|
বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮
আমরা প্রগতিশীল সমাজ নির্মাণ করতে পারিনি
- নাসিরউদ্দিন ইউসুফ
বাচ্চু
নাসিরউদ্দিন
ইউসুফ বাচ্চু।
নাট্যব্যাক্তিত্ব।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক
জোটের সভাপতি।
মুক্তিযুদ্ধের বীর-সেনানী।
গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকায়
ইউকে বেঙ্গলিকে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি কথা বলে বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের
স্বপ্ন, প্রগতিশীল শক্তির ব্যর্থতা,
যুদ্ধাপরাধের বিচার-সহ
নানান প্রসঙ্গে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জগন্নাথ
বিশ্বাস।
ইউকেবেঙ্গলিঃ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে-স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য ছিলো, তা কি
পূরণ হয়েছে?
নাসিরউদ্দিন ইউসুফঃ না,
সে-স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে
আমরা একটা ভূখণ্ড
পতাকা ও
পরিচয় ছাড়া কিছুই পাই নি।
যে-গণতান্ত্রিক
সাম্যবাদী রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা নিয়ে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম সেই
¯^cœ
সূদুর পরাহত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি
ভাষা-ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন ছিলো আমাদের লক্ষ্য।
কিন্তু ৭৫ এর পট
পরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশ ক্রমশঃ সে-লক্ষ্য থেকে সরে গেছে।
রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে
নেয় প্রতিক্রিয়াশীল পরাজিত শক্তি।
বিভিন্ন সামরিক ও
অগণতান্ত্রিক সরকারের আমলে ঐ শক্তি আরও পুষ্টি লাভ করে।
এখন তারা
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এতো শক্তিশালী হয়ে পড়েছে যে-রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে সরানো দায় হয়ে
পরেছে।
সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক
আন্দোলনের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ পর্যন্ত করা হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে।
এ-প্রেক্ষাপট মাথায়
রাখলে বলতে হয় আজকের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ-কালীন স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে।
আমরা চেয়েছিলাম সবার
জন্য অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
পেয়েছি সাম্প্রদায়িক
সঙ্কীর্ণ মনোভাবাপন্ন একটি রাষ্ট্র,
যা সাংবিধানিক ভাবে সবার
সমান অধিকার নিশ্চিত করে না
।
৫২-এর
মতো ভাষা-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র গঠনের
ক্ষেত্রে প্রগতিশীল শক্তি ব্যর্থ হলো কেনো
?
এ-প্রশ্নের জবাবে নাসিরউদ্দিন
ইউসুফ জানান, ব্যর্থ হওয়ার কারণ অনেক।
তিনি বলেন, প্রথমতঃ শেখ
মুজিবর রহমানের সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে স্বাধীনতা-বিরোধীদের বিচার করেননি।
ফলে স্বাধীনতা-যুদ্ধের
প্রতিক্রিয়াশীল অংশ শক্তি সঞ্চয় করে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
পরবর্তীতে তারা রাষ্ট্র
ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে রাষ্ট্রে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে
দিয়েছে।
এ-প্রতিক্রিয়াশীল আচরণের সময়
আমরা যারা প্রগতিশীল বলে নিজেদের দাবী করি তারা সঠিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারিনি।
ফলে পুরো জাতি আজ দ্বিধা
বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
আমরা
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশ গড়তে চাই অপরদিকে অন্য অংশটি এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
অবশ্য এ-দুই ধারা মাঝে
তৃতীয় একটি ধারা আছে যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ,
চেতনা এগুলো ভাল করে
বোঝেই না।
একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের
মাধ্যমে বিভক্ত জাতিকে আমরা এক পতাকার তলে আনতে পারতাম।
কিন্তু স্বার্থবাদী
রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য তা সম্ভব হয়নি।
মৌলবাদের উত্থান এর জন্য
দায়ী।
পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিকেও
কিছুটা দায়ী করা যেতে পারে।
এবারের
নির্বাচনের মাধ্যমে গুনগত পরিবর্তনের ব্যাপারে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ।
তিনি
মনে করেন মক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধের বিচার হবে কি-না,
সেটা পরের ব্যাপার,
তবে
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন হবে।
বিএনপি-জামায়াত আমলে দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপর লিখিত-অলিখিত বিধি নিষেধ
আরোপের সে-দম-বন্ধ পরিবেশ হয়তো আর থাকবে না।
তবে
ভোটের দ্বারা রাজনীতি প্রভাবিত হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারও হয়তো সংবিধানের
ধর্ম-নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
রাষ্ট্র কাঠামোর অন্যান্য ক্ষেত্রেও কতোটা সংস্কার করতে পারবে সে-ব্যাপারেও
সন্দিহান তিনি।
তবে
দুর্নীতিদমন ও জবাবাদিহিতার ক্ষেত্রে এবারের নির্বাচন একটি গুণগত পরিবর্তন আনতে
পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ।
ইউকেবেঙ্গলিঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা গেলো না
কেনো ?
নাসিরউদ্দিন ইফসুফঃ একেবারে সম্ভব হয়নি তা বলবো না।
ঘাতক-দালাল নির্মূল
কমিটি কিংবা এখনকার সেক্টর কমান্ডার্স ফৌরাম ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাংস্কৃতিক
সংগঠনগুলোতো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফল।
তবে অস্বীকার করব না যে,
এ-সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোতে গণ-মানুষকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়নি।
না হওয়ার একটি কারণ
রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ব্যর্থতা।
ইউকেবেঙ্গলিঃ সামনে ১৬ ডিসেম্বর|
এবার বিজয়ের মাসে একটা
গুরুত্বপূর্ণ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সব মিলিয়ে কোন
পরিবর্তনের আভাস কি দেখতে পান
?
নাসিরউদ্দিন ইউসুফঃ খুব আশাবাদী হতে পারলে ভাল লাগতো।
তবে বাংলার মানুষতো কখনও
হেরে যায়নি।
৫২,
৬৯,
৭১ এ তারা বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে,
বিজয়ী হয়েছে।
আমরা পতাকা,
ভূখণ্ড,
আত্মপরিচয় সব কিছুই
পেয়েছি কেবল একটি প্রগতিশীল সমাজ নির্মাণ করতে পারিনি।
যদিও জানি যে,
একটি অসাম্প্রদায়িক,
মুক্ত-চিন্তার সমাজ
নির্মাণ বহু-বর্ষের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং শ্রমের বিনিময়েই সম্ভব।
এবারের ১৬ ডিসেম্বরের
নির্বাচনকে সামনে রেখে আমি সে-পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিধ্বনী শুনতে পাই।
অনেক দূরে হলেও বোধ হয়
সামনে আলো আছে।
আপলৌডঃ
১৬ ডিসেম্বর ২০০৮ |