|
বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮
বুর্জোয়া দলগুলোর চরম ব্যর্থতার কারণেই দেশে মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে
-
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুজাহিদুল
ইসলাম সেলিম। স্বাধীনতার
পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রথম সহ-সভাপতি।
মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ
নিয়েছিলেন।
গড়ে তুলেছিলেন কমিউনিস্ট
পার্টি-ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী।
ছাত্র রাজনীতি শেষ করে
যোগ দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে।
বর্তমানে কমিউনিস্ট
পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশের
শীর্ষ-স্থানীয় বাম নেতাদের একজন।
বিজয়ের মাস উপলক্ষ্যে গত
২ ডিসেম্বর ইউকেবেঙ্গলির সাথে কথা বলেছেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
ঢাকায় সাক্ষাতকারটি
নিয়েছেন আবদুর রহিম হারমাছি।
ইউকেবেঙ্গলিঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমঃ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ সুদীর্ঘ সংগ্রামের
মধ্য দিয়ে।
বস্তুতঃ পাকিস্তান সৃষ্টির পর
দ্বিজাতি তত্ত্বের অসারতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা বিষয়ে উপলব্ধি জন্মে বাঙালীদের।
আর তার ভিত্তিতেই
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ।
পাকিস্তানের
দ্বি-জাতিকরণ,
ভাষা-ভিত্তিক জাতীয়তা, এ-সব বিষয়ক চিন্তা ক্রমশঃ বিকশিত হয়।
একই-সঙ্গে পাকিস্তানের
স্বৈরতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদ-তোষণ নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।
ধনীকে আরও ধনী ও গরিবকে
আরও গরীব বানানোর শ্রেণীগত বৈষম্যের বিষয়টিও বাঙালীরা মেনে নিতে পারছিলো না।
সর্বোপরি পাকিস্তানের
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যও মানতে পারছিলো না বাঙালী।
এসবের বিরুদ্ধে পরিচালিত
ক্ষোভ-হতাশা ও পাওয়া-না-পাওয়া আস্তে-আস্তে সংগ্রামে পরিণত হয়।
এর পথ
ধরে ১৯৫২র ভাষা আন্দোলন,
১৯৫৪ যুক্তফন্ট গঠন,
১৯৬৯-এর গণঅভ্যূথান,
ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন,
সর্বশেষ ১৯৭১-এ সশস্ত্র
যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।
এ-গোটা ধাপগুলোর চেতনারই
প্রতিফলন ছিলো ১৯৭২ এর সংবিধানে।
গণতন্ত্র,
ধর্ম-নিরপেক্ষতা,
জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র
হয় রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি।
কিন্তু দুঃখজনক হলো
১৯৭৫-এর পট-পরিবর্তনের পর আমাদের সংবিধানের এ-চার মূলনীতির দুটি বাদ দেয়া হয়েছে। এর
একটি ধর্ম নিরপেক্ষতা আর
অন্যটি সমাজতন্ত্র।
ইউকেবেঙ্গলিঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন হয়েছে কি?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমঃ এ-প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে
হচ্ছে স্বাধীনতার
৩৭ বছরেও আমরা মুক্তিযুদ্ধের
চেতনা বাস্তবায়ন করতে পারিনি।
উল্টো স্বাধীনতা-বিরোধী
জামায়াত, রাজাকার, আল-বদর ও আল-সামসদের উত্থান ঘটেছে।
এমনকি দেশের রাষ্ট্রীয়
ক্ষমতায় পর্যন্ত অধিষ্ঠিত হয়েছে তারা।
আমাদের প্রধান রাজনৈতিক
দলগুলোর ক্ষমতায় যাওয়ার লালসার কারণে স্বাধীনতা-বিরোধীরা বিভিন্ন সময়ে নানা-ধরণের
সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চেপে বসেছে।
একদিকে রাষ্ট্রীয় চার
মূলনীতি থেকে দুটি নীতি বাদ দিয়ে মৌলবাদীদের উত্থানের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ক্ষমতায় যাওয়ার
সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার হওয়ার কারণেও তাদের উত্থান ঘটেছে।
চার
মূলনীতির বাকি দুটি - অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র - প্রসঙ্গে মুজাহিদুল ইসলাম
সেলিম মনে করেন, এ-দুই নীতির কোনোটিই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
জাতীয়তাবাদ নিয়ে
বিভ্রান্তিকর বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে।
একটা মহল জাতীয়তাবাদের
ভাবধারার ভিতরে ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক উপাদান যুক্ত করে পাকিস্তানের
দ্বিজাতি-তত্ত্বকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
আবার আরেকটি মহল বাঙালী
জাতীয়তাবাদের ব্যাপারে বড়ো-বড়ো কথা বললেও এদেশে অন্যান্য যেসব ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠী
রয়েছে,
তাদের ব্যাপারে নেতিবাচক।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম জানান, বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ তথাকথিত
বিশ্বায়নের অজুহাতে এক ধারায় চলে এসেছে।
উভয়ে জাতীয় স্বার্থকে
সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ এবং
বিশ্বব্যাংক,
আইএমএফ-সহ বিভিন্ন বহুজাতিক
সংস্থার কাছে কেবল নতজানুই হয়নি,
এক ধরণের শর্তহীন
আত্মসমর্থনও করেছে।
এর ফলে দেশ নতুন করে
বিদেশী শোষণ ও আধিপত্যের শেকলে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন,
জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের
ধারায় ১৯৭১ সালে আমরা যে-মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম,
তার প্রধান যুক্তি ছিলো
সামাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে,
দখলদারদের কাছ থেকে
স্বাধীন জাতীয় সত্ত্বার বিকাশ ঘটানো।
ঐ মূল উপাদানটিই এখন
জলাঞ্জলি দেয়া হয়েছে।
তাই প্রশ্ন দাঁড়ায়,
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দূরের কথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আত্মমর্যাদা ও
সম্মান, এ-সবের কতোটুকুই
বা অবশিষ্ট রেখেছে বুর্জোয়া শাসক দলগুলো।
ইউকেবেঙ্গলিঃ আর গণতন্ত্রের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমঃ একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে,
আমাদের গণতন্ত্র
চূড়ান্তভাবে ক্ষত-বিক্ষত।
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে
সামরিক কর্তৃপক্ষের অধীনে দেশ পরিচালিত হওয়ায় গণতন্ত্রের এ-হাল হয়েছে।
সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক
প্রতিষ্ঠান-বিধিবিধানগুলোকে স্থগিত করা হয়েছে বারবার।
জারী করা হয়েছে জরুরী
আইন।
এভাবেই দেশ চলেছে অনেক বছর।
মাঝে-মাঝে নির্বাচিত
বেসামরিক সরকার এসেছে ঠিকই।
সে-সময়গুলোতে ক্ষমতার
কর্তপক্ষ হয়েছে আওয়ামী-লীগ,
বিএনপি-জামায়াত,
জাতীয় পার্টির মতো
রাজনৈতিক দল।
এ-সরকারগুলো মুক্তিযুদ্ধের
চেতনা-ধারা ফিরিয়ে আনার পথে যায়নি,
গণতান্ত্রিক শাসনকে
দৃঢ়মূল করার কোনো চেষ্টাও নেয়নি।
আগা-গোড়াই তারা সবাই
লুটপাটের অর্থনীতি,
সাম্রাজ্যবাদের নির্ভরশীলতা,
বিশ্বব্যাংক,
আইএমএফ-এর তাবেদারি,
দক্ষিণপন্থী
প্রতিক্রিয়াশীল নীতি অনুসরণ করেছে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম জানান এসব নীতি অনুসরণের ফলে বাজার অর্থনীতি একদিকে
লুটপাটতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে।
একইসঙ্গে উদ্ভব হয়েছে
বাজার রাজনীতির।
রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ,
দুর্বৃত্তায়ন,
দলীয়করণ,
আত্মীয়করণ,
মাস্তানতন্ত্র-এ সব
অনুসঙ্গ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
খুবই নিকৃষ্ট ধরণের
রুগ্নতা শাসক-দলগুলোকে গ্রাস করে ফেলেছে।
দেশ ও দলকে তারা বড়ো-বড়ো
কৌম্পানীর মতো পরিচালনা করছে।
সব জায়গাতেই কৌর্পোরেইট
কালচার।
একটি কৌর্পোরেইট কৌম্পানী
যেভাবে পরিচালিত হয়,
আমাদের এসব রাজনৈতিক দলগুলোও
সেভাবেই পরিচালিত হচ্ছে।
একজন সিইও (প্রধান
নির্বাহী কর্মকর্তা) থাকতে হবে,
তার হাতেই সব ক্ষমতা।
কৌম্পানী ভালো চললেই,
দেশ ভালো চলবে, এ-তত্ত্ব নিয়ে তারা পারস্পারিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।
এগুলো সবই গণতান্ত্রিক
চেতনা ও ধারা থেকে বহু দূরের ব্যাপার।
ইউকেবেঙ্গলিঃ দেশে মৌলবাদের উত্থানের পেছনে প্রধান কারণগুলো কী?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমঃ প্রধানতঃ শাসন পরিচালনায় বুর্জোয়া দলগুলোর চরম ব্যর্থতার
কারণেই দেশে মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে।
এছাড়া সাধারণ মানুষের
ইহলৌকিক জীবনের সমস্যাগুলো - যেমন, ভাত,
কাপড়,
চিকিৎসা,
বাসস্থান ইত্যাদি - না
দিতে পারার সুযোগ নিয়ে সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
মুক্তিযুদ্ধের পর যেভাবে
একটি গভীর সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংঘটিত করার কথা ছিলো, এ-ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের
পক্ষের শক্তির সীমাহীন অবহেলার সুযোগ নিয়েছে মৌলবাদীরা।
এর চেয়েও
বেশি দুঃখের ব্যাপার হলো ক্ষমতার খেলায় বড়ো দুটি বুর্জোয়া দলই এ-শক্তিকে বারবার মদদ
দিয়েছে।
সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তি
পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একবার এর কাঁধে একবার ওর কাঁধে বন্দুক রেখে স্বার্থ আদায়ে
সক্ষম হয়েছে।
চলমান
রাজনৈতিক সঙ্কট ও মৌলবাদের মোকাবিলার ক্ষেত্রে লুটেরা-বুর্জোয়া শাসকদের হাত থেকে
দেশকে মুক্ত করার উপরে জোর দেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
তিনি মনে করেন,
দ্বি-দলীয় মেরুকরণ-ভিত্তিক যে-ব্যবস্থা দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে,
তা থেকে বের হয়ে আসা
প্রয়োজন।
এদের কোনো নব-সংস্করণ দিয়েও
কোনো লাভ হবে না।
ক্ষমতায় নিয়ে আসতে হবে বাম
গণতান্ত্রিক ধারার শক্তিকে,
যারা ১৯৭২-এর সংবিধানের
পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে।
তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে
দেশের অর্থনীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
জানান, আসন্ন নির্বাচনে এ-লক্ষ্যে ষোল-আনা পূরণ করা সম্ভব না হলেও নির্বাচনে
বাম-শক্তিকে যতো বেশি সম্ভব বিজয়ী করে আনতে হবে-যাতে করে সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে
তারা পরবর্তী পর্যায়ে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিতে পারে।
আর
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারলে এবারের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী,
রাজাকার,
সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে
সম্পূর্ণভাবে পরাজিত সম্ভব বলে মনে করেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
।
আপলৌডঃ ১৬ ডিসেম্বর ২০০৮ |