|
বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮
বাংলাদেশের উচিত হবে সমস্যাগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং সম্ভাবনাসমহূকে বাস্তবে
রূপায়িত করা
- মাহমুদ হাসান এমবিই
মাহমুদ
হাসান এমবিই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ করেছেন ৪ নম্বর সেক্টরে। ঊনসত্তর-সত্তরে সক্রিয় ছাত্রলীগার হবার সুবাদে বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্টের সদস্য
ছিলেন। ১৯৭৯ থেকে ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বাস করছেন। ভলান্টারী সেক্টরে সফল পেশাজীবী
হিসেবে পরিচিত মাহমুদ হাসান বর্তমানে শিক্ষা-প্রতিবন্ধী সহায়ক সংগঠন এ্যাপাসেন্থ-এর
ম্যানেজার। এক সময় তিনি লন্ডনের ক্যামডেন বারায় লেবার দলীয় কাউন্সিলার
নির্বাচিত হন। ব্রিটেইনে বাঙালীদের সংগঠনসমূহের দক্ষতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যে
তিনি আম্রেলা অর্গানাইজেশন হিসেবে কনসৌর্টিয়াম অফ বেঙ্গলি এসৌসিয়েশনস প্রতিষ্ঠা করে
এর চেয়ার হিসেবে ভূমিকা রাখছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের
চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার বিষয়ে যত্নশীল মাহমুদ হাসান ব্রিটেইনে মুক্তিযোদ্ধা
সংসদের সক্রিয় সদস্য হওয়া ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের নেতৃত্ব-দান
করছেন।
বাংলাদেশের
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের সাঁত্রিশতম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ইউকেবেঙ্গলি মুক্তিযোদ্ধা
মাহমুদ হাসানের সাক্ষাতকার গ্রহণ করে।
নিচে
তার সম্পাদিত রূপ প্রকাশ করা হলোঃ
ইউকেবেঙ্গলিঃ
আপনি কি একজন মুক্তিযোদ্ধা?
কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন?
মাহমুদ হাসানঃ
আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা –
যুদ্ধ করেছি চার নম্বর সেক্টরে।
ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে আমি বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্টের সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালে
যুদ্ধ করেছি মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
মুক্তিযুদ্ধে যাবার পিছনে কী প্রেরণা ছিলো আপনার?
মাহমুদ হাসানঃ
আমি তখন ইন্টারমেডিয়েটের ছাত্র।
ঊনসত্তর
থেকে ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে আইয়ুব-বিরোধী
আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম।
সত্তরের
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর যখন ভূট্টোর প্ররোচনায় ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা
হস্তান্তরে টালবাহান শুরু করলো,
তখন আমরা বুঝে গিয়েছিলাম যে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা ছাড়া আমাদের
কোনো গত্যন্তর নেই।
ইউকেবেঙ্গলিঃ ১৯৭১
সালের ১৬ই ডিসেম্বর কোথায় ছিলেন এবং কী করছিলেন?
মাহমুদ হাসানঃ
১৬ ডিসেম্বরে সিলেট শত্রুমুক্ত হয়নি।
হয়েছে
১৭ তারিখ।
জেনারেল
ওসামানীর সাথে দেখা করে আমাদের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাই।
সে-সময়
শেখ কামাল জেনারেল ওসমানীর পিএ ছিলেন।
ওসমানী
আমাদেরকে ভারতে থাকা বাঙালী শরনার্থীদের দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসনের ব্যাপারে
আমাদেরকে আত্মনিয়োগ করতে বলেন।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলেন যদি,
তাহলে দেশ থেকে বিদেশে চলে এলেন কেনো? কবে
ছেড়েছেন দেশ?
মাহমুদ হাসানঃ
দেশ ছেড়েছি ১৯৭৯ সালে।
দেশ
স্বাধীন হবার পর সকলের মতোই আমিও আমার পরিবার-সহ
আমার চারপাশের মানুষের নতুন জীবন গড়ে তোলার কাজে সচেষ্ট হয়েছিলাম।
লেখা-পড়া
শেষ করে চাকুরী করার চেষ্টা করেছি।
এক
পর্যায়ে ব্যবসাও করেছি।
কিন্তু
স্বাধীনতার পর দেশে অপশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়,
তাতে মনে হয়েছিলো আমাদের যুদ্ধটা বৃথাই গিয়েছে।
সাধারণ
মানুষের উন্নততর জীবন নিশ্চিত হবার বদলে কতিপয়ের জীবন সমৃদ্ধতর করার ব্যবস্থা
প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বুঝলাম
দেশের আর্থ-সামাজিক
কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া মানুষের প্রকৃত মুক্তি আসবে না।
তাই সে-সময়ে
জাসদের রাজনীতির দিকে ঝুঁকলাম।
কিন্তু
হঠাৎ করেই ১৯৭৫-এ
যে ঘটনাটা ঘটে গেলো, তা ছিলো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।
সামরিক
শাসন জারী হবার পর বেশ কয়েকটি বছর গেলো রাজনীতি-হীনতায়।
প্রকৃত
অর্থেই সে-সময়ে
কোনো রাজনৈতিক দিক-দর্শন ছিলো না।
বলতে
পারেন,
এক রকমের হতাশা থেকেই দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
দৃশ্যতঃ এটি একটি ব্যর্থতা।
এর জন্য
কে বা কী দায়ী?
মাহমুদ হাসানঃ
এর জন্য দায়ী ভুল রাজনীতি ও ভুল রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
স্বাধীনতার আন্দোলন ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে যে-আকাঙ্খা
ও প্রস্তুতি তৈরী হয়েছিলো, সে-সময়কার
রাষ্ট্র-ক্ষমতায় আসীন নেতৃত্ব তার যথাযথ উপলব্ধি করতে
ব্যর্থ হয়েছে।
আসলে
যুদ্ধের সময়েই বুঝা গিয়েছিলো,
সে-নেতৃত্ব কমিটমেন্টের দিক থেকে কতোটুকু
দূর্বল ছিলো।
আমি মনে
করি স্বাধীনতার পর দেশ ও জাতির পুনর্গঠনে সঠিক নেতৃত্ব দানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ
হয়েছিলো সে-সময়কার
নেতৃত্ব।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
অপেক্ষাকৃত একটি উন্নততর দেশে একজন সফল পেশাজীবী হিসেবে যখন বাংলাদেশের দিক ফিরে
তাকান,
তখন আপনার কী মনে হয়? কী বলার আছে আপনার
বাংলাদেশের জন্য?
মাহমুদ হাসানঃ
আমি মনে করি বাংলাদেশে সমস্যা ও সম্ভাবনা,
দু-ই আছে।
বাংলাদেশের উচিত হবে সমস্যাগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং সম্ভাবনাসমহূকে বাস্তবে
রূপায়িত করা।
বাংলাদেশের আছে বিপুল প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ।
কিন্তু
দেশটির মূল সমস্যা হচ্ছে উপযুক্ত পরিচালনার অভাব
–
অর্থাৎ
নেতৃত্ব।
সুদক্ষ
ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের অধীনে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ
কাজে লাগালে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে প্রকৃত অর্থেই একটি সমৃদ্ধ দেশ।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
ব্রিটিশ বাঙালীদের এ-ক্ষেত্রে
কী করার আছে বলে আপনি মনে করেন?
মাহমুদ হাসানঃ
ভারত ও চীনের অনাবাসীরা যা করছে,
অনেকটা সে-করমই।
অর্থাৎ,
এখানকার বাঙালীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও দক্ষতা-অভিজ্ঞতা
ট্র্যান্সফার করে বাংলাদেশের জন্য বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
তা-হলে,
তা করছেন না কেনো? কে আটকাচ্ছে ?
মাহমুদ হাসানঃ
আটকাচ্ছে সদিচ্ছার অভাব।
আমি
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি,
আমরা চাইলেও বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের পক্ষ থেকে আমরা কোনো
সহযোগিতা পাই না।
বাংলাদেশের উন্নয়নে অনাবাসী বাঙালীরা কী ভূমিকা রাখতে পারেন,
তা সম্ভবতঃ বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব উপলব্ধি করতে পারছেন না।
ইউকেবেঙ্গলিঃ এখানে
আপনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের সাথে যুক্ত।
কী করেন
বা করতে চান এ-সংগঠনের
মধ্য দিয়ে?
মাহমুদ হাসানঃ
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন।
আমি
একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এ-সংগঠনে
আছি।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের মাধ্যমে আমরা এদেশে বাঙালী সম্প্রদায়ের মধ্যে
মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও তার অন্তর্নিহিত চেতনাকে তুলে ধরার চেষ্টা করি।
এ-দেশে
আমাদের নব-প্রজন্মের মধ্যে বাঙালী হিসেবে আত্ম-পরিচয়ের
বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক
ঘটনা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও
চেতনাকে মানুষের মধ্যে জীবন্ত বা পুনর্জীবিত করতে চাই।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের নিয়ে যে সেক্টর কমান্ডার্স ফৌরাম গঠিত হয়েছে এবং
তারা যুদ্ধাপরাধীদের
যে-বিচার দাবী করছে,
তাতে আপনার বক্তব্য কী?
মাহমুদ হাসানঃ
আমি মনে করি, এ-ফৌরাম
গঠন একটি সঠিক কাজ হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়াটা খুব জরুরী,
যা অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিলো।
কিন্তু
সেক্টর কমান্ডার্স ফৌরামের নেতৃত্বকে আরও বিচক্ষণ হতে হবে।
ফৌরামের
একজন নেতা যেভাবে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ঋণ-খেলাপী
হয়ে প্রার্থী হবার যোগ্যতা হারিয়েছে, তাতে আমি হতাশ হয়েছি।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের সাঁইত্রিতম বার্ষিকীতে ইউকেবেঙ্গলির পাঠকদের প্রতি
আপনি কী বলতে চান?
মাহমুদ হাসানঃ
বিজয়ের শুভেচ্ছা।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
ধন্যবাদ আপনাকে।
মাহমুদ হাসানঃ
আপনাকেও ধন্যবাদ।
আপলৌডঃ
১৬
ডিসেম্বর ২০০৮
|