London:

Home

Archive

Contact

About us

সম্পাদকীয়

কলাম

সাক্ষাতকার

সাময়িকী

ঘুরে দেখি লন্ডন

পাঠকের কলম

কী-কখন-কোথায়

পত্র-পত্রিকা

 রেডিও

টেলিভিশন

ফটো-গ্যালারী

সত্যজিৎকে ফিরে দেখা

সাক্ষাৎকারঃ বার্ট কারডুলো

অনুবাদঃ এনুমা এলিস ও মনজুরুল আহসান

শুরুর আলাপ

১৯৮৪ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ঘরে-বাইরে প্রদর্শনের পর থেকে সত্যজিৎ রায় অসুস্থ হয়ে পড়েন পরপর দুটি হার্ট এ্যটাক, বাইপাস অপারেশনের কারণে তিনি এ-সময় কোনো পূর্ণ-দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরীতে হাত দিতে পারেননিতবে চিকিৎসক পুরো বিশ্রামে থাকতে বললেও সত্যজিৎ নিজেকে নিষ্ক্রিয় রাখেননিএসময় তিনি শিশুতোষ পত্রিকা সন্দেশের জন্য কাজ করেন, ছেলে সন্দীপ কিছু কাজের সঙ্গীত পরিচালনা ও চিত্রনাট্য তৈরী করেন১৯৮৭ সালে তিনি বাবা সুকুমার রায়ের জীবন, লেখা, প্রবন্ধ নিয়ে একটি ডক্যুমেন্টেশনের কাজ করেন১৯৮৯ সালে এক গ্রীষ্মের দিন যখন আমি তার সাক্ষাতে যাই, তখন তিনি তার ২৬তম ছবির কাজে মাত্র হাত দিয়েছেনসুসংবাদ হলো হ্যানরী ইবসেনের নাটক 'এনিমী অব দ্য পিপল' থেকে তৈরী সিনেমা 'গণশত্রু ' বাজারে আসে ঠিক পরের বছরইআর খারাপ সংবাদ হলো, ১৯৯২ সালের এপ্রিলে আমরা সত্যজিৎকে হারালাম; মৃত্যুর আগে শাখা প্রশাখা ও আগন্তুক নামের দুটি অসাধারণ সিনেমা উপহার দিয়ে গেলেন তিনিকলকাতার প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তার বাসায় আমরা বেশ কয়েক ঘন্টা তার চলচ্চিত্রের জীবন নিয়ে আলাপ করি

১. যখন আপনার কোনো একটা সিনেমা দর্শকপ্রিয়তা পায় না, বা সমালোচনা আপনার পক্ষে যায় না, তখন কেমন লাগে?

সত্যি কিছু-কিছু ছবির প্রতিক্রিয়া আমাকে অবাক করেছেযেমন, অরণ্যের দিনরাত্রিএটা ভারতে খুব সমাদৃত হয়নি কোনো সফলতা পায়নিকিন্তু বিদেশে আমার যে-কয়টি ছবি সমাদৃত হয়েছে, এটি তার একটিএ-ছবিটা লন্ডনে টানা চলেছে, আমেরিকায় অনেক সমাদৃত হয়েছেআমি বলতে চাচ্ছি, এমনটাই ঘটেএটাও জরুরীআপনি জনগণের পছন্দ, অপছন্দ, ভারতীয়দের বিষয়ে তাদের আগ্রহ বুঝতে পারবেন, পশ্চিমা সমালোচনা অনেক কখনও কখনও কাজের ভারতের কথা বলতে গেলে আমি মনে করি, বছর-জুড়ে আমি নিশ্চিতভাবেই কলকাতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারিআমার তৈরী করা যে-কোনো সিনেমা এ-শহরের ৩টা পৃথক প্রেক্ষাগৃহে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ চলেকলকাতার জনগণের একটা বড়ো অংশ আমার পরবর্তী ছবির অপেক্ষা করে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিতআমার দর্শকের পরিমান দিনে দিনে বাড়ছে এবং এ-অঞ্চলকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে সেটা অবশ্যই ভালো খবর

২. মনের ভিতর এমন কোনো কাজের স্বপ্ন খেলে নিশ্চয় যা এখনো করে উঠতে পারেন নি?

ওহ্‌, এমন অনেক অনেক কিছু আছে যা আমি করতে পারলে খুশি হতামকিন্তু সেগুলো কোনো-কোনোটার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন, আর কোনো-কোনোটা বেশ জটিল কাজআমি মহাকাব্য ধরে কিছু একটা করতে চাই আমি ভিন্নমাত্রায় গাঁথা নিয়ে কাজ করতে চাই ধরা-বাঁধা বর্ণনাধর্মী যে-সব কাজ এখন পর্যন্ত করেছি, সেরকম করে না সহজ কিন্তু বেশ একটা স্টাইলের কিছুআমি নিশ্চিত না এ-ধরণের সিনেমা দেখার দর্শক আছে কি-না তাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব তো কাউকে না কাউকে নিতে হবে হয়তো মহাভারত, রামায়নের মতো মহাকাব্য থেকে আমি কিছু একটা করতে পারবোবিশেষ-করে মহাভারতটা আমাকে টানে আমি ইতিহাস-নির্ভর আরো চলচ্চিত্র বানাতে চাই সেটা হতে পারে মুঘলদের ধরেমুঘল আমলের বেশকিছু চরিত্র আমাকে আগ্রহী করে তোলেঅষ্টাদশ-উনবিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন জায়গা থেকে বৃটিশদের আগমনের সময়টা নিয়ে কিছু করার আগ্রহ আছেআমি আজও এগুলো ধরে ছবি বানানোর স্বপ্ন দেখি

৩. আপনি আপনার সিনেমাগুলোতে সামাজিক সমস্যা নিয়ে বেশি কাজ করেননি বলে ভারতে কেউ কেউ আপনার একটা সমালোচনা করে থাকেনএ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?

এটা ঠিক সত্য নয় আমি মনে করি সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে চলচ্চিত্রে প্রচুর কাজ করেছিহয়তো সেগুলোর উপস্থাপন অনেকের মন মতো হয়নিতারা চান সিনেমার শেষ নাগাদ সমস্যাগুলোর সমাধান থাকুককিন্তু আমি নিজেই তো অধিকাংশ সমাধান জানি নাআমি চেষ্টা করি সমস্যাগুলোকে যতোটা সম্ভব পরিস্কারভাবে তুলে ধরতে এবং দর্শকদের তাদের নিজস্ব চিন্তার খোরাক দিতে

আপনার কথা মতো আমি ধরে নিচ্ছি অশনি সংকেত ছবিটিতে বাংলার দুর্ভিক্ষ যেভাবে দেখিয়েছি আপনি তার কথা বলছেন হ্যাঁ ঠিক আছেএর বাস্তবতার কিছু দিক আমি আপনাকে বলতে পারি১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের সময় আমি কলকাতায় থাকিবিজ্ঞাপন ডিজাইনিং এর একটা কাজ পেলাম হাজার হাজার মানুষ তখন জোয়ারের মতো কলকাতায় আসছেমনে পড়ে রেলস্টেশনগুলো কাজ-হীন আশ্রয়-হীন মানুষে লোকারণ্যমানুষ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপনীতহয়তো অনেকেই কিছু দিনের মধ্যে মারা যাবে রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো মাড়িয়েই প্রতিদিন আমাদের কাজে বেরুতে হতোএর দশ পনেরো বছর পরে আমি বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাসটা পড়ি তিনি ওইসময় গ্রামে থাকতেনবইটি ছিল মূলতঃ তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনাএটা ছিলো ১৯৫৮/৫৯ সালের ঘটনা আমি খুব দ্রুত উপন্যাসটাকে চলচ্চিত্রে রূপ দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললামকিন্তু এর জন্য উপযুক্ত শিল্পী খুঁজে পাচ্ছিলাম না এবং এমন আরও অনেক কিছুই ঘটলো এ-বাস্তবতার মধ্যেই অন্য কিছু চলচ্চিত্রের কাজও করলামশেষে ১৯৭২ সালে দূর্ভিক্ষ নিয়ে চলচ্চিত্র অশনি সংকেত নির্মানের সিদ্ধান্ত নিলাম

কিন্তু আমি একটা স্ববিরোধী দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলার দূর্ভিক্ষকে হাজির করেছিএরকম একটা পরিস্থিতিতেও গ্রামে একজন অতিথিকে যেভাবে উদারতার সাথে গ্রহণ করা হয়; বিশেষ করে অতিথিটি যদি শহর থেকে এসে থাকেনআপনি গ্রামে যান, যে-কোনো বাড়ীতে ওরা আপনাকে খাওয়াবে এক ঘন্টার মধ্যে সেখানে আপনার এক বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবেতাদের নিজেদের সামর্থ খুব সামান্যই কিন্তু একজন অতিথি তাদের কাছে ঈশ্বরতূল্যএটাই ভারতীয়দের ধর্মঅশনি সংকেতে একজন বৃদ্ধলোকের মধ্য দিয়ে দূর্ভিক্ষের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটেছেতার স্ত্রী বলছেন, আমরা অবশ্যই তাকে একবেলা খাওয়াবোতার স্বামীটি বেশ চালাকির আশ্রয় নেয়, কিন্তু তার মধ্যে ক্রমশঃ পরিবর্তন আসছিলোসে বলে, না, ও একজন ফকিরআমি জানি সে ভিক্ষা করার জন্য এসেছে, আমাদের খুব সতর্ক থাকা দরকার; অবশ্যই আগে নিজেদের খাবার নিয়ে চিন্তা করা উচিতস্ত্রী বলে, না, দরকার নাইআমি দুবেলা না খেয়ে থাকবো, তাও চলো ওকে একবেলা খাওয়াই স্বামীটি একই সাথে একজন পুরোহিত, স্কুল শিক্ষক এবং ডাক্তার সে কোনো-কিছুই বিশেষ জানতো নাকিন্তু গরিব কৃষকদের গ্রামে একমাত্র ব্রাক্ষ্মণ হিসেবে তার মর্যাদা ছিলোতখন সে কলেরায় আক্রান্ত রোগী ঝাড়তে যায় কিন্তু যাবার আগে সে স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান বিষয়ক বই দেখে এবং ঝাড়-ফুঁকের অনুষ্ঠানও প্রচলিত রীতিতেই সম্পাদন করে শেষে যেন কথার ছলেই সে নদীর পানি বা মাছি বসা খাবার খেতে নিষেধ করেএ ধরণের বিষয়গুলো আপনি জানেন প্রগতি বলুন বা বিজ্ঞান বলুন সে একভাবে তা বিশ্বাস করে

খুব ভালো, চমৎকারকিন্তু শুরুতে সে একজন অসাধু ব্যক্তি ছিলকারণ সে গ্রামের এইসব গরীব মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিতোশেষে যখন দূর্ভিক্ষে এক অস্পৃশ্য নারী মারা যায় এবং কেউ তাকে ছুতে পর্যন্ত নারাজ, তখন এ-ব্রাক্ষ্মণ স্বামীটি ঘোষণা করে আমি যাব, এর জন্য কিছু করতেই হবেআমি নিজে মৃতের শেষকৃত্যানুষ্ঠান করবোসুতরাং শেষ দিকে এসে এ-সব কুসংস্কার থেকে সে নিজে মুক্ত হয় এবং কাজটা করতে পারেমানবতা তার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়

৪. ভারতে সেন্সরশীপ কি একটা বড়ো সমস্যা?

রাজনৈতিকভাবে বলতে গেলে হ্যাঁসব চলচ্চিত্রই সেন্সর হয়

৫. আপনি কি এ-ধরণের কোনো সমস্যায় পড়েছেন?

না, আমাকে পড়তে হয়নিসম্ভবত এ-কারণে যে, ভারতে আমার একটা বিশেষ অবস্থান আছেযেমন ধরুন দ্য মিডলম্যান সিনেমায় আমি বিষয়গুলো বেশ খোলামেলাভাবে দেখিয়েছিযদি এটা অন্য কেউ করতেন, তাহলে তার রাজনৈতিক দিকগুলো হয়তো সেন্সর করা হতোকিন্তু আমি এ-মুহূর্তে কিছু কিছু বিষয় বের করে নিয়ে আসতে পেরেছি

৬. আপনি কখনও সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন বা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে কাজ করেছেন?

নাযদিও আমার অধিকাংশ বন্ধুই বাম ঘরানাররাজনীতির ব্যাপারে আমার মোহ-ভঙ্গ হয়েছে এবং এখন এ-সব নিয়ে আর চিন্তাও করি নাআমি এখন রাজনীতি বিষয়ক আলোচনাতো বটেই, সংবাদপত্র পড়াও ছেড়ে দিয়েছিব্যক্তিই আমার কাছে বিবেচ্য, তার রাজনীতি নয়

একটা রাজনৈতিক চিন্তা-ধারা আছে যদিও এটাকে রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার ব্যাপারে সচেতনতা বলতে পারেন, বিশেষতঃ আমাদের ভারতের ক্ষেত্রেআমি দেখতে পাই, রাজনীতিকরা ও তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চরম অসততা এবং বালখিল্যতায় পূর্ণএরা গিরগিটির মতোই এতো ঘন-ঘন রঙ বদলায়, যে তাদের সাথে তাল মেলানো খুবই কঠিনপাশাপাশি মস্তিস্কের সামর্থেররতো সীমাবদ্ধতা আছে; আমার মস্তিস্কে রাজনৈতিক ক্ষেত্রের সব বিষয়গুলোকে ধারণ করার মতো ফাঁকা জায়গা অবশিষ্ট নেই

৭. রাজনৈতিক সক্রিয়তা সৃষ্টিশীলতাকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে?

এটা ঘটেছে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সোভিয়েত ইউনিয়নে নিয়ে যানযখনই তারা যে-দেশে আধুনিক জীবন নিয়ে সিনেমা বানানোর চেষ্টা করেছে, দেখবেন তাদের কাজগুলো সাদামাটা আর দ্বিমাত্রিক হয়ে গেছেএকই সাথে তারা আবার তাদের অতীতের সাহিত্য-নির্ভর খুব ভালো কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেনচলচ্চিত্র নির্মাতারা সেখানে খুবই সঙ্কুচিত বোধ করেনএকবার মস্কৌ চলচ্চিত্র উৎসবে গ্রিগরী চুখরাই আমাকে বলেছিলেন যে, তিনি ব্যালাড অফ এ্যা সৌলজার নির্মাণের পর কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননিকারণ রাজনৈতিক অজুহাতে তার প্রায় আশিটির মতো পাণ্ডুলিপি অনুমোদন পায়নিএখন স্টুডিওতে বসে অন্যদের কাজ দেখেনমার্ক ডনস্কি তাঁদের চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের ভাবনা জানতে চেয়েছিলেন এবং বলেছিলেন কেনো আমরা ওগুলোকে স্রেফ আবর্জনা বলি না

৮. তাহলে বর্তমান সমাজে একজন শিল্পী কি ধরণের রাজনৈতিক মতামত ধারণ করতে পারেন?

একজন শিল্পী হিসেবে আমি এমন একটা মুক্ত পরিবেশ চাই, যেখানে আমার পছন্দ-মতো কাজ করতে পারবোআমার আর কোনো মতামত নেই

৯. তারপরও বুঝা যায়, আপনি বামদের প্রতি সহানুভূতিশীল, সম্ভবতঃ এ-কারণে যে আপনার প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী ভারতের গরীব গ্রামবাসীদের জীবন নিয়ে নির্মিত

একই সাথে আমাকে অনেকেই বলেন আমি জলসা ঘরে সামন্তবাদকে এরকম অনুমোদন দিয়েছি যেনো আমি সেখানে সামন্তবাদকে দুষিনি বরং এর প্রতি সহানুভূতিশীল

১০. পথের পাঁচালি নির্মানের পেছনে কি কি নন্দনতাত্ত্বিক বা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকসমূহ কাজ করেছে?

মনে হলো, আমি যদি এ-সিনেমাটা তৈরী করি, তবে সেটা বাংলা চলচ্চিত্র ভিন্ন দিকে মোড় নিবেকোনো সন্দেহ নেই এ-ব্যাপারটি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেভাবলাম চলচ্চিত্রে প্রথম কাজ হিসেবে আমি একটা আদর্শ বিষয় পেয়েছিঅনেকে মনে করবেন, পথের পাঁচালি তৈরী করার আগে আমি ইংল্যান্ড ছিলাম এবং সেখানে ইতালীয় কিছু বাস্তববাদী সিনেমা দেখেছি কিন্তু ইংল্যান্ড যাবার আগেই আমি এ-পরিকল্পনাটা নিয়ে বেশ কয়েকজন পেশাদার মানুষের সাথে কথা বলেছিলামতারা বললেন, এভাবে সিনেমা বানানো সম্ভব না তুমি একটা গোটা সিনেমার দৃশ্যায়ন আউট-ডৌরে করতে পারবে নাসেখানে আবার সব শিল্পীই নতুন সাজসজ্জা ছাড়া স্টুডিওর বাইরে একটা সিনেমা বানানো খুবই কঠিনএভাবেই আমাকে পথের পাঁচালি নির্মাণের উদ্যোগ নিতেও নিরুৎসাহিত করা হয়কিন্তু সিনেমাটি তৈরী করলাম, যা আমাকে প্রচলিত দর্শকদের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করতে সমর্থ করেছেতারপরও যেহেতু একটা উচ্চমার্গীও সিনেমা বানানোর উদ্দেশ্য ছিলো না তাই সম্ভাব্য দর্শকের দৃষ্টি-ভঙ্গির ব্যাপারে আমার নিজস্বএকটা হিসেব ছিলো

১১. চলচ্চিত্র জগতের সবচাইতে সৃজনশীল (অন অব দ্য ক্রিয়েটিভ ফৌর্সেস) শক্তিগুলোর একজন আপনি যখন কোনো সিনেমা নিয়ে চিন্তা শুরু করেন, তখন নিশ্চয় কিছু অনুভূতি আপনাকে ভিতরে-ভিতরে আন্দোলিত করেএসময় আপনাকে কি বেশি আকৃষ্ট করে একটা স্থির প্রতিচ্ছবি, চিত্রায়নের স্থান (লোকেশন) নাকি নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র?

সত্যি, সবগুলোই জড়াজড়ি করে থাকেতবে আমি বলবো চরিত্রগুলো এবং মানব সম্পর্কই সব চাইতে কর্তৃত্বশীলএরপরে আসে পারিপার্শ্বিকতা এবং গল্পটাকে কতোটা সিনেমাটি কীভাবে গতিশীল করা যাচ্ছে, সে-বিষয়গুলো শৈল্পিক চলচ্চিত্র নির্মাণে অন্য যে-দিকগুলোতে আমার মনোযোগ থাকে, ছবির চিত্রায়নের ধরণ, এর আভ্যন্তরীন বৈশাদৃশ্য ও নাটকীয়তা এগুলো সবই একে অপরের সাথে ওতপ্রতোভাবে জড়িতআরও আছে রাসার উপাদান ভারতীয় বিশেষ নন্দনতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে নাভা-রাসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণনানান মেজাজের মিথস্ক্রিয়ার (ইন্টারপ্লে) মধ্যে রাসাকে চিত্রিত করা হয় একটা শৈল্পিক কাজে নানান চরিত্রের যে-ধরণের প্রকাশ থাকে

এখানে সংখ্যাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারআমি মনে করি, আমার বিজোড় সংখ্যক চরিত্র চাইআমার ছবিগুলো যদি খেয়াল করেন দেখবেন, সেখানে তিন, পাঁচ বা সাতটি চরিত্র উঠে আসছেআপনি জানেন প্রশ্নাতীতভাবেই 'ত্রয়ী'রও এখানে একটা ভূমিকা আছেযেমন, 'চারুলতায়' পাঁচটি চরিত্র, এখানে যদি চারটি ব্যবহার করতাম তাহলে হয়তো সমস্যা হতোপাঁচটি চরিত্রের ব্যবহার সিনেমাটার নাটকীয়তা সামান্য হলেও বাড়িয়ে দিয়েছে

১২. কোথাও আপনি বলেছিলেন, চারুকলায় পড়ার সময় শেখা যাবতীয় সবকিছুই আপনার চলচ্চিত্র নির্মাণে কাজে লেগেছেএ-প্রশিক্ষণ কীভাবে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুললো? যেমন একবার আপনার চলচ্চিত্র এবং চিত্র-কর্মের সাদৃশ্য এঁকেছিলেন, বিশেষ করে পিয়েরে বৌনার্ডের চিত্র-কর্মগুলো

এমন-কিছু সাদৃশ্য-মূলক কাজ আমি করেছিকিন্তু অবশ্যই আক্ষরিক অর্থে নয় আমি বৌনার্ডকে পছন্দ করি তিনি যেভাবে তার চিত্র-কর্মে সব-কিছু সূক্ষভাবে হাজির করেন, মানবদেহও যেখানে চেয়ার টেবিল ফলভর্তি পাত্র বা ফুলদানিতে ফুলের তুলনায় মূখ্য হয়ে ওঠে না কোনোটার থেকে কোনোটা কমও না বেশিও না একটা মাত্র মিশ্রণ এবং সবকিছুই সেখানে প্রকাশ পাচ্ছেকিছু সিনেমায় আমি একই ধরণের প্রকাশ ঘটাতে চেয়েছি সব বিষয়গুলোকে এমনভাবে একত্রিত করা, যেনো সবগুলোই পরস্পর সম্পর্ক-যুক্ত এবং সমান গুরুত্বপূর্ণআপনাকে বুঝতে হবে, একটা প্রেক্ষাপটে সবগুলো চরিত্র পরস্পর সম্পর্কিতবিষয়বস্তু ও ঘটনা একটু বর্ণনাত্মক এরা সবকিছু মিলেই একটা অর্থ তৈরী করে সমগ্রকে না ভেঙে আপনি এখান থেকে কোনো উপাদান আলাদা করতে পারবেন নাএবং আপনি পুরো ছবিটা না বুঝে ছোটো একটা ব্যাপার ধরতে পারবেন না

আমি এ-ধরণের অর্গানিসিটী সবসময় কার্টিয়ার ব্রেসনের স্থির-চিত্রগুলোতে এমনকি মুখ-চিত্রগুলোতেও পাইএকটা ছবিতে সার্ত্রেও উপস্থিতি এমন নিসপ্রভ যেনো তার চারপাশের সবকিছুই আপনার চোখে আসেদেখা যাচ্ছে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে তার চারপাশের সবকিছু আপনার চোখে ধরা পড়ে; ব্রিজ, ল্যাম্পপোস্ট তার পিছনের দালান-কোঠার অবয়ব, সবকিছুইআপনি কোনো অংশই অস্বীকার করতে পারেন না কারণ, পুরোটা নিয়েই এ-স্থিরচিত্র যেখানে ব্যক্তিটিকে উপস্থাপন করা হয়েছেএকইভাবে ম্যাতিস তার কবুতরগুলো মাঝে বসে আছে যেনো কবুতরগুলো ও ব্যক্তি অস্তিত্ব মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেছে এটা কার্টিয়ার-ব্রেসনের করা আর একটা প্রতিকৃত

১৩. আপনার সকল পাণ্ডুলিপি আপনার নিজের লেখা- এর পিছনে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ আছে কি? একে উপযোগী করে তোলা হয়, না-কি একইরকম থাকে? যদিও আপনি কখনো অন্য পরিচালকের জন্য লেখেননি

আমি সবসময় এভাবেই কাজ করছিএকবার আমি আমার এক সহকারী - যিনি পরবর্তীতে পুরোদস্তুর পরিচালনার কাজ শুরু করেন - তার জন্য একটা পাণ্ডুলিপি লিখে দিয়েছিলামতিনি চেয়েছিলেন তার প্রথম চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপিটা যেনো আমিই লিখে দিইকিন্তু চিত্রনাট্যকার হিসেবে অন্য কারওর জন্য আমি ঐ এশটি কাজ করেছিআমার মনে হয় একজন লেখক নিজে তার পাণ্ডুলিপিকে সবচাইতে ভালোভাবে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে পারেননা হলে, পাণ্ডুলিপি বুঝার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে বা এর থেকে সর্বোচ্চ আহরণ সম্ভব নাও হতে পারেএকজন পরিচালক নিজেই তার চিত্রনাট্য লিখবেন, এটা আমার কাছে নিয়মের মতো

১৪. আপনার কাজে কার্টিয়ার-ব্রেসন কতোটা গুরুত্বপূর্ণ?

একদম শুরু থেকেই আমার কাজে কার্টিয়ার ব্রেসনের প্রভাব রয়েছেতার আলোকচিত্রগুলোতে অসাধারণ গাঠনিক শক্তি রয়েছে, যাকে শেষ পর্যন্ত অর্গানিক বলা যায়তিনি সব ধরণের ভিন্নমুখী বিষয়গুলোর নিঁখুত মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে পারেন এবং একই সাথে একটা নিখুঁত আদলের বোধ অর্জন করেন আমি তাঁর রসিকতাও বেশ উপভোগ করিআমাকে সব চাইতে বেশি আকর্ষণ করতো তাঁর মানবতাবাদ, মানুষের জন্য উদ্বেগ, যা সব-সময় সমঝোতা ও সহানুভূতির সাথে প্রকাশ পায়

১৫. এমন একটা বিষয়ই আমি জানতে চাচ্ছিলামআপনি যখন বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তখন কি কোনো বাধা অনুভব করেন, যা আপনি সবসময় কাটিয়ে উঠতে চান?

হ্যা, অবশ্যইযেমন 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ীতে আমি ইংরেজি ভাষার অংশে এসে আমি বেশ স্বস্তি বোধ করলামকারণ আমার হিন্দি, ইংরেজির মতো অতো ভালো নাতাই যদিও শতরঞ্জ কি খিলাড়ীর ইংরেজি সংলাপ আমি নিজেই লিখলাম, কিন্তু সজ্ঞতির পাণ্ডুলিপি যা আমার নিজেরই লেখা এবং ইংরেজিতে, তাকে আবার হিন্দিতে রূপান্তরিত করতে হলোএবং আমি কখনওই জানলাম না যে, সংলাপগুলো আদৌ ভালো বা যথাযথ হয়েছে কি-নাএমনকি অভিনয় শিল্পীদের মহড়ায় যেখানে আমি নিজে আলাদা আলাদা চরিত্রের অভিনয় করে দেখাই, তাও হিন্দি সিনেমার ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়েযেহেতু ভাষাটা জানা নাই তাই পাত্রপাত্রীদের শুধুমাত্র করণীয়গুলো নির্দেশনা দিতে পারিনিজে আলাদা আলাদাভাবে অভিনয় করে দেখাতে পারি নাতাই হিন্দি সিনেমার ক্ষেত্রে নতুন মুখ আমি খুঁজি না, শুধুমাত্র অভিজ্ঞদের নিয়েই কাজ করি

১৬. আপনি কি হিন্দী ছাড়া আরো কোনো ভাষায় সিনেমা তৈরী করবেন?

নাহ্‌, কখনোই না

১৭. ইংরেজিতে?

হয়তো করবো সেক্ষেত্রে আমার দেশীয একটা গল্প নির্বাচন করবো; সত্যি বাইরের চলচ্চত্র নির্মাণের কোনো আকাঙ্ক্ষা আমার নেইএকটা ছবি যেখানে ইংরেজি কথোপকথন যৌক্তিক যেমন, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে লোকজন আসছে, তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য তারা হয়তো ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করছেআমার দেশে আমি হয়তো ইংরেজি ভাষার এমন সিনেমা বানাতে পারি

১৮. দেশের বাইরে ভারতীয় সিনেমার ভাবমূর্তি সম্পর্কে কিছু বলবেন? এবং ভারতীয় সিনেমা কি সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারছে?

বিদেশে ভারতীয় সিনেমার ভাবমূর্তি কেমন এটা আমার জানা নেই, আসলে পশ্চিমে আমার সিনেমাগুলোই প্রদর্শিত হচ্ছেকিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আমার সিনেমা দেখানো না হলেও প্রচুর বৌম্বের সিনেমা দেখানো হয়আমি জানি না, বিশেষতঃ মধ্যপ্রাচ্যে ভারতীয় সিনেমার ভাবমূর্তি ঠিক কেমন? অনেকে আক্ষেপ করেন, আমি বাদে অন্য পরিচালকদের প্রচুর রপ্তানিযোগ্য সিনেমা তৈরী হয় নাকিন্তু মনে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে দর্শকরা অনেক বেশি বিনোদনমূলক আর চটকদার সিনেমাগুলোই দেখেনআর যাই হোক, ভারতে বহু সুন্দরী নায়িকা এবং সুদর্শন নায়ক রয়েছেঅনেক ভাল ভাল গায়কও আছেনকিন্তু এ-সব সিনেমা দেখে এ-দেশ সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া সম্ভব নয় এবং যদি মধ্যপ্রাচ্যের দর্শকদের কেউ এমনটা চেস্টা করেন, তবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় তারা কানাগলিতে ঢুকে পড়বেন

আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নে আসি ভারতীয় সিনেমা সাধারণ মানুষের চাহিদা পুরণ করতে পারে কি-না, সে-ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছেবিশেষ-করে বৌম্বে চলচ্চিত্রগুলোতে বিত্ত-বৈভবের ছড়াছড়ি দেশটিকে (ভারত) কেনো আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে বিলাসবহুল বাড়ী, অভিজাত পোশাক ইত্যাদির সমারোহ থাকেএটা ভারত সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে একটা ভুল ধারণা দেয়কিন্তু আমার মনে হয় না, বিদেশীদের মধ্যে ভারতীয় সম্পদ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি আছেতারা জানে এটা এমন এক দেশ, যাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভিক্ষা করতে হয় বৌম্বের সিনেমাগুলোকে তারা শুধু দেখার মতো বিষয় হিসেবে নিয়েছে, অনেকটা অভ্যস্ততার মতোতারা এ-সিনেমাগুলো দেখতে যায় কেবল বিনোদন লাভের জন্য, একটা দেশ হিসেবে ভারত সম্পর্কে জানতে নয়

১৯. একজন শহুরে মানুষ হয়েও আপনি এ-দেশটাকে, এর শহরতলিকে খুব ভালো জানেন

হ্যাঁতবে লোকালয়ের বাইরেটাই আমার পছন্দ বিজ্ঞাপন নির্মাণের সাথে যুক্ত থাকার কারণে ট্রেইনে চেপে বেরিয়ে পড়তাম, নকশা (স্কেচ) আঁকতাম ও ছবি তুলতাম ফলে, আমি বাংলা এবং এর লোকাচারের প্রতি গভীর টান অনুভব করিযেমন; বাজারগুলো ও গ্রামের মেলাগুলো আমার খুবই পছন্দ

২০. তারপরেও শিশুতোষ কল্পকাহিনী সোনার কেল্লায় আমেরিকান মারদাঙ্গা সিনেমার ছাপ দেখে বেশ অবাক হয়েছি

ঐ ছবিটা তৈরী করার সময় এমন দর্শকদের কথা মাথায় রাখা হয়েছে, যারা আমার বইয়ের ভীষণ ভক্ত কিন্তু আমার গুরুত্বপূর্ণ সিনেমাগুলো দেখার খুব একটা সুযোগ হয়নি কিন্তু সোনার কেল্লা নিপাট শিশুতোষ ছিলো নাএর আরও ভিন্ন কিছু দিক ছিলো মারপিটের এ-দিকগুলো রেনো এবং রোসোলিনির আমেরিকান শহুরে সিনেমাগুলোর প্রভাব চল্লিশের দশকে আমি এরকম বহু ছবি উপভোগ করেছি মনে আছে রাউল ওয়ালস, হাওয়ার্ড হোকস আর জন হিউস্টনের সিনেমা দেখেছিবিশেষ-করে হিউস্টনের 'বিট দ্য ডেভিল' ছবিটা মারদাঙ্গা ছবিগুলোর মধ্যে সেরা

২১. জাপানী সিনেমা আপনার কেমন লাগে?

আমিতো জাপানী সিনেমার বেশ ভক্ততাঁরা সত্যিই নমস্যআমি ওযুর আগের চলচ্চিত্রগুলো সম্পর্কে বিশেষ জানি নাতবে তিনি তাঁর কর্ম-জীবনের শেষ-ভাগে পুরোপুরিই জাপানী হয়ে গিয়েছিলেন হলিউড দ্বারা একদমই প্রভাবিত ছিলেন নাতিনি প্রচলিত রীতি নীতি সব গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেনআমি তার কিছু সিনেমা বারবার দেখেছি, আর অবাক হয়ে ভেবেছি লোকটা হলিউডের আদল বা ব্যকরণ কিছুই মানেননিওযুর আরো একটা দিক ছিলো যাকে কেউ নিজস্ব ভৌগলিক পরিবেশের প্রতি একাগ্রতাও বলতে পারেনএটা তার একদম নিজস্ব এবং এতোটাই মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি যে-চলচ্চিত্র নির্মাণের তথাকথিত প্রাথমিক পাঠ পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে

২৭. এটা কি সত্য যে, আজকাল ভারতে অনেক পরিচালক উঠে আসছেন, যারা নিজেরাই ক্যামেরার কাজ করেন?

আসলে ক্যামেরাম্যান-পরিচালক খুব কমই আছেনবিষয়টা পরিস্কার করে বলি আমি যা করি, তা হলো ক্যামেরা পরিচালনাএক কথায় আমি এটা চালাইযে-পরিচালক ক্যামেরা চালাতে পারেন, তারা একটা বড়ো রকমের সুবিধা পানকারণ এতে তারা বড়ো আত্মবিশ্বাস অর্জন করেনআমার ক্ষেত্রে যেটা হয়, আলোক-নির্দেশ সংক্রান্ত বিষয়সমূহ আমার তত্ত্বাবধানেই দেখাশোনা করে আমার লাইটিং ক্যামেরাম্যান যেহেতু এটা সিনেমাটোগ্রাফীর প্রধান দিক, আমি ক্যামেরা বা ক্যামেরাম্যানকে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখি নাএটা কাজের উপর আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ রাখতে সহযোগিতা করেকিন্তু আমি কখনও নিজেকে একজন ক্যামেরাম্যান বলব না

তাছাড়া, যতোটা মনে করতে পারি, ভারতে বা অন্য কোথাও অধিকাংশ পরিচালকদের মধ্যে কেউ নিজেই ক্যামেরাম্যান নন, তারপরেও সত্যিকারের বড়ো মাপের পরিচালকদের একটা সুনির্দিষ্ট ক্যামেরা স্টইল আছেআপনি আলোকচিত্র, রঙের ব্যবহার এসব দেখে বুঝবেন, এটা কোনো পরিচালকের কাজতাই এ-পরিচালকেরা ক্যামেরাম্যানদের পরিচালনা করেন এবং যতোটা সম্ভব করেনএটা সিনেমার জন্য একটা বাড়তি সুযোগ দুঃখজনকভাবে আমার দেশে ইউরোপীয়ন বা আমেরিকান মানের ভেন নিকভিস্ট ব গ্রেগ টোল্যাণ্ড এর মতো কোনো সিনেমাটোগ্রাফার নেই

২৮. তার মানে, আপনি বলতে চাইছেন ভালো পরিচালকের একজন ভালো ক্যামেরাম্যান তেমন দরকার নেই?

ঠিক ধরেছেন কারণ এ-কাজ দুটো খুব সম্পর্কিত নয় কিন্তু একজন ভালো পরিচালক অবশ্যই জানবেন লাইটিং এবং কম্পোজিশন কীভাবে করতে হয়এবং তিনি তার কাজে ক্যামেরাম্যানকে পরিচালনা করতে পারেনসবকিছুর পরেও ভিস্যুয়াল স্টাইল একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার মতামতেরই একটা অংশএটা কাঙ্ক্ষিতইচাছা-ছোলাভাবে বললে, যন্ত্রপাতি এবং কৌশলের ওপর নিয়ন্ত্রন, কীভাবে ক্যামেরা ব্যবহার করতে হয়, এটাকে কোথায় এবং কীভাবে বসাতে হয়, কীভাবে শব্দ ও আলো সামলাতে হয়, এগুলো যদি না জানেন, তবে সিনেমায় আপনি যতোই সামাজিক দায়বদ্ধতা বা নান্দনিক সংবেদনশীলতা জাহির করেন না কেনো, আমার মনে হয় না আপনি একটা সফল সিনেমা বানাতে পারবেন

২৯. আপনার কি মনে হয়, ভাবনার যে-জায়গা থেকে কর্ম-জীবন শুরু করেছেন এবং এখন যেভাবে ভাবেন, বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় আপনার পরিবর্তন এসেছে?

আমার ভাবনাগুলোর কথা বলতে পারবো নাকিন্তু আমার কৌশল সিনেমা ব্যকরণ পাল্টেছে এবং ফরাসী নয়া আন্দোলনের জন্য দায়ীবিশেষ-করে গদার নতুন-নতুন পথ দেখালেনমেইকিং পয়েন্টের কথাই ধরুন এবং তিনি অত্যন্ত তীব্রভাবে চলচ্চিত্র ব্যকরণের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেনএটা একটা অসাধারণ ব্যাপার ফলে ভারতীয় পরিচালকরা অনেক বেশি ক্লিপড হয়ে উঠেছিলেনফেইড ও ডিজল্‌ভে'ও ব্যবহার বেড়ে গেলোআমরা এখন অনেক বেশি টুকরো দৃশ্যের (কাট) ওপর নির্ভরশীলদর্শকরাও কিন্তু এগিয়েছেন যে-কারণে তারা এ-পরিবর্তনগুলোকে গ্রহণ করতে পারছেনআমাদের গল্প বলার ধরণটা আগে অনেক বেশি আমেরিকান ঢংয়ে ছিলোফরাসী, সুইডিশ ও জার্মান-সহ ইউরোপীয় প্রভাব এসেছে পরেসুতরাং আমরা যদি ৫০-এর দশকের একটা ভারতীয় সিনেমার সাথে আজকের একটার তুলনা করি, তাহলে দেখবো পরের সিনেমার কাহিনী বেশ শানিত হয়েছেএকটা প্রাসঙ্গিক ব্যাপার, যে-রকম একটা চরিত্রকে বক্তব্য ছাড়া তার অঙ্গভঙ্গি, চাউনি, কাজ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করা সবসময় খুব কঠিনআমার কাজের মধ্যে এ-ধরনের উপস্থাপন/প্রকাশ পাওয়া যাবে সম্ভবতঃ চারুলতায় কিন্তু অপু ত্রয়ী শেষ করার আগে পর্যন্ত একটা চরিত্র এভাবে উপস্থাপন করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো নাযখন আমি পরিচালনার কাজ শুরু করি, তখন এধরণের নীরব বাচন সামলাতেই পারতাম না

৩০. যখন আপনার শুরুর দিককার উদ্যোগগুলোর দিকে ফিরে তাকান, তখন কী মনে হয়? চলচ্চিত্র নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গি, অভিনয় শিল্পীদের পরিচালনার পদ্ধতি সবমিলিয়ে কোনদিকে কতোটা এগুতে পেরেছেন?

সব-কিছু বাদ দিলেও সংলাপ লেখায় আমার উন্নতি হয়েছে সর্বাধিকপথের পাঁচালি অপরাজিতর জন্য মাত্র পনেরো থেকে কুড়ি ভাগ সংলাপ লিখেছিবাকীটা মূল উপন্যাস থেকে নেয়া কখনও ভাবিনি আমি নিজে সংলাপ লিখতে পারবো এবং আমার প্রথম দুটি সিনেমার টাইটেল সংলাপ না ছিলো তাৎপর্যপূর্ণ না সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশকসংলাপ লেখায় এখন আমি আরও বেশি আত্মবিশ্বসী, বেশ সাবলীল, এটা ছিলো কাঞ্চনজঙ্ঘানির্মাণের সময় যখন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করলাম, আমি আমার সংলাপ পুরোটাই লিখতে এবং এমনকি একটা চরিত্র সৃষ্টি পর্যন্ত করতে পারিকল্পনা করতে পারি, সে-কীভাবে কথা বলবে বা তার আচরণ পর্যন্ত কেমন হবে

কিন্তু বিশুদ্ধ সিনেমাটিক ধারণাগুলো যতোখানি গুরুত্বপূর্ণ, পথের পাঁচালিতে তেমন আছে এবং বই (মূল উপন্যাস) থেকেও নেয়া হয় না এমন ধারণাগুলো আজও আমার সিনেমাগুলোতে বর্তমানপ্রথম ঐ সিনেমাটার প্রধান শক্তির দিক ছিলো এর অদ্ভুত উদ্দীপনার মুহুর্তগুলোযেমন; ইন্দিরার মৃত্যু, দূর্গার মৃত্যু, শেষে সাপের ব্যাপারটা, অপু-দূর্গার চোখে ট্রেইন চলে যাওয়ার দৃশ্যএগুলোর কোনোটাই উপন্যাসে ছিলো না এবং আজও আমি এ-দৃশ্যগুলো উপভোগ করি কিন্তু পথের পাঁচালিঅপরাজিত দুটি সিনেমাতেই আমি প্রচুর ওভারশট নিয়েছি এতো বেশি, যে মনে হয় এর অনেকগুলোই বাদ দিতে হতোআমার বেলায় এ-গাথুনি বা আনুপাতিক বোধটা এসেছে অনেক পরেআমি লেন্স বাছাইয়ের ব্যাপারে, ক্যামেরার সঠিক পজিশন বা মুভমেন্টের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস ক্রমশঃ অর্জন করেছি- অভিজ্ঞতার সাথে এগুলো সবই সহজ হয়ে গেছে চলচ্চিত্র নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়াটিই আমার জন্য বেশ দ্রুত এবং সুনিশ্চিত হয়ে উঠেছে

৩১. সংলাপ লেখার প্রসঙ্গে ফিরে আসিনাটক লেখা বা পরিচালনা করার ব্যাপারে আপনি কখনও ভেবেছেন? আপনিতো প্রচুর নাটক পড়েন এবং আমি জানি আপনি আজও তাই করেন জেনেছি আপনি একজন উন্মুখ থিয়েটার দর্শকও বটেনাটকের কলেজ থেকে আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা করা একজন মানুষ হিসেবে আমি এটা জানতে চাইছি

হ্যাআজকাল প্রচুর অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষ থিয়েটারের কাজ করেনআমি অবশ্যই বলবো চলচ্চিত্রে শৈল্পিক প্রতিভা বেশি নেইহয়তো এটা একটা প্রযুক্তিগত মাধ্যম বলেই ঘটেছেগোড়াতেই আমার মনে হয়েছে চলচ্চিত্রই বেশ, থিয়েটার আমার জগত নয়কারণটা হয়তো এ-যে ভারতীয় চলচ্চিত্র এমন পশ্চাদপদ ছিলো কিন্তু আমার মনে হতো সম্ভবতঃ একে এতোটা নেতিবাচকভাবে রেখে দেয়া ঠিক নাআমি কখনওই নাটক লেখা বা পরিচালনার কথা ভাবিনিশুধু চিত্রনাট্য লেখা যা আমার কাছে সরাসরি আসে এবং পরের কাজ অবশ্যই এদেরকে চলচ্চিত্রে রূপ দেয়া

৩২. নাটক থেকে চলচ্চিত্র নির্মানের কথা কখনও ভাবেননি?

গণশত্রু নির্মাণের আগে পর্যন্ত সত্যি ভাবিনি কারণ সিনেমা অনেক বেশি বক্তব্য-নির্ভর হয়ে পড়ে এবং আমি এতে আগ্রহী নাআমার মনে হয় একটা সিনেমার চূড়ান্ত মুহূর্তটা নির্বাক হওয়া উচিতযেখানে একটা নাটকে শব্দ (সাউণ্ড) খুব গুরুত্ব পায়নাটকের মধ্যকার এরকম একটা পরিস্থিতি সিনেমার মতো বা স্ক্রীন-উপযোগী হয়ে উঠতে পারেতবে কাউকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হয়, একজন মানুষ কতোক্ষণ পর্যন্ত নির্বাক থাকতে পারেআমার বিশ্বাস, আমি যেমনটা গণশত্রুতে করেছি অভিযোজনের সবচেয়ে ভালো উৎস হলো একটা দীর্ঘ ছোটো গল্পএকটা নাটকও নয়, বা কোনো উপন্যাসও নয়দু-ঘন্টা বা এরকম দৈর্ঘের চলচ্চিত্রের জন্য একটা দীর্ঘ ছোটো গল্প সব থেকে মানানসই সাহিত্যরূপ৪শ থেকে ৫শো পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস থেকে চার বা পাঁচ ঘন্টার চলচ্চিত্র নির্মাণ করা উপন্যাসটার প্রতি সুবিচার করা হয় না এমনকি আপনি যদি একে দুই বা তিন পর্বেও করেন, তাও হবে না

২২. রেনো নির্মিত দি রিভার কেমন? এ-সিনেমার ব্যাপারে আপনার মতামত?

ছবিটিকে সত্যিকারের ভারতীয় চলচ্চিত্র বলতে পারছি নাপটভূমি ছিলো ভারতীয় এবং একে অসাধারণভাবে ব্যবহার করা হয়েছিলনদীর তীর, নৌকা জেলে এবং সাধারণ ভূ-প্রকৃতি কিন্তু গল্পটা খানিক ভাববাদী বা আদর্শায়িত এবং খুব আকর্ষণীয় নয়এক ইংলিশ পাটকল ম্যানেজার ও তার পরিবারকে নিয়েএটা কখনওই একটা ভারতীয় গল্প নয় এবং এমনকি ভারতীয় প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা গল্প বললেও ঠিক বলা হয় নাএখানে সেখানে রেনোর ছোঁয়া পাওয়া যায় এবং সার্বিকভাবে আমি দি রিভার উপভোগ করেছিতবে একে তাঁর ফেঞ্চ সিনেমাগুলোর সাথে তুলনা করা যাবে না

৩৩. আমি খুব কৌতুহল নিয়ে খেয়াল করেছি, আপনি প্রায়শই অপেশাদার বা শখের বশে কাজ করতে আগ্রহী থিয়েটার কর্মীদের ভিতর থেকে অভিনেতা খুজে নিয়েছেনএ ধরণের পারফর্মারদের ব্যবহার করার বাড়তি কোনো সুবিধা আছে কি?

তেমন নাকারণ যারা থিয়েটারে অভিনয় করেন, তারা পেশাদার হন বা অপেশাদার হন কখনো কখনও চলচ্চিত্রে অভিনয় করে স্বস্তি বোধ করেন নাএখানে তারা সরাসরি দর্শকদের স্বীকৃতি পান নাচলচ্চিত্রে অভিনয়ের ছাড়া ছাড়া ভাব/নিরবচ্ছিন্নহীনতা/অনিরবচ্ছিন্নতা থিয়েটার অভিনেতারা পছন্দ করেন না তাদেরকে একটা ছোটো অংশের অভিনয় তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে করতে হয়, পর পর শটগুলো থেকে এডিটিং টেবিল পর্যন্ত চলে

৩৪. আপনার চোখে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সব থেকে হতাশা-জনক বিকাশ কোনটি?

বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের রং আর বড়ো পর্দায় চিত্রকল্পের কর্তৃত্ব এবং ধারাবাহিকভাবে সাদা-কালো সিনেমাকে শ্বাসরোধ করাতবে রংয়ের ব্যবহার কয়েক দর্শক আগের তুলনায় এখন বেশ ভালো তখন রং নিয়ন্ত্রণ করা যেত নারংয়ের মধ্য দিয়ে সবকিছুই অনেক সুন্দর, বেশ মনোরম দেখায়কিন্তু আজকের দিনে বাড়তি সুযোগ হলো রং আরও সূক্ষ্ম আরও খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো তুলে ধরতে পারেআপনি অবশ্যই একে খুব সাবধানে ব্যবহার করবেন যা'হোক, কোনো-কিছু পরিবর্তনের জন্য আপনি ল্যারেটরী ব্যবহার করতে পারেন নাআমি যদি পোষাকের কোনো রং পছন্দ করি, সিনেমাতেও ঐ রংগুলোই দেখাবোযেমন আমি যদি নীল এবং হলুদের উপর জোর দিই আমি রং সংশোধনের জন্য কোনো ল্যাবরেটরী চাইবো না

৩৫. আপনি এমন কাউকে পেয়েছেন, যাকে আপাতদৃষ্টিতে যোগ্য মনে হলেও অভিনয়ে অক্ষম এবং পরে তাকে বাদ দিতে হয়েছে?

না, এক্ষেত্রে আমি বেশ ভাগ্যবান আপনি শ্যুটিংয়ের আগেই স্ক্রীন টেস্ট করছেন এবং তখনই আপনি দেখবেন, কে অভিনয় পারছে আর কে পারছে নাসেটে শুধুমাত্র শিশুদের নিয়ে আমাকে কখনও কখনও সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছেযেমন, যে ছেলেটি পথের পাঁচালিতে অপুর চরিত্রে অভিনয় করেছেতার নাম সুধীর চক্রবর্তী এবং তাকে খুবই যোগ্য মনে হলেও একদম অভিনয় করতে পারতো না; অমনোযোগীও ছিলোতাকে অভিনয় করাতে আমাকে প্রচুর খাটতে হয়েছিলো- ক্যামেরার সাহায্যে আমার উদ্ভাবিত কৌশলও প্রয়োগ করতে হয়আপনি দেখবেন কিছু শিশু আছে যারা জন্ম-অভিনেতা কিন্তু পথের পাঁচালির সুধীর তেমনটা ছিলো না

৩৬. আপনি কি আপনার সিনেমার চিত্র-গ্রহণ বাইরে (লৌকেশন) করেন?

স্টুডিওতেও করি তবে আমি স্টুডিওর ভিতরে শিল্প নির্দেশনা এবং আলোর ব্যবহার নিয়ে খুব সতর্ক থাকিআমি চাই না একজন দর্শক বলতে পারুক এটা স্টুডিও বা অন্যকিছুঅবশ্যই স্টুডিওতে চিত্র-গ্রহণ সহজ কলকাতায় বহিঃদৃশ্যের চিত্রগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কঠিনসব-সময় আপনার চারিদিকে হৈ-হট্টগোল লেগেই থাকবেমাঝে-মধ্যে কাউকে হয়তো বাইরে চিত্র-গ্রহণ করতেই হয়তবে আমরা যখন করি, তখন খুব দ্রুত এবং হাতে ধরা ক্যামেরা দিয়ে করিযদি ছবির পরম্পরা (সিকোয়েন্স) দীর্ঘ হয়, তবে আপনি সমস্যায় পরতে পারেনভারতে পুলিসের ভাবমূর্তি খুব ভালো না হওয়ায় আমরা তাদেরও ব্যবহার করতে পারি না বরং পুলিস থাকলে হট্টোগোল আরও বেড়ে যায়মানুষ জড়ো হয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে কী হচ্ছেতাই নিজেদেরই পুলিসের দায়িত্ব পালন করতে হয়এখানে কেউ শুধুমাত্র দর্শক থাকতে চায় না

৩৭. একটা সম্পুরক প্রশ্ন, চিত্রগ্রাহকদের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন?

আমি শুরু করেছিলাম খুব ভালো একজন ক্যামেরাম্যান নিয়েকিন্তু সে একাধিকবার দৃশ্যগ্রহণের জন্য জোড়াজোড়ি করতোকম বাজেট নিয়ে কাজ করা একজন নির্মাতার জন্য একটা ভয়াবহ ব্যাপারতাই ঠিক করলাম আমি নিজেই ক্যামেরা ধরবো মাঝেমধ্যে ট্র্যাকিং শট নিতে গিয়ে দেখা গেলো, ক্যামেরাটা আমার নিজের কারণেই কেঁপে গেলোএটা কোনো সমস্যা নয়, যদি কাজটা ভালো হয়কিন্তু এ-লোকের চিন্তা শুধু ঐ কেঁপে যাওয়াটা নিয়েসে যে-কোনো মূল্যে মসৃণ চিত্র ধারণ করতে চায়ক্যামেরা চালাতে গিয়ে বুঝলাম, আমি যখন নতুন পাত্র-পাত্রী নিয়ে কাজ করি, তখন তারা আমাকে না দেখলে বেশ আত্মবিশ্বাসী থাকেআমি ক্যামেরার পিছনেই থাকি, ওখান থেকে ভালো দেখাও যায় আর ফ্রেইমিংটাও আমার মন-মতো করতে পারিঅন্যথায় ক্যামেরাম্যানের উপর আমার নির্ভর করতে হয় ফ্রেইমিং, টিল্টিং, প্যানিং, ট্র্যাকিং, সব-কিছুই সে করে তখন আপনাকে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় আপনি আসলে কী চানআমি আমার ফ্রেইমিং, ভিস্যুয়াল কম্পোজিশন ইত্যাদি নিজে করতে এতোটাই অভ্যস্ত যে, অন্য কোনোভাবে তা করার কথা ভাবিও নাএটা এমন না, যে ক্যামেরাম্যানের কাজের সমর্থের ব্যাপারে আমার আস্থা নেইএটা শুধু এমন একটা জায়গা, যেখান থেকে সব চাইতে ভালভাবে অভিনয় বিচার করা যায়তাই আমি অবশ্যই ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখি

সুতরাং আমি অন্য এক লোক সুব্রত মিত্রকে আমার লাইটিং ক্যামেরাম্যান হিসেবে ঠিক করলাম, সে সত্যিকারের একজন নবিশ ছিলো তার যখন একুশ বছর বয়স, তখন সে পথের পাঁচালির চিত্র গ্রহণের দায়িত্ব নিলোএর আগে সে কখনও ভিডিও ক্যামেরা চালায়নিআমার এমন একজনকে ব্যবহার করতে হয়েছিলো, কারণ পেশাদার যারা ছিলো, সবাই বলতো আমি বৃষ্টির মধ্যে এমন কি আউট ডৌরেও শ্যুট করতে পারবো নাএর পিছনে তারা কারণ দেখাতো, বাইরে সূর্যের আলো দ্রুত এবং ঘন ঘন পরিবর্তন হয়যখন নতুন ক্যামেরাম্যান পেলাম, দুজনে অনেক কথা-বার্তা বলে প্রাথমিক কিছু বিষয় ঠিক করে নিলাম যেমন, দৃশ্যগুলো আমি আগেই মনে-মনে কল্পনা করে নিবো এবং ওগুলো থেকেই আমরা কাজ করবোপরবর্তীতে সবগুলো রঙিন সিনেমায় আমার প্রতিটা রঙিন স্কীম এবং পোষাক নির্বাচন অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ছিলোএগুলো কিনতে আমি অনেক সময় নিজেই চলে যেতামউপস্থিত (প্রাকৃতিক) আলো ব্যবহারের ব্যাপারে আমি এবং আমার ক্যামেরাম্যান একমত ছিলাম এবং টানটান বড়ো এক টুকরা কাপড় থেকে উৎক্ষিপ্ত আলো ব্যবহার করে এধরণের আলোর আবহ স্টুডিওতেই তৈরী করবো বলে আমরা লক্ষ্য-স্থির করলাম

৩৮. কী ধরনের কাপড়?

সাধারণ সাদা চাদর, যাকে আমরা লং-ক্লথ বলে চিনিআমরা সাদা চাদরের টুকরোগুলো দিয়ে ফ্রেইম তৈরী করেছিলাম, সে এক বিশাল ব্যাপার এবং পিছন থেকে আলো ফেলতাম তবে অবশ্যই রাতের দৃশ্যগুলোতে এটা করতাম না একবার যখন আলোর উৎসটা ঠিক হয়ে যায়, তখন আপনি যতোটা সম্ভব উৎসটাকে অনুসরণ করতে পারছেনএটা যদি একটা মোমবাতি একটা লণ্ঠন বা একটা বৈদ্যুতিক বাতিও হয়, আপনি উৎসটা বুঝতে পারবেনএটা বিষয়গুলোকে সহজ করে দেয় আপনি জানেন, প্রায় সাত-আট বছর পরে পথের পাঁচালি তৈরী করার সময় আমেরিকান সিনেমাটোগ্রাফার শীর্ষক একটি লেখাতে পড়লাম, লেখক (ভেন নিকভিস্ট) এ-উৎক্ষিপ্ত আলোক (বাউন্সড লাইট) উদ্ভাবনের দাবী করেছেনএটা ছিলো বার্গম্যানের থ্রু এ গ্লাস ডার্কলী নির্মাণের সময়কিন্তু আমরা এটা ব্যবহার করেছিলাম ১৯৫০ সালে

৩৯. আপনার চলচ্চিত্রগুলোতে একই জিনিষ বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতায় বা বাস্তবতায়, সমাজের নানান পরিবর্তনশীর স্তরে এমনকি ভিন্ন-ভিন্ন সময়ে উঠে এসেছেএটা আপনাকে এতোটা আকৃস্ট করলো কেনো?

এটা সত্য যে, কর্ম-জীবনের শুরুতে আমি এ-ধরণের বিষয়গুলো মূল্যায়ন করেছি, কিন্তু এখন কাহিনীগুলো বেশ বিস্তৃত দশ থেকে বারো বছর এ-সময়টা যখন কেউ পার করে এটা আমাকে তেমন আকর্ষণ করে নাআমি পছন্দ করি এ-দিনগুলোকে স্বল্প সময়ের ব্যাপ্তিতে যার মধ্যে চরিত্রটি একটা দুঃখজনক অভিজ্ঞতা নিয়ে পরিবর্তন বা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়-এটাই বিকাশ, পরিপক্কতা ও গতিএর একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে জনঅরণ্যে, যেখানে সময়ের ব্যাপ্তিটা এক বা দু-মাসের বেশি নয়এ-কম সময়ের মধ্যে একটা সৎ নিস্পাপ বালক সম্পূর্ণ বখে যায় এবং সশ্লেষে তখন এবং কেবলমাত্র তখনই তার নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতে পারেআমি অবশ্যই বলবো এ-গতি চরিত্রটির একটা নির্দিস্ট অবস্থা থেকে অন্য একটা অবস্থায় অভ্যন্তরীন রূপান্তরের - এটা আমাকে মুগ্ধ করেএমনকি আমার একটা পুরোনো সিনেমা মহানগরেও এমন আভ্যন্তরীণ পরিবর্তন পাবেন, সেখানে কাজ করতে চায় না এমন একজন নারী স্বামীর পীড়াপীড়িতে কাজ শুরু করে, সফলতা পায় ও স্বামীর ঈর্ষার মুখে পড়ে এবং এমনকি স্বামীটি যখন চাকরি হারায়, তখন কর্তৃত্বশীল হয়ে ওঠে তখন শেষ পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক পুনর্গঠিত হয়এ-সিনেমায় বেশ কয়েকটি পরিবর্তনের ধাপ রয়েছে, যা প্রায় সর্পিল ও উত্থান-পতনে গতিশীল এবং আপনার যদি এ-ধরণের কিছু না থাকে, আপনি অন্য সব কাজকর্ম করেও আমার মতো একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারবেন না

৪০. আপনি যেমন বলছেন, বছর-জুড়ে আপনি একটা পরিস্থিতির মনোস্তত্ত্বের ব্যাপারে অধিক থেকে অধিকতর আগ্রহী থাকতেন

বরং এভাবে বলি, আমি মনোবিজ্ঞানেই আগ্রহী এবং দেবী নির্মাণ পর্যন্ত এটা ছিলো এখন মনোবিজ্ঞান আমার কাছে কেন্দ্রীয় গুরুত্বের জায়গা

৪১. আপনি যদি একটা গল্প পান, যেখানে বাইরের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, আপনি কি একে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে আগ্রহী হবেন?

হ্যা, যদি বাইরের খুটিনাটিগুলো আসলেই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে আমি হয়তো জানতে চাইবো গল্পে সত্যিকারের মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটছেযদি চরিত্রগুলো আকর্ষণীয় না হয়, বা ভিতরে ভিতরে বিকশিত না হয়, তবে আমি সেখানে আগ্রহী না

 

৪২. পশ্চিমা ক্লাসিকাল সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগের প্রাথমিক কারণ কী?

দেখুন, আমাদের বাসায় রবীন্দ্র-সঙ্গীত ও ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শোনার প্রচলন ছিলোআমার কাকা ভীষণ সঙ্গীত-প্রেমী ছিলেনফলে উঠতি অনেক শিল্পীই আমাদের বাসায় আসতেন, গাইতেন ও বাজাতেনতখন থেকেই আমার ভারতীয় সঙ্গীতের সাথে সখ্য গড়ে ওঠেফলে এ-ক্ষেত্রটিকে জানতে আমার করণীয় আরো কিছু আছে বলে আমার পরবর্তীতে মনে হয়নি

অন্যদিকে, পশ্চিমা সঙ্গীতের ক্ষেত্রে নতুন কিছু আবিস্কারের উত্তেজনা ছিলোএকেবারে অচেনা জগৎ বেটোফেন এবং অন্যসব আমি কেবল পড়েছিআমাদের সঙ্গীতে যে-বিষয়গুলো নেই, সেগুলো নিয়ে কাজ করার আগ্রহ হবে না? এ-প্রচণ্ড উদ্যোম নিয়ে আমি অনেক বন্ধুর সাথেই আলাপ করেছি এবং মনে আছে ৩/৪ জন বাঙালী তরুণের পশ্চিমা ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতে এতো আগ্রহ দেখে বিভান এণ্ড কোং এর বিপননকারী রীতিমতো বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন

৪৩. আপনি ১৯৬৬ সালে বলছেন সিনেমা নির্মাণের প্রতিটি স্তরে আমি সিনেমাকে সঙ্গীতের ঝংকার হিসেবেই আবিস্কার করেছি যা আমার মনোযোগ কেড়েছেএ-মুহূর্তে, এটা একটা কষ্টসহিষ্ণ প্রক্রিয়া

হুম, বিষয়টা আপনি বুঝবেনবছরে হয়তো একবার আমি সঙ্গীত কম্পৌজ করে থাকিআমি যদি পেশাদার কম্পৌজার হতাম, তাহলে হয়তো এ-কাজটা করতে গিয়ে আমি অনেক বেশি সুবিধা ভোগ করতে পারতামআপনাকে সাথে-সাথে এটাও মনে রাখতে হবে, আমি একেবারে নিজের তাগিদে সঙ্গীতে একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তিএকটা সিনেমার জন্য শর্টহ্যান্ডের মাধ্যমে সুরগুলোকে টুকে রাখি আমি।...এখন এ-পুরো কাজের প্রক্রিয়াটা আমার কাছে যে-কোনোভাবেই খুব সহজ হয়ে গেছে, তারপরও এটা তো ঠিক পেশাদার কম্পোজার যতো সহজে পারে আমি ঠিক ততো দ্রুত সঙ্গীত ভাবনাগুলোকে কাগজে রূপ দিতে পারি নাএবং এ-কাজটা আমার জন্য অনেক সময়সাপেক্ষ এবং এক ধরণের দুশ্চিন্তাও কাজ করেসে-চিন্তা আরও বেড়ে যায়, যখন দেখি আমি যেমনটা চাই, সঙ্গীত পরিচালক তেমন করে বাজাচ্ছেন নাকেনো-না, এ-বঙ্গে তারা ভিন্নভাবে বাজিয়ে অভ্যস্ত

৪৪. এটা কি নিজে সঙ্গীতে খুব বেশি দক্ষ কি-না সেটা নিশ্চিত না থাকার কারণে? পথের পাঁচালিতে আপনি সে-সময়ের গুটি কয়েক পেশাদার সঙ্গীতজ্ঞর একজন রবি শংকরকে নিয়ে কাজ করেছেন এর কারণ কী?

রবি শঙ্করকে নিয়ে কাজ করার কারণ একমাত্র সেই আমার এতো কাছের ছিলো, যার সাথে আমি কাজ করে আরাম পাবোতার মতো একজনের সাথে কাজ করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলোসে নতুন ধরণের উপস্থাপনা হাজির করতে পারতো, যেটা সে-সময়ের বাংলা সিনেমা অন্য কম্পৌজারদের থেকে একেবারেই আলাদা ছিলো

৪৫. কাজ করার সময়টা কেমন ছিলো?

সে-সময় রবি শঙ্কর বিদেশে অনুষ্ঠান করা নিয়ে অনেক ব্যস্তআমি দিল্লী নাকি বৌম্বেতে চিঠি লিখলাম, পথের পাঁচালি বানাচ্ছি, সেখানে তাকে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে পেতে চাইতারপর তিনি যখন কলকাতা এলেন, তখন তার সাথে দেখা করলামসে খুব ছোট একটা পল্লী সুর ভাজলো খুবই সুরেলা লাইন গুনগুনিয়ে শোনালো আর আমার মনে হলো, পথের পাঁচালিতে এটাই চাইএবং সেটা পথের পাঁচালির শীর্ষ সঙ্গীত হয়ে দাঁড়ালো পরবর্তীতে পুরোটাই শঙ্করের কৃতিত্ব

৪৬. আমার মনে হচ্ছে, নেপথ্য সঙ্গীতকে চলচ্চিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন আপনি, যেটা ছাড়া নিজেকে প্রকাশ করা যায় না...

হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি চলচ্চিত্রে সঙ্গীত একটু বাড়তি কিছু যোগ করেকিন্তু বেশির ভাগ সময় আমরা সঙ্গীত ব্যবহার করি কারণ একটা দৃশ্য থেকে আরেকটাতে যাওয়ার পরিবর্তনটা দর্শকরা এমনি বুঝতে পারবে এ-আত্মবিশ্বাস আমাদের নেই ফলে আমরা এ-পরিবর্তনের আবহটাকে সঙ্গীত দিয়ে বুঝাতে চাইযদি সম্ভব হতো তবে আমি মিউজিক ছাড়াই করতে ইচ্ছুক, কিন্তু আমার মনে হয় না সেটা সম্ভব

আমার মনে হয় মিউজিক ছাড়া একটা লম্বা দৃশ্য দর্শকদের ক্লান্তির কারণ হতে পারেএটা সোজা কথামিউজিকের কারণে দৃশ্যটা এমনিতেই ছোটো হয়ে আসে এবং কিছু-কিছু ধরণের ছবিতে খুবই উন্নত প্রাকৃতিক শব্দ না থাকলে সঙ্গীত অবশ্যই প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দেয়অনেক সময় কিছু-কিছু সিনেমায় খুবই উন্নত মানের প্রাকৃতিক শব্দ না থাকলে সঙ্গীত অবশ্যই প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠেঅনেক সময় কিছু খসড়া দৃশ্যকে (ধারণকৃত রাশ দৃশ্য) লুকানোর জন্যই সঙ্গীত ব্যবহৃত হয়ডি-সিকার বাইসাইকেল থিফ, মিরাকল ইন মিলার, শ্যুসাইনে মতো সিনেমার কথাই ধরা যাক২য় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে অসম্ভব পরিস্থিতির মধ্যে এ-দৃশ্যগুলো করাকিছু খসড়া দৃশ্য ভীষণভাবে সঙ্গীত দাবী করে, আর সেটা সিকোগনিনি খুব চমৎকারভাবে সেখানে করেছিলেনও

৪৭. যদি সুযোগ পান তাহলে আপনার কোনো সিনেমাটার আবহ সঙ্গীতে পরিবর্তন চাইবেন?

সব কটার! যখনই আমি আমার কোনো সিনেমা দেখি, নিজে নিজে ভাবি, সুযোগ যদি পেতাম, সম্পাদনার কাজটা আরেকবার করতাম, আরেকবার মিউজিক এর কাজটা করতাম এখন তো রেকর্ডিংয়ের মান ভীষণভাবে বেড়েছে আমরা যেটা করতাম, শ্যুটিং শেষ হবার সাথে সাথে রাফ কাট শেষ করতে হতোএক ধরণের তাড়াহুড়ো ছিলো ফলে সবগুলো কাজই খসড়ার ওপর হতো এবং ভুগতেও হতোএভাবেই কাজ করতে হতোফলে, আমি যেভাবে যেটা চাই, সেভাবে করা সবসময় সম্ভব হয়নি

আজকের দিনে বিষয়গুলো অনেক সহজ হয়ে গেছেএখন আমি পুরো ডায়ালগ ক্যাসেট এ ধারণ করিতারপর প্রতিটি চরিত্রের কথার লাইনগুলো ধরে তালিকা করে নিই যাতে করে কোথায় কোন মিউজিক লাগবে, তা চট করে ঠিক করা যায়এবং এটা করার কারণ একজন পরিচালক হিসেবে সিনেমার খুঁটিনাটি সব আমার মাথায় থাকেফলে যদি আমি বাসায়ও কাজ করি এবং তুলনামূলকভাবে তাড়াতাড়ি করা সম্ভব হয়আমি ছবি বানানো বা মিউজিক করা দুটোই বিষয়গুলোর ভিতরে থেকে-থেকে শিখেছিএকজন নির্মাতা এ-নিয়মগুলো নিজের মতো করে বুঝে নেন

৪৮. এমন কোনো দৃশ্যের কথা বলতে পারেন যেটা মিউজিক দাবী করেছে, কিন্তু দেয়া হয়নি?

অপরাজিত, হরিহরের মৃত্যুর পরের দৃশ্য সর্বজয়া এবং অপু যখন গ্রামে ফিরলো দৃশ্যটাতে কিছুই দেখার মতো নেই, শোনারও নেই একেবারে লম্বা একটা দৃশ্যএখন এসে সেই দৃশ্য যখন দেখি, আমি অস্বস্তি বোধ করিকিন্তু রবি শঙ্কর এখানে কোনো মিউজিক দিতে চাননিএবং আমারও দিতে বলার মতো আত্মবিশ্বাস ছিলো না

৪৯. আপনার কোনো সিনেমায় খুবই শক্তিশালী অর্কেস্ট্রার প্রয়োজন হয়েছিলো?

জলসা ঘরযেখানে আমি জানতাম দীর্ঘ নীরবতা থাকতে পারে, যেটা অনেক বেশি মিউজিক দাবী করে

৫০. শেষ প্রশ্ন, এখনকার সময়ে ভিন্ন-ধারার মনোযোগী চলচ্চিত্রকাররা কী ধরণের সমস্যা ও সঙ্কটগুলোর মধ্য দিয়ে যায় বলে আপনি মনে করেন?

অন্যদের সম্পর্কে আমি ততোটা জানি নাআমি কেবল নিজের সম্পর্কেই বলতে পারিযে কি-না ছবি তৈরী করতে চায়, তার সামনে অর্থনৈতিক দিকটিই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়সম্ভবতঃ এমন পরিচালক পাওয়া যাবেই না, যারা তাদের প্রযোজক টাকা তুলে আনতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে চিন্তিত থাকেন নাকিন্তু আমি নিজে সেই কাতারের পরিচালক যে কি-না, একটা বিষয়ে যথেস্ট সচেতন যে, আপনাকে সৃজনশীল করে তুলতে অন্যরা এগুবেই কারও সহায়তা ছাড়া আপনি অসহায় এবং আপনি চলচ্চিত্রাঙ্গনে সৃজনশীল হতে পারবেন নাএকটা সাধারণ মানের সিনেমা তৈরীতেও টাকা ঢালতে হয়, যেটা সব-সময় আপনি নিজের গাঁট থেকে খরচ করার সমর্থ রাখেন নাযার জন্য অন্যদের ওপর নির্ভর করতেই হয়

আমার মনে হয় না সিনেমায় অস্পস্ট বা বিমূর্ত কিছু তুলে ধরার জায়গা ভারত হতে পারেযদি না আপনি নিজের টাকায় বা সুপার-৮ এ ছবি না বানানতেমন হলে আপনি যা মন চায় করতে পারেন এবং সময়ে-সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো খারাপ না, ভালোকিন্তু যখন আমি নিজেকে বাণিজ্যিক পরিসরে বিবেচনা করবেন, যেমনটা আমি করি, অবচেতনেই আপনি মূল দর্শকদের নিয়ে ভাববেনঅবশ্যই আপনি সাধারণ মানের নিচের দর্শকদের নিয়ে ভাববেন নাএখনও আপনি আপনার সিনেমার দর্শকদের কথা ভাবছেনএবং আশা করছেন এ-দর্শকরা আপনি যা করছেন তাতেই সাড়া দিবেকিছু অভিজ্ঞার পরই আপনি যেটা জানবেন, দর্শকরা সাড়া দেয় সেটাতেই যেটা সে মনে ধরতে সচেষ্ট থাকে

৫১. এবার সত্যি-সত্যি শেষ প্রশ্নআপনার সাক্ষাৎ পাওয়া এতো সহজ যে, আমি অবাকই হয়েছি আমি বলতে চাচ্ছি, আপনার কাছে পৌঁছাতে একজনকে শুধু একটা লম্বা সিঁড়ি ভাঙতে হবে, এটা অবিশ্বাস্য আমাকে কথা বলার সুযোগ দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই

ফোন বইতে আমার নম্বর আছে আপনি আমার দরজায় এসে কড়া নাড়তে পারেনআমার কাছে যে-কেউ আসতে পারেন, যারা আমার সাথে দেখা করতে চানআসলে, রোরবার সকালে যারা দেখা করতে আসেন, তারা প্রায় সাধারণ মানুষবড়ো-বড়ো তারকা বা সে-ধরণের কেউ না তাদের কেউ-কেউ আমি যখন বিজ্ঞাপনের কাজ করতাম তখনকার সহকর্মীআবার কেউবা আমার সিনেমা দেখে আমাকে কাছের ভেবেছে এমন মানুষশেষ-কথা হলো, নিজের চারপাশে উঁচু দেয়াল তুলে রাখাকে আমি বোকামি মনে করিআমরা আজকের দিনে যেভাবে কাজ করে যাচ্ছি, সেভাবেই কাজ করা অনেক বেশি আগ্রহোদ্দীপক, প্রাপ্তির ও উত্তেজনার

সাক্ষাৎকার গ্রহীতার পরিচয়: বার্ট কারডুলো তুরস্কেও এইজ ইউনিভার্সিটিতে নাট্যতত্ত্ব ও সিনেমা বিভাগে পড়ানবিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে তিনি এশোটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করেনযেগুলো স্টেইট ইউনভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে

আপলৌডঃ ১ জুন ২০০৯

 

আজকের প্রধান খবর8

জুলাই আর্কাইভ 8

আর্কাইভ8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.