখ্যান
আতিকা
বিনতে বাকী
এ-সমাজ ও
এ-সমাজের কনসেপ্টটা কে সৃষ্টি করেছে বলতে পারেন? নিশ্চই বলবেন 'মানুষ
ছাড়া আর কে', তাই না? ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে
এর ব্যাখ্যা অবশ্য সম্পূর্ণ আলাদা ও বিতর্কিত।
তাই ওই প্রসঙ্গ আপাততঃ
তোলাই থাকুক।
কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে,
ভালো-মন্দ, পবিত্র-অপবিত্র ইত্যাদি
বিষয়গুলোর ধারণা কবে থেকে মানুষের জীবনে জড়িয়ে পড়লো? আসলে মানুষ প্রয়োজন
অনুযায়ী তার বহু বছরের অভিজ্ঞতাকেই বিশেষ বিশেষ খাতে প্রবাহিত করে এবং সুবিধা
অনুযায়ী 'বিভেদ' ও 'ব্যবধান' নামের বিষয়গুলো দিয়ে
ইটের পর ইট সাজিয়ে সুউচ্চ দেয়াল গড়ে তুলেছে।
মানুষ দিনে দিনে সভ্যতার
সৃষ্টি (!) করে গেছে এবং কখনও আর পেছন ফিরে তাকায়নি।
আসলে বিষয়টা হলো, হয়তো তাকাতে পারেনি।
কারণ তাকাতে গেলে
নিজেদের সৃষ্টিগুলো দেখে নিশ্চিত লজ্জা পাবার আশঙ্কাটা থেকেই গিয়েছিলো।
নৃবিজ্ঞানের আলোচনার ক্ষুদ্র ও সহজ উপস্থাপনার মাধ্যমে বিষয়টির সামান্যই বর্ণনা করা
যেতে পারে এক্ষেত্রে।
নৃবিজ্ঞানীদের মতে, আদিম সমাজে মানুষে
মানুষে প্রভেদ ছিলো না।
সবাই হয়তো সুখী ও নিজ
নিজ অস্তিত্ব
ও সম্মান নিয়ে জীবন-যাপন করতো।
নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সবাই
শিকার ও সংগ্রহের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো।
পরবর্তীতে সভ্যতার যাত্রা যখন একধাপ এগিয়ে পশুপালনের সাথে যুক্ত হলো, ঠিক সে-মুহূর্তে নারী ও
পুরুষের জন্য কাজের পরিধি ও পরিচিতি নির্দিষ্ট হয়ে গেলো।
এ-পর্যায়েই মূলতঃ নারীরা
একধাপ এগিয়ে গেলো আবদ্ধ জীবনের দিকে।
আর প্রতিনিয়ত বিভিন্ন
কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রমাণের চেষ্টা অব্যাহত থাকলো যে, শারীরিক ও মানসিকভাবে নারী
পুরুষের চেয়ে দূর্বল।
মূলতঃ নারীর-যে
প্রতিমাসে স্বাভাবিক নিয়মে নারীত্বের জানান দেয়া শুরু হয়েছিলো এবং সন্তান ধারণের
মাধ্যমে নারী তার জীবনের বিশেষ কিছু সময় পুরুষের সমান কাজের অংশীদার হতে সম্ভব হতো
না, এ-বিষয়টি যা, বস্তুতঃ নারীর
একটি বিশেষ ক্ষমতা, তা অক্ষমতা হিসেবে নির্দেশ
করেছিলো সুচারু ভাবে।
তাই, সর্বজন দ্বারা স্বীকৃতি
লাভ হলো, শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতায়
অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ মানুষ যারা নারী বলে পরিচিত, তারা পুরুষদের বা অপেক্ষাকৃত
শক্তিশালীদের অধিনস্তে পরিণত হলো।
এ-যুগে পুরুষরা
বন্যপ্রাণীদের বশ করে নিজেদের আয়ত্বে আনতে সক্ষম হলো এবং নারীরা গৃহস্থালীর কাজে
জড়ালো।
এক্ষেত্রে, নারীর শারীরিক দিকটিই
গুরুত্বপূর্ণ ছিলো এবং মানসিক দিকটি সম্পূর্ণই উপেক্ষিত হয়েছিলো।
এ-যুগেই মানুষ বড়ো
গোষ্ঠী ভেঙে ছোটো ছোটো দল তৈরী করলো।
এ-দলগুলোর মধ্যে যাদের
পশুর সংখ্যা বেশি, তারাই অন্যদের চেয়ে শক্তিশালী, কর্মঠ ও কর্মদক্ষ হিসেবে
বিবেচিত হলো।
এরপর, আরো একটু এগিয়ে চলা এবং
যাযাবর জীবনের অবসান ঘটিয়ে নির্দিষ্ট একটি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলো মানুষ।
এবার ছোটো দল ভেঙে একদম “নিজের” বিষয়টির সৃষ্টি হলো।
এবার নিজের সম্পদ, নিজের পশু, নিজের সন্তান, নিজের বংশ ইত্যাদিতে
স্থায়িত্ব লাভ করলো।
তবে অনেকক্ষেত্রেই
'নারী' নিজের নারী হতে পারলো না।
তবে, নারীরা এবার চিরতরেই
আবাস পাতলো অন্দরমহলে।
এক্ষেত্রে, কার্ল মার্ক্স ও
এঙ্গেল্স-এর তত্ত্বের স্মরণাপন্ন হলে জানা যায় যে,
‘মানুষে মানুষে প্রভেদ
তখনই শুরু হয়েছিলো যখন মানুষের মাঝে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা তৈরী হয়েছিলো।’ মূলতঃ এ সময়টাতেই সমাজ, সমাজে বাস করার তত্ত্ব, রীতি, ভালো-মন্দ, পবিত্র-অপবিত্র ইত্যাদি
তথাকথিত মহতি (!!) বিষয়ের প্রচলন শুরু হয়েছিলো।
অর্থাৎ, যে বিষয়গুলো
শক্তিশালীদেরকে শক্তিশালী হিসেবে চিহ্নিত করে, শুধু সেই বিষয়গুলি সমাজ
ও তার একক হিসেবে টিকে গেলো।
মানুষ, প্রতিনিয়ত হানাহানি
করেছে এই সম্পদ আহরণ করতে গিয়ে।
দিনের পর দিন একে অন্যকে
ঠকিয়েছে আর সৃষ্টি করে গেছে সভ্যতার।
এক্ষেত্রে একটি বিষয়
স্পষ্ট করেই বলা যায় যা এই প্রভেদের সারকথাও, সবল যখন বুঝে গিয়েছিলো
তার শক্তি, কুটিল বুদ্ধি ও
স্বার্থপরতার কথা, তখনই সে ঠকিয়েছে অন্যকে।
প্রত্যেকটি বীরত্বগাঁথার
পেছনে যে ইতিহাস লুকায়িত, সেখানে আহরিত সম্পদের
পেছনে এক ভয়াবহ ও নৃশংস ইতিহাসের জাল বোনা রয়েছে এবং আমাদের ভাবনার জায়গাটা সে
অব্দি পৌঁছায় না।
আমরা মনে মনে ও তীব্র
কল্পনাশক্তির বদৌলতে অনুভব করি রাজা ও রানীর এক অনন্যসাধারণ জীবনের, প্রেম কাহিনীর।
যেখানে রাজকীয় পোশাক, রাজার বীরত্ব এবং যে
বীরত্ব অন্যকে বধ করা বা অনেকক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের নারীকে বা নারীদেরকে অপহরণ করে ও
রাজ্য দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
এরপর
নারীও আস্তে আস্তে এতো যুগের ইতিহাস ভুলে অন্দরমহলই শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করে নিজেদের
অবরুদ্ধ করলো।
হয়তো তাদের পূর্বজদের ইতিহাস
সম্পর্কে তারা অবগত হওয়ার সুযোগ লাভ করেনি।
আবার, এমনও হতে পারে, আদিম কালের নারীরা বর্বর
হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছিলো।
তাই, তাদেরকে আর আদর্শ হিসেবে, হিসেবের মধ্যেই ধরা হয়নি।
হয়তো, এমনও ভাবা হয়েছিলো, তারা অসভ্য ছিলো, তাদের শিক্ষা ছিলো না, সমাজ বা সামাজিক
রীতিনীতি ছিলো না ইত্যাদি।
তাই, নারী-পুরুষ একই কাজ একই
সাথে করেছে এটা কোনো
স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে
বিবেচিত হয়নি।
সময়ের
পরিক্রমায় যুগ বদলের শেষ দোরগোড়ায় সৃষ্টি হলো রাষ্ট্র নামক নতুন এক বিষয়।
এক্ষেত্রে লুপ্ত হলো
রাজা ও রাজ্যের ধারণা।
নানাবিধ সৃষ্টি, সুখ, সমৃদ্ধি ইত্যাদিকে
উপজিব্য হিসেবে গণ্য করে আত্ম প্রকাশ ঘটালো এক একটি রাষ্ট্র।
রাষ্ট্র সৃষ্টি করলো
নানাবিধ নাগরিক সুযোগ সুবিধা।
বলা হয়, সভ্যতার সবচেয়ে বড়ো
নিদর্শন হলো আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা।
সত্য মিথ্যা বিচার করার
জ্ঞান বা বুদ্ধি কোনোটিই আমার নেই।
আধুনিক রাষ্ট্রে নারীরা
আর অন্দরমহলে অবরুদ্ধ নয়।
আশার কথা
হলো, প্রায় সবক্ষেত্রেই নারীর
বুদ্ধিদীপ্ত বিচরণ লক্ষ্য করা যায়।
আবার, এই নারীদেরই আধুনিকতার
নামে সহজেই পণ্য হিসেবে উপস্থাপিতও হতে দেখা যায়।
যেমন, টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে
ওঠে মিঃ হোয়াইটদের ইমপ্রেস করতে নাম না জানা মেয়েটি রেক্সনা ডিওড্রেন্ট মেখে সদা
প্রস্তুত থাকছে।
আবার, বিল বোর্ডের দিকে তাকালে
চোখ আটকে যায় যে একজন
স্বাস্থ্যবতী
বয়স্ক নারী
রাস্তার ওপর ফেরীওয়ালার কাছে শাক-সবজির দরদাম করছেন আর সবজি ওয়ালারা নাক চেপে বসে
আছে।
এটিও রেক্সনা ডিওড্রেন্ট-এর
বিজ্ঞাপন।
ব্যক্তিগত ভাবে আমার কোনো
কম্পানীর সাথেই বিরোধ নেই তা স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছি।
বিশ্বায়ণের এ যুগে
নারীকে পণ্য হিসেবে উপাস্থাপনের চিত্রটি বেশ কিছু দিন ধরেই কয়েকজন নারী লিখে চলেছেন
বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে।
কারণ, বড়ো বড়ো পত্রিকাগুলো তা
ছাপায় না।
এই না ছাপানোর কারণ হিসেবে একটা
বিষয় স্পষ্ট ধারণা দেয় যে, বড়ো বড়ো পত্রিকাগুলো
তাদের বিজ্ঞাপণ অংশটি, যা তাদের আয়ের একটি বড়ো
খাত, তা তারা হারাতে রাজি নন।
তারা তাদের নারী বিষয়ক
বোধের জায়গা থেকে সপ্তাহে একটি বিশেষ আয়োজন রাখেন যার নাম নারীপাতা।
কিন্তু, উক্ত লেখকদের লেখা
কথাগুলো প্রিন্টেড কাগজেই শোভা বাড়িয়েছে এবং বস্তুত কোনো ফলাফল লাভ করেনি।
এই লেখাটিও পূর্বের
লেখকদের লেখার মতোই প্রিন্টেড কাগজে শোভা পাবে, সেকথা আর বলার অপেক্ষা
রাখে না।
আরো একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়
যে, যেসব নারী বিজ্ঞাপনের মডেল
হয়েছেন তারা কখনও অনুভব করার প্রয়োজনই বোধ করেননি যে তারা পণ্য হিসেবে উপাস্থাপিত
হয়েছেন মাত্র।
আমি কয়েকজনের সাথে আলাপচারিতায়
জানতে পেরেছি তাদের মনোভাব।
প্রথমত, তারা মনে করে থাকেন তারা
টেলিভিশনের পর্দায় মুখ দেখাতে পারছেন এবং খুব সহজেই তাদের পরিচিতি লাভ হচ্ছে এবং
সাথে সাথে তারা খ্যাতি লাভ করছেন।
দ্বিতীয়ত, তারা মডেল না হলেও কেউ
না কেউতো এই বিজ্ঞাপনগুলোর মডেল হবেনই।
তাই নিজের সুয়োগটা সে
অন্যকে দিতে রাজি নন।
বস্তুত, ঘটনাগুলি সত্যি।
আসলে বিজ্ঞাপনগুলোর মূল
সমস্যা হলো এর মেকিং ও কাহিণী।
এই দু’টি
বিষয় যদি নির্মাতারা মাথায় রাখেন তবে নারীকে আর পণ্য হতে হয় না।
(নির্মাতাদের সাথেও আমার
ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই)
একটু
পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায় আরব্য রজণীর গল্পগুলোতে খোলা বাজারে অন্যান্য পণ্যের
সাথে বিভিন্ন ঝলমলে পোশাক পরিহিতা নারীরাও বিক্রি হচ্ছে।
এরই আধুনিক সংস্করণ
মূলতঃ বিশ্ববাজারের বিজ্ঞাপণগুলো।
সরাসরি নারী বিক্রি
হচ্ছে না এক্ষেত্রে, বিক্রি হচ্ছে তাদের ব্যবহৃত
সামগ্রীগুলো খুব নিম্নমানের উপস্থাপনায়।
আরব্য রজনীর গল্পগুলো
কল্পিত কোনো ঘটনা নয়, এগুলো সমসাময়িক সময়ের
প্রতিচ্ছবির আলোকেই নির্মিত।
নারীরা
আজ সফলতার পদচিহ্ন রাখছে সবক্ষেত্রেই।
এতে, যেমন তাদের নিজেস্ব
যোগ্যতাকে নির্দেশ করে ঠিক তেমনি এটাও সত্য যে অনেক মহত পুরুষই তাদের অন্দরমহল থেকে
বাইরের জগতে পা রাখবার বিষয়টি আন্তরিকতার সাথেই অনুভব করেছেন।
ইতিহাস সেরকমই সাক্ষী
দেয় বাংলাদেশের বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জীবনীতে।
তাই, আধুনিক যুগ ও আধুনিকতা
মানেই জিন্স টি-শার্ট, বিশেষ কায়দায় শব্দের
উচ্চারণ নয়, আধুনিকতা হতে হবে
সাবলীল বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বের
উপস্থাপনা।
যেখানে নারীকে আর পণ্য হতে হয়
না।
শুধু বর্তমানে বাঁচলে চলবে না, বরং ভবিষ্যতের নারীদের
জন্য দৃষ্টান্ত ও ব্যক্তিত্ব
সম্বলিত
একটা জায়গা তৈরী করতে হবে নারী
ও পুরুষ উভয়কেই।
আতিকা
বিনতে বাকী
|