London:

Home

Archive

Contact

About us

সম্পাদকীয়

কলাম

সাক্ষাতকার

সাময়িকী

ঘুর দেখি লন্ডন

পাঠকের কলম

কী-কখন-কোথায়

পত্র-পত্রিকা

 রেডিও

টেলিভিশন

ফটো-গ্যালারী

নিজের ভাষার কোনো গুরুত্বই নেই যেনো- ভাষা সৈনিক রওশন আরা চৌধুরী

[ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা নিয়ে কিছু ছড়ানো ছিটানো কাজ হয়েছেসে-সময়ের ছবিতে নারীদের মিছিলের সারি দেখা যায় কিন্তু তাদের স্বীকৃতি কোথায়? সম্প্রতি ভাষা সৈনিক রওশন আরা চৌধুরীর সাথে কথা বলেছেন উদিসা ইসলাম।] 

উদিসা ইসলামঃ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের দিন কি কি ঘটেছিলো সেই গল্পই শুনবোকোনো প্রশ্ন আপনার সামনে আপাতত রাখছি না

রওশন আরাঃ আমরা দুইশো বছর ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিলামআমরা নির্যাতিত হয়েছিকিন্তু শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছিভারত দ্বি-জাতিতত্ত্ব ভিত্তিক হয়ে গেলে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি যখন ভাগ হয়ে গেল তখন আমরা দেখলাম, আমরা আসলে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিআবারো আমাদের একজন শাসক দাঁড়িয়ে গেছেআমরা শোষিতএকই সময় আমরা দেখলাম, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিলো আমাদের ভাষা নিয়েভাষাকে আমরা তখন হারাতে বসেছি জিন্নাহ্‌ বক্তৃতায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলোতখনই আমরা না না করে উঠেছিলামশোনেনি এরপর যখন খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এসে আবারো সেই একই কথা বললেন তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করে ওঠে

জরুরী সভা ডাকা হলোঠিক হলো ৪ঠা ফেব্রুয়ারী আরেকটা সভা হবে এবং সভা শেষে মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করা হবে৪ঠা ফেব্রুয়ারী সফলতার সাথে সেটা করে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তে আসলামএ বিষয়ে একটা কথা আছে আমারা বুঝেছিলাম গ্রামে-গঞ্জে যদি এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে না পারি তাহলে ঢাকায় খুবই কম সংখ্যক মানুষ নিয়ে আমরা অর্জন করতে পারবো না কিছুইএই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ১২ ফেব্রুয়ারী থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারী এই তিন দিন আমরা পতাকা দিবস পালন করলাম, দলে-দলে ভাগ হয়ে সভা করলামএ-আগুন যখন ছড়িয়ে গেলো তখন আমরা ২১ ফেব্রুয়ারী আরেকটি মিছিলের সিদ্ধান্তে আসিসেদিন ছিলো প্রদেশের আঞ্চলিক পরিষদের অধিবেশনতাই সেই দিনটাকেই বেছে নেয়া হলোসেদিনের কর্মসূচিতে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের দাবির সাথে-সাথে আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিষয়টাকেও আমরা জুড়ে দিইএই দাবিগুলো মিলিয়ে আমরা একটি আঞ্চলিক মেমোরেণ্ডাম (স্মারক) পেশ করার চেষ্টা করলাম    

এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ২০ ফেব্রুয়ারী আমরা প্রস্তুতি নিতে থাকিসব ঠিকঠাককিন্তু হঠাৎ করেই সরকার আমাদের প্রস্তুতি টের পেয়ে আন্দোলন দাবিয়ে দিতে ১৪৪ ধারা জারি করে ফেললোআমরাও বুঝতে পারছিলাম আমাদের এই আন্দোলনকে বানচাল করে দেয়ার জন্যই এই আয়োজন২০ তারিখ মেয়েরা হোস্টেলেই ছিলামএবার আমি শুধু মেয়েদের কথাই শুরু করিআমাদের সামাজিক বাস্তবতা যা ছিলো ছেলেতে-মেয়েতে কথা বললে ১০ টাকা ফাইন করা হতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, আমরা তো যথেষ্ট বুদ্ধি রাখিকিন্তু তাতে কি? কোনো বই দরকার হলে মাঝখানে প্রক্টর দাঁড়িয়ে থাকতেনতার সামনে কথা হতোআবার ফেরত দেয়ার সময়ও তাইসেই অবস্থায় এরকম আন্দোলনে অংশগ্রহণ, বুঝতেই পারছোআমরা মেয়েরা যে আন্দোলনে শরিক ছিলাম সেদিন আমাদের ভূমিকাটা কি ছিলো? এই কথাটাই আজ বলতে চাইকথাগুলি ঠিকভাবে উঠে আসা দরকার

আমরা জানতাম কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে হোস্টেল থেকে বের করে দিবে, আমরা জানতাম অভিভাবকরা পড়ালেখা বন্ধ করে দিবেন ছেলেদের সাথে কথা বলা, আন্দোলন করার অপরাধেসেসব তোয়াক্কা না করে আমরা বেরিয়ে এসেছিআরেকটি কথা বলিআমাদের আন্দোলনকে অন্য খাতে প্রবাহিত করতে বেতন বাড়িয়ে দেয়া হলো হুট করেনানারকম বিধি-নিষেধ, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে আমরা গোপন সভা করতামতখন বেতন ৮ থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা করা হলোসেদিনের হিসেবে ১২ টাকা কিন্তু অনেক টাকাআর মা-বাবার তো একটা সন্তান ছিলো না যে, তার পিছনেই সব খরচ করবেসেসব ভেবে বেতন বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন করলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাম কেটে দেয়ার হুমকি দেয়া হলোকেউ-কেউ অবশ্য বাড়তি টাকা দিতে রাজি হয়ে সরে পড়লো কিন্তু আমরা আন্দোলন চালিয়ে গেছি

পরবর্তীতে যখন ভাষা আন্দোলন আসলো তখন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য গোপন সভা করে ঠিক করলাম কর্মসূচিটা কি হবেপোস্টার লেখার জন্য কি করতাম জানো? তখন তো এতো কাগজ কেনার পয়সা আমাদের ছিলো নাছেলেরা হল দারোয়ান ননী দার কাছে পুরোনো সংবাদপত্র দিয়ে যেতো আর আমরা রাত জেগে আলতা দিয়ে, কাজল দিয়ে সেগুলোর ওপর লিখে পোস্টার বানাতাম- 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই',  'আরবি হরফে বাংলা চলবে না' নুরুন্নাহার করীরই বেশিরভাগ সময় পোস্টার লিখতেনতার হাতের লেখা অসাধারণ ছিলো, আমরা তাকে সাহায্য করতামতিনি যা করেছেন, তার স্বীকৃতি কি পেয়েছেন বলে মনে করো? কেনো পাননি?

আলতা দিয়ে লিখে ডরমেটরীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শুকিয়ে ফেলতামননীদা এসে বলতো, 'দিদি ছেলেরা কাগজ লিতে এসে গেছে' তিনি পোস্টারগুলো পৌঁছে দিতেন ছেলেদের হাতেভোরে অন্ধকার থাকতে ছেলেরা আসতোতাদের নামও জানতাম নাএই যে মেয়েদের অবদানগুলি, এই যে নুরুন্নাহার কবীর যা করেছেন, সেইসব কথা- আন্দোলনের সাথে যেসব ছেলেরা জড়িত ছিলো তারা উচ্চারণ করেন না কেনো?

২০ ফেব্রুয়ারী পোস্টার নিয়ে চলে গেলো২১ ফেব্রুয়ারীতে আমরা বিভিন্ন স্কুল কলেজ থেকে ছাত্রী সংগ্রহ করতে বের হলামঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমরা তো মাত্র কয়জন মেয়েএমনকি প্রাইমারি স্কুল থেকেও মেয়েদের এনেছিলামমেয়েদের নিয়ে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছালাম তখন দেখি বিরাট বাধা সৃষ্টির প্রস্তুতি নিয়েছে প্রতিপক্ষআমরা আগেই টের পাচ্ছিলাম সেটাআমরা নিরস্ত্র আর ওরা সশস্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় গেটের সামনে ৩/৪ ট্রাক পুলিশতখন প্রশ্ন ওঠে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবো কি করবো নামধুদার দোকানে তর্ক চলছেবেলা ১২টায় সভা শুরু হয়সভাপতি ছিলেন গাজীউল হক১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা নিয়ে সভায় বিভক্তি সৃষ্টি হয়কেউ শান্তিপূর্ণ মিছিল করবে বলে জানালো, আর কেউ মিছিলে যেতে রাজি নামনে রাখতে হবে, ভাষা আন্দোলন একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনএখানে কারো নেতৃত্ব ছিলো সেটা বলা ঠিক হবে নাএসব সময়ে নেতা তৈরি হয়ে যায়যেমন ২১ ফেব্রুয়ারী কিভাবে কি হবে এটা ১১জন ছাত্র আগের দিন রাত্রে শহীদুল্লাহ হলের পিছনের পুকুর ঘাটে বসে রাত ১১টায় ঠিক করেছিলোসেই গোপন সভায় মতিন ভাই, অলি আহমেদ, গাজী ভাই, তোহা সকলেই ছিলেনতারাও শঙ্কিত ছিলেন একদল হয়তো কর্মসূচি থেকে পিছু হটতে চাইবেকিন্তু যতোই শঙ্কা থাকুক না এটা নিশ্চিত ছিলো যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোয়ার ঠেকানো সম্ভব হবে নাতো যেটা বলছিলাম, সেদিন নেতৃত্ব ছিলো সাধারণ শিক্ষার্থীদেরই হাতেযখন শামসুল হক বললেন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করে শান্তিপূর্ণ মিছিল করার কথা তখন সকলে হৈ হৈ করে উঠলোমধুদার দোকান থেকে টেবিল এনে তার ওপর চেয়ার দিয়ে গাজীউল হককে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো গাজীউল হক আর মতিন ভাই জিজ্ঞেস করলেন সবাইকে - 'আমরা কি ১৪৪ ধারা ভাঙতে চাই?' সকলে বলে ওঠে 'চাই .. .. চাই'সে শব্দ আজো আমার কানে ভাসে সিদ্ধান্ত হলো ১৪৪ ধারা ভাঙবো কিন্তু আরেকটি প্রশ্ন তারপরই দেখা দিলো যে, কিভাবে ভাঙবো?

একবার কে যেনো প্রস্তাব করলো ২জন ২জন করে সামনে এগুতে থাকিকিন্তু এতো মানুষ ২জন করে এগুবে এটা অবাস্তব আর তাতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গও হবে নাএদিকে গেটের সামনে পুলিসি ব্যারিকেড বন্দুকের নল আমাদের দিকে তাক করামূল গেট এর কাছে যখন গেলাম দেখি ডঃ শহীদুল্লাহ, ডঃ মোজাফ্‌ফর আহমদ, মতিউর রহমান সব শিক্ষকরা সেখানেডঃ শহীদুল্লাহর মুখটা খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছিলআজও মনে আছেতিনি বললেন, 'পুলিশ পজিশন নিয়ে আছে সেটা খুবই চিন্তার' তারপর সিদ্ধান্ত হলো ১০জন করে এগুবেসব দলেরই সামনে থাকবে মেয়েমতিন ভাই তালিকা করতে শুরু করলেনমেয়েদের সামনে দেয়ার পিছনে যুক্তি ছিলো এতে করে পুলিশি গ্রেফতার এড়ানো যাবেআমি নিজে প্রথম যে ১০জন সামনে হাঁটা দেয় সেই দলের সামনে ছিলামএগিয়ে যাচ্ছি আর ব্যারিকেড দেখে ভাবছি এইতো এটাই ১৪৪ ধারাএটা পার না হতে পারলে ১৪৪ধারা ভাঙা হবে নাভাবছি আর এগুচ্ছি

ড. সুফিয়া খাতুন তখন উইমেন্স ইউনিয়নের ভিপি ছিলেনউনি লাঠির ব্যারিকেডের ওপর দিয়ে পেরিয়ে গেলেন আর হালিমা খাতুনসহ আরো যারা ছিলো তারা গেলো লাঠির নিচ দিয়েআমার কিন্তু লাঠির নিচ বা ওপর দিয়ে যাওয়াটা একেবারেই পছন্দ হলো নাআমি করলাম কি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলামমেয়েরা যেনো বেরিয়ে এসে মিছিলে যোগ দিতে পারে তাদের সহযোগিতার জন্যএভাবে একটি দুইটি দল পার হবার পর তৃতীয় দলের ছেলেদের সাথে ব্যারিকেড ভেঙে পার হলামযখন পার হচ্ছি ঠিক সে-সময়েই শুরু হলো লাঠি চার্জ ব্যারিকেড দিয়েছিলো যে লাঠি দিয়ে সেগুলো তো আমরা ভেঙে দিয়েছিলামপুলিশ করলো কি, ওই লাঠি দিয়েই আমাদের পেটাতে থাকলোসবাই কমবেশি আহত হলেও শ্লৌগান দিতে-দিতে এ্যাসেম্বলী হলের দিকে এগুতে থাকি আমরাকিন্তু মেডিকেল মোড়ে যখন পৌছালাম তখন দেখি রণক্ষেত্রপুলিস অনবরত গুলি ছুঁড়তে শুরু করেছেকোথা থেকে ছোঁড়া হচ্ছে সেই দিশাও পাইনি

মেডিকেল গেটের পাশেই ছিলো একটা বইয়ের দোকান আর রেঁস্তোরাসেই রেঁস্তোরার এক-কোনে কতোগুলো ভাঙা রিক্সা ছিলোসেখানে রিক্সার পা-দানী স্তুপ করা ছিলোআমি করলাম কি (সেসময় চারিদিক অন্ধকার টিয়ার সেলের কারণে কিছু দেখা যায় না, হৈচৈ বেড়েই চলেছে) সামনে গুলি চলছে বুঝে যেকোনো সময় গুলি লাগার সম্ভাবনা আছে দেখে একটা শেষ চেষ্টা করার কথা ভাবছি, ভাবছি বাঁচতে হবেপাশে সলিমুল্লাহ হলের প্রভোস্টের ডঃ বদির বাসাআমি উনার বাড়িতে লাফ দিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলামলাফটা দিতেই কাটাতারে শাড়ি আটকে গেলকেউ একজন সেটা ছাড়িয়ে দিতেই আমি ওপাশে চলে গেলাম

বিকেল হতেই খবর আসতে শুরু করলোশুনলাম বরকত, সালামসহ অনেকে নিহতএবং আরো লাশ মেডিকেলে আছেপরের দিন আমরা আবার কর্মসূচি দিই এ্যাসেম্বলী হল থেকে তর্কবাগীশ আব্দুর রশীদ ছুটে আসেনতিনি বলেন, 'আমার ছাত্রদের মারা হচ্ছে আর আমি ভিতরে বসে পাখার বাতাস খাব? এসব বরদাস্ত করা যাবে নাআমি আইন পরিষদ, সংসদ ভবন ত্যাগ করে ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে যাচ্ছি' বিকেল ৫টায় একেবারে ফাঁকা চারিদিকআমি ভয় পাচ্ছিলাম কিভাবে হোস্টেলে ফিরবোসেদিন মুনীর চৌধুরী আমাকে হোস্টেলে পৌঁছে দেনএই ছিলো ২১ ফেব্রুয়ারীর দিনটি

উদিসাঃ যে কয়জন মেয়ে আপনারা ছিলেন, তাদের সবার সাথে যোগাযোগ আছে আপনার?

রওশন আরাঃ অনেকের সঙ্গেই আছেঅনেকে ইতোমধ্যে মারা গেছেনমিছিলে ছিলো হালিমা, সুফিয়া (বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন আমরা ৬/৭জন মেয়ে) বাকিরা স্কুল-কলেজেরআরো ছিলো সেদিন রোকেয়া খাতুন, সাফিয়া খাতুন, জাহানারা

উদিসাঃ আপনি তখন কোন্‌ বর্ষে পড়তেন?

রওশন আরাঃ দ্বিতীয় বর্ষে

উদিসাঃ এই যে পথে নামলেন আন্দোলন করতে, পারিবারিক চাপ ছিলো না?

রওশন আরাঃ ছিলো না আবার! আমাকে বাসা থেকে বলে দেয়া হয়েছিলো- 'তোর কারণে তোর অন্য ভাইবোনদের পড়ালেখা যেনো বন্ধ না হয় সেটা মনে রাখিস' ছেলেদের সাথে মিলে আন্দোলন? চাচাতো -মামাতো ভাইয়েরা বাড়িতে বেড়াতে আসলেই তো আমাদেরকে চোখের ইশারায় ভিতরে চলে যেতে বলা হতোআমি রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে ছিলাম

উদিসাঃ আপনাদের অবদানে আমরা নিজের একটা ভাষা পেয়েছিআপনাদের অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন কি?

রওশন আরাঃ পদক কে পেলো কে পেলো না সেটা নিয়ে আমি ভাবি নাআমি যেভাবে দেখতে চাই সেটা হলো, আমি যা করতে চেয়েছি তা করতে পেরেছি কিনাআমার বাংলা ভাষা, আমার মাতৃভাষা যেজন্য আমি/আমরা লড়াই করেছি, আমার ভাইয়েরা রক্ত দিয়েছে সেটা প্রতিষ্ঠিত হলো কিনাসেটা যদি হয়ে থাকে তাহলে আমি স্বীকৃতি পেয়েছি বলেই মনে করবো

উদিসাঃ এখনকার ছেলে-মেয়েদের বিষয়ে কি মনে হয়? তারা কি সেই চেতনা ধরতে পেরেছে কি?

রওশন আরাঃ দুঃখ হয় জানো? এখন বাংলার যে করুণ দশা ভাবলেই মনকে পীড়া দেয় কথায়-কথায় ইংরেজি আর হিন্দিনিজের ভাষার কোনো গুরুত্বই নেই যেনোইংরেজি বলা বা শেখা খারাপ না কারণ বিশ্বায়নের যুগে আমি এটা অমান্য করতে পারি নাপিছিয়ে পড়ার ভয় আছে তাতেতারপরও আমাদের যে সংস্কৃতি, আমাদের যে শিক্ষা, আমাদের যে মাতৃভাষা তার স্থান সবার ওপরে থাকবে সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? আমাদের যে সমৃদ্ধ ভাষা আছে সেটাকে বিকৃত করা একেবারেই সহ্য হয় না

আজকাল টেলিভিশন দেখি, আমাদের বাংলা ভাষা আধুনিকতার নামে উচ্চারণের দিক দিয়ে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে ভাষাটাকে রীতিমতো নষ্ট করে ফেলেছেআমরা ভাষার উন্নতি, আধুনিকায়ন অবশ্যই চাইকিন্তু সেটা কিভাবে? আমাদের উচ্চারণ ঠিক হবে, আমাদের সংস্কৃতি, জীবন যাপনের সাথে মানানসই হবে তবেই না সমৃদ্ধ হবে ভাষাসেজন্য আমি মনে করি প্রচুর গবেষণা হওয়া দরকার, ভাষা ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানও জরুরী আর বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আসনে বসিয়ে রাখলেই চলবে না এর চর্চাটার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে

উদিসাঃ এ প্রজন্মের জন্য বলার কিছু আছে নিশ্চয়..

রওশন আরাঃ এটুকুই বলবো, সব এখনো শেষ হয়নিবাঙালির জাতীয় সত্ত্বাটাকে যেন ভুলে না যাইআমাদের দেশীয় পার্বণ, রীতি, মেলা এগুলো হারিয়ে যাচ্ছেআমাদের যাত্রা-গান, আমাদের নিজস্ব যে বিষয়গুলো সেগুলোকে বাঁচানোর দায়িত্ব এই প্রজন্মেরইএটা ভুলে গেলে চলবে কেনোআমাদের চলনে বলনে বাঙালীত্ব যেনো প্রকাশ পায়

যেটা মনে রাখা খুবই জরুরী, একটি জাতির স্বকীয়তা থাকবে না সেটা কি করে হয়? এই বাঙালি উঁচু আসনে আসীন হবে এই প্রজন্মের হাত ধরে এটাই এদের কাছে আমার দাবি আমরা তোমাদের জন্য এইটুকু দিয়ে যেতে পেরেছি, সামনে নিয়ে যাওয়া এবং ভাবমূর্তিটাকে তুলে ধরে উচ্চতর জায়গায় পৌঁছানোর দায়িত্বটুকু সততার সাথে তোমরা পালন করবে এটাই চাই

আপলৌড  ২০ ফেব্রুয়ারী ২০০

 

আর্কাইভ8

 
 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.