|
বাংলা
ভাষার জন্য ভালোবাসা দেখতে পাই না-
হেনা দাস
[হেনা
দাস।
ভাষা সৈনিক।
সিলেটের মেয়ে।
জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারী ১৯২৪।
কলেজে পড়ার সময় পার্টির
নির্দেশে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে পার্টির
পরামর্শে আবার শুরু করেন।
কিছুদিন আগে স্ট্রৌক
হওয়ার পর থেকে এখন আর মনে রেখে ধারাবাহিকভাবে কথা বলতে পারেন না।
হুইল চেয়ারে বসে থাকেন।
দেখাশোনা করার জন্য আছেন
মেয়ে।
হেনা দাস থাকছেন ঢাকায় প্রকৌশল
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কোয়ার্টারে, তার মেয়ের বাসায়।
এবার জন্মদিনে তার সাথে
কথা হয় উদিসা ইসলাম।]
উদিসা
ইসলামঃ
আপনি যদি ভাষা আন্দোলনের
সময়ের কথা কিছু বলেন আমাদের।
হেনা
দাসঃ আমি তখন সিলেটে ছিলাম।
অনেক বাধা ছিলো পরিবার
থেকে।
আমাদের কিছুই করতে দেয়া হতো না।
কিন্তু মনে হয়েছে করা
তাই দরকার করেছি।
কি করতে পেরেছি জানি না।
উদিসাঃ
আমরা কি আপনাদের সেই সম্মান দেখাতে পেরেছি আজও?
হেনা
দাসঃ আমরা মানে অনেক নারীই আলাদাভাবে সম্মান পাইনি।
এখন আর চাইও না।
আজকালকার
ছেলেমেয়েদের মধ্যে বাংলা ভাষার জন্য ভালোবাসা দেখতে পাই না যখন, মানুষ খেতে পারে না
দুবেলা যখন তখন নিজেদের ব্যর্থ মনে হতে থাকে।
উদিসাঃ
আন্দোলনে যে নামলেন কি ভেবে নেমেছিলেন?
হেনা
দাসঃ দেশটাকে সুন্দর করবো ভেবেছিলাম।
আর তার জন্য নিজের
ভাষাটা আগে দরকার।
যখন উর্দুকে
রাষ্ট্রভাষার কথা বললো তখন শুধু এটাই মনে হয়েছিলো যে, কিছু বুঝি না বাংলাকে
রাষ্ট্রভাষা রাখতে হবে।
পরের দিনই জানো, সিলেটের
চৌহাট্টায় প্রথম শহীদ মিনার বানিয়েছিলাম, নিজেরা ইটের পর ইট দিয়ে।
উদিসাঃ
নির্মাণের সময় কারা সাথে ছিলো? মনে আছে?
হেনা
দাসঃ ঠিক মনে নাই।
উদিসাঃ
ওই সময় কোথায় পড়তেন?
হেনা
দাসঃ স্কুল কলেজ শেষ করে পার্টির নির্দেশে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছিলাম।
তারপর ৫২'র পর পার্টির
নির্দেশেই শুরু করলাম পড়ালেখা।
তারপর ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হয়েছি।
উদিসাঃ
এখনকার ছেলেমেয়েদেরকে দেখে কি মনে হয়?
হেনা
দাসঃ সত্যি বলি আমরা এমন চাইনি।
এরা এমন হয়েছে তাদের
আধুনিক বলা যায় না।
আমরা সব ইংলিশম্যান হয়ে
গেছি।
আমরা পড়ি ইংরেজিতে, লিখি
ইংরেজিতে এবং আমাদের গোড়াটা এখন ইংরেজিতেই হচ্ছে।
এসব চাইনি আমরা।
উদিসাঃ
ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রদের নিয়ে কিছু বলেন
হেনা
দাসঃ ওদের আর কি দোষ? ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসটা ওদের জানানো দরকার, পড়ানো দরকার।
না জানলে জানবে কিভাবে??
ভাষা আন্দোলন কি, কবে কেনো হয়েছিলো তা ওদের জানানো দরকার।
কি হয়েছিলো তখন।
এগুলো জানতে হবে।
আধুনিক মানে সব দিক দিয়ে
আধুনিক, পোশাকে না।
উদিসাঃ
ওই সময় আপনাদের নেতা কারা ছিলো?
হেনা
দাসঃ আশু সেন, রবীন্দ্র দত্ত এরা আমাদের নেতা ছিলেন।
উদিসাঃ
২১ ফেব্রুয়ারী সকাল থেকে কি করেছিলেন সেটা কি মনে আছে?
হেনা
দাসঃ অতোকিছু মনে নাই।
শুধু মনে আছে আমরা ১৪৪
ধারা ভাঙবই ঠিক করেছিলাম।
তবে আমরা পারব কিনা সেই
দ্বিধা ছিলো।
কিন্তু জিদও ছিলো সবার মধ্যে।
কেনো যেনো মনে হয়েছিলো
এটা করতে না পারলে চলবে না।
উদিসাঃ
মেয়ে কতোজন ছিলো?
হেনা
দাসঃ মুসলিম মহিলা লীগের কয়েকজন ছিলো।
জোবেদা রহমান চৌধুরী
ছিলো।
এরপর
নিজের মনেই কথা বলতে থাকেন হেনা দাস।
জোবেদা রহমানের গল্প।
জানো, একটা কর্মসূচিতে
জোবেদা রহমান চৌধুরী মহিলাদের নিয়ে গেছেন।
মঞ্চে সেদিন কাজী নজরুল
ইসলাম ছিলেন।
সেখানে তিনি মঞ্চে উঠে জোবেদা
রহমান চৌধুরীকে ডাকলেন।
এবং বললেন, 'আপনি
মেয়েদের নিয়ে কাজ করবেন কিভাবে, বোরখা পরে তো সব মেয়েদের আপনি আগ্রহী করতে বা টানতে
পারবেন না।
আপনি সেক্ষেত্রে কি করবেন?'
জোবেদা রহমান ছিলেন তেজী।
তিনি কাজী নজরুল ইসলামকে
জিজ্ঞেস করলেন,'আপনি কি করতে বলেন আমাকে?' নজরুল বললেন, 'বোরখা খুলে ফেলতে হবে।'
সেইদিন সেইসময় জোবেদা রহমান মঞ্চে দাঁড়িয়েই বোরখা খুলে ফেলেন, আর পরেননি।
এরপর
হেনা দাস ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
সারাদিন জন্মদিনের
শুভেচ্ছার ধকলের পর বিশ্রামের সময় হয়ে আসে তাঁর।
আপলৌড
২০ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ |